বিশেষ রচনা

images

ভারতীয় নারীবাদ ও যৌনতার ডিসকোর্স

images1
______________________________________
সরোজিনী সাহু
______________

অনুবাদ: মাহবুব অনিন্দ্য
________________________

সরোজিনী সাহু দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম নারীবাদী লেখিকা। kindle ম্যাগাজিনের দৃষ্টিতে ভারতে ২৫ ব্যতিক্রমী নারীর একজন। জন্ম ১৯৫৬ সালে ভারতের ওডিশা রাজ্যে। লেখেন ওড়িয়া ও ইংরেজিতে। তার গল্প, কবিতা, উপন্যাস ও প্রবন্ধের বিষয়বস্তু মোটা দাগে নারীÑ নারীর জীবন, যন্ত্রণা ও নানাবিধ জটিলতা। গল্প-উপন্যাস মিলিয়ে ওড়িয়া ভাষায় প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৭। ইংরেজিতে এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে একটি উপন্যাস ও দুটি গল্প-সংকলন। কলেজে অধ্যাপনার পাশাপাশি ফিচারভিত্তিক ইংরেজি জার্নাল ইন্ডিয়ান এজ এর সহযোগী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত। নিয়মিত ব্লগ লেখেন। তার লেখা এরমধ্যে পাঠকসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। অনূদিত হয়েছে ইংরেজি-বাংলা-হিন্দিসহ বেশ কয়েকটি ভাষায়। লেখালেখির জন্য ওডিশা সাহিত্য একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসহ অর্জন করেছন বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মাননা। এই লেখাটি Indian Feminism and Sexuality Discourse প্রবন্ধের বাংলা রূপান্তর।

