স্নান ৩৫

স্নান-৩৫
একটি চিহ্নপরিপূরক ছোটকাগজ

 

সম্পাদক
দীপ্ত উদাস

 

বর্ণ বিন্যাস
স্নান

প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ
নাজ

 

গল্পক্রম

অলিখিত হলফ…
রহমতে রাব্বী….২
নশ্বর
অতন্দ্র অনিঃশেষ…৪
দ্বান্দ্বিক ছায়ার উপকথা
জে এ জিকু…৭
গল্পকারের গল্পের গল্প
শশি আলিওশা…৮
মুখোশ
মো. আমিনুর রহমান…১০
জন্মান্তর নায়কের সমুদ্রযাত্রা
রফিক সানি…১২
অন্য মানুষ
অরণ্য রহমান…২৮
অপরাধ ও শাস্তি
নাসিমুজ্জামান সরকার…৩৩

অলিখিত হলফ…
রহমতে রাব্বী

এক (অসংলগ্ন)
একটা গল্প শুনবি? প্রশ্নটা শুনে অবাক চোখে তাকালো স্নিগ্ধা। আঠারো বছরে মনে হয় প্রথম শুনছে কথাটা! কিন্তু তার নির্বাক চোখ যেনো কি একটা বলতে চায়। মায়াময় চোখে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। চোখটা নামিয়ে বললাম, চরম রোদ উঠেছে! চল্ বাসায় যাই। কথাটা বলেই পা বাড়িয়েছিলাম। কিন্তু ওর প্রশ্ন আমাকে থামিয়ে      দিলো— ‘কার বাসায়?’ একমুহূর্ত দাঁড়িয়েছিলাম বটে, তবে সেটা একমুহূর্তই।

দুই (বর্তমান)
সালাম সাহেব বসে আছেন। মাথার উপরে ফ্যানটা ফুলস্পিডে ঘুরছে। এসি নষ্ট বলে সেটা ছাড়া সম্ভব হচ্ছে না। তিনি ঘামছেন, ফ্যানের বাতাসে কাজ হচ্ছে না। এই মুহূর্তে এসি ঠিক করানোর চেষ্টা করাও সম্ভব নয়। তিনি কী করবেন সেটাও ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। কিন্তু তার করার মতো যথেষ্ট কাজ রয়েছে। তার ঠিক বাড়ির সামনেই সাদা কাফনে ঢাকা রয়েছে একটা লাশ। অনেক লোক সেখানে ভিড় করার কথা, কিন্তু কেউ নেই সেখানে। স্রেফ একটা মেয়ের লাশ পড়ে আছে। লাশের একমাত্র ওয়ারিশ কোনো ডিসিশনে আসতে পারছেন না। লাশটা পুলিশের মাধ্যমে আসবে তিনি একরকম ধরেই নিয়েছিলেন। কিন্তু এখনো পুলিশ আসছে না কেনো?

সাতদিনে পরিস্থিতি অনেকটা সহনীয় হয়ে এসেছিলো। মেয়েকে জীবিত পাওয়ার আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন সালাম সাহেব। প্রথম তিনদিনে সম্ভব সবকিছুই করেছেন তিনি। পুলিশ, সংবাদমাধ্যম, সামাজিক ওয়েবসাইট, স্নিগ্ধার বন্ধুবান্ধব সবাই জেনে গেছে খবরটা। আত্মীয়-স্বজন যারা এসেছিলো, তারাও আশা ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে। বাড়িতে সালাম সাহেব একা। বোধশক্তি হারানো একজন ব্যক্তি ইজিচেয়ারে বসে ঘামছেন।

পুলিশের জিপ এসে ঢুকলো স্নিগ্ধাবাসে। জিপের শব্দে সম্বিত ফিরে পেলেন সালাম সাহেব। উঠে দাঁড়াতে যাবেন সেই মুহূর্তে ওসি মোশাররফ দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন।
¬—সালাম সাহেব, আমরা দুঃখিত।
—চেষ্টা তো করেছেন এখন আপনাদের করণীয় কী?
—পোস্টমর্টেম।

তিন (বর্তমান-পূর্ববর্তী)
স্নিগ্ধা
মেরিট পজিশন- ১৩
আইন বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

এভাবেই মাসছয়েক আগে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলো স্নিগ্ধা। অনেকের মতো তারও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন পূরণ হয়েছিলো। বাবাসর্বস্ব পরিবারে আনন্দ বলতে তেমন কিছু ছিলো না তার, যদিও আর্থিক দিকটা উঁচুতেই ছিলো। তবুও স্বাভাবিক নিয়মে বখে যায়নি সে। বিশ্ববিদ্যালয়-ক্লাস-সবুজ চত্বরে আড্ডা-দুচারটা বন্ধু সবমিলে ভালোই চলছিলো।

চার (প্রতিনিয়ত)
পড়াশোনা না করলেও টুকটাক গল্প-উপন্যাস পড়া, ফেসবুক চ্যাটিং এসব করেই বিকেলটা কাটে স্নিগ্ধার। দুপুরে ঘুমাতে ভালো লাগে না বলেই এতোসব আয়োজন। সবকিছুর মাঝে যোগ হয়েছে রঙিন জীবনের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের ঘোরে হঠাৎ বেজে উঠলো সেলফোনের রিংটোন। একটা অপরিচিত নম্বর ওঠানামা করছে স্ক্রিনে।¬
—হ্যালো কে বলছেন?

পাঁচ (শেষের আগে)
উফফ সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠা কি যে কষ্টকর! শালার এতো পড়াশোনা করে ডাক্তার না হয়ে ডাকাত হলেই ভালো করতাম। আবার সেই কাটাকুটি! ঘুম থেকে উঠে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে নিজের কথা নিজেকেই শোনাচ্ছিলাম। পুরনো অভ্যাস, ঘুম থেকে উঠে জ্বালাতেই হবে একটা সিগারেট। প্রতিদিনের মতো ফ্রেশ হয়ে নাস্তাটা ফারুকের দোকানে সেরে নিলাম। হাসপাতালে যেতেই দেখি একটা পোস্টমর্টেম এটেন্ডেন্স রেডি। চেম্বারের ব্যালকোনিতে গিয়ে দ্বিতীয় সিগারেট ধরালাম। মাথাটা একটু ঘুরছে। তবে খারাপ লাগছে না, ব্যাপারটা উপভোগ করতে করতেই পেশাদারি মনোভাব নিয়ে পোস্টমর্টেম রুমে গেলাম।

মুখের কাপড় সরাতেই মায়াবী চোখজোড়ায় চোখ পড়লো। পুরোপুরি খোলা। অস্ফুটে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো— স্নিগ্ধা!

নশ্বর
অতন্দ্র অনিঃশেষ

ভয়ংকর রকমের বড় কবরস্থান। যেখানে রাতে প্রার্থনা করা হয়। মৃত মানুষের কাছে ভিক্ষা চাওয়া হয়জ্জঅনাগত কষ্টের প্রশমিত রূপে। সপ্তাহে দু’একদিন আখেরি মোনাজাত হয়। হালকা জিকির থেকে শুরু করে তসবিহ পাঠের আসর। নিয়ম কানুনের দরজায় তালা দিয়ে জানালা খুলে দেওয়া থাকে। উদারচিত্তে মগ্ন হয়ে রব উঠে কবরের পাশে। শান্তি! শান্তি! কিন্তু কবরে দাফন হয় দাফনের নিয়মে। নিয়মের বাইরে কিছু নিয়ম থাকে, যা বুক থুবড়ে মরে গেলেও কেউ জিকিরের মুষ্টি খোলে না। দুনিয়াতে কি একটি নিয়মই সৃষ্টি হয়েছেজ্জনারী-পুরুষ? যার ব্যতিক্রমে আতকে উঠি।  কবরের পাশে একটি জংগল আছে। এবং রূপকথার গল্পের মতো অনেকেই বিশ্বাস করে যে—সেখানে কিছু সুন্দরী নারী বসবাস করে। তাদের কাজ কবর পাহাড়া দেওয়া। কোনো এক রাতে আমি স্বপ্নে দেখলাম কবর জিয়ারত করতে গেছি। হঠাৎ পেছন থেকে এক ধরনের ভৌতিক আওয়াজ। আমি ভূতে বিশ্বাসী না হলেও যে ভয় পাই নাই তা কিন্তু নয়। বরং স্বপ্নগুলো সবসময় অন্ধকার হয়। এবং স্বপ্নের কোনো রঙ থাকে না। অন্ধকারময় স্বপ্নাসিক জগতের দৃশ্যপট সাজানো নয়। এই একমাত্র জায়গা যেখানে কোনো কিছু নিয়ম অনুযায়ী হয় না। সম্পর্কের বালাইকে ছুঁড়ে মেরে সাহসের সাতকাহন জাগ্রত হতে থাকে। তাই বাস্তবের চেয়ে স্বপ্নে বুকটা বেশি কাঁপে। আমি ভয়কে জয় করার নিমিত্তে সামনে আগাতে লাগলাম, দেখি অসম্ভব সুন্দরী… হাতে একটা বালিশ আর মাথায় জলজল করছে আলো। হঠাৎ তার কন্ঠে ভেসে আসলো  ‘এতো রাতে তুই কবরে? কোন মতলবে?’

আমি ভীতু চোখে তাকিয়ে বললাম, ‘সবাই তো এখানে প্রার্থনা করতে আসে।’

‘সবাই তো এখানে দিনে আসে তুই রাতে কেনো?’ তার ক্ষিপ্ত উত্তর।

ভয়ে ভয়ে তাকে বললাম, ‘দেখুন আমার মনে হয় আমি স্বপ্ন দেখছি না হলে আমি এতোরাতে এখানে আসবো কেনো?’

‘এখানে কেউ স্বপ্নে আসে না। তুই মিথ্যাবাদী, তুই প্রতারক। আর যে এখানে একবার স্বপ্নেও আসে সে তো মানুষ, না হয় সে পাখি, না হয় নগ্ন?’

‘কেনো? মানুষও তো নগ্ন হতে পারে, পাখির কথা না হয় বাদ দিলাম।’ এবারের কথাগুলো একটু নির্ভয়ে বলি ।

‘তুই একটা মুর্খ। তোর শরীরে জ্ঞানের বিন্দুসদৃশ্য নেই। মানুষ কখনো নগ্ন হয় না, নগ্ন হয় তার দেহ। তুই এখানে কি নিয়ে এসেছিস দেহ না মানুষ?’

অদ্ভুত প্রশ্নে আমি উত্তরহীন হয়ে পড়লাম। ভাবছি কখন চেতন পাবো আর একটু শান্তি মিলবে। ভাবতেই সে অদৃশ্য। এবার পেছন থেকে আওয়াজ— ‘কিরে কি ভাবিস? আমি চলে গেছি! হাঁ হাঁ… স্বপ্নরাজ্যে কেউ একবার আমার কাছে আসলে আমি আর তাকে যেতে দেই না।’

‘আসলে আপনি কে? বলুন তো কে? আমার কাল সকালে ঘুম থেকে উঠতে হবে আমায় মুক্তি দিন।’

‘তোকে তো আমি বেঁধে রাখি নি। তুই চাইলেই যেতে পারিস। তয় তুই যদি এখানে থাকিস তাহলে তুই জীবিত থাকবি আর যদি তোর স্বপ্ন ভেঙ্গে দেই তাহলে তুই মৃত অবস্থায় জাগ্রত হবি।’

‘এটা কি ধরনের কথা? আমি মৃত অবস্থায় জাগা পাবো কি করে? মরা মানুষ কি কখনো জাগতে পারে!’

‘তাহলে তুই মৃত… তুই একটা মৃত…’ তার হাস্যস্বরে ভেসে আসছে কথাগুলো।

‘আচ্ছা আপনি আমাকে কতোক্ষণ এখানে আটকে রাখবেন?’

‘যতোক্ষণ তুই মানুষ না হবি।’

‘কেনো আমি তো মানুষ! দেখুন আমি রক্তে মাংসে গড়া মানুষ।’

এবার তার কণ্ঠটা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে গেলো। এবং খুব জোরে চিৎকার করে বলল— ‘মানুষ কখনো স্বীকার করে আমি মানুষ? তুই কেনো ঢোল পিটিয়ে বললি— আমি মানুষ। যে মানুষ সে কখনো বলে না, আমি মানুষ। আসলে সে মানুষ না সে একটা পশু।

এবার নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছিলো। কেনো যে রাতে ঘুমাতে গেলাম আর কেনো যে স্বপ্ন দেখতে বসলাম। যে কথাই বলি সেই কথারই বিপরীত যুক্তি।

‘কি ভাবছিস? তুই খুব বিপদে? ভুল ভাবিস না, তুই খুব সুখে আছিস। পৃথিবীর সবচাইতে সুখে এখন তুই।’

‘আমার সুখ লাগবে না । আপনি আমাকে যেতে দিন।’

‘তোকে যেতে দিতে পারি তবে একটা শর্ত আছেজ্জযদি মানতে পারিস!

‘কি শর্ত?’

‘আমার গর্ভে তোর সন্তান চাই। কি, দিতে পারবি?

‘অসম্ভব! আর স্বপ্নে কখনো কারো সন্তান হয় নাকি?’

‘যদি না পারিস তাহলে আমার গর্ভে আমি তোকে নিয়ে নিবো। আর তুই আমার সন্তান হবি। তখন তোর আর কোনোদিনের জন্যেই ঘুম আসবে না। হয় তুই আমায় গর্ভবতী করবি, না হয় তুই আমার গর্ভে চলে যাবি।’

‘কীই-ই… বলেন!’ এবার আর সহ্য করতে পারলাম না। কান্নাকাটি শুরু করলাম। দৌড়াতে গিয়ে পা বেধে ওখানেই পড়ে গেলাম। জোরে চিৎকারও করতে পারছি না। পৃথিবীর কেউ আমার অসহায়ত্বের ডাক শুনছে না। আমি এবার শরীরে শক্তি জোগাতে লাগলাম কিন্তু আমার হাত পা অবোশ হয়ে যেতে লাগলো।

‘হাতে বেশি সময় নাই। যা করার তাড়াতাড়ি কর।

কথাটা শুনে একটু স্বস্তি পেলাম। হাতে সময় নাই মানে ভোর হলে সে অদৃশ্য হয়ে যাবে।

‘তুই যা ভাবছিস তা মিথ্যা। তুই ভাবছিস আমি অদৃশ্য হয়ে যাবো। ভুল, তোর ধরণা ঠিক না। আমি স্বপ্ন দেবী। আমার কথায় সারা বিশ্বের স্বপ্নের আলোকরশ্মি উন্মেচিত হয়। আমি স্বপ্নে কাউকে হাজার বছরও ধরে রাখতে পারি। বিধাতা আমাকে স্বপ্নের সকল দায়িত্ব দিয়েছেন।’

‘আপনার যখন সব দায়িত্ব, তখন দেবী হিসাবে কর্তব্যটুকু পালন করুন। আমি একজন মানুষ। মানুষের সাথে কি দেবীর সহবাস হয়?’

‘তুই কবরে এসে দেবী দেবী করে চিৎকার করছিস কেনো? আমি লুকিয়ে থাকি এখানে। আর দেবী উচ্চারণ করবি না।’

‘কিন্তু আমি তো মুসলিম। আর আপনি তো দেবী।’

‘মৃত মানুষের কোনো ধর্ম থাকে না। আর মৃত্যুর পর সবাই এক একটি স্বপ্ন দেবতা হয়ে যায়। স্বপ্নের কষ্ট, হাসি, উল্লাস কিছুই বুঝতে পারি না। তেমনি মৃত মানুষের চেতনাকে কখনো জাগ্রত করা যায় না। তারা সবাই এক। তোরা দুনিয়াতে ও নিয়ে ভাবলেও মৃতরা ভাবে না। আমাকে দেখ— আমি দেবী তবুও তোদের কবর পাহারা দেই।’

‘আচ্ছা আপনি আমায় স্পর্শ করেন তো।’

‘কেনো! তোর বুঝি দেবী শুনে স্পর্শ করার খুব শখ জাগলো?’

‘না আমি তো জানি, দেবীদের স্পর্শ করা যায় না।’

‘কে বলেছে দেবীদের স্পর্শ করা যায় না?’

বুকে সাহস সঞ্চার করে ভাবতে লাগলামজ্জস্বপ্নে আমার আর কি হবে? আমি তো দেহ থেকে আলাদা। ঘুম ভাঙলে না হয় দেখা যাবে। এবার আমি দেবীর মুখের দিকে ঠোঁট আগাতেই প্রকট আওয়াজ শুরু হলো। শুনতে পেলাম একদল কবরদস্যু ডুকছে। কবরের লাশদের হনন করতে আসছে। দেবীও অদৃশ্য হয়ে গেলো। আমি দেবীকে আর খুঁজে পেলাম না। কবরের কোনায় বসে দেখলাম কয়েকজন কবরদস্যু একটা মাথার খুলি নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছে। একদল বলছে ও আমার দলের। আরেক দল বলছে না ও আমার। এবার কাড়াকাড়ি করে দুই দল মাথার খুলিটার দুই অংশ ভাগ করে নিলো। আমি কবরের পাশে ভয়ে শুয়ে থাকলাম।

কিছুক্ষণ পর অদৃশ্য কণ্ঠ শুনতে পেলামজ্জকোনো একজনের সুর। পুরুষ-নারীর মাঝামাঝি কন্ঠ। কবরে তো পুরুষ অথবা নারী থাকে। দাফন করার সব নিয়ম তো পুরুষ আর নারীর। তাহলে যে দেবী এসেছিলো?