১৯০১, ফুল ফোটে, ঝরে

১৯০১ সালে বস্তারের (বর্তমানে ছত্তিশগড়) এক খ্রিস্টান পরিবারে তার জন্ম। পরে তিনি কটক মেডিকেল স্কুলে পড়ালেখা করেন এবং সেখান থেকেই অর্জন করেন এলএমপি ডিগ্রি। সেই সময়েই তিনি কটক রেডক্রসের সুপারিনটেনড্যান্ট হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন। এসময় পিতার বয়সী এক লোকের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে তার স্ত্রী কর্তৃক হাতেনাতে ধরা পড়েন। তাদের মধ্যে গভীর শারীরিক সম্পর্ক ছিল, কিন্তু প্রেমিকটি মনেপ্রাণে চাইতেন যোগ্যতম কোনো ব্যক্তির সাথে তার বিয়ে হোক।
১৯২১ থেকে ১৯২৭, এই ছয়-সাত বছরে তিনি বেশ কিছু লেখালেখি করেন। ওড়িয়া ভাষায় অঞ্জলি ও অর্চনা সহ কয়েকটি কবিতার বই এবং ভারতী ও পরশমনি নামে উপন্যাস বের হয় তার। লেখার মাধ্যমে তিনি প্রতিবাদ করেছেন পর্দাপ্রথা, বাল্যবিবাহ, জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা ও নারীর প্রতি সকল বৈষম্যের। পাশাপাশি কথা বলেছেন নারীর অধিকার, ক্ষমতায়ন ও বিধবা বিবাহের পক্ষে। রেডক্রসে তার পরামর্শক-প্রেমিকটির সাথে সম্পর্ক থাকা অবস্থায় তিনি দিল্লিতে বসবাসরত এক অখ্যাত ডাক্তার তথা ভণ্ডলোকের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। অচেনা এই ডাক্তারের সাথে বিয়ের বিরোধিতা করেন প্রেমিকটি। তাতে কাজ হয়নি। চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি আর্যসমাজের সভ্য হন এবং অচেনা সেই ডাক্তার লোকটিকে বিয়ে করেন। তারপর দিল্লির চাঁদনিচক এলাকায় ক্লিনিক খুলে সেখানেই বসবাস করতে থাকেন। ওড়িয়া ভাষায় লেখা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি হিন্দিতেও লিখতে শুরু করেন তিনি। বরমাল্য নামে হিন্দি কবিতার সংকলন বের হয় তার। পাশাপাশি মহাবীর, জীবন ও নারী ভারতীর মতো কয়েকটি হিন্দি সাময়িকপত্রের সম্পাদক হন। পরে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় ও বেনারশ হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেবার আমন্ত্রণ পান। একজন নারীর জন্য সেই সময়ে এটি ছিল দুর্লভ স্বীকৃতি।
কিন্তু তার বিবাহিত জীবন সুখের ছিল না মোটেও। স্বামী তাকে ব্যবহার করেছিল উপার্জনের উৎস হিসেবে। প্রতিরোধের চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত পারেননি। রোগে-শোকে, মানসিক আঘাতে জর্জরিত হয়ে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে মারা যান তিনি। তার করুণ জীবন ও সংগ্রামের ওপর ভিত্তি করে প্রখ্যাত হিন্দি সাহিত্যিক জিনেন্দ্রকুমার রচনা করেন কল্যাণী উপন্যাস।
তার নাম কুন্তলা কুমারী সাবাত। ওড়িয়া সাহিত্যের বহুদর্শী এক লেখিকা। তার বিবাহপূর্ব ও বিবাহোত্তর জীবন সুখের ছিলো না। প্রেম, যৌনতা, অত্যাচার, প্রতারণা তার জীবনকে বিষিয়ে তুলেছিলো। সামন্ততান্ত্রিক ভারতে পুরুষ-আধিপত্যশীল সমাজের অনেক আঘাত সয়েছেন নীরবে। সাহিত্যে প্রকাশ করেননি তেমন কিছুই। যৌনতা কিংবা জীবন-যন্ত্রণার কোন বয়ান আমরা পাই না তার কবিতায়। বরং যৌন অভিপ্রকাশের ওপরে এক ধরনের সুফি আদর্শ বা আধ্যাত্মিকতার প্রলেপ দিয়ে সবসময় গোপন করতে চেয়েছেন বেদনা-জর্জর জীবন-অভিজ্ঞতার সব করুণ আখ্যান। এই প্রবণতা স্থায়ী হয়েছিল অনেক বছর, এমনকি পোস্ট-কলোনিয়াল যুগ শুরুর পরে কয়েক দশক পর্যন্ত। এই যুগে নারী-কবিতাকাররা তাদের ভালবাসার অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন ভক্তিমূলক কবিতার ফরম্যাটে।