দ্বান্দ্বিক ছায়ার উপকথা
জে এ জিকু

আজ রাতেও ঘুম ভেঙে গেলো। সেই ভৌতিক শিসের অসমাপ্ত সুরে। রাত দুপুর। দিগন্তে মেঘের জটলা হয়তোবা। অন্ধকার ঘরে হালকা নীল আলো। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় পিংপং বলের মতো বাতিটি দেখতে পাচ্ছি। বাতির নিচে বোকার মতো ঝুলে আছে বেশ ক’বছর আগের পুরোনো ক্যালেন্ডার। ক্যালেন্ডারের ছবিতে অশ্বারোহী নাপোলেয়ঁ বোনাপার্ত। এই চিত্রকলায় প্রথমবারের মতো আমি আবিষ্কার করেছিলাম ঘোড়ার বিস্ময়ভরা গতিশীল সৌন্দর্য। বন্ধ জানালার ওপাশে লম্বা বারান্দা। তালাবদ্ধ। বারান্দার গ্রীল গলে কীভাবে যেন সে আসে। শিস দিয়ে সুর তোলে— সব সময় আমার পছন্দের সঙ্গীতে। সুরগুলো মাঝপথে এসে থেমে যায়। যেমনটা আমার হয়। সঙ্গীতের মতোই আর সবকিছু আমি শুরু করি দারুন উদ্দীপনার সঙ্গে— মাঝপথে এসে মনে হতো— নাহ্! এটা ভালো হচ্ছে না। নতুন কিছু আরো ভালোভাবে শুরু করতে হবে। কিন্তু আবারো অসমাপ্ত! আর এভাবেই আমার সবকিছু অসমাপ্ত রয়ে যায়।

সে এখন শিস বাজাচ্ছে। শিসটা বাতাসে পারফিউমের মতো ছড়িয়ে পড়ে। বিটোফেন ফার এলিস অবিকল আমার মতো করে। মাঝামাঝি এসে সুরটা বেসামাল হয়ে গেল। পারফিউমের গন্ধরা মুখ থুবড়ে পড়লো মেঝেতে। আমি লজ্জায় কুঁকড়ে গেলাম। সুনসান বারান্দায় দীর্ঘশ্বাস পতনের শব্দ। সে কি অশরীরী কেউ নাকি আমার সিজোফ্রেনিয়া? কুসংস্কার কিংবা বিজ্ঞান কোনোটাতেই আজকাল আমার আগ্রহ নেই। আমি নিজেকে এতোটাই গুটিয়ে নিয়েছি যে ঘরের নির্লিপ্ত বাতাস ছাড়া বাইরের কর্মব্যস্ত বাতাসে আমি শ্বাস নিতে পারি না। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম মনে নেই। ঘুম ভাঙলো বৃষ্টির ঝমঝম শব্দে। শীতশীত লাগলো। গায়ে পাতলা চাদর জড়ালাম। সিগারেট খেতে ইচ্ছে করলেও খেলাম না। সে কি আসবে না? এমন বৃষ্টিতে কোথায় যাবে সে? আমি তাকে কখনো দেখি নি কিন্তু তার জন্য আমার ভীষণ মায়া।

আমি অদ্ভুতভাবে তার জন্য অপেক্ষা করি।

সে আসে। দরজায় কড়া নাড়ে। ঠিক আমার মতো দ্বিধান্বিত শব্দে। দ্বিধা আমাকে কখনো ছাড়ে নি। প্রেমিকার ঘরের দরজায় একবার কড়া নেড়ে ভেবেছি— ফিরে যাই। গতকালের স্মৃতিটাই সুন্দর ছিলো।

নদীতে স্নানের মতো সব দ্যাখাইতো শেষ দ্যাখা। স্থান-কাল-সত্তার বিবর্তনে আমরা কেউই আগের মতো থাকি না। আজ যদি তিক্ত কোনো স্মৃতির জন্ম হয়…পরক্ষণেই ভেবেছি— নাহ্! শ্রেষ্ঠতম স্মৃতিটাও তো পেতে পারি। আরো একবার কড়া নাড়ি অথবা ফিরে চলে যাই। সে দ্বিতীয়বার কড়া নাড়লো…

মৃদু…

অথচ আকুলতায় ভরা।

…নিরবতা।

এবার কড়া নাড়লে আমি দরজা খুলে দেবো। বৃষ্টির জলে উঠোন হয়তো ভরে গেলো— মরা পাতার ভেলা ভাসলো—পাতারা উঠোন পেরুতে পারলো না।

সোফার উপর চাদর মুড়ি দিয়ে একটা ভ্রুণ শিশুর মতো আমি শুয়ে থাকি—দুই হাঁটু ভাঁজ; চোখ বন্ধ আর হাতদুটো মুঠো করা। আমি জরায়ুর নিরাপদ একাকীত্বে ফিরে যেতে চাই। নির্ধারিত বস্তুজগতের গোলাপি ওড়না দেখলেও আমার ভয় লাগে। গোলাপি ভয়!

সে আর কড়া নাড়লো না। আমাদের হয়তো কখনোই দ্যাখা হবে না— দু’জনেই দ্বিধান্বিত! আমি যা সে তাই। তবু আমরা অপেক্ষা করবো। হয়তো আগামি শুল্কপক্ষের রাতে…

গল্পকারের গল্পের গল্প
শশি আলিওশা

আমরা একটা গল্প পড়বো বলে এই লেখাটা শুরু করলে প্রথমেই যে জিনিসটা চোখে লাগে সেটা এই গল্পের নাম। গল্প লেখকের গল্পটা কি আসলে? আসলে যে লোকের গল্প এটা মানে যে লোকটা গল্প লিখছে তার গল্প নাকি গল্প লেখে এমন কারো গল্প? এই কথার মারপ্যাঁচে আমরা আটকে গেলে নিজেদের আমরা আবিষ্কার করি গল্পকারের মস্তিষ্কের ভেতরে কিছু চরিত্র আকারে। এই গল্পকার আমাদের নিয়ে খেলছে, আমরা ভাবছি গল্পকার বোধহয় পাগল-টাগল হয়ে গেছে, মাথার তার ছিঁড়ে গেছে আর আমাদের বোকা বানাচ্ছে—বলছে এটাই নাকি গল্প! এটা সম্ভব? এটা গল্প কিনা ভাবতে ভাবতে আমরা গল্পকারের গল্পের প্লটে একটু ঘুরে আসতেই পারি। গল্পকারের কল্পনার হাত ধরে আমরা যখন প্লটে পৌঁছাই তখন নিজেদের আবিষ্কার করি যে আমরা কমিউটার ট্রেনে করে নাচোল যাচ্ছি, গল্পকারের বাড়ি। গল্পকার প্রতি সপ্তাহে রাজশাহী থেকে নাচোল যায় আবার পড়তে রাজশাহী আসে। গল্পকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে আর গল্প লেখে। তো বহুদিন ধরে সে ট্রেনের যাত্রীদের নিয়ে একটা গল্প লিখবে বলে ভাবছে কিন্তু চরিত্র খুঁছে পাচ্ছে না। আসলে পাচ্ছে না বললে ভুল হবে যে চরিত্রের প্রতি তার দুর্বলতা সেটা নিয়ে লিখতে ভয় পাচ্ছে। আমরা যেহেতু গল্পকারের গল্প পড়ছি এবং জানছি তখন গল্পকারের কেনো গল্প লিখতে ভয় পাচ্ছে সেটাও জানা দরকার। যখন আমরা গল্পকারের মতিষ্কে প্রবেশ করছি তখন একজন সুন্দরী হিজরা এসে গল্পকারের সামনে এসে দাঁড়ালো। গল্পকার কিছুটা বিব্রত হল যখন সুন্দরী হিজরা তার কোলে বসে পড়লো এবং দশটি টাকা চাইলো। এমনিতেই গল্পকারের মাথায় পাঠক হিসাবে আমরা বসে আছি তারপর ট্রেনের আবালবৃদ্ধ যাত্রীরা তার এই অবস্থা দেখে মুচকি মুচকি হাসছে। অন্যের বিব্রতকর অবস্থা দেখে আমাদের হাসি পায়। আবার আমাদের গল্পের প্রধান চরিত্রে গল্পকারের কোলে একজন সুন্দরী হিজরা বসে গাল টিপে দশ টাকা চায়। এই বিব্রতকর পরিস্থিতি দেখে আমাদের মাঝে একটা চাপা হাসি আসা স্বাভাবিক। তো এই বিব্রতকর অবস্থায় গল্পকার কি করে এটা দেখতে গেলে দেখি যে গল্পকার নিজেকে সামলে নিয়ে বুক পকেট থেকে দশ টাকা বের করে সুন্দরী হিজরার হাতে দিল। তারপর হিজারটাকে আমরা দেখলাম সেও মুচকি হাসি দিয়ে ব্ল­াউজের খাঁজে টাকা গুঁজে পাছা দুলাতে দুলাতে চলে গেল। এই পাছা দুলানি দৃশ্যটা দেখে গল্পকারের মনে আসলো পাছা শব্দটা কি অশালীন! আমরাও যেহেতু গল্পকারের গল্পের পাঠক সেহেতু আমাদের মনে কি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে পাছা নিয়ে সেটা ভাবছে যখন গল্পকার ততক্ষণে ট্রেন নাচোল পৌঁছে যায়, গল্পকার নেমে পড়ে। এখন যেহেতু গল্পকারের গল্পের প্লটের ভেতরে গল্পকার আমরাদের থাকার অধিকার দেন আমরা আর তার সাথে ট্রেন থেকে নামি না। আমরা আবার পরের সপ্তাহে ট্রেনে গল্পকারের প্লটে হাজির হই। গল্পকারের চরিত্র কে হতে পারে এইটা নিয়ে গল্পকার কি ভাবছে এ কথা যখন আমরা ভাবি তখন আরেকদিনের মতো ঐ হিজরা সুন্দরী এসে হাজির হয়। আমরা আবার দেখি সে গল্পকারের কোলে বসে পড়ে গল্পকারের গাল টিপে দশটি টাকা চায়। দ্বিতীয়বারের মতো এমন ঘটনার শিকার হয়ে গল্পকার একটু কম বিব্রত হয় এবং আমরা যারা গল্পটা জানছি, পড়ছি তারাও কম মজা পাই। গল্পকার যথারীতি দশটাকা সুন্দরী হিজরার হাতে তুলে দিলে সে তার ব্ল­াউজের খাঁজে দশ টাকা গুঁজে পাছা দুলাতে দুলাতে চলে যায়। দ্বিতীয়বারের মত গল্পকার ভাবে পাছা শব্দটা কি অশালীন! পাঠক এই শব্দটা কিভাবে গ্রহন করবে এটা ভাবতে ভাবতেই নাচোল পৌঁছে যায় ট্রেন, গল্পকারের সাথে না গিয়ে আমরা ট্রেনেই থেকে যাই। তৃতীয় সপ্তাহে আমরা আবার গল্পকারের গল্পের প্লটে হাজির হলে দেখি গল্পকার ট্রেনে বসে উশ-খুশ করছে। আমরা গল্পকারের গল্পের চরিত্র নিয়ে গল্পকারের সাথে ভাবতে গেলে আবার ঐ সুন্দরী হিজরা এসে হাজির হয়। গল্পকারের কোলে বসে গল্পকারের গাল টিপে দশ টাকা চাইলে গল্পকার মোটেই বিব্রত হয় না। আমরা যারা গল্পকারের গল্পের গল্প পড়ছি তারাও বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নিই। এরপর গল্পকার পকেট থেকে দশ টাকা বের করে সুন্দরী হিজরার ব্ল­াউজের খাঁজে গুঁজে দিতে গিয়ে তার দুধে হাত দিয়ে ফেললে সুন্দরী হিজরা গল্পকারের গালে সজোরে চড় বসিয়ে দেয় এবং গল্পকারের দিকে দশ টাকার নোটটা ছুঁড়ে পাছা দুলাতে দুলাতে চলে যায়। এইবার গল্পকার পাছার দিকে তাকায় না, মুখ নিচু করে ভাবতে থাকে এইটা কি হলো? আমরাও ভাবি যে গল্পকার কি কারণে এই ঘটনাটা ঘটালো। গল্পকারের লজ্জিত হওয়া দরকার নাকি এই আকস্মিক কাজটা কেনো করল সে! এটা ভাবতে ভাবতে ট্রেন নাচোল পৌঁছে যায়। যথারীতি গল্পকার তার গল্পের প্লটে আমাদের রেখে যায় তবে ভেবে যায় ট্রেনের যাত্রীদের নিয়ে সে যে গল্পটা লিখবে বলে ভাবছিল সেটা আর লিখবে না। আমরা তখন ভাবি গল্পকারে গল্পটা কি তার এবং সুন্দরী হিজরার গল্প নাকি অন্য কিছু? মানে গল্পকারের সাথে এমন বিব্রতকর ঘটনা ঘটেছিলো বলেই কি গল্পকার গল্পটা লিখতে ভয় পাচ্ছিলো?

মুখোশ
মো.আমিনুর রহমান

১.
সেদিন অফিস থেকে ফিরছি। এমন সময় পথমধ্যে একটা মধ্যবয়সী লোক আমার পিছনের জামাটা ধরে টানছিলো। পিছনে ফিরে তাকাতেই লোকটি বললো- ‘স্যার, আমার মাইয়ার বিয়ে।’ আমি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলাম কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। বুঝে ওঠার আগেই লোকটি বলে উঠলো— ‘স্যার, আমি গরীব মানুষ। আমার মাইয়্যাটারে বিয়া দেওন লাগবে। কিন্তু টাহার অভাবে মাইয়্যাটারে বিয়া দিতে পারছি না। যদি কিছু সাহায্য… আল্লায় আপনার মঙ্গল করবো।’ লোকটার কথায় আমার মন ভিজে গেল। পকেটে হাত দিতেই মনে পড়লো আমার কাছে এক হাজার টাকা আছে। তাও সেটি ছিলো বউয়ের শাড়ি কেনবার জন্য। অনেক কিছু ভেবে লোকটির হাতে এক হাজার টাকা তুলে দিয়ে প্রসন্ন মনে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলাম। আমি বিয়ে করে সুখেই আছি কিন্তু অসহায় মেয়েটির বিয়েতে সাহায্য করা তো আমাদেরই দায়িত্ব।

২.
আমার বাড়িটি ছিলো অফিস থেকে ক্রোশ দেড়েক দূরে। আমি প্রায়ই অফিসের সামনে যে খোলা মাঠ এবং মাঠের উত্তরদিকে যে বিশাল খাল, ছায়াঘন সবুজ পরিবেশ সেখানেই অবসর সময়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে সময় কাটাই। সেদিন বাসায় ফিরে কিছুটা সময় বিশ্রাম করে বিকেলের মুক্ত হাওয়ায় বের হয়েছিলাম। এমন সময় পথমধ্যে দেখি দুজন মদ্যপ বাগবিতণ্ডতায় লিপ্ত। ‘শালার জুয়াচোর জুয়া খেইল্যা হাইর‌্যা গেছস অথচ ট্যাহা দিস না; এহন বলিস ট্যাহা কই পামু! দুই হাজার ট্যাহার জুয়া হাইর‌্যা এক হাজার ট্যাহা দিস। কালকের মইদ্যে ট্যাহা না দিলে…।’ কাছে যেতেই পায়ের নিচে মাটি যেনো সরে যেতে লাগলো। মাথাটা পাক খেতে শুরু করলো। মিথ্যা, এতো বড়ো মিথ্যা! আমার সাথে জুয়াচুরি। আর কিছুই ভাবতে পারলাম না। যখন আমার চৈতন্য ফিরে আসলো, তখন দেখি, আমি খাটের উপর শুয়ে আছি, বউ আমার পাশে বসে আছে। ডাক্তার হাতটি ধরে বললেন, ‘আর ভয়ের কিছু নেই।’ ডাক্তার চলে গেলে বউ আমার কাছে প্রশ্ন করলো, ‘পথমধ্যে তোমার কী হয়েছিলো, বিড়বিড় করে কী বলছিলে ওইসব?’ শুধু বললাম- ‘কিছ ুনা।’ কিন্তু নিজের মন থেকে যেটি হারিয়ে গেল সেটি পৃথিবীর সবার অজানাই রয়ে গেলো। মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করলাম আর কখনো না..

৩.
কয়েক বছর পর একদিন স্ত্রী ও একমাত্র ছেলে নাহিদকে নিয়ে ঈদের মার্কেট করতে পকেটভর্তি টাকা নিয়ে বের হয়েছি, এমন সময় অল্পবয়স্ক একটি ছেলে এসে বললো, ‘স্যার, আমার মার বেজায় অসুখ, আমার মায় আর বাঁচবো না। ডাক্তার বলিচে অপারেশন করা লাগবি। কিন্তু অপারেশন করতি তো মেলা ট্যাহা লাগবো। কিছু দিবেন স্যার?’ ছেলেটার কথা শুনে আমার মাথায় রক্ত চেপে গেল। আমি ছেলেটাকে গালি দিয়ে তাড়িয়ে দিলাম। ভাগ, যত্তোসব জুয়াচোর। আবার নতুন করে ছলনা করতে এসেছে। আমার বউ হঠাৎ করে বলে উঠলো কী ব্যাপার আজ তোমায় এতো বিষণœ লাগছে কেনো? আর ওই ছেলেটাকে এভাবে কিছু না বললেও পারতে। কথার উত্তর না দিয়ে শুধু বললাম, ‘চলো।’ সেদিন মার্কেট থেকে বাড়ি ফিরে অনেক আনন্দই করলাম।

৪.
অফিসের কাজে ব্যস্ততার জন্য কয়েক দিন সময় যে কীভাবে কাটিয়েছি তা হিসেব করার অবসর পাইনি। তাই অফিসের কাজ কম হলে পুরোনো অভ্যাসমতো একদিন বিকেলে আবার ঘুরতে বের হয়েছি। একটু দূরে পথের পাশে গাছের নিচে কিছু লোকজনের ভিড় দেখতে পেলাম। ভিড়ের ভেতর থেকে একটি করুণ কান্নার শব্দ বাতাসে ভেসে এলো। কাছে যেতেই দেখি একটা মৃত মানুষের পাশে বসে ক্রন্দনরত সেদিনকার সেই ছেলেটি। বুঝতে আর কিছু বাকি রইলো না। আমার পাশ থেকে একজন লোক বললো, ‘আহারে অপারেশনের অভাবে…’  আর কিছুই শুনতে পেলাম না।

জন্মান্তর নায়কের সমুদ্রযাত্রা
রফিক সানি

তখন কলেজে পড়ি। গ্রীষ্মের শুরুতে মেজাজটা তিরিক্ষি হয়ে উঠেছে। তাকে একটু কোমল করার জন্যই সমুদ্র দেখতে যাওয়া। সমস্ত পরিপার্শ্ব থেকে কয়েকদিনের ছুটি নিলাম।  কয়েক বন্ধু মিলে মনস্থির করলাম সমুদ্র দেখতে যাবো। গ্রীষ্মে সাধারণত সমুদ্রে লোকের ভিড় কম থাকে। নওয়াপাড়া থেকে ছোট্ট একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করা হলো। দুপুর থেকে শুরু করে সারারাত গাড়ি চলবে। ভোর চারটায় কুয়াকাটা পৌঁছানো যাবে। সেখানে পৌঁছেই সূর্যোদয় দেখবো। সন্ধ্যায় সূর্যাস্ত দেখে ফিরবো। বাংলাদেশের এটাই একমাত্র সমুদ্র সৈকত, যেখানে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখা যায়। নওয়াপাড়া থেকে রওনা হলাম দুপুর ১টায়। বিকাল নাগাদ খুলনা পৌঁছালাম। সেখান থেকে এক ডাক্তার বন্ধু উঠলো আমাদের সাথে। দুজনের যাওয়ার কথা ছিলো। দ্বিতীয় জনকে নিতে খানিকটা দেরি হচ্ছিলো। শেষ পর্যন্ত তাকে নেওয়া গেলো না। খুলনা থেকে ছেড়ে যেতে আমাদের সন্ধ্যা হয়ে গেলো।

খুলনা থেকে আমাদের গাড়ি যখন ডানে মোড় নিলোজ্জতখন আমার চোখে এলো একটু ঘুমের আবেশ। মনে হয় খানিকটা সময় ধরে ঘুমাই। হঠাৎ হ্যাঁচকা ব্রেইকের ঝাঁকুনিতে আমার ঘুম ভেঙে গেলো। তাকিয়ে দেখি গাড়ির ঠিক কয়েক হাত সামনে একজন লম্বাচওড়া মানুষ টনটন হয়ে শুয়ে আছে। সবাই ভীষণ ভীতু হয়ে পড়লো। কেউ আর নামতে চায় না। আমিও প্রথমে যেতে চাচ্ছিলাম না। পরে বন্ধুদের পীড়াপীড়িতে নামতে হলো। দেখি লোকটা জীবিত। শ্বাসপ্রশ্বাস বইছে। সবাই আসলো। সামনের হাসপাতালে ভর্তি করবো ভেবে তাকে গাড়িতে উঠিয়ে নিলাম। কিছুক্ষণ পরে লোকটি স্বাভাবিক হয়ে গেলো। হাসপাতালে ভর্তি আর করতে হলো না। গাড়িতে সারারাত ঘুমালো। ডাক্তার বন্ধু তাকে চেক করে বললো— ‘অধিক পরিশ্রমের ফলে এমন হয়েছে। ঠিক হয়ে যাবে।’

লোকটিকে গাড়িতে রেখেই আমরা সমুদ্র সৈকতে নেমে পড়লাম। তখন সকাল নয়টা হয়তো হবে। আমি দলছাড়া হয়ে একটু অন্যদিকে চলে আসলাম। সমুদ্রের জলে সূর্যের কিরণ এমনভাবে পড়েছে যে, সেটিকে মনে হচ্ছে একটি হিরকনির্মিত শে^তবর্ণ রাজপ্রাসাদ। তার উপর একটি গম্বুজ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। আমার দু’চোখ যেনো কৃতজ্ঞতায় পূর্ণ হয়ে গেলো। এই কৃতজ্ঞতা ঠিক কার জন্যে সেটা নিয়ে আমার ভাবনা হয়নি বিন্দু মাত্র। কারণ আমি ভাবনার আরো বড়ো দুয়ার খুঁজে পেয়েছিলাম কিছু সামনে গিয়েই। হাঁটতে হাঁটতে দেখি আমার নীল রঙের ডায়েরিটা সৈকতে পড়ে আছে। ভেবে পাই না এটা এখানে এলো কি করে। গাড়িতে রেখেই তো এসেছিলাম সৈকতে! চকিত হয়ে ডায়েরিটা তুলে হাতে নিই। দ্রুত ভাবনান্তর হয়। এটাকে এখানে আনতে পারে একমাত্র সেই লোকটি—যাকে আমরা তুলে এনেছিলাম রাস্তা থেকে। আমি দূরে সমুদ্রের দিকে একবার তাকাই। দেখি সেই লোকটি, যে খুব ভোরেও অচেতন অবস্থায় শুয়েছিলো গাড়িতে। সে, হ্যাঁ, সে-ই তো। সামনে সমুদ্রের দিকে চলে যাচ্ছে। সমুদ্রস্নানের জন্যেই এগিয়ে যাচ্ছে যেনো। আহা, সমুদ্র তাকে যে কী ডাক দিয়েছিলো! সেই যে গেলো তাকে আর ফেরানো গেলো না

তবে সে আমার জন্যে রেখে গিয়েছিলো এক অনন্য ভাবনা; নীল রঙের ডায়েরিটির কয়েকটি পাতাজ্জতার একদিনের ঘটনাবৃত্তান্ত। ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত গাড়িতে বসে এবং সৈকতে এসেও সম্ভবত কিছু অংশ সে লিখেছিলো। লেখাটা আমার কাছে এতোটাই গুরুত্ব নিয়ে এসেছিলো যে, আমি প্রতিদিন সেখানে কী যেনো খুঁজে ফিরতাম। কিন্তু এতোদিন ধরে খুঁজেও কোনো মর্ম উদ্ধার করতে পারিনি। আজ এর মর্ম উদ্ধারের দায়িত্ব আমি পৃথিবীর মানুষের হাতে দিয়ে নিস্তার পেতে চাই। কেউ যদি মনে করে থাকেন লেখাটি আমার তাহলে ভুল হবে। আমি টুটি ছুঁয়ে বলছি— সত্যি, এ আমার গল্প নয়। সুতরাং এর কোনো সম্পাদনা আমি করিনি। তা করার এখতিয়ার আমার নেই। লোকটি যা লিখেছিলো তা-ই কোনো কাটাছেড়া না করে হুবহু সম্প্রদান করলাম।

আজ থেকে এর কোনো দায় আমার রইলো না। যদি কোনো দায় থেকে থাকে তা তোমাদের।

জন্মান্তরের ঠিকানা

দক্ষিণের জানালাটা খুলতেই আজ হঠাৎ সেই সুরটি কঠিন করে বেঁজে উঠলো, চারিপাশজুড়ে। উন্মনা করে দিলো আমায়।

এই কেরানি মহল্লায় আসার পর থেকে মাঝে মাঝে আমার কানের কাছে একটা সুর বেঁজে চলেছে—অস্ফুট স্বরে। তানপুরা, নয়তো বেহালা। সাথে সাথে মৃদঙ্গের কোমল তাল। বাঁশিও বাঁজে যেনো থেকে থেকে। শুধু সুর নয়, সাথে সাথে একটি মসৃণ কণ্ঠও ভেসে আসে মিশালি হয়ে। কোনো স্বর্গের কিন্নরী যেনো গাইছে পরম আবেগে। তার কণ্ঠে জড়ানো এক-আকাশ ভীষণ আবেশ। মাঝে মাঝে সেই তালের সাথে সুরের কারুকাজ অস্পষ্টতার মাঝেও বোঝা যায়। এ সুর সব সময় পাই না। ঠিক যখন ভাবনায় বিহক্ষল হয়ে পড়ি তখন। ভাবনার কি আর অন্ত আছে? ভবিষ্যতের চিন্তা, অতীত স্মৃতি, তার অতীত, তারও অতীত। জন্মাতীতের স্মৃতি। আমি কে ছিলাম, কেনো ছিলাম? কোথায় ছিলাম? কিভাবে এখানে এলাম? কেনো এলাম? যাবো কোথায়? মৃত্যুর পরে আবার কী ফিরে আসতে পারবো এইখানে? কালই তো মারা যাবো, তার পরের দিন আমার স্থান কোথায় থাকবে। তখন এই পৃথিবী কেমন থাকবে? ঠিক তখনই কানে বাঁজেজ্জসেই সুর। অস্ফুট তানপুরার সুর।

তখন মনে হয়, সুরটি আমার কোনো এক অতি পরিচিত শহর থেকে আসছে। আমি সে শহরকে জনম জনম ধরে চিনি। কোন সে শহর? বার বার মনে আনতে চেষ্টা করি, কিন্তু মনে এসেও যেনো আসে না। আবার চেষ্টা করি, আবার, আবার। তবু আশা ছেড়ে দিই না। আমি বিশ্বাস করি সব মানুষের মধ্যে জাতিস্বরের ব্যাপারটা আছে। মানুষ মৃত্যুর মুখোমুখি হলেই তার পূর্ব জন্মের কথা মনে পড়ে। আমারও যেনো মনে পড়তে চায়। কিন্তু স্পষ্টভাবে কোনো কিছুই মনে আসে না। তবু আমার মনে হয় আমি কোনো আর্যসন্তান নই। আমার শিরা উপশিরা-ধমনী জুড়ে যেনো অনার্যের রক্ত বয়ে চলেছে। মৃত্যুর আগে এই ভাবনাটা আমাকে বিহ্বল করে রাখে। আবার সুর বেঁজে ওঠে। এমনিতেই লুকিয়ে থাকার অভ্যাস। কিন্তু সুরটি শুনলে আর লুকিয়ে থাকতে পারি না। জনান্তিকে মিলিয়ে নিতে চাই নিজেকে। সামনে যাকে পাই তাকে জিজ্ঞেস করি, ‘ভাই, ওই সুরটা তুমি কি শুনতে পাও? তানপুরার সুর। না, না, বেহালার। তার সাথে বাঁশিও আছে। এ সুর কি তোমাদের কানে যায় না?’ তারা কেউই শুনতে পায় না। সবাই মাথা ঝোঁকায়। আর কেমন উদাস চোখে আমার দিকে চেয়ে থাকে।

আমি কারো দিকে তাকাই না। ঝংকারের তালে তালে ছুটি। মনে হয় এই তো হাতের কাছাকাছি কোথাও আছে। আমি হাত বাড়ালেই হয়তো নাগাল পাবো। হাত বাড়াই, পাই না। সুরটা যেনো ছুটে পালায়। একটু সামনে, আরো একটু সামনে করতে করতে আমাকে ঘুরিয়ে নিয়ে যায় মফস্বল শহরের সমস্ত রাস্তাব্যাপী। রাস্তায় হয়তো কয়েকজনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেও দিই। কেউ কেউ হয়তো সাইকেল সামলাতে সামলাতে আমার দিকে তাকায়। উ™£ান্তের মতো আমি ছুঁটতে থাকি। এক সময় আমি উপস্থিত হই মফস্বল পেরিয়ে গ্রাম সীমান্তে। একটি কৃষিমাঠে। অনেক অনেক নাড়াবন, ঢেলাবন পার হয়ে আসি মুহূর্তে। মাঠের ঠিক মাঝখানটিতে আমি ছোটাছুটি করি। এই মাঠে আগে কখনও আসা হয় নি। জানি না এর সীমা পরিসীমা।

কতোবার যে মাঠের এপার থেকে ওপার ছুটেছি সে সংখ্যাটাও জানি না। মাঠে একমনে কৃষাণেরা কাজ করে যাচ্ছে। তারা হয়তো আমাকে একদুবার ডেকেছেও, আমি শুনতে পাই নি। তাদেরকে পাশ কাটিয়ে আমি শুধু দৌড়েছি। এক সময় সুরটা মাঝখানে এসে ক্রমাগত ঘুরতে থাকে। আমিও ঘুরতে থাকি। একবার ডান থেকে বামে, আবার বাম থেকে ডানে। আমি ক্লান্ত হয়ে এক সময় বসে পড়ি আইলে। পা আর চলে না। মাথাটা ঝিমঝিম করে। মাথাটা নুইয়ে পড়তে চায় মাটিতে। এক সময় মাঠের ওপার থেকে শঙ্খধ্বনি ওঁ-ওঁ-ম, ওঁ-ওঁ-ম করে দুতিনবার বাঁজে। কখন যেনো সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আমাকে টেনে আনা সুরটাও যেনো বিদায় নেয়। ধীরে ধীরে বাসার উদ্দেশ্যে পা বাড়াই।

ঘরে ফিরে সমস্ত ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলতে বিছানাকে অবলম্বন করি। মুখহাত না ধুয়েই বিছানায় লুটিয়ে দিই নিজেকে। দক্ষিণের জানালাটা তখনো খোলাই আছে। জানালা লাগোয়া বিছানায় গা এলিয়ে দিই। সমস্ত দেহজুড়ে ক্লান্তি। অথচ কী আশ্চর্য! ঘুম আসতে চায় না। কয়েকবার এপাশ-ওপাশ করি। এক সময় বাহিরে দৃষ্টি গেলো। কী সুন্দর জোসনা নেমেছে! আকাশ থেকে চুইয়ে চুইয়ে জোসনা পড়ছে মেহেগনি গাছটির উপর। গাছ সেখান থেকে যতোটুকু  কুলিয়ে পারছে গ্রহণ করছে, বাকিটা ফেলে দিচ্ছে মাটিতে। এমন জোসনা দেখে স্বভাবতই ঘৃণিত নিক্ষেপিত প্রেমিকের মন নাড়া দিয়ে ওঠে। স্মৃতিকে আটকে ধরে পুরোনো প্রেম। উতলা সময়—

আহা, এমনই জোসনা সেদিনও ছিলো, শরতের রাতে। সে জোসনার কী রূপ! গিতীকাকে কথা দিয়েছিলাম ‘রাত ১১টায় চাঁদ উঠবে। তখন আমি আসবো। তুমি এসো কিন্তু।’ সেদিন সত্যি সত্যি রাত ১১টায় চাঁদ উঠেছিলো। রক্তিম চাঁদ। অন্য বর্ণ চাঁদ তার স্বরূপে ফিরে আসতে সময় নিলো খানিকটা। মাটিতে লম্বা লম্বা ছায়া সৃষ্টি করলো। সানবাঁধানো পুকুরঘাটে গিতীকা বসে, একা। চাঁদ ধীরে ধীরে মাথার উপরে আসে। সফেদা তলাটি তখন ছোপ ছোপ আলো-আঁধারিতে আলপনায় ভরে গেছে। পুকুরের জলের মধ্যে এক সময় চাঁদের পূর্ণ অবয়ব পড়লো। গিতীকা জলের দিকে তাকিয়ে চাঁদকে প্রশ্ন করে, ‘কখন আসবে সে? আর কতো যন্ত্রণা দেবে আমায়? আর কতো অপেক্ষা করতে হবে?’ এরই মধ্যে সে কতো বার যে আমার নাম উচ্চারণ করেছিলো! যথা সময়ের দুঘণ্টা পরে গিয়েও তাকে দেখতে পেলাম সেখানে। একমূর্তিতে বসে আছে প্রাণের প্রিয়তমা আমার। জলের আর আকাশের দুই চাঁদের বিকিরণে বিকিরণে তার বদনখানি হিরন্ময় জ্বলছে। সেখানে পৌঁছতেই আমাকে দু হাতে জড়িয়ে ধরলো, ভীষণ ভীতুর মতো। এতোক্ষণ একাকী বসে থাকাতেও তার কোনো ভয় ছিলো না। ভয় যেনো হঠাৎ করে আবির্ভাব হলো। দারুণ ভয়ার্ত চোখ নিয়ে কী যেনো সে বলতে চাইলো আমাকে। সেদিন আমি তার কোনো কথা শুনতে চাই নি। শুধু তার সমস্তটুকু পেতে গিয়েছিলাম। সেদিন আমি দুহাতে কোনো বন্দুক ধরতে চাই নি। ট্রিগারে হাত রেখে বলতে চাই নি ‘ফায়ার’। সেদিন কার্তুজের বদলে দাঁতে ছিঁড়তে চেয়েছিলাম তার কাঁচুলি।

গিতীকা কোনো কথা বলতে পারে না। তার শরীরের সমস্ত ভারটা আমার উপর সপে দিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। পরম আবেশে চোখজোড়া বন্ধ করে আমার চঞ্চুর মধে চঞ্চু পুরে দেয়, আমিও। দুজনার নড়াচড়াতে সফেদা গাছে বসে থাকা রাতপাখিটি উড়ে যায়। এতোক্ষণ সে হয়তো শরতনিশীর শিশির পোহাচ্ছিলো, নতুবা একাকী গিতীকাকে সঙ্গ দিচ্ছিলো। তার উড়ে যাওয়ার ঝাঁকুনিতে সফেদা পাতায় জমে থাকা কয়েক ফোটা শিশিরবিন্দু পুকুরের জলে পড়ে। রাতপাখি শব্দহীন রজনীকে কিছু টুপুর টাপুর শব্দ উপহার দিয়ে যায়। জলের নিচের চাঁদ একটুখানি কেঁপে উঠলো যেনো। তার কম্পনে গিতীকার মুখাবয়বে একটি চন্দ্রবিকিরণের তরঙ্গ বয়ে গেলো। আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম।

সমস্ত ক্লান্তি সত্ত্বেও গিতীকার সেই মুখচ্ছবি আমাকে সারারাত ঘুমাতে দিলো না। সেই আবেদনময়ী মুখ এখন কোথায়? আমার অনাগত ভবিষ্যত এখন কোথায়? তাদের রেখেই আমি আজ পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে উৎসাহী হয়েছি। সমস্ত রাতের নিদ্রাহীন চোখ বাইরে জোসনার দিকে চেয়ে থাকে। ধীরে ধীরে জোসনা ফুরিয়ে যায়। পূবের আকাশ ফর্সা হয়ে ওঠে। বড়ো মসজিদে মুয়াজ্জিন আযান দেয়। জানালা ভরে যেনো একটুখানি ঈষৎ শীতল হাওয়া শরীরে পরশ বুলিয়ে দেয়। আহ সকাল! কতোদিন তাকে দেখা হয় নি! মৃত্যুর পরে আর তোমাকে দেখা হবে না। পরশু হয়তো আমি থাকবো না। আজ তোমায় শেষবারের মতো দেখে নিতে চাই। আজ তোমার চলে যাবার সাথে সাথে হয়তো আমাকেও চিরবিদায় নিতে হবে। ছাদে উঠে তোমার কাছে থেকে তোমাকে দেখবো।

খালি গায়ে সিঁড়িপথ মাড়াই। চিলেকোঠার দরজা খুলে ছাদে পা রাখতেই এক আঁচল বাতাস আমার সমস্ত শরীর স্পর্শ করে নিলো। আমাকে যেনো জাপটে ধরলো তার বুকে, তার সমস্ত শরীর আমার সাথে মিশিয়ে। ঠিক প্রেমিকার মতো। ঠিক গিতীকার মতো। গিতীকা এমন একদিন তার নাতিশীতোষ্ণ শরীর আমার সাথে মিশিয়ে দিয়েছিলো।

সেই জোসনা রাতের কয়েক মাস আগের কথা— আমাকে সে দুহাতে জাপটে ধরলো। সেই আমাদের প্রথম আলিঙ্গন। এর আগে ওর সাথে আমার কোনো প্রেম ছিলো না। আমার জন্যে ওর-ও কোনো অপেক্ষা ছিলো না। কারো প্রতি কারো কোনো অনুরাগ ছিলো না। সেখানে রাগারাগিটাই ছিলো। আমাদের মধ্যে সারাক্ষণ শুধু খুনসুটি লেগে থাকতো। একে অন্যকে খোঁচা দেওয়া, নিন্দা করা, দোষ ধরা এই সব করে বড়ো হচ্ছিলাম। স্কুলে এক সাথে পড়তাম। সেখানেও তাই। একদিন ও আমার নামে, তো অন্য দিন আমি ওর নামে নালিশ করতাম। একে অন্যকে শাস্তি দিতে ভয়ানক মিথ্যা গল্পও বানাতাম। সে গল্পে বিপরীত জন শাস্তি পেলে খুব মজা পেতাম। মাঝে মধ্যে আমাদের মধ্যেই হয়তো হাতাহাতি হয়ে যেতো খানিকটা। এই তো চলছিলো জীবন।

আমার সেনাবাহিনীতে চাকরির যোগদানপত্র আসলো। আমি চলেও গেলাম, সেদিনও ওর একটুও চোখ ছলছল করেনি। বরং ও বলেছিলো, ‘তুমি চলে গেলে, আর আমার হাড়ের জ¦ালাও পড়লো। তোমার বিদায়ের সাথে সাথে আমার তিতিক্ষাগুলোও দূর হলো।’

আর্মি ট্রেনিং-এর নির্যাতনের ছয়টি মাস গিতীকাকে খুব মনে পড়েছে। বাড়িতে ফিরেই প্রথম গেছি ওদের বাড়িতে। সারাবাড়িতে তাকে খুঁজে পেলাম না। কেউ একজন সংবাদ দিলো ছাদে তাকে পাওয়া যাবে। ছাদে উঠতেই কোত্থেকে যেনো উড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। তার সেই নাতিশীতোষ্ণ দেহের আলিঙ্গন আমাকে বলে দিয়েছিলোজ্জসে আমার উপর কতো অভিমানে প্রতি বিকাল ছাদে এসে আকাশ দেখে কাটায়। সেদিনই জানতে পেরেছিলামজ্জগিতীকার সেই তিতিক্ষাগুলো কিভাবে প্রতিক্ষায় রূপ নিয়েছিলো। তার চোখের জলের ভাষায় বুঝেছিলামজ্জগোপনে গোপনে সে আমায় কতো ভালোবেসেছিলো।

গিতীকার সেই জল ছলছল চোখ, ভালোবাসায় রঞ্জিত মুখের ছায়া মনের পর্দায় ভেসে উঠলে ইচ্ছা করে না আত্মহত্যা করতে। কিন্তু তবু আমাকে মৃত্যুকে গ্রহণ করে নিতেই হবে। তা ভিন্ন অন্য কোনো রাস্তা আমার খোলা নেই। মৃত্যুর জন্য এই ছাদই উত্তম।

আহা যন্ত্রণা! এই মৃত্যু। মৃত্যুর কথা ভাবলেই সেই সুর বেঁজে ওঠে। তানপুরা, নয়তো বেহালা। সাথে সাথে মৃদঙ্গের কোমল তাল। বাঁশিও বাঁজে যেনো থেকে থেকে। শুধু সুর নয়, সাথে সাথে একটি মসৃণ কণ্ঠও ভেসে আসে মিশালি হয়ে। কোনো স্বর্গের কিন্নরী যেনো গাইছে পরম আবেগে। তার কণ্ঠে জড়ানো এক-আকাশ ভীষণ আবেশ। মাঝে মাঝে সেই তালের সাথে সুরের কারুকাজ অস্পষ্টতার মাঝেও বোঝা যায়। আমি আবার উন্মাতাল হয়ে যাই। কানের খুব কাছেই যেনো সুর বাঁজে। আমি স্পষ্টভাবে শুনতে চেষ্টা করি। সুরের একটু নিকটে আসতে চাই। সুরটাও সরে যায়। আমি আবার চেষ্টা করি। এভাবে সারা ছাদময় দুমদুম আওয়াজ করে দৌড়াই। সুর আরো দূরে চলে যায়। একবার বুঝতে পারি, সুরটা যেনো রেলস্টেশনের দিক থেকে আসছে। ছাদ থেকে নেমে সেদিকে যাত্রা সুরু করলাম।