১৯১৪, গোপন দুঃখ

১৯৩০ সালে ১৬ বছর বয়সী ভারতীয় এক বালিকার সাথে রোমানিয়ার এক তরুণের সক্ষাৎ হয়। দুজনে প্রেমে পড়ে। তরুণটি এসেছিল ভারতীয় দর্শনের ওপর পড়ালেখা করতে, মেয়েটি ছিলো তার শিক্ষকের কন্যা। এই সম্পর্ক তারা গোপন রাখতে পারেননি, অল্পদিনের মধ্যেই অভিভাবকেরা বিষয়টি জেনে যায়। তরুণটিকে শিক্ষকের বাড়ি থেকে চলে যেতে এবং আর কখনোই মেয়েটির সাথে যোগাযোগ না করতে বলা হয়। পরবর্তীতে সেই তরুণ পরিচিতি পান বিশ্বখ্যাত দার্শনিক হিসেবে। লেখেন একটি আধা-আত্মজৈবনিক উপন্যাস। ১৯৩৩ সালে রোমানিয়ায় বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। এটি লেখা হয়েছিল বিশেষ করে একটি সাহিত্য পুরস্কারের জন্য। পরে তা দেদার বিক্রি হয় এবং লেখকের জন্য বিপুল অর্থ ও খ্যাতি বয়ে আনে। উপন্যাসটি তখন ইতালিয়ান, জার্মান, ফরাসি, স্প্যানিশ সহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়।
পরে বিশ বছর বয়সে মেয়েটির বিয়ে হয়ে যায়, সন্তানও হয় দুটি। এরপর তিনি লেখালেখিতে আত্মনিয়োগ করেন, প্রকাশ করতে থাকেন কবিতা ও গদ্যের বইপত্র। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর বেশ কয়েকটি বই লেখেন তিনি। তবে ১৯৭৪ সালের আগে তেমন বিখ্যাত হতে পারেননি।
১৯৩৮ কিংবা ১৯৩৯ সালে তার পিতার ইউরোপ ভ্রমণের পরেই কেবল তিনি রোমানিয়ায় প্রকাশিত উপন্যাসটি সম্পর্কে জানতে পারেন। এও জানতে পারেন সেটি তাকেই উৎসর্গ করে লেখা হয়েছে। ১৯৭২ সালের দিকে লেখকের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু কোলকাতায় এলে অবশেষে তিনি বুঝতে পারেন যে বইটিতে তাদের দুজনের যৌন সম্পর্কের বর্ণনা করা হয়েছে। পরে এক বন্ধুকে দিয়ে উপন্যাসটি ফরাসি থেকে অনুবাদ করিয়ে নেন। উপন্যাসের বর্ণনা তাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। ১৯৭৩ সালের তিনি আমেরিকায় যান একটি সেমিনারে রবীন্দ্রনাথের ওপর বক্তৃতা দিতে। ৪৩ বছর পর লেখকের সাথে আবার সাক্ষাৎ হয় তার, ব্যক্তিগতভাবে তার সাথে কথা বলেন তিনি। আর এই বলে সতর্ক করে দেন যে, বইটি কখনও ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়ে থাকলে লেখকের বিরুদ্ধে তিনি মামলা করতে পারেন। লেখক তাকে নিশ্চিত করেন যে, উপন্যাসটি তিনি ইংরেজিতে প্রকাশ করেননি বা করবেন না। সম্ভবত লেখককে তিনি বিশ্বাস করেননি, চেপে রাখতে পারেননি নিজের মর্মবেদনা ও দুঃখের কথা। দুঃখ ছিলো এই যে, তার ভালোবাসাকে অসত্য ও ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এরপর তিনি নিজে একটা উপন্যাস লেখেন। তার মৃত্যুর পরে ১৯৭৪ সালে আমেরিকার শিকাগো ইউনিভার্সিটি প্রেস রোমানিয়ান ও ভারতীয় উপন্যাস দুটির একটি যুক্ত ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশ করে। এতে উঠে আসে দুজনের সম্পর্কের খোলামেলা বর্ণনা। উপন্যাসটিতে তিনি তুলে ধরেছেন এক ভারতীয় মেয়ে কিভাবে পশ্চিমা এক তরুণের প্রেমে পড়ে যায় তার বয়ান। শরীরী সম্পর্কের চেয়ে আবেগের কথাই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে এখানে।
রোমানিয়ার সেই লেখকের নাম মির্চা এলিয়াদ আর ভারতীয় মেয়েটির নাম মৈত্রেয়ী দেবী। রোমানিয়ার উপন্যাসটির ইংরেজি নাম বেঙ্গল নাইটস আর ভারতীয় উপন্যাসটির নাম ইট ভাজ নট ডাই। উপন্যাস দুটি বাংলায় যথাক্রমে লা নুই বেঙ্গলি ও ন হন্যতে নামে অনূদিত হয়েছে, সেকথা আমাদের অনেকেরই অজানা নয়।