প্লাটফর্মের উপর দাঁড়িয়ে আছি। সকাল ৮টার ট্রেন আসার সময় হয়ে গেছে। পথেই শুনতে পেয়েছি ঘণ্টার আওয়াজ। সেখানে দাঁড়াতেই সুরটা যেনো নিষ্প্রভ হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ সেখানে থাকতেই ট্রেন চলে এলো। বিকট শব্দে হুইসেল বাঁজিয়ে ট্রেন আসছে। হ্যাঁ, আবারও সেই সুর বাঁজছে মনে হলো। ওই ট্রেনটিই সেটা বয়ে নিয়ে আসছে। আমি প্লাটফর্মের দিকে আগাতে শুরু করেছি। ট্রেনের চাকার নিচেই বুঝি সুরটাকে পাওয়া যাবে। একবারে প্লাটফর্মের প্রান্তসীমায় পৌঁছে গেছি। ওই তো ক্রমে সুরটা আরো স্পষ্ট হচ্ছে। এখনই সুবর্ণ সুযোগ ভালো করে কান পেতে শুনে নেয়ার। সুরের সাথে মেশানো কণ্ঠটির গান একবারের মতো শুনেই ট্রেনের নিচে মাথা দিয়ে দেবো। তারপর আর কোনো সুর আমাকে এমন করে জ্বালাতে পারবে না। আমি একদম প্রান্তবিন্দুতে। এই তো চলে এসেছে। আমার খুব কাছেই সুরটা। হ্যাঁ, অতি নিকটেই। হঠাৎ হাতদুই দূরে ট্রেনটি থেমে গেলো।

সুরটাও যেনো হারিয়ে গেলো নিমেষে। আমি আরো উ™£ান্ত হয়ে গেলাম। চারিদিক স্তব্ধ হয়ে গেলো। আমার ভেতরের কী যেনো উবে গেলো। কয়েক মিনিট ধরে আমি রেললাইনের এধার-ওধার করলাম। একবার দূরে গেলাম, আবার কাছে এলাম। না, সুরটা আর কেনো রূপেই পাওয়া গেলো না।

ট্রেন আবার ছেড়ে দিলো যথা সময়ে। তখন আমি প্লাটফর্মের বিপরীত পাশে। প্লাটফর্ম ও আমার মাঝখান দিয়ে ট্রেন চলে যাচ্ছে। আমি তাকিয়ে আছি তার চলে যাওয়ার দিকে। হঠাৎ ঝংকারের মতো কানে বেঁজে উঠলো সেই পরিচিত তাড়িত সুরটি। যেনো ট্রেন সেটাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে, অতিকায় হস্তির মতো দুলে দুলে অতি কষ্টে সে এগিয়ে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে তা আমার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। আমি লাফিয়ে পড়ে সুরটাকে ধরতে চেষ্টা করি।

ট্রেনের দরজায় লটকে থাকি কিছুক্ষণ। অতি উৎসাহী কিছু যাত্রী এসে আমাকে ধরাধরি করে উঠায়। তারপর তারা আমাকে একটি সিট খালি করে সেখানে বসতে দেয়। আমি বসি। দরজায় লটকে থাকা অবস্থায় ঘা লেগে দাঁতের ছ্যাঁচায় ঠোঁট কেটে গেছে খানিকটা। সেখান থেকে রক্ত আর লালা ঝরে পড়ছে। খালি গা। উস্কোখুস্কো চুল। রক্তে রাঙা চোখ। যার পাশে সিট দিয়েছিলো সে ভদ্রলোকটি নাক সিঁটকিয়ে উঠে চলে গেলো। খানিকদূর গিয়ে দাঁড়িয়ে উসখুস করতে থাকে সে। বলতে থাকে, ‘শালার দেশটা নেশাখোর মাতাল দিয়ে ভরে গেছে। আগে ট্রেনে এমন ঝামেলা ছিলো না। এখন ঝামেলাটা আরো বেড়ে গেছে। এদের জ্বালায় ট্রেনেই ওঠা ছেড়ে দিতে হবে দেখছি। যন্ত্রণা।’

আমি সেদিকে কোনো দৃকপাত করি না। তা শুনতেও পাচ্ছি না। আমার মগজে তখন সেই সুরটি বেঁজে চলেছে, এক ধেয়ালে। ট্রেনে এসে তা যেনো তাল বদলেছে। এখন তা ঝুমুর তালে বাঁজছে। সেই তালে লোকের সমন্ত কথা চাপা পড়ে যাচ্ছে।

স্টেশনে স্টেশনে ট্রেন থামছে। ট্রেন থামলে সুরটা থামছে। লোকেরা মুখ বাড়িয়ে প্রশ্ন করছে। তখন আমি সেটা শুনতে পাচ্ছি। আমাকে উত্তরও দিতে হচ্ছে।

একজন জিজ্ঞাসা করে— ভাই, আপনের নাম কী, কোন গ্রামে বাসা, কি করেন?

আমি উত্তর দিই— মারুত, আদিত্য মারুত আমার নাম। বাড়ি লোহাগড়ার সারসপুরে, এখন থাকি আব্দুলপুরে, কেরানি মহল্লায়। আগে সেনাবাহিনিতে চাকরি করতাম। এখন কিছুই করি না।

— ও রিটায়ার্টমেন্ট সৈনিক! সবাই আশ্বাসের শ্বাস ফেলে। যেনো এতোদিন ধরে তারা যা শুনেছে, তার জ্বলন্ত প্রমাণ আজ ট্রেনযাত্রীরা হাতেনাতে পেয়ে গেলো। এতোদিন ধরে তারা যে শুনেছেজ্জআর্মিদেরকে এমন অত্যাচার করে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় যে, তারা শেষ জীবনে পাগল হয়ে যায়। তাদেরকে আদালতের সাক্ষী হিসাবেও গ্রহণ করে না। কিন্তু তাই বলে ট্রেনে লাফিয়ে ওঠার মতো এতোটা বদ্ধ মাতাল হবে, তা তারা হয়তো কল্পনা করতে পারে না। তাই আবারও প্রশ্ন করে—

— তা ভাই, আপনে যাইবেন কোনঠে? এভাবেই বা ট্রেনে লাফায়ে উঠলেন ক্যান?

— মরতে যাচ্ছি ভাই। ট্রেনে লাফিয়ে পড়েছিলাম মরার জন্যে।

উফ, আর কেউ কোনো কথা বলতে পারে না কিছুক্ষণ। নিরব স্তব্ধ হয়ে থাকে সকলে। সবাই একখেয়ালে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর কেউ একজন প্রথম আমার থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়, তারপর অন্যরাও। সবাই যেনো আবার স্বাভাবিকতায় আসে। কেউ একজন বলে ওঠে—

— তা আপনে ভাই বেশ রসিক লোক আছেন। আমরাতো আসলে সবাই মৃত্যুর দিকেই যাচ্ছি। কিন্তু ঠিক করে কন তো, এখন কোথায় যাচ্ছেন?

আমি পেটের মধ্য থেকে টেনে এনে সারা শরীর দোলা দিয়ে হাসি— ‘হু, প্রাসাদে যাচ্ছি, ভাই, রাজপ্রাসাদে।’

রাজপ্রাসাদ! এ কী হলো! এতোক্ষণ ধরে যে সত্যটি আমি গোপন করে এসেছি তা সবার সামনে এভাবে বলে ফেললাম! রাজপ্রাসাদ শব্দটি শুনে সবারই আবাক হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু কেউ বিন্দুমাত্র আশ্চর্য হয় না। সবাই উপহাস মনে করে। কিন্তু আমি লজ্জায় হেট হয়ে যাই।

রাজপ্রাসাদের নাম যখন বলেই ফেললাম তখন তার ইতিহাসটাও বলে ফেলি। কী দরকার গোপন রেখে। আর গোপন রেখেই বা কী হবে? কেনো আমাকে মরতে হচ্ছে আজ? এটা হবে তার ইতিহাস।

২.
সেনাবাহিনিতে চাকরি করার তাড়না আমার ছিলো বাল্যকাল থেকে। শরীরের মাপজোপও সে তাড়নায় সাড়া দেয়। ক্লাস নাইনেই উচ্চতা পূর্ণ হয় আমার। আমি শুধু অপেক্ষায় থাকি একটি সার্টিফিকেটের। মেট্রিক পাশ হলেই আমার একান্ত ইচ্ছাটি পূরণ হবে। একদিন পাশও করলাম। চাকরিও পেলাম। বাড়ির সকল আবেগ ঝেড়েমুছে চলে গেলাম দেশমাতৃকার সেবায় আত্মনিয়োগ করতে। দীর্ঘ ছয়-ছয়টি মাস ফুরিয়ে গেলো আমার ছয়দিনের ব্যবধানে। অথচ এরই মধ্যে কতো সতীর্থ ক্যাম্প ছেড়ে পালালো! কতো জন কমান্ড সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করলো! কতো জনকে আত্মহত্যার পরও লাশের বুকে গুলি করা হলো! সে ভয়ে আবার কতো জন চাকরি ছেড়ে দিলো! আমি শুধু অটল রইলাম। অটল থাকতে হলো। আলিক স্যার আমাকে অটল করে রাখলেন।

আহ, আলিক স্যারের কী সেই কণ্ঠ! খোলা প্যারেটের মাঠে তার নেতৃত্বে যখন মার্চ করে মাঠ পার হতাম, বুকটা আমার আত্মবিশ্বাসে ফুলে উঠতো। তারপর ব্যারাকে  ফিরে  তাকে

পেতাম বন্ধুর মতো করে। খাসা আধুনিক বাংলায় কথা বলতেন তিনি। তার গল্প বলার দক্ষতাও ছিলো প্রচণ্ড। তিনি যখন গল্প বলতেন আমরা যেনো মোহিতের মতো শুনতাম। একটা ঘোর আমাদের আটকে ধরে রাখতো। তাঁর গল্পের রীতি ছিলো— গল্প শেষে দেশপ্রেমে উজ্জিবীত করা। কী দারুণ কথা তিনি বলতেন! ‘শোনো বাংলার সৈনিকেরা, আমাদের দেশ কিন্তু যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্ব রাজনীতি যেভাবে চলছে তাতে মনে হয় না এ যুদ্ধ বাঁধতে দেরি হবে। তোমরা প্রস্তুত থেকো।’ গল্পের শেষে উপদেশ, তার শেষে বুকের ভেতরের কোন অন্তপুর থেকে দারাজ কণ্ঠে বলতেন, ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’।

আলিক স্যার আমাদেরকে সবসময় প্রস্তুত করে রাখতেন। তাঁর বিদায়ের পর খানিকটা সময় আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে বসে থাকি। ভাবতে থাকি যুদ্ধ কেনোজ্জকোনো ভূমিকম্প, সাইক্লোন, মহামারিও আমার কাছ থেকে এদেশকে কেড়ে নিতে পারবে না। আমার শরীরে রক্তের বহমানতা থাকাকালীন কেউ এদেশের বিন্দুমাত্র সম্পদ হরণ করতে পারবে না। ভাবতে ভাবতে আমি যুদ্ধের প্রতি ঝুঁকে পড়ি। মনে মনে চাই, হ্যাঁ, আসুক যুদ্ধ, ভয় করি না। একবার যুদ্ধ আসলেই পৃথিবীর সমস্ত মানব সন্তান জানতে পারবে বাঙালি জাতিরও যুদ্ধনেশা আছে। পৃথিবীর ইতিহাসে নাম উঠিয়ে জ্বলজ্বল করবো আমি। তারপর সারারাত স্বপ্ন দেখে কাটাই, কাদের সাথে যেনো যুদ্ধ বেধেছে। আমি এক এক করে শত্র“ নিধন করে যাচ্ছি। এক একটি বাহিনীকে পরাজিত করে বীরবেশে ফিরে আসছি। ফেরারর পথে দেশবাসী আমাকে সংবর্ধনা দিচ্ছে। পুষ্পবন্যায় ভাসিয়ে দিচ্ছে তারা আমায়।

আমার দেখা এ স্বপ্ন একেবারে বৃথা হয়ে যায় না। তা শুধু ঘুমিয়ে দেখা স্বপ্নই থেকে যায় না। দেশবাশী সত্যি সত্যি আমাকে পুষ্পবন্যায় ভাসিয়ে দেয় একদিন। আমার যুদ্ধনৈপুন্যের পুরস্কার হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র যেদিন বাংলাদেশের উপর সকল শর্ত উঠিয়ে নেয়। আজীবন যুদ্ধের চিন্তা থেকে অবশান দেয়। কখনো তারা বাংলাদেশকে আক্রমণ করবে না, এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে সেদিন। সেইদিন সমস্ত দেশবাসী আমাকে ফুলেল শুভেচ্ছায় ভাসিয়ে দেয়। আহা, সেই ফুলেল শুভেচ্ছা। সেই পুষ্পবন্যা আমার সমস্ত লজ্জার আধার। তাই আমার কাল হলো। আমাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিলো।

সেনাবাহিনিতে আমার উত্তরোত্তর সাফল্য, নৈপুন্য, কৌশলের প্রয়োগ, আত্মবিশ্বাস দেখে আলিক স্যার খুশি হন। সাথে সাথে সমস্ত ডিপার্টমেন্টে প্রচার হয়ে যায় আমার সুনাম। একে একে সাত সাতটি র‌্যাংক পাড়ি দিয়ে এক তরুণ যুবক আমি লেফটেন্যান্ট জেনারেল ঘোষিত হলাম। বাংলাদেশ সেনাবাহিনিতে আমিই প্রথম এতো দ্রুত এবং এতো অল্প বয়সে ওই পদ পেলাম। কথা ছিলো বিদেশ থেকে এসে জেনারেল পদের দায়িত্ব পালন করবো।

তারপর বিদেশ যাত্রা। জাতিসংঘ। পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো শান্তি বাহিনী। সেখানেও আমার সাফল্য আকাশচুম্বি। পরপর তিনটা শান্তি অভিযানে আমার কৌশল অবলম্বন করে তারা।

বিনা রক্তপাতে তিনটি অভিযানেই জয় নিশ্চিত হয় আমাদের। আমার নাম, এবং বাংলাদেশী সেনাবাহিনীর নাম তখন সমস্ত বিশ্ব জেনে গেছে। সবাই জেনে গেছে এদেশের রণকৌশল বড়ো ভয়ানক। সমস্ত শক্তিধর দেশ বাংলাদেশের উপর থেকে তাদের দখল পরিকল্পনা বানচাল করতে শুরু করেছে। একসময় সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্রও তাদের লোভী পরিকল্পনাগুলোও তুলে নিলো।

চুক্তিস্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষ হলে তিন জন লোকের সাথে দেখা হলো কন্ফারেন্স কক্ষের বাহিরে। তারা তিনজন তিন রকমের মানুষ। তিনজনের দেশও বুঝি আলাদা। একজন গৌরবর্ণের, একজনের দীর্ঘাকায় শরীর, থেবড়া মুখাবয়ব, অন্যজন ককেশীয় ফর্সা। ককেশীয় রঙের ব্যাক্তিটির নাম মার্টিন কুলাস্, দীর্ঘকায় শরীরের অধিকারী পার্থেন অজিল আর সুহায়েল গৌরবর্ণ। তিন জনের শারীরিক কাঠামো ভিন্ন হলেও, এরা তিনজনই বাংলা ভাষা বলতে পারে সুন্দর সাবলীলভাবে। সম্পূর্ণ কথা বলে সাধু ভাষায় এবং যে শব্দ তারা শিখেছে তার অন্য কোনো সমার্থক শব্দ তারা জানে না। কথা শুনলে বোঝা যায় ব্যাকরণিক পন্থা অবলম্বন করে এবং সাধুভাষা চর্চার স্বর্ণ যুগের বইপত্র নিবিড়ভাবে পাঠ করে এ ভাষা আয়ত্ত্ব করেছে। কোনো বিদেশীর মুখে মাতৃভাষার চর্চা দেখলে তাদেরকে স্বভাবতই ভালো লাগবেই। আমারও তাদেরকে পছন্দ হয়। একজনের প্রথম উক্তি ছিলো, ‘সুস্বাগতম বৎস, সুস্বাগতম। আপনার এই সর্বোত্তম সাফল্যে আমরা আশান্বিত। আপনার মাতৃভূমির জন্য আমাদের শুভকামনা রহিলো। আমরা দীর্ঘদিবস যাবৎ এমনই একজনের প্রত্যাশায় রহিয়াছিলাম। আপনার সাফল্যে আমরা আনন্দিত। এই শুভক্ষণের সাক্ষ্য হিসাবে একটি নৈশভোজনের আয়োজন করিয়াছি। আপনি সদয় সম্মতি জ্ঞাপন করিলে আমরা কৃতার্থ হইতাম।’

প্রথমে একটু দ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম। অপরিচিত তিনজন মানুষ। তারা এভাবে যেচে আমাকে সমাদর করছে কেনো। এখানে তাদের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য আছে কিনা কে জানে! মুহূর্তক্ষণ চুপ করে থাকলাম। আবার পরক্ষণে বুঝলাম—না, তিনজন মানুষ আমার খুশিতে খুশি। তারা আমার দেশের মুক্তিতে আনন্দিত। আবার আমার ভাষারও চর্চা করে। কী করে তাদের বিমুখ করে দিই। তাদেরকে আমি ফেরাতে পারি না।

সচারচর যেভাবে ভিনদেশীরা ডিনার করে— একটা রেস্টুরেন্টে ঢোকে, খাবারের মেনু দেখে অর্ডার দেয়, বয় এসে খাবার দিয়ে যায়, তারা গোগ্রাসে গিলে বিল পরিশোধ করে চলে আসে। কিন্তু এদের ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। শহর থেকে খানিকটা দূরে গ্রামের মতো এলাকায় একটি বাংলোবাড়িতে আমাকে নিয়ে যায়। অসাধারণ এলাকা। বাংলাদেশের পার্কের মতো জায়গা। কোনোদিকে অন্ধকার নেই। রাস্তার দুপাশে সোডিয়াম আলো। বেশ শুনশান নিশ্চুপ পরিবেশ। সেখানে গিয়ে দেখি সবকিছু তৈরি। শুধু আমাদের যাওয়ার অপেক্ষা। টেবিলে বসতেই তারা নিজ হাতে বাঙালী কায়দায় পরিবেশন করে দিলো। খাবারও বাঙালী রান্না। ডাল, আলুভর্তা, মাছ ভোনা, গোস্ত রান্না একেবারে বাঙালি কায়দায়। আহ, প্রাণটা জুড়িয়ে গেলো। কতোদিন এই রান্না খাই নি! সেই কবে খেয়েছি গিতীকার হাতের রান্না! আমি বাড়ি গেলেই মাছ ভুনা সে করতোই। ডাল আর আলুভর্তা খাবারের তালিকায় থাকতোই।

খেতে খেতে বারবার অবাক হচ্ছিলাম। আমি যেগুলো খাবার পছন্দ করি তার প্রতিটিই এখানে আছে। তৃপ্তি সহকারে খাওয়া শেষ করলাম। ‘এবার উঠতে হয়। কালই দেশে ফিরতে হবে’জ্জএই প্রস্তাব দিতে না দিতেই তারা মদের বোতল বের করলো। জলজল করে উঠলো আমার চোখ। আমি ভেবেই পাচ্ছি না খাওয়ার পরে যে আমার মদের অভ্যাস আছে, একথা এরা জানলো কিভাবে! ভুলেই গেছিলাম, এদেশে খাওয়ার পরে সাধারণত মদ খাওয়ার প্রচলন আছে। সব বয়সী নারী-পুরুষ এটা খায়। ঠিক আমাদের দেশের পান খাওয়ার মতো। এখানে কোনো নিষেধ নেই। কেউ কিছু মনেও করে না। তবু মদ কাপে ঢালতে ঢালতে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আমার খাবার মেনু আপনারা জানলেন কি করে? কী করে জানলেন আমি খাওয়ার পরে মদ খাই?’

সুহায়েল একেবারে অকৃত্রিম হাসি টেনে বললো, ‘জনাব, শুধু আপনার খাবার ফর্দ নহে, আপনার জীবনবৃত্তান্ত থেকে এই বয়স অব্দি সকল বৃত্তান্তই আমাদের সংগ্রেহে আছে।’ আমি বেশ পুলকিত হলাম। একজন মানুষের একরাতের সেবা করার জন্য তারা এতো কষ্ট করেছে! কম কষ্টে তো আর এতো দূর দেশের একজন বিচ্ছিন্ন মানুষের সকল বৃত্যান্ত জানা যায় না! আমি সত্যি সত্যি গর্ববোধ করি। আমি আগ্রহে প্রশ্ন করি— ‘বলুন তো, আর কী জানেন।’

পার্থেন অজিল গম্ভীর স্বরে বলে, ‘আপনার গৃহে সুন্দরমতী স্ত্রী আছে, তাঁহার নাম অদিতি গিতীকা। তাঁহার অনেক দুঃখ। কারণ আপনি তাঁহার কোনো ইচ্ছাই পূর্ণাঙ্গ পূরণ করিতে পারেন না।’ এবার আমি দমে যাই। মুহূর্তেই আমার উজ্জ্বল মুখ বিবর্ণ হয়ে যায়। অজিলের কাছ থেকে এমন খবর আমি শুনতে চাই নি। বাংলাদেশী কেউ হলে হয়তো তর্ক করতাম। হয়তো বলতাম ‘না, না। সে খুব সুখেই আছে, আমার বিরুদ্ধে তার কোনো অভিযোগ নেই। আমি তার সকল চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম।’ কিন্তু এরা অতি কষ্ট করে আমার বায়োডাটা সংগ্রহ করেছে। অসত্য তথ্য এরা গ্রহণ করতে পারে না। আর খবরটাও অসত্য নয়। সত্যিই গিতীকা খুব অসুখী জীবন যাপন করে। আমি তার কোনো ইচ্ছাই আজও পূর্ণাঙ্গরূপে পূরণ করে প্রশান্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারি নি। কি করে পারি! স্বল্প বেতন। যদিও বাহ্যিক দিক দিয়ে দেশের অন্যান্যদের তুলনায় তা বেশি। কিন্তু একজন লেফটেন্যান্টের জন্য যথেষ্ট নয়। আমি যদি একা আমি হতাম, তাহলে এ প্রশ্ন আসতো না। বেতনের অর্ধেক তো গ্রামের বাড়ির খরচে ব্যয় হয়ে যায়। বাকী অর্ধেকে না হয় অতিথি আপ্যায়ন না হয় গিতীকার সাধ পূরণ। বাসায় তো আর কম অতিথি আসে না প্রতি সপ্তাহে। তার উপর একটা সঞ্চয় একাউন্ট করা হয়েছেজ্জঅনাগত শিশুর জন্যে। প্রতি মাসেই ধার করতেই হয়। ধারে ভীষণ লজ্জা লাগে। এই অর্থাভাবের কথা ভাবতে ভাবতে মাথাটা ঝিম ধরে যায়। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। মদে এমন নেশা আমার সাধারণত হয় না। গিতীকার অপূর্ণ জীবন যাপনের কথা মনে করে কয়েক পেগ বেশি নেওয়া হয়ে গেছে। নেশায় কানের দুপাশ ঝাঁঝাঁ করছে। কোনো কথা আর কানে ঢুকছে না। বাকী তিনজন হয়তো কোনো ব্যাপারে আলোচনা করছে। আমি তার কিছু স্পষ্ট বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে পাখির কিচিরমিচির শব্দ হচ্ছে চারিপাশে। সন্ধ্যায় পাখিরা যেমন একটি গাছকে কেন্দ্র করে ঘুরে ঘুরে একাধারে কিচিরমিচির করতে থাকে, তেমনই ওরা তিনজন যেনো আমাকে কেন্দ্র করে কিচিরমিচির করছে। আমার চোখজোড়া অবনমিত হয়ে আসে। ঝিম মেরে বসে থাকি চেয়ারে।

হঠাৎ একটি প্রস্তাব শুনে আচমকা আমার ঝিমঝিমানি কেটে যায়, ‘প্রাসাদটির খবর দিতে পারিলে তাহার এক চতুর্থাংশ মূল্য আপনি পাইবেন।’ মাথার ভেতর ভীষণ এক ঝাকানি খায়। যেগুলোকে এতোক্ষণ পাখির কিচিরমিচির মনে হচ্ছিলো সেগুলো আবার কথাতে রূপ নেয়। আবার শুরু থেকে আমি শুনতে থাকি। অনেক কণ্ঠের মিলিত ধক্ষনি নয়, বরং মার্টিন কুলাস্ একাই কথাগুলো বলেছে এতোক্ষণজ্জ

‘প্রাগৈতিহাসিক সময়ের সত্য আখ্যান। প্রাচীণ ভারতবর্ষে এক রাজা বাস করিতেন। তাহার ছিলো দুর্দান্ত বিক্রম। তিনি ছিলেন ভারতরাজ্যের একমাত্র অধিপতি। সুতরাং তাহার অঢেল সম্পদ রহিয়াছিলো। সেই অঢেল সম্পদ ব্যয়ে তিনি নির্মাণ করিয়াছিলেন একটি রাজপ্রাসাদ। রাজপ্রাসাদটি সম্পূর্ণ হিরকরাজি দিয়া নির্মাণ করা হইয়াছিলো। সেটা দেখিতে অতি মনোহর হইয়াছিলো। রাজা সেইখানে সুখেই বসবাস করিতেন। কারণ তাঁহার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো না। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাহাকে বেশি দিবস সেই সুখ ভোগ করিতে দেয় নাই। মহাপ্লাবনে সেই প্রাসাদ ডুবিয়া যায়। তাহার পর মাটির স্তর পড়িয়া তাহা ঢাকিয়া যায়। তথাপি তাহার গম্বুজটি কিছুদিবস ভাসিয়া ছিলো। কিন্তু তখন পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা অতি সামান্য। তাহাদের কোনো অভাব নাই, ততো বিচরণও নাই। তাহাদের যাহা ছিলো তাহা দিয়াই চলিয়া যাইতো। ফলতঃ তাহার কদর বুঝিতে বুঝিতে তাহা একেবারে মাটির নিচে ডুবিয়া গিয়াছে। যখন মানবজাতি পুনরায় বাড়িতে শুরু করিলো, তখন আবার মানুষের মধ্যে অভাব দেখা দিলো। তাহারা দেশ-বিদেশে অর্থের অন্বেষণ করিতে লাগিলো। তাহারা জানিতে পারিলো ভারতবর্ষে একটি বহুমল্যবান হিরকনির্মিত রাজপ্রাসাদ রহিয়াছে।

প্রাসাদটি বাংলাদেশের মাটিতে প্রোথিত, এই কথাটি পাশ্চাত্যমানুষ জানিতে পারে প্রায় সাড়ে বারোশত বৎসর পূর্বে। তখন থেকেই ওই দেশে পাশ্চাত্যমানুষ বিভিন্ন বেশে বিভিন্ন উপায়ে গমন শুরু করিয়া দেয়। তাহা ফলদায়ক নয় বলিয়া তাহারা যোদ্ধার বেশে আক্রমণ করিলো। দখল করিলো। কিন্তু তাহারও তেমন কোনো ফল পাইলো না। সামান্য কয়েকটা মন্দির দখল করিয়া সামান্য সম্পদ তাহারা পায়। তাহারপর অনেক অনেকবার আপনার দেশে পাশ্চাত্য আক্রমণ হয়। সর্বশেষ ইংল্যান্ড আক্রমণ করিয়া দুই শত বৎসর থাকিলো। তবুও কোনো লাভ করিতে পারিলো না। এদের কাহারও সঠিক পরিকল্পনা এবং কলাকৌশল না থাকায় কেহই সুফল পায় নাই।

আমরা ইহার সন্ধান করিতে চাই। আপনি যদি রাজি থাকেন তাহা হইলে তাহা আমাদের জন্য অতিশয় সহজ হইবে। আমাদের বিশ্বাস আছে আপনি থাকিলে অতি কম সময়ের মধ্যেই তাহা আমাদের হস্তগত হইবে। সেইখান হইতে যে সম্পদ আমরা পাইবো তাহা এই চারিজন সমানভাগে ভাগ করিয়া লইবো। প্রাসাদটির খবর দিতে পারিলে তাহার এক চতুর্থাংশ মূল্য আপনি পাইবেন।’

আমার নেশা যেনো সম্পূর্ণ কেটে যায়। চোখের দৃষ্টিও স্পষ্ট হয়ে আসে। আমি দেখতে পাই, সামনে বসে তারা খুব আশাপূর্ণ হাসি হাসছে। ইচ্ছা করে একবাক্যে ‘না’ বলে চলে আসি। কিন্তু তাদের আপ্যায়নের কথাও মাথায় আসে। আমি এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করি, ‘ঠিক আছে, দেশে গিয়ে ভেবে আপনাদের জানাবো।’

আরও এক পেগ মদ কাপে ঢেলে দেয় সুহায়েল।

কুলাস্ আবার বলে ‘দেখুন জনাব, ভাবিয়া লাভ নাই। আপনি এড়িয়ে যাইবার কথা ভাবিতেছেন? আপনি আমাদের কথা শুনিয়া বুঝিতে পারিয়াছেন নিশ্চয় আমাদের প্রস্তুতি কতোটা ভয়ংকর? আপনি না সাহায্য করিলেও কিন্তু আমরা তাহা উদ্ধার করিতে পারিবো। হয়তো একটু দেরী হইবে। আমরা সেটা পাইবোই, অথচ সেইখানে আপনার কোনো হিস্যা থাকিবে না। ব্যাপারটা একটু চিন্তা করিয়া দেখুন।’

আমি বুঝলাম এখানে থাকা আমার জন্য খুব একটা হিতকর নয়। টালমাটাল অবস্থায় চেয়ার ছেড়ে উঠতে চেষ্টা করি। অজিল আমার হাত ধরে বসিয়ে দেয় না বরং উঠতে সহায়তা করে। আমি দাঁড়াই।

তখন অজিল বলে, ‘শুনুন জনাব মারুত, দেখিতে পাইতেছেন— আপনার দেশে বিভিন্ন বেশে আবারও অনেক পাশ্চাত্যজন পৌঁছাইয়া গিয়াছে। কেহ ব্যবসা নিয়ে, কেহ কৃষি নিয়ে, কেহ বা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। তাহাদের কাহারও উদ্দেশ্য কিন্তু তাহা নহে। সবারই উদ্দেশ্য একই। প্রাসাদটি খোঁজা। আমাদের পূর্বে তাহারা যদি তাহা পাইয়া যায়, তাহা হইলেজ্জনা পাইলেন আপনিও কিছু, না আমরাও। সুতরাং কী লাভ এমন সুযোগ হাতছাড়া করায়? আপনার ভাগে কতো সম্পদ আসিবে তাহা আপনি কল্পনাও করিতে পারিতেছেন না। সে সম্পদের হিসাব আধুনিক কম্পিউটারেও আনিতে পারিবেন না। তাহা দিয়া আপনার স্বচ্ছন্দে জীবন চলিবে। স্ত্রীর সকল আশা পূরণে আপনার আর সংকট থাকিবে না। ওরকম একটা রাজপ্রাসাদ আপনিও গড়িতে পারিবেন গিতীকার জন্য।’

এবার আমাকে একটু থমকে দাঁড়াতে হয়। গিতীকার অভাব আমার চলার পথ স্থির করে দেয়। পড়ে যেতে থাকি আমি। সঙ্গে সঙ্গে তারা তিনজনই আমাকে ধরে পাশের ঘরে নিয়ে শুইয়ে দেয়। কুলাসের ইশারায় আরও দুজন মানুষের ছায়া ঘরে প্রবেশ করে। ‘উপভোগ করুন জনাব’ বলে তারা ঘর ছেড়ে চলে যায়। আমি নবাগতদের দেখার চেষ্টা করি। দেখেই লজ্জায় আমার নেশা এবার একেবারেই কেটে যায়। এরা আমার এ ব্যাপারটিও জানে? ছিঃ ছিঃ। আমি কদমতলার সুচনার কাছে যেতাম মাঝে মাঝে। সেটা খুবই গোপন। কেউ জানে না। অতি গোপনে নিঃসঙ্গ রাতে একটু সঙ্গ পেতে কদমতলার সেই দরজায় হানা দিতাম। কেউ কোনোদিন দেখেছে বলে মনে পড়ে না। সুচনা ছাড়া আমার এ গোপন আর কেউ জানে না। সেটাও শেষমেশ ফাঁস হয়ে গেলো! আর কী বাকী রইলো!

মেয়ে দুটি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে আমার বিছানার পাশে এসে বসলো। গায়ে হাত রাখলো। তাদের চোখে মুখে ঠোঁঠে সর্বত্রই যেনো কামনার ঝড় উঠে যেতে থাকে। আমিও উঠে বসি বিছানায়। ধীরে ধীরে তাদের একজন আমার দিকে এগিয়ে আসে। দেখে মনে হয়, অনন্ত লালসা তার সমগ্র দেহজুড়ে।

ঘটনাটা যখন ফাঁসই হয়েছে, তখন আর বলতে দ্বিধা করে কী লাভ! আমি সুচনার কাছে অনেকবার গেছি। শুধু সুচনা নয়। আরো অনেকের সঙ্গ আমি পেয়েছি। আমার নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্যেই তাদের কাছে গেছি। কামার্ত হয়ে গেছি। বার বার গেছি আর একটা জিনিস খুব লক্ষ্য করেছি-জ্জসুচনাদের মিলনে কোনো সাড়া ছিলো না কোনোদিন। আমার চোখ টকটকে লাল হয়ে বেরিয়ে আসার অবস্থা। অথচ, ওদের চোখ নিষ্প্রভ। কোনো আবেদন নেই সেখানে। তখন বুঝেছিলাম, এ প্রজাতির ব্যবসায়ীরা এরকমই হয়। কিন্তু এ কোন লালসা আমি দেখছি। এভাবে আমার দিকে তৃষ্ণার্ত ঠোঁট নিয়ে এগিয়ে এসেছে একমাত্র একজন। সে গিতীকা।

আহা গিতীকা! তার কথা মনে পড়তেই আমি বিহ্বল হয়ে পড়ি। হঠাৎই আমি সুচনার মতো নিষ্কাম হয়ে যাই। মেয়ে দুটি কোনো সাড়া না পেয়ে হয়তো পালায়। তখন গিতীকা আমাকে সঙ্গ দেয়। তার অভাবের মাঝেও মিলন, মিলনের মাঝেও অভাব। গিতীকা কতোদিন থেকে বলছিলো— ‘আর ভাড়াবাসায় থাকা যাচ্ছে না। এবার একটা নিজস্ব বাড়ি প্রয়োজন।’ আর আমি ওকে ছলনা করেই যাচ্ছি। এ-বছর ও-বছর করে ঘুরাচ্ছি। আর ভাবছি, আমাদের সত্যিই কি নিজস্ব বাড়ি হবে না কোনো দিন? হাতের কাছে এমন একটা সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যদি তা হারাই তাতে ফল কি হবে? কিন্তু দেশের সাথে কী করে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করি! আবার এ কথা যদি গিতীকা জানতে পারে তাহলে সে কি ভাববে? হয়তো বলবে— ‘তুমি বেশ করেছো। দেশের সাথে কোনোভাবেই বেঈমানি করো নি।’ কিন্তু ওর ক্ষুধাপেট কী বলবে না— ‘তুমি আমাকে অবহেলা করেছো। আমার থেকে তোমার দেশপ্রেম বড়ো হয়ে গেলো।’

যাহ, কী হবে দেশপ্রেম দিয়ে? মৃত্যুর পর একটা সামরিক সেলুট, কিছুদিন ডিপার্টমেন্টে মৃত্যুদিন পালন, মিলাদ বা ভোগ এই তো। এর বেশি আর কি দেবে দেশ আমাকে? তার থেকে এটাই ভালো। যে কদিন বেঁচে আছি ভালোভাবে বাঁচি।

চুক্তিতে সাক্ষর করে দিলাম। কি আশ্চর্য! এতোক্ষণ যে আমার মধ্যে বিষয়টা নিয়ে এতো দ্বন্দ্ব ছিলো, কলম ধরে সাক্ষর করতে সেই আমার হাত একটুও কাঁপলো না!

বাংলো থেকে বেরোনোর পথে পেছন থেকে কুলাসের উপেক্ষিত হাসিমুখে শুনি প্রথম ইংরেজি ভাষা— ইবহমড়ষর সধহ, ষবফরবং রং বহড়ঁময.

দু’দুটি চুক্তি করে পরদিনই দেশে চলে আসি।

দেশের মাটিতে যেদিন পা রাখলাম, সেদিন বাংলার আপামর জনসাধারণ আমাকে বরণ করে নিলো যেনো। মন্ত্রী থেকে রিক্সাওয়ালা পর্যন্ত সকল মানুষ আমায় ধন্য ধন্য করতে থাকে। ইতোমধ্যেই আমি তাদের মুক্তিদাতা বলে স্বীকৃতি পেয়ে গেছি। বিমানবন্দরে সবাই আমাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানালো। আমার চলার পথে চারিদিক থেকে পুষ্পবন্যায় ভেসে যেতে থাকলো। আমি হেঁটে চলেছি। চারিদিকে সারি সারি জনগণ দাঁড়িয়ে। মধ্যের পথে আমি চলেছি বীরের মতো। জনগনের সারি যেখানে শেষ, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আমার স্ত্রী, গিতীকা। তার মুখের দিকে তাকিয়ে বেশ প্রশান্তি বোধ করলাম। তার অপেক্ষাকৃত নিচ থেকে একটি ফুলের তোড়া আমার দিকে উঠে আসলো। সাথে সাথে একটি মিষ্টি ধ্বনি ‘আব্বু তোমাকে শুভেচ্ছা।’ গিতীকা তাকে কোলে নিয়ে একবার আদর করে খানিকটা হাসলো। আমার বুঝতে বাকী রইলো না, এই আমার অনাগত শিশু। আমার সন্তান।

আমার সন্তানের বিশ্বাস আমি ভঙ্গ করেছি। তাদের চোখে, আমি তাদের রক্ষক। কিন্তু আমি তা নই। এবার আমি এসেছি তাদের সম্পদ হরণ করতে। এ কী করেছি আমি। এমন কোমল বিশ্বাসে আঘাত! এ আপরাধ কেউ কোনোদিন কোনোকালে করেছে বলে আমার মনে হয় না। কী এর প্রায়শ্চিত্ত তাও খুঁজে পাই না। অবশেষে বুঝি মৃত্যুই এর একমাত্র প্রায়শ্চিত্ত। তা ভিন্ন আর কিছু নয়।

সবার থেকে তাই আলাদা হয়ে চলে এলাম আব্দুলপুরের কেরানি মহল্লায়।

১/খ
একটি গন্তব্যে এসে ট্রেনটি থামলো। এর মধ্যে ট্রেন কয়েকটি স্টেশনে কয়েকবার থেমেছে। কখনো সে সুর কানে আসেনি। ট্রেনের ধারা এই। চলতে থাকেলে ঝুমুর তালে সুর শুরু হয় থেমে গেলে সুরও থেমে যায়। কিন্তু এই স্টেশনে সুর থামে না। চলতেই থাকে। আমি শুনতে পাই অস্ফুট স্বরে। তানপুরা, নয়তো বেহালা। সাথে সাথে মৃদঙ্গের কোমল তাল। বাঁশিও বাঁজে যেনো থেকে থেকে। শুধু সুর নয়, সাথে সাথে একটি মসৃণ কণ্ঠও ভেসে আসে থেকে থেকে। কোনো স্বর্গের কিন্নরী যেনো গান গাইছে পরম আবেগে। তার কণ্ঠে জড়ানো এক-আকাশ ভীষণ আবেশ। মাঝে মাঝে সেই তালের সাথে সুরের কারুকাজ অস্পষ্টতার মাঝেও বোঝা যায়। এখানে এসে একটু স্পষ্ট হতে চায়। খুব কাছেই যেনো এই সুরের উৎপত্তি।

দক্ষিণ দিক থেকে বাতাস আসে। বাতাসের সাথে সাথে সেই সুরের ধাক্কা এসে কানে লাগে। আমিও দক্ষিণ দিকে দৌড়াতে থাকি। দৌড়াতে থাকি আর দৌড়াতে থাকি। কোথায় এলাম, কোথায় যাচ্ছি কিছুই জানা নেই। উর্ধ্বশ্বাসে শুধু দৌড়াচ্ছি। একটা মানুষ আর কতো দৌড়াতে পারে! একসময় অন্ধকার নামে। তখন আবার আমাকে থামতে হয়। টলে পড়ি কালো রাস্তার মাঝখানে।

কাল দৌড় থামানোর পরে আর সে সুর শুনি নি। কোথায় এসে ঘুম ভাঙে জানি না। কতো বেলা হলো তাও বুঝতে পারি না। মাথা উঁচু করে সূর্যের দিকেও তাকাতে পারি না যে, আন্দাজ করবো কিছু। পায়ের নিচে অনেক ধুলো জমে আছে। ঝাড়–দার যে কোথায় গেলো? হঠাৎ কানের মধ্যে নুপুরের নিক্বন বেঁজে ওঠে। অস্পষ্টভাবে আমি যেনো দেখতে পাই, কে যেনো হেঁটে চলে যায় আমার সামনে দিয়ে। পাশে আর কেউ নেই। তাকে ধরতে যাই। ধরতে পারি না। একটুপরে মনে হয়, দূরে যেনো দেখা যায়— পুকুরের জলে বালকেরা সাঁতার কাটছে। পরিচিত কিছু মুখ। ডাক দিই। তারা শুনতে পায় না। হঠাৎ  ঝাড়–র শব্দ কানে আসে কিন্তু ঝাড়–দারকে দেখতে পাই না। তার একটু পরে কানে আসে কে যেনো ‘গো ধর, গো ধর’ বলে চিৎকার করছে। কে করছে বোঝা যায় না। তবে কণ্ঠটি চেনা। আগে কোথাও যেনো শুনেছি এই চিৎকার।

অতি কষ্টে মাথাটা সোজা করে সামনে তাকানোর চেষ্টা করি। অমনি সামনে দেখতে পাই বিশাল রাজপ্রাসাদ। হিরকমোড়া রাজপ্রাসাদ। সূর্যের আলো তার উপর পড়ে ঝিকমিক করছে। আলো ঠিকরে এসে পড়ছে চোখে। প্রাসাদের দিকে আর তাকানো গেলো না।

এই তো মহেন্দ্রক্ষণ। এরই জন্যে আমি এতো দূর পাড়ি দিয়েছি। আমার সব মনে পড়ছে। সেই মহাপ্লাবনের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে এসে গেছি। হ্যাঁ, লতিকার গান শুনতে অন্দরে ঢুকছিলাম, তখনই তো প্লাবণ শুরু হলো। লতিকা সব চেয়ে দামী গাইয়ে ছিলো। এক নামে সবাই তাকে চিনতো। সেদিন প্লাবনে ভেসে গেছিলাম। হ্যাঁ, সব মনে পড়ছে। এই যে আমার প্রাসাদ। অনেক কষ্টের ফসল এই নির্মাণ। ওই যে গম্বুজ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাসাদের সামনে আঙিনায় আমি দাঁড়িয়ে আছি। আঙিনায় ধুলো জমেছে। ওই যে ঝাড়–দার খস খস শব্দে ঝাড়– দিচ্ছে। ও-ই যে দূ-রে বালকদল পুকুরে ঝাপাঝাপি করছে। ওই যে ক্ষেতে গরু ঢুকে পড়েছে। মালি তার সেই পুরোনো ভাষাতেই চিৎকার করছে— ‘গো ধর, গো ধর।’ ওই যে দেখা যায় মন্ত্রী-শান্ত্রীরা সব বসে রোদ পোহাচ্ছে। আহ, কী ভয়ানক শীত। কী বোকা আমি, এই শীতে খালি গায়ে বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। এখনই অন্দরে গিয়ে গরম পোশাক পরে নেয়া উচিত। কিন্তু বাইজিটা? লতিকা তো এখনো এলো না। ওদিকে গানের বেলা পার হয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, ওই যে লতিকা আসছে। যাও লতিকা ভেতরে গিয়ে প্রস্তুত হও আমি আসছি। অনেক দিন হলো তোমার গান শুনি নি।

এর পর আদিত্য মারুত ধীরে ধীরে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যায়। যায় শুধু যায়। পেছন ফিরে তাকায় না। আমি কাছে আসতে না আসতেই এক প্রকাণ্ড ঢেউ এসে তাকে নিয়ে যায়।

অন্য মানুষ
অরণ্য রহমান

পরনে লেদার জ্যাকেট আর চোখে দামী সানগ্লাস চাপিয়ে মোটর বাইকের গর্জন তুলে সূর্য যখন রাস্তায় বের হতো, পাড়ার সবাই জানতো যে একদিন না একদিন এই মোটর বাইকটা তার সর্বনাশের কারণ হবে। অবশ্য মনে হয়তো সবাই তেমনটাই কামনা করতো। এম.পি. বাবার বখাটে ছেলের জন্য এলাকাবাসীর মনে সহানুভূতি থাকার প্রশ্নটাই ওঠা উচিত নয়।

সূর্য পড়াশোনা করে একটা নামকরা প্রাইভেট ভার্সিটিতে। বি.বি.এ.। অবশ্য পড়াটা নামে মাত্র। ভবিষ্যতে রাজনীতি তার পেশা হবে এবং সবাই জানে যে এদেশে রাজনীতিবিদ হতে গেলে শিক্ষিত হওয়া আবশ্যক নয়।

সেদিনও সূর্যের দিনটা আর দশটা দিনের মতোই শুরু হয়েছিলো। সকাল এগারোটায় ঘুম থেকে ওঠা, র‌্যাপ মিউজিক দিয়ে বাড়ি কাঁপিয়ে গোসল করা, ঘন্টাখানেক মোবাইল ফোনে গ্যাঁজানো ও তার ফাঁকে ফাঁকে নাস্তা করা এবং সবশেষে দোতলা থেকে নীচে বাবার কাছে নেমে আসা টাকার জন্য।

বাবা বাসাতেই ছিলেন, তবে বের হবার জন্য তৈরি। সারাদিন যেসব লোকজন নানান রকম ‘তদরিক’ নিয়ে আসে, তাদের একটা অংশের  সাথে তিনি সকাল বেলাতেই সাক্ষাত করে থাকেন। বাবা অফিসে, সাথে ‘ক্লায়েন্ট’ আছে। তাকে বিরক্ত না করে প্রিয় দাদাজানের শরণাপন্ন হয় সূর্য। হাজার বিশেক আজ না হলেই নয়। অবশ্য দাদাজান মানুষটাও ক্ষমতাশালী। ৭১’এ শান্তি কমিটির হোমরা-চোমরা নেতা ছিলেন। মাঝে কিছুদিন চুপচাপ থাকলেও আজকাল বেশ নড়ে চড়ে উঠেছেন। তবে তিনি যে আসলে কী করেন, সেটা সূর্যের কাছে পরিষ্কার না। দিন নেই, রাত নেই শুধু গোপন বৈঠক চলছে।

দাদাজান: হাতের ধর্মীয় বইটা সাথে সাথে বন্ধ করেন মীর মকসেদ তালুকদার। কই যাচ্ছিস, বাপ?

-যাব…এই তো! টাকা হবে কিছু? আব্বু তো দেখলাম ব্যস্ত।

-কতো?

-হাজার বিশেক তো মিনিমাম!

বংশের একমাত্র উত্তরসূরির হাতে আলমারির চাবি তুলে দেন মকসেদ তালুকদার।

-বের করে নে। লাগলে হাজার দশেক বেশি নে। বন্ধুদের দিবি ফুর্তি করতে।

হেসে ফেলে সূর্য।

-বি ক্লিয়ার, দাদাজান, কী কাজ করতে হবে?

-আগের কাজটাই তো করিস নাই। তোরে না বলেছিলাম কবিতার সাথে ওই ছোটলোকের বাচ্চাটারে যেন আর না দেখি।’

-ও শিট! সহসাই ভয় জেগে ওঠে সূর্যের মধ্যে। আমার মনে ছিলো না। আজকেই ওটার খেল খতম করছি।

-এমন অবস্থা করবি যেন কবিতার নাম শুনলেই চিল্লা-ফাল্লা করে। কি আমার রঙ রে, বাপ ছিলো মুক্তিযোদ্ধা- যতোসব ধর্মোদ্রোহী, ঐ ফকিরনীর পোলার সাথে কবিতা প্রেম করে।

-ছেলে দেখ ওর জন্য। বিয়ে হলে একদম সোজা হয়ে যাবে।

-হুম…।

অন্যমনস্ক হয়ে যান দাদাজান, সেই ফাঁকে বের হয়ে যায় সূর্য। এইসব মারামারি কাটাকাটির মধ্যে সে নাই। তবে লোকজন আছে। টাকা কিছু পেলে নাচতে নাচতে কাজ করে দেবে। সে নিজে ফাইটার নয় কোনোমতেই। সে হচ্ছে প্রেমিক। মেয়েমানুষ ছাড়া দুনিয়াতে ইন্টারেস্টিং আর কিছু নাই। অ্যালকোহলের নেশার চাইতেও ভয়াবহ এই নেশা।

রাত তখন দেড়টা।

অবশ্য ঘটনাটা ঘটলো গভীর রাতে ফাঁকা রাস্তাতেই। তীব্র গতির মোটর বাইকটা একেবারে দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছিলো। আর সূর্য গিয়ে আঁছড়ে পড়েছিলো মাইক্রোবাসটার উপরে। এবং পরদিন সূর্য নিজেকে আবিষ্কার করেছিলো দৃষ্টিশক্তিহীন হিসেবে।

কাঁচের গুড়ো ক্ষতিগ্রস্ত করেছে কর্ণিয়াকে। যথাসম্ভব দ্রুত কর্ণিয়া প্রতিস্থাপনের অপারেশনটি করে ফেলা হলো। তবুও সব মিলিয়ে যে সময় লাগলো, সে সময়ে সূর্যের কপালের ক্ষতো আর ভাঙা পা সেরে গিয়ে শরীরটা মোটামুটি ঝরঝরে হয়ে গেলো। দৃষ্টিক্ষমতা ফিরে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল সূর্য তখনো জানতো না যে এই একটি ঘটনা তার জীবনকে চিরকালের জন্য বদলে দিয়েছে।

-কীরে ভাইয়া? তুই এতো সকালে? মাত্র তো সাতটা!

বোনের বিস্ময়কে উপেক্ষা করে বেতের একটা চেয়ার টেনে বসলো সূর্য। তারও জানা ছিলো না যে, সকাল বেলা কবিতা বাগানে বসে থাকে। অবশ্য জানবেই বা কী করে। বোনকে কখনো ঠিকমতো সময় দিয়েছে? তাছাড়া ওর এই বোনটি সবার চাইতে আলাদা। ভাইকে চায়ের কাপ এগিয়ে দেয় কবিতা। সেই ফাঁকে বোনের মুখের দিকে তাকায় সূর্য, মোটেও কালো-কুৎসিত নয় তার বোনটা বরং কোমল আর স্নিগ্ধ। চোখে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা আর সততার ছাপ।

‘সততা’ শব্দটা মনে আসতে একটু অবাক হয় সূর্য। আশ্চর্য; আগে কেন বোনটিকে কখনো এমন লাগেনি? কি অদ্ভুত সুন্দর তার বোনটা; চারপাশের প্রকৃতিটাকেও খুব সুন্দর লাগে তার। দৃষ্টিক্ষমতা ফিরে পাওয়ার আনন্দেই কি সব অন্যরকম লাগছে? হবে হয়তো। গতরাতে একফোটা ঘুম হয়নি। কাল সন্ধ্যায় চোখের ব্যান্ডেজ খোলা হয়েছে, বাসায় ফিরতে ফিরতে দশটা। এসেই বিছানায় গিয়েছিলো। শুধু যাওয়াটাই সার। একফোটা ঘুমও হয়নি। বার বার শুধু…নিজের অজান্তেই চোখ জোড়া বন্ধ করে ফেলে সূর্য। হ্যাঁ…এইতো আবার দেখা যাচ্ছে কী কোমল একটি নারীমুখ; চঞ্চল, একটু মেজাজী, ভীষণ অভিমান দু’চোখে। মাথাভরা লম্বা কালোচুল বাতাসে উড়ে এসে আছড়ে পড়ছে মুখের ওপর…

দৃশ্যটা এতো বাস্তব যে— অজানা আবেগে ফেঁপে ওঠে সূর্য, এবং চোখ খোলার পরও দৃশ্যটা তার পিছু ছাড়েনা।

সূর্য তখনো জানেনা যে অভিমানী চোখজোড়া তাকে আরো দীর্ঘরাত জাগিয়ে রাখবে। এবং মুখটাকে সে বাকী জীবনে একদিনের জন্যও ভুলতে পারবে না। এরপরের বেশ অনেকগুলো দিন ঘর ছেড়ে বের হয় না সূর্য। নিজের ভিতরে অদ্ভুত একটা পরিবর্তন তাকে যেমন বিস্মত করে তোলে, ততটাই করে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদেরও। শোবার ঘরের দেয়াল থেকে নায়িকাদের কুৎসিত অঙ্গভঙ্গিও পোস্টারগুলো গায়েব হয়ে গেছে, ব্ল­ু-ফিল্মেও কালেকশান গেছে সোজা ডাস্টবিনে। জানে না কেন, কদিন হলো ছাপার অক্ষরে ভালো কিছু পড়ার জন্য চোখজোড়া ব্যাকুল হয়ে উঠেছে।

সারাদিন আজকাল মায়ের সাথেই কাটায় কাটায় সূর্য। শরীরের ডানপাশটা প্যারালাইজড অবস্থায় মা বিছানায় পড়ে আছে অনেকদিন থেকে। মায়ের বিষণ্ন মুখটা আগে কখনো এতো ভালো লাগেনি সূর্যের। সেই মা, যিনি স্বামী আর শ্বশুরের সাথে অনেক বাকবিতণ্ডা করে পুত্রের নাম রেখেছিলো সূর্য। সন্তান একজন চমৎকার মানুষ হবে এই আশায়।

আয়নায় নিজেকে কেমন অপরিচিত মনে হয় সূর্যের। অত্যাধুনিক ফ্যাশনের চুলের ছাট, কানের রিঙ, থুতনিতে অল্প একটু দাঁড়ি— সব বিসর্জন দেওয়ার পর একটু  যেনো ভালো লাগে। নিজের প্রতিবিম্বটাকে অনেক বেশি আপন মনে হয়। অনেক ভাবে সূর্য…কেন এই পরিবর্তন? পুরানো সব কিছুই নতুন দৃষ্টিতে দেখছে সে। কর্ণিয়া প্রতিস্থাপনের সাথে কি এর সম্পর্ক আছে? যে মানুষের কর্ণিয়া দুটো সে পেয়েছে, এটা কি তবে সেই মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি? অবশ্য সূর্য‘র এসব ধারণাকে হেসেই উড়িয়ে দেন ডাক্তার। সূর্য‘র মন অবশ্য শান্ত হয় না। নতুন কেনা বাইকটা নিয়ে সন্ধ্যা ঘেরা শহরের রাস্তায় রাস্তায় অহেতুক ঘোরাঘুরি করে। হয়তো অহেতুক নয়, তার চোখজোড়া আসলে খোঁজে সেই মুখটাকে, যে মুখটা চোখ বন্ধ করা মাত্রই এসে হাজির হয় সামনে। যে মুখটা তাকে জাগিয়ে রাখে সারারাত। মেয়েটির জন্য অদ্ভুত ব্যাকুলতা কাজ করে সূর্যর বুকে। আচ্ছা, তার কর্নিয়া জোড়াকি কোনো ছেলের ছিলো? সেই ছেলেটাকি ভালোবাসতো মেয়েটাকে? নতুবা চোখ বন্ধ করলেই কেন একটা অজানা, অচেনা মুখ বারবার হাজির হবে চোখের  সামনে?

সিগন্যালে আটকে পড়ে আশেপাশের প্রতিটি মুখ দেখে সে। ব্যস্ত সড়কটাও। রাস্তার দু’ধারে শপিংমল আর নামকরা ফাস্টফুডের দোকান। চারদিকে শুধু হাসি, উচ্ছ্বাস, আনন্দ।

যদিও এ সব সূর্য তাকে স্পর্শ করে না। তার মন পড়ে থাকে অর্ধনগ্ন শিশুগুলোর দিকে। নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে অশ্র“ গড়ায়…

হৃদয়টা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। নিশ্চিত হয় সূর্য, এই দৃষ্টি তার নয় কিছুতেই নয়।

সূর্যর মধ্যেকার পরিবর্তনগুলো ক্রমশ আরো স্পষ্ট  হয়ে ওঠে। কুৎসিত ঘটনা দেখতে হবে বলে বন্ধুদের সাথে মেলামেশাও একদম বাদ। করার কিছুই নাই, তাই সবসময় পড়াশোনাই করে সে। বাবা কিংবা দাদাজানের সঙ্গেও পারতোপক্ষে দেখা করে না সে। জানে না কেন?  মানুষ দুটিকে তার চোখে বড় হিংস্র মনে হয়। জীবনে প্রথম বারের মতো সূর্য অনুভব করতে চেষ্টা করে। ‘মানুষ’ শব্দটার অর্থ। ডাক্তারের মতো পরিচিত সবাইও ধরে নিলো যে এমন আচরণ সেই দুর্ঘটনার ফলাফল। সময়ে কিছুই কি হবে না। তাই সে নিজেকে বন্দি করে রেখেছিলো একটা বৃত্তে। পরিবারের সাথে অনিবার্য সংঘর্ষটা এড়ানোর জন্য। তার জানা ছিল না যে এক শীতের বিকালে মা যখন নিজের রুমে ডেকে পাটালো, তখনই শুরু হলো নতুন আরেকটা অধ্যায়ের।

‘কীরে সূর্য? সারাদিন দেখিনি কেন? মায়ের বিছানার পাশে হাঁটু গেরে বসে সূর্য। ‘পরীক্ষা তো মা! এবার নিজের যোগ্যতায় ভালো রেজাল্ট করবো। ক্ষমতার জোরো সে অনেক করলাম। হাসে মা, খুব দেখি বুদ্ধি হয়েছে। এবার তোর হাতে কবিতার দায়িত্ব দিয়ে শান্তিতে মরতে পারবো। এসব কি বলো? ধুর তুমি না থাকলে আমার কী হবে?

‘মা কি কারো চিরকাল থাকে?’

‘আমার থাকবে’।

ছেলেকে আরো কাছে টেনে নেন মা। আমি জানি বাবা, তুই বদলে গেছিস। আর বদলে গেছিস বলেই তোকে আজকে কিছু কথা বলবো। মায়ের কথা মেনে নিয়ে না করিস না, ঋণ মনে করে দায়িত্বগুলো পালন করবি। তোকে করতেই হবে। মায়ের দিকে বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকে সূর্য। যদিও তার দু’চোখে এতটুকু বিস্ময় ছিলো না। ছিলো অদ্ভুত এক শক্তির আভাস।

‘কী করবো, বলো ? তুমি যেমন বলবে তেমনই হবে’

‘পারবি?’

‘পারতে হবে!’

সন্তানের মুখের দিকে দীর্ঘ অনেকগুলো মুহূর্ত তাকিয়ে থাকেন মা। কবিতার বিয়ে হচ্ছে জানিস?  তোর দাদাজানের পছন্দের পাত্রের সাথে। মাথা ঝাকায় সূর্য। ‘হ্যাঁ’ সেই লোকের আরো তিন স্ত্রী আছে, কবিতা হচ্ছে চতুর্থ।

‘বলো কী?‘

সেই লোকটা বিরাট ধনী। তোর দাদাজানের পার্টির মানুষ। কবিতাকে বিয়ের আগে বাকি তিনজনকে সে তালাক দেবে। অবিশ্বাস্য মনে হয় সূর্যের। এটা কোন যুগে বাস করছে সে? মধ্যযুগ? এসব কোন দেশীয় আচারবিধি?

মাথা নিচু করে বসে থাকে সূর্য। আহারে বোনটা। মাথা নিচু করে বসে থাকে কারণ লজ্জায় ওর ঘাড় হেঁট হয়ে যাচ্ছিলো। কিছুদিন আগ পর্যন্তও সে বাপ-দাদার যোগ্য উত্তরসূরী ছিলো। দাদার কথায় কবিতার ভালোবাসার ছেলেটিকে কী অবস্থাই না করছে।

জানিস তো— তোর বাবার নবক্ষই ভাগ অর্থ-সম্পদ তোর নামে। যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে তোকে নিয়ে বড় গর্ব তার।

‘জানি’

এটাও তো জানিস যে ঠুনকো এই সামাজিক মর্যাদা কতো প্রিয় তাদের কাছে?

‘জানি’

এও তো বুঝতে পারিস যে নামকরা মানুষের সন্তানেরা নিজ বংশের দুর্নাম করলে তা প্রচার মাধ্যমকে কাঁপিয়ে দেবে? এবং সেটা ঠেকাতে তোর বাপ-দাদারা যে কোন শর্তে রাজি হবে ?

‘জানি’ মায়ের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে সূর্য। আমি জানি, মা, তুমি যা চাও, তাই হবে। দাদাজান এই বাড়িতে বসে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে…

সেখান থেকে শুরু করলে কেমন হয়?

শেষকথা
শিশুগুলোর আনন্দ দেখে মনটা ভরে যাচ্ছিলো জেবার। এরা হতদরিদ্র, রাস্তার শিশু হিসাবে বেড়ে ওঠা, একটা নতুন জামা আর ভালো খাবার এই শিশুগুলোর কাছে স্বপ্ন সত্যি হবার মতো, সোহান তেমনই বলতো। শিশুগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে বারবার দু’চোখ ভিজে আসে জেবার, স্বপ্নগুলোকে ফেলে রেখে কোথায় চলে গেলো সোহান। স্বপ্ন দেখতো মানুষটা, এ দেশের অসুস্থ আর অস্থির সমাজব্যবস্থাকে বদলে ফেলার স্বপ্ন।

আশপাশের ভিড়ের চোখ এড়িয়ে সাবধানে চোখ মুছে নেয় জেবা। আজ সোহানের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। এক বছর আগে এই দিনেই মারা গিয়েছিলো ওর সবচাইতে প্রিয় বন্ধুটি— ডেঙ্গু জ্বরে।

বিশ্বাস হয় না। এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় জেবার যে এতো সজীব একটা মানুষ এতো সামান্য একটা কারণে মরে যেতে পারে। এইতো, সেদিন ছিলো।

মনকে ঘুরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলেও ভিড়ের মাঝে একটা ছেলে বারবার শুধু সোহানের কথা মনে করাতে থাকে। ঠিক এ রকম হেয়ার স্টাইল, চোখের চশমা পরনের নীলচে চেকশার্ট আর জিন্স। সবচাইতে অদ্ভুত চোখের দৃষ্টিটা। অবিকল একরকম। যেনো যেমন খুশি সাজো কম্পিটিশনে ছেলেটি সোহানকে অনুকরণ করছে।

জানেনা কখন যেনো পায়েপায়ে এগিয়ে যায় জেবা। ছেলেটির চোখে চোখ রেখে দাঁড়ায়। আপনি দেখতে অবিকল আমার এক বন্ধুর মতো। খুব ভালো বন্ধু ছিলো আপনার? ‘হ্যাঁ, বেস্ট ফ্রেন্ড। আশেপাশের ভিড় আর তুমুল হৈ-চৈ-এর দিকে একনজর তাকায় সূর্য, তারপর আবার জেবার চোখে।

‘সোহানের স্বপ্নটা পূরণ করেছেন?’

ক্ষীণ হাসে মেয়েটা, ‘আপনি বুঝি সোহানকে চিনতেন?’

‘এখন চিনি, খুব ভালোভাবে। সে আমাকে তার স্বপ্নগুলো দিয়ে গেছে।’

অনেক অনেকগুলো মুহূর্ত বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকে জেবা।

‘সোহানের কর্ণিয়া আপনি পেয়েছেন?’

‘হ্যাঁ, এবং অনেক কষ্ট করে খুঁজে বের করেছি আপনাদেরকে।’

‘কেনো?’

‘সোহানের স্বপ্নগুলো আমাকে বাধ্য করেছে। আমাকে নেবেন আপনাদের সাথে?’

‘কেনো? অবশ্যই নেবো।’

হাসে সূর্য। অপলক তাকিয়ে থাকে জেবার দিকে। শেষ বিকেলের আলোয় জলভরা একজোড়া দৃষ্টি তাকিয়ে আছে ওর চোখে। সেই অপরিচিত মুখ।

জেবার একটা হাত ধরে সে।

‘আপনি কি জানেন, সোহান নামের ছেলেটা যখনই চোখ বন্ধ করতো, সে শুধু আপনার মুখটাই দেখতে পেতো?’

জলবিন্দুগুলো গড়িয়ে নামে জেবার গাল বেয়ে, বিকেলের রোদে চিকচিক করে।

মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে সূর্য।

কিংবা সোহান।

অপরাধ ও শাস্তি
নাসিমুজ্জামান সরকার

ছোট্ট মনোহর একটা বাড়ি। কোনো একটি বাড়িকে যেভাবে সাজানো হলে তা একটি উৎকৃষ্ট শিল্পে পরিণত হতে পারে বাড়িটি ছিলো সেরকমই। সেই গৃহে বাস করতেন প্রথম যৌবন অতিক্রান্ত হয়ে চলেছে এমন বয়সের এক ভদ্রলোক। ভদ্রলোকের নাম রাজেশ খান। ভদ্রলোক ছিলেন মহা সৌখিন মানুষ। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্মের এমন কোনো নিদর্শন নাই যা তার গৃহে অনুপস্থিত ছিলো।   বই-পুস্তক থেকে শুরু করে বিখ্যাত সব পেইন্টিং, ভাস্কর্য ও অন্যান্য জিনিসপত্র দিয়ে তার সমস্ত বাড়ি সুসজ্জিত ছিলো। শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত এমন কোনো বিষয় নেই যার সামান্যতম নিদর্শন তার বাড়িটিতে মিলতো না। এই মাঝ বয়সে পা দিয়েও ভদ্রলোক নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করতেন। বাইরের এই সহজ কথাটির প্রলেপের অভ্যন্তরে কোনো নিগূঢ় সত্য কথা লুকিয়ে আছে কিনা তা শক্ত করে বলা কঠিন। কি জানি মানুষের মন, তার কোন গহক্ষরে কোথায় কোন মর্মব্যথা লুকিয়ে আছে কে বলতে পারে? তারই বাড়িতে থেকে একটি কিশোরী বাল্যকাল হতে বেড়ে উঠছিলো। কিশোরী রাজেশের রক্ত সম্পর্কে কেউই নয়। এই কন্যাটিকে তিনি হয়তো কখনো চিনতেনও না। একদিন দুর্লভ বইয়ের খোঁজে শহরের একটি পুরোনো বইয়ের দোকানের দিকে রাজেশ গাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলেন। খুব ছোট একটি মেয়ে তারই গাড়ির ধাক্কায় রাস্তার ধারে পড়ে পায়ে আঘাত পায়। যদিও সে দুর্ঘটনায় রাজেশের কোনো দোষই ছিলো না। মেয়েটির সাথে মাঝবয়সী একজন মহিলাও ছিলেন। মহিলা ঐ কন্যার মায়ের দূর সম্পর্কের বোন হতো। আপনার বলতে তিনি ছাড়া মেয়েটির আর কেউই ছিলো না। ভীষণ রাগ এবং বিরক্তি নিয়ে রাজেশ গাড়ি থেকে নেমে আসলেন। আজ বড়ো অপ্রীতিকর কিছু একটা ঘটে যেতে পারতো। যদিও ভাগ্যে রাজেশের খুব বেশি আস্থা ছিল না তথাপি বিস্ময়জড়িত চোখসমেত ভ্রুযুগল উঁচু করে কপাল ও মাথার অগ্রভাগের স্থানটিতে আলতো করে হাত ছুঁইয়ে নিলেন। এমন বড়ো বিপদের সম্ভাবনা তার চালক জীবনে আর কখনো ঘটেনি। প্রচণ্ড বিরক্তির সঙ্গে মহিলাটিকে তিনি কড়া ভাষায় বকা দিতে উদ্যত হবেন এমন সময় দেখলেন ছোট্ট মেয়েটির পা দিয়ে অঝোরে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। ইতোমধ্যে সেখানে এক অস্বস্তিকর ভিড় উপস্থিত হতে আরম্ভ করেছে দেখে তিনি তৎক্ষণাৎ মহিলা ও ছোট মেয়েটিকে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। ভিড়টি জমবার পূর্বেই ভেঙে গেলো। বিশেষ কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি, কি ভয়ানক কাণ্ডই না ঘটতে পারতো কিংবা কাণ্ডটি মূলত কী ছিল এমন নানা কথায় কানাকানি করতে করতে মানুষগুলো স্ব-স্ব কর্মস্থলে ফিরে গেলো। রাজেশ এরই মধ্যে তাদের দুজনকে নিয়ে একটি নিরিবিলি প্রাইভেট হাসপাতালে এসে উপস্থিত হলেন। যেহেতু বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল এবং হাসপাতালেও বিশেষ ভিড় ছিলো না তাই ফাঁকা বেড ও ডাক্তার পেতে বিলম্ব হলো না। ডাক্তার মেয়েটির পায়ে ব্যান্ডেজ করছিলেন। এই সময়ের মধ্যে মহিলাটির কাছ থেকে রাজেশ আদ্যন্ত মেয়েটির সম্পর্কে শুনে নেয়। জগতে তার আপন বলতে কেউ নেই, স্থায়ী বাসস্থান নেই, জীবনের নিরাপত্তা নেই। এই মহিলার সাথে থেকে মেয়েটিকে অনাবশ্যক নির্যাতন সহ্য করতে হচ্ছে আর এই বোধবুদ্ধিহীন বয়সেই যে তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিযুক্ত হতে হয়েছে তাতেই রাজেশের হৃদয় বিদীর্ণ হতে লাগলো। রাজেশের বয়স তখন খুব বেশি হয়নি। সবেমাত্র কয়েকবছর হয় পড়ালেখা শেষ করে বড়ো সরকারি অফিসে উচ্চপদে চাকরিতে নিযুক্ত হয়ে বছরখানেক আগে একটা গাড়ি কিনেছেন। এই সময়ে সুনয়না মায়াবী কন্যাটির মুখের দিকে চেয়ে স্ত্রীসন্তানহীন যুবকের মনে এক অচেনা মায়ার সৃষ্টি হলো। যেহেতু তার নিজেরও কেউ ছিল না এবং এই অনাবশ্যক পৈতৃক সম্পত্তি আর চাকরি উপার্জিত বিপুল অর্থের কোনো অংশীদার নেই। তারপরও তার নিজের এবং এই সুসজ্জিত গৃহটি দেখাশোনার জন্যও এমন কেউই তার নেই এই ভাবনাই তার হৃদয়ে বেশি করে বাজতে লাগলো। তিনি মুহূর্তেই ভেবে ফেললেন মেয়েটিকে নিজের কাছে রেখে দেবেন। এই কথাটিই মহিলাটিকে তিনি ইনিয়ে বিনিয়ে বললেন। মহিলাটিও তার অনিচ্ছার কথা আকারে ইঙ্গিতে রাজেশকে জানিয়ে দিলো এবং এই ছোট্ট শিশু মেয়েটি যে তার দৈনিক উপার্জনের একটা বড় উৎস সে কথাটা প্রকাশ্যে জানাতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলো না। রাজেশ মহিলার হাতে দশ হাজার টাকার একটা তোড়া গুঁজে দিয়ে বললেন তুমি আর আপত্তি করো না। মহিলার মুখাবয়বে একটি হাসির রেখা বিজলীর ন্যায় মুহূর্তেই ঝলক দিয়ে গেলো। মুহূর্তেই সে তা সংবরণ করে বলে উঠলো— ‘আমার বোনের একটি মাত্র মেয়ে। কী মায়ায় জড়ানো চোখ দু’খানা, মুখের কী অপরূপ শ্রী, শরীরে গৌরবর্ণে কী লাবণ্য! এ মেয়েকে দেখলে নিতান্ত নির্দয়-হৃদয় সাহেবের পকেট হতেও টাকা সুড়সুড় করে বের হয়ে আসে। এমন মেয়েকে এতো অল্প কয়টি টাকার বিনিময়ে আমি ছেড়ে দিতে পারি না।’ মহিলার হৃদয়ে এক নিদারুণ টাকার লালসা ব্যতীত মেয়েটির প্রতি সামান্য মমতা প্রকাশ পেলো না তাই দেখে প্রচণ্ড ব্যথা ও বিরক্তিতে আরো পাঁচ হাজার টাকার একটা তোড়া রাজেশ মহিলার দিকে ছুঁড়ে দিলেন। তাতেও মহিলার আপত্তি ঘুচলো না দেখে রাজেশ রুক্ষস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘কতো টাকা তোমার চাই? আরো কতো টাকা হলে মেয়েটিকে তুমি আমায় দিবে?’ মহিলাটি নির্লজ্জের মতো বলে দিলো, ‘আমায় পুরো বিশ হাজার টাকা দিতে হবে তবেই আমি আমার বিনুকে অন্যের হাতে তুলে দেবো।’ রাজেশ তাই দিয়ে তাকে বিদায় হতে বললেন। বিশ হাজার টাকা ঐ সময়ে বেশ বড়ো অঙ্কের টাকা। একজন নিঃস্ব মানুষের সারা জীবনের খোরাকের জন্য বিশ হাজার টাকা একেবারে অপর্যাপ্ত হয়তো নয়। সুতরাং মহিলাটি অহেতুক মিথ্যে মায়ার ভান করে গদগদ কণ্ঠে রাজেশের বাড়ির ঠিকানা জানতে চাইলো কিন্তু কী আশ্চর্য এতো অর্থপ্রাপ্তির লোলুপ খুশি তৃপ্তির আভা তার মুখ থেকে বিলীন হলো না। রাজেশ এবার অত্যন্ত রূঢ় স্বরে তাকে বের হয়ে যাবার নির্দেশ দিলেন। মহিলাটি আর কথা না বাড়িয়ে ঈষৎ হাস্যমুখে অথচ অভিমানের ভান করে হাসপাতালের কেবিন হতে বের হয়ে চলে গেল। রাজেশ কন্যাটিকে গাড়িতে তুলে বাজার থেকে প্রয়োজনীয় ঔষধপত্র, কিছু ফলমূল, কিছু শুকনো খাবার ও মেয়েটির জন্য ভালো কয়েক সেট রঙিন কাপড় কিনে বাসায় ফিরে গেলেন। এরপর প্রায় দুবছর মেয়েটিকে বাড়ির কোনো কাজই করতে হয়নি। এই সময়ে রাজেশ মেয়েটিকে দেখাশোনা করেছে, অবসর সময়ে নিয়ে গল্প শুনিয়েছে এবং আনন্দপ্রদায়ক নানা কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দিনগুলো অতিক্রান্ত হয়েছে। রাজেশ নিজেই রান্না করতেন। রাজেশ যখন মেয়েটিকে নিয়ে আসেন তখন তার বয়স আটাশ অতিক্রম করেছে আর কন্যাটির বয়স অনুমান সাত থেকে আট বছর হবে। এরপর মেয়েটি নিজে নিজেই কিছু কিছু গৃহকর্ম করতে শুরু করে। এখন রাজেশ আটত্রিশের কোঠায় আর কন্যাটির সতের-আঠারো। বর্তমানে পুরো গৃহ ও গৃহকর্ম মোটামুটি কন্যাটির নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। প্রথম দিকে রাজেশ কন্যাটিকে বিনু বলেই ডাকতো। পরে আদর করে নাম রাখে হীরা। এখনো হীরা নামেই তিনি মেয়েটিকে ডেকে চলেছেন। বাড়িতে নিয়ে আসার সময়েই বালিকা মহল্লার বিনা বেতনের স্কুল থেকে কিছু কিছু পড়ালেখা শিখেছিলো। তখন তার মা জীবিত ছিলেন। বিশেষ করে অ,আ; ক,খ; এ,বি,সি-র অধ্যায়গুলো তার মুখস্ত ছিলো। এইসব বর্ণগুলো দিয়ে সে শব্দও মেলাতে শিখেছিলো। গণিতের ধারাপাতের নয় ঘর পর্যন্ত নামতাও সে জানতো। সুতরাং রাজেশের মেয়েটিকে শিক্ষিত করবার ব্যাপারে আগ্রহ সৃষ্টি হতে বিপত্তি ঘটলো না। আর তা খুব বেশি শক্তও হলো না। দেখতে না দেখতেই মেয়েটি পড়ালেখা শিখবার উপযুক্ত হয়ে উঠলো আর পড়ালেখার প্রয়োজনীয়তা ও মানসিকতা ভদ্রলোকের কথায় কোন ফোকর দিয়ে তার মস্তিষ্কে প্রবেশ করলো সে তা জানতেও পেল না। এভাবে দিনের পর দিন হীরা শিক্ষিত হয়ে উঠতে লাগলো। বিশ্বের বিখ্যাত সব প্রেমের পুস্তক পড়ে, সিনেমা দেখে, বিখ্যাত সব পেইন্টিং ও ভাস্কর্য দেখে মেয়েটির দিনভালোই কাটতে লাগলো। রাজেশ সারা দিনে খুব বেশি সময় বাড়িতে থাকতে পারতেন না। সরকারি কর্মচারি বলে ছুটি পেতেন কম। কিন্তু যতটুকু সময় অবসর পেতেন তিনি বাড়ির বাইরে কখনো কাটাতেন না। বিশেষত বাড়িটি তার খুব প্রিয় ছিলো। হীরা এ বাড়িতে আসার পর তা আরো আকর্ষণীয়, আরো অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। হীরা দেখতে দেখতে যুবতী হয়ে উঠতে লাগলো। রাজেশের মনের অন্তর্লোকে কোথায় কখন কীভাবে হীরার একটা ছায়া প্রকট হয়ে উঠতে শুরু করলো তা তিনি নিজেও বুঝে উঠতে পারলেন না। বিশেষত হীরার সাথে তার সম্পর্কটা যে কী তা তিনি নিজেই গুলিয়ে ফেলতেন। এ তার কন্যা নয়, ভগিনী নয়, স্ত্রী নয়, প্রেমিকা নয়জ্জকেউই নয়। তথাপি হীরার সঙ্গে তার সম্পর্কটা নেহাত প্রভু ও দাসীর সম্পর্ক মনে করা দুঃসাধ্য ছিলো। বাড়িতে আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত রাজেশ তাকে হীরা নামে এবং তুমি সম্বোধনেই ডেকে আসছেন। হীরা তাকে ‘আপনি’ ব্যতীত অন্য কোনো কিছু বলে সম্বোধন করেনি। অধিকন্তু ‘বনলতা সেন’ কবিতার বনলতা সেন; ভিনচির ‘মোনালিসা’র স্থানে; কিংবা ব্র“নারোতির ‘নিউড ইয়থ’-এর পাশে কিংবা পিকাসোর ‘গার্ল বিফোর দি মিরর’ সামনে রেখে তিনি হীরার মুখম-লই কল্পনা করতে লাগলেন। কিন্তু হীরার শারীরিক পরিবর্তন সমাজে স্বাভাবিক চোখে টিকলো না। কয়েকজন বয়স্ক ব্যক্তি তাকে ডেকে বুঝিয়ে দিলেন হীরার বয়স হয়েছে। তার সম্পর্কে ভাবা উচিৎ। কিন্তু বিশেষ বিত্তবান ও প্রভাবশালী বলে তার মুখের সামনে কেউ কিছু বলতে সাহস পেতো না। কিন্তু পেছনে কটুকথা বলতেও ছাড়তো না। এ কথা রাজেশের অজানা ছিলো না। এ ব্যাপারে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ না থাকলেও বিষয়টি তাকে পীড়া দিতো। স্নেহ ও ভালোবাসা তার মনে যে জটাজাল তৈরি করেছিলো তার থেকে নিষ্কৃতি পাবার কী পথ তা তিনি অনেক ভেবেও আবিষ্কার করতে পারেন নি। মাথার চুলের রেখায় ও দাড়ি-গোঁফে পাক ধরেছে। মুখশ্রী এখন আর ঠিক আগের মতো লাবণ্যময় নেই। এই বিষয়গুলো তাকে নিভৃতে পীড়া দিতো। মাঝে মাঝে দর্পণের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে কখনো দুএকটি কবিতাও লিখে ফেলতেন। আর তা কখনো হীরাকে ছলে-কৌশলে শুনিয়েও ছাড়তেন। কিন্তু স্পষ্ট করে কিছু বলার সাহস তার ছিল না। বিশেষ করে হীরার মনে তার সম্পর্কে ভাবনার স্থানটা যে কীরূপ-পিতার ন্যায়, ভ্রাতার ন্যায়, মনিবের ন্যায় না কীরকম তা ভেবেও তিনি অনেক রাত দ্বিপ্রহর করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধান মেলেনি। এ গেলো রাজেশের কথা।

আর হীরার কথা? প্রেম বস্তুতা যে কী তা বুঝবার পর থেকে তার ধ্যান জ্ঞানে সে শুধুমাত্র একটি মানুষকেই কল্পনা করতে শিখেছিলো। তিনি রাজেশ। রাজেশের অপ্রকাশিত কথাগুলো যেন সে নিভৃতে পড়তে পারতো। আর তা তাকে বেশ আনন্দও দিতো। হীরার সামান্য অনুপস্থিতি ভদ্রলোককে কেমন বিহ্বল করে তুলতো তাও সে নিরবে উপভোগ করতো। কিন্তু হীরা ছিলো রাজেশের থেকেও অসহায়। সে যে নারী! আশ্রিতা, যাঁকে সে ভালোবাসে তাঁরই করুণায় বেঁচে থাকা এক অসহায় নারী। ভালোবাসার সুপ্ত বীজ তার হৃদয় ফুড়ে অঙ্কুরিত হতে চাইলেও সে এই ভাবনাতেই দুঃখ নিজের মধ্যে চেপে রাখতো। আর এতোটা নিষ্ঠা, এতোটা দৃঢ়তা, এতোট সংযমতার চরিত্রে ছিল যে ভদ্রলোকের প্রতি শ্রদ্ধার সাথে সাথে কোথাও অতিরিক্ত যে আরো কিছু আছে তা ভুল করে কখনো ইঙ্গিতেও প্রকাশ হতে দিতো না। হীরা চরিত্রের এ দৃঢ়তাই ভদ্রলোককেও সাহস যোগাতে বাঁধা দিতো। কোনোদিন রাজেশের আসতে একটু দেরি হলে হীরা নিরবে বসে দুশ্চিন্তার প্রহর কী যন্ত্রণায় অতিক্রম করতো তা সে কেবল নিজেই জানে। কিন্তু কখনো সে ভদ্রলোককে একথাও বলতো না যে, যেনো কখনো আর এমন দেরি করে আসা না হয়, আসলেও তা আগে থেকেই যেনো জানানো হয়। তার ব্যথা, আনন্দ, যন্ত্রণা, ভালোবাসা সবই একান্ত নিরবে ফুলের মতো বিকশিত হয়ে মুহূর্তেই ঝরে পড়তো। আর কখনো কোনো বিশেষ সরকারি কাজে রাজেশকে বাড়ির বাইরে থাকতে হলে কী যন্ত্রণাময় একাকীত্ব তাকে সহ্য করতে হতো সে কেবল হীরাই জানে। অবশ্য ভদ্রলোকও গোপনে বাইরের কাজ যতোটা না নিলে চাকরি টেকে না তার অধিক নিতেন না যদিও সেখানে উপরি পাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকতো। এমনি করেই তাদের দুজনের একান্ত দুর্বোদ্ধ রোমান্টিক মুহূর্তগুলো কাটতে থাকে। এই দুর্বোদ্ধতা তাদের দুজনের মধ্যে অবশ্য একটা লজ্জার দেয়াল তৈরি করে। এ কারণে হীরা পরবর্তীতে যতোটা সম্ভব ভদ্রলোকের সামনে কম আসা যায় ততোই কম আসতো। কিন্তু প্রতিনিয়ত দূর থেকে তাকে অনুসরণ করতো আর তার আদেশের প্রত্যাশা করতো। এ পর্যন্ত হীরার পড়ালেখা নিজের মতো করে ভালোই চলছিলো। কিন্তু এই প্রেম যখন তীব্রভাবে তাকে পীড়া দিতে আরম্ভ করলো তখন তার পড়ালেখায়ও আর মন বসতে চাইলো না। সারাক্ষণ শুধু ভদ্রলোককে নিয়ে নিভৃতে আকাশকুসুম কল্পনা করতে আর তার ডাকের প্রত্যাশার প্রহর গুণতেই তার সময়ের অবসর রইলো না। এমনি করেই দিন যাচ্ছিলো। রাজেশ একদিন সন্ধ্যায় ঘরে বসে কাজ করছিলেন। টেবিলের কোণে মৃদু আলো জ্বলছিলো। বিশাল ঘরের সর্বত্র তা একটি অপরূপ মায়া সৃষ্টি করে স্বল্প রশ্মিতে বিকিরিত হতে থাকে। তার চ্ছটায় রাজেশের মাঝ বয়সী মুখেও একটি লাবণ্যের সৃষ্টি হয়। সেটাই পাশের ঘরের দোর থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে হীরা দেখতে থাকে। রাজেশের টেবিলে কয়েকটি ছোট ও মাঝারি সাইজের অপরূপ ভাস্কর্য শোভা পাচ্ছিল। হঠাৎ সামান্য পানির তেষ্টা পেলে রাজেশ হীরাকে ডেকে এক গ্লাস পানি আনতে বলেন। ওই মুহূর্তে ভদ্রলোকের নির্দেশটি হীরার শিরার মধ্যে এক অপরূপ দোলা দিয়ে যায় এবং তার মনে হয় এই ডাকটির জন্যই যেনো সে যুগের পর যুগ অপেক্ষায় ছিল। খুশি ও লজ্জার মাঝামাঝি অনুভূতি তার মুখে ফুটে উঠলো। হুঁশিয়ার হয়ে সে তড়িঘড়ি করে এক গ্লাস পানি নিয়ে প্রায় কাঁপতে কাঁপতে এসে রাজেশের ঘরে প্রবেশ করলো। কিন্তু অধিক উচ্ছ্বাসে সে একটি ভুল করে বসলো। গ্লাসটি রাজেশকে দিতে গিয়ে অসতর্কতাবশত টেবিলের একটি ভাস্কর্য নিচে পড়ে ভেঙে গেলো। ভাস্কর্যগুলো রাজেশের অত্যন্ত প্রিয় ছিলো। এই কাণ্ড দেখে রাজেশ বিরক্ত হয়ে চোখ রাঙা করে হীরার দিকে একটিবার মাত্র তাকালো। আর কিছুই নয়। এতেই হীরা একেবারে সঙ্কুচিত হয়ে যেনো মাটির সঙ্গে মিশে গেলো। অপরাধবোধে সে মুখ নিচু করে একেবারে নিজের ভেতর যেন নিজেকে গুটিয়ে নিতে চাইল। হীরার এতোটা মলিন মুখ রাজেশ তার সমস্ত জীবনে আর কখনো দেখেনি। কিন্তু এই অপরাধী সঙ্কোচিত ভাব হীরাকে কতোটা মনোরম করে তুলেছিলো তা দেখে রাজেশ মুগ্ধ বিহক্ষল দৃষ্টিতে হীরার দিকে চেয়ে রইলো। হীরার রক্তাভ ঠোঁট ঈষৎ কাঁপছিলো। রাজেশ কঠোর ভাব করে এবার হীরাকে ডেকে বললেন, ‘তুমি কি জান তুমি কতো বড়ো অন্যায় করেছ? এ অন্যায়ের জন্য তুমি কোনো শাস্তি পাবে না, তা তো হবে না। শাস্তি তোমাকে পেতেই হবে।’ হীরা কোনো কথা বললো না। কেবল নীরবে মুখ নিচু করে রইলো। তার ভাবখানা এমন দাঁড়ালো যে, সে সর্বপ্রকার শাস্তি মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত। রাজেশ চেয়ার থেকে উঠে হীরাকে শাস্তি দেবার উদ্দেশ্যে তার হাতদুটো ধরে সজোরে বুকের সাথে টেনে নিলো। আর হীরার ঈষৎ কম্পমান ঠোঁট দুটোতে রাজেশ তার নিজের ঠোঁট মিশিয়ে দিয়ে যেনো তার কম্পন থামাবার বৃথা চেষ্টা জুড়ে দিলো। রাজেশের শাস্তি যে পরম আদরে রূপান্তরিত হয়েছে সে লজ্জায় হীরা সহ¯্রবার মৃত্যু কামনা করলো। হীরার গলায়, বুকে, কপোলে, চিবুকে অনবরত চুম্বনের বান বর্ষিত হতে লাগলো। কিন্তু তাকে নীরবে ভাবলেশহীনভাবে এই চির প্রত্যাশিত সুখের মুহূর্ত সহ্য করতে হলো। এই শাস্তির মধ্যে এক অসহ্য যন্ত্রণা আছে। যন্ত্রণার মাঝে কোথায় যে এক তীব্র সুখ অর্ন্তনিহিত আছে তা হীরাকে পুলকে বিস্ময়ে আত্মহারা করে দিলো। এমনিভাবে তেতাল্লিশ মিনিট শাস্তিকার্য সম্পন্ন হবার পর রাজেশ উঠে দাঁড়ালো। হীরা কোনো কথা বলতে পারলো না। মুখ নিচু করে দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে গেলো। আবেগের বশে এক চরম ভুল হয়ে গেছে এই পীড়ায় রাজেশ লক্ষ কোটিবার নিজের মৃত্যু কামনা করতে লাগলো। সে কেমন করে এই শিশুসুলভ কা- করে বসলো তা সে ভেবেই পেলো না। নিজের প্রতি চরম বিতৃষ্ণায় তার নিজেরই নিজেকে খুন করতে ইচ্ছে করলো। এরপর দু’দিন হীরা লজ্জায় আর রাজেশের সামনে আসেনি। রাজেশও তাকে এই দু’দিন একটিবারের জন্যেও ডাকেনি। খাবার সময় নীরবে একা গিয়ে খেয়ে এসেছে। কিন্তু এই মানসিক যন্ত্রণা তাকে প্রতিনিয়ত পীড়া দিতে লাগলো। রাজেশ কয়েকদিন তার মুখচছবি আর হীরাকে দেখায়নি। এই দুশ্চিন্তায় তার শরীরটাও কেমন ভেঙে পড়ে। একদিন সে অফিসে না গিয়ে বাড়িতেই বাইরের কদম গাছের নিচে বসে দুশ্চিন্তা করছিলো। ঘটনাটি যে হীরাকে কতোটা দুঃখ দিয়েছে তা ভেবে রাজেশ নিজেকে খুব অপরাধী মনে করলো। আর এই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করবে বলে ঠিক করলো। কিন্তু তা কীভাবে হবে তা সে স্থির করতে পারলো না।  এই ভাবনার জন্যই সে আজ অফিসে যায়নি। সন্ধ্যার সময় রাজেশ পুনরায় টেবিলে বসে ভাবছিলো কথাটা কীভাবে হীরাকে বলা যায়। সে কোনো আগামাথা ঠিক করতে পারলো না। অবশেষে সাহস সঞ্চয় করে সে হীরাকে মৃদকণ্ঠে ডাক দিলো। যেহেতু রাজেশ সারাদিন বাড়িতেই ছিলো তাই যেকোনো সময় ডাক আসতে পারে ভেবে হীরা আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলো। বলা মাত্রই তড়িঘড়ি করে মৃদু পায়ে হীরা উঠে এলো। হীরার পরনে ছিলো একটি লালপেড়ে শুভ্র শাড়ি, তাতে নীল রঙের ছোটো ছোটো ফুলের নকশা করা। হীরা এসে রাজেশের ঘরের দুয়ারে দাঁড়াতেই সে হীরার মুখের দিকে একবার তাকালো। যৌবনের সমস্ত রঙ ও রূপ যেনো তার সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে হীরার মুখাবয়বে ব্যাপ্ত হয়েছে। সে রূপ দেখলে নেহাত থুবড়ো বুড়োর হৃদয়েও হয়তো কবিতা তৈরি হবে। রাজেশ হীরার মুখের দিকে কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো চেয়ে রইল। একটি কথাও তার মুখ ফুঁড়ে বের হলো না। হীরা জ্বলন্ত অগ্নিমূর্তির ন্যায় তার অগ্নি বিস্ফারিত রক্তাভ চোখ একদৃষ্টিতে রাজেশের দিকে নিবদ্ধ করে রাখলো। হীরার এই চাহনি রাজেশের চির অচেনা বলেই দুর্বোদ্ধ। সেই চাহনির ভেতর যদিও চরম অভিমান ভিন্ন আর কিছুই ছিলো না তথাপি রাজেশের কাছে তা ঘৃণা ও ক্রোধ মিশ্রিত অগ্নিপিণ্ডের মতো মনে হতে লাগলো। ভদ্রলোক একমুহূর্ত হীরার মুখের দিকে চেয়ে নীরবে মুখ লুকিয়ে রইলেন।

হীরার চোখে যেন সহ¯্রবর্ষের জমানো জল ঝলমল করে উঠলো। এক আকাশ ধূসর মেঘ জড়ো হয়ে বারিবর্ষণের জন্যে যেমন ঘনীভূত হয় হীরার নয়ন দু’টোও কয়েকদিনের গভীর অতল অসহ্য অভিমানে জমা অশ্র“ মুহূর্তে বষর্ণের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। এভাবে নিরবতায় দুজনের মুহূর্ত অতিবাহিত হতে লাগলো। রাজেশ তেমনি করেই মুখ নিচু করে রইলেন। হীরার প্রত্যাশা এবার গড়িয়ে বিরক্তিতে রূপান্তরিত হতে শুরু করেছে। এমনি করে হীরার ধৈর্যের স্খলন ঘটলে এবার একটি বিকট শব্দে রাজেশের নিমীলিত চোখের দৃষ্টি মেঝের দিকে ছুটে গেলো। মেঝের উপর একটি ভাস্কর্য কয়েক টুকরো হয়ে ভেঙে রয়েছে। এবারে যে ভাস্কর্যটি ভেঙেছে তা পূর্বেরটির তুলনায় রাজেশের ঢের প্রিয় ও কয়েকগুণ দামি।

বৃষালি-পর্ব

দোয়েল ও খঞ্জনার দেশটি এককালে খররৌদ্রে ভরে যায়। ভোর করে শাদা বক ম্রিয়মান পাখনায় হাওয়া তুলে বলতে থাকে : ‘বৃষালি তুই কেন বাদলাস্বরে ডাকতে থাকিস!’ বৃষালি আহা সেই বৃষালি, এককালে সে হয়ে উঠেছিল পাশের বান্নির ডুগডুগির তুর্কী। জমজমাট সেখানে ভরা গলায় সে ভাটিয়ালি গাইত। চেনা ভাটিয়ালি কী? ঠিক মনে নেই। কিন্তু কঠিন উত্তপ্ত সুর তার। ঠিক রঙের ভেলায় ভাসানো চারকোণা ঝালর ঘুড্ডির মতো। ও কী পালতোলা বুঝি! পাশের দইডোবা দিয়ে তখন সারি নৌকো যায়, নাইয়র ভাসে, ওপারেই গাড়াবেড় গ্রাম। নদী পার হলেই ওতে অন্ধকার, পাথার কালো করা নিবিড় অন্ধকার। জটিল সে অন্ধকার। ওখানেই বৃষালিরা থাকত। বান্নি উপলক্ষ্যে ওটাই ওদের নিবাস। আমাদের তখন কচি ঘন সবুজ ঘাস মাড়ানোর দিন। ঘাসের ভেতর নখ খুঁইয়ে ঘাসের ডগা চেনা। পাশের ক্ষেতে মচমচা টম্যাটোর বাগানের ওপর পা ফেলে বৃষালিদের তাবুতে পৌঁছানো। ওখানে গানের আসর তখন। কী সুঠাম বৃষালির শরীর। ভরাট বুকে, রক্তগোলাপের রাঙা শরীরে আমাদের চোখ ফেরে না। চিক্কন কোমরের স্থির সৌন্দর্য আমাদের চিরচেনা হাওয়াকে হরণ করে, পাল্টিয়ে দেয়। তীব্রভাবে টানা ভাটিয়ালি বৃষালিকে আরও ভরিয়ে তোলে। আমরা তখন বেরিয়ে পড়ি, গাড়াবেড় গ্রামকে অলৌকিক আদরে রাতের চাঁদের ভরমে শ্র“তিময় সুখে আলিঙ্গন করি। ঘনানো রাতে বৃষালিকে কাছে ডাকি, কথা বললে সে প্রাণখোলা হাসিতে কী কী সব কয়। বোঝা যায় না। অন্ধকার ক্ষেতে বান্নি ডুবে যায়, বৃষালি আবার আসিবে কিন্তু কথার আগেই একদিন লোপাট হয় সবকিছু। পীরের আদেশে নাকি স্থানীয় মেম্বরের আগুনে পুড়ে যায় বৃষালিরা জানা হয় না। থানার বড় বাবুরা সাক্ষ্য সংগ্রহ  করেন। অনেককাল পরে গ্রেফতার হন মেম্বর, পীরের লান্নোতের দেখা কেউ পায় না— কিন্তু বৃষালি হারিয়া যায়। আজও কাঁদি বৃষালির জন্য— তাইতো শাদা বক এখন চিরকাল ম্রিয়মান। আমরা লান্নোত বুঝি না, মেম্বারের সাজা বুঝি না, বৃষালিকে বুঝি। বান্নিমুখরিত এলাকায় আমাদের বৃষালিরে ফিরাইয়া দাও। ও না থাকিলে বান্নিতে কে আসিবে! অনেক চিক্কুর দিলেও সে আসে নাই। তখন পাতাদের সংসারে মাঘনিশীথের রাতে নাড়ার আগুনে সেই রক্তগোলাপের ছিনতাই করা মুখ ধরা পড়ে। খুব তোলপাড় কান্না ওঠে। বৃষালিরা আসে না। রাত্রির গহ্বরে অন্ধকারে হারিয়া যায়, অঙ্গারের নিঃশব্দে তখন ভোরের হাওয়া ঢুকে পড়ে স্নানরত বৃষালি পুনরায় বৃষ্টিস্নান পায়। ভরা আষাঢ়ে এখন তাহার গভীর উদ্যাপন। এ উদ্যাপনেই সে বাঁচিয়া থাকিবে। চিরকিশোররূপে পাইবে তাহার সৃষ্টির অমরত্ব।

চিহ্নপ্রধান

আলোচনা