১৯১৯, লাভ স্টোরি

মৈত্রেয়ী-কাহিনীর ছয় বছর পরে পাঞ্জাবের অল্পবয়সী এক নারী-কবি বিয়ে করেন এক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদককে। শৈশব থেকে পরিচয় ছিলো দুজনের। বিয়ে করে নাম পাল্টে ফেলেন তিনি। পরবর্তীতে উপন্যাস, ছোটগল্প ও কবিতা মিলিয়ে তিনি ৭০টির মতো বই লেখেন। ভারতীয় সাহিত্য আকাদেমি যে ২১ ব্যক্তিকে ফেলো নির্বাচন করে তাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। এছাড়া পদ্মবিভূষণ, জ্ঞানপীঠ ও পদ্মশ্রী প্রভৃতি পুরস্কারে ভূষিত করা হয় তাকে। দিল্লি, জবলপুর ও বিশ^ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডি-লিট ডিগ্রি প্রদান করে। ১৯১৯ সালে গুজরানওয়ালায় (বর্তমানে এটি পাকিস্তানে পড়েছে) জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার একমাত্র ছেলে একাধারে স্কুল শিক্ষক, কবি ও একটি সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক। ৪০ বছর বয়সে তিনি উর্দু ভাষার এক কবির সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এজন্য ত্যাগ করেন স্বামীকে। কিন্তু সেই কবি তাকে বিয়ে করেননি। তার জীবনে নতুন এক নারীর আগমন ঘটেছিল। পরে তিনি এক চিত্রশিল্পীর সাথে জড়িত হন এবং জীবনের বাকি ৪০ বছর তার সাথেই কাটিয়ে দেন। তার বেশিরভাগ বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকেন এই শিল্পী। বাকি জীবনে দুজন প্রেমিকের সাথেই সমানতালে নির্বিঘেœ সম্পর্ক টিকিয়ে রেখেছিলেন তিনি। এই লেখিকার নাম অমৃতা প্রীতম।  ২০০৫ সালের ৩১ অক্টোবর মারা যান তিনি। তার দুই প্রেমিক ছিলেন ইমরোজ ও সাহির লুধিয়ানভি। অমৃতা-ইমরোজের কাহিনী নিয়ে পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া প্রকাশ করে উমা ত্রিলকের লেখা অমৃতা-ইমরোজ: আ লাভ স্টোরি।

১৯৩৪, খোলা হাওয়া

মৈত্রেয়ী-ইলিয়াদ প্রেম-রোমান্সের চার বছর পরে কেরালায় জন্ম নেয় এক মেয়ে। সেই শহরে কাটে তার শৈশব। ১৭ বছর বয়স থেকে সে ইংরেজি ও মালয়ালম ভাষায় লিখতে শুরু করে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তার চেয়ে ১৫ বছর বেশি বয়সী এক লোকের সাথে বিয়ে হয় মেয়েটির। বিয়ের এক বছর পরেই জন্ম নেয় তাদের প্রথম সন্তান।
শীঘ্র তার লেখায় এক ধরনের বৈপরীত্য দেখা যায়। তার লেখা হয়ে দাঁড়ায় এক ধরনের স্বীকারোক্তিমূলক আখ্যান। জীবনের দুর্গতি ও টিনেজ বয়স থেকে শুরু হওয়া মানসিক আঘাতের কথা তিনি গোপন রাখতে পারেননি। লেখিকা হিসেবে তিনিই প্রথম নিজের যৌন আকাক্সক্ষার খোলামেলা বর্ণনা তুলে ধরেছেন এবং সেগুলো নিয়ে নির্দ্বিধায় আলোচনা করেছেন। নিজের সমকামী সম্পর্ক, স্বামীর সমকাম-প্রবণতা এমনকি বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের কথাও গোপন রাখেননি। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, সেই স্বামী সবসময় সমর্থন দিয়ে গেছেন তার লেখার।
বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ মাই স্টোরিতে তিনি লিখেছেন, “আমার মানসিক বৈকল্যের দিনগুলোতে আমার স্বামী ও আমার মধ্যে এক ধরনের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় যা ছিলো একান্ত শরীরী… সে আমাকে গরম পানিতে গোসল করিয়ে দিতো তারপর ছেলেদের পোশাক পরিয়ে তার কোলে বসাতো, আর আদর করে ‘মাই লিটল ডার্লিং বয়’ বলে ডাকতো… আমি প্রকৃতিগতভাবে লাজুক ছিলাম…। কিন্তু অসুস্থতার সময়ে জীবনে প্রথমবারের মতো সব বিসর্জন দিয়েছি। সেই প্রথম বুঝতে পারি বিছানায় নিজেকে কিভাবে পুরোপুরি সমর্পণ করতে হয়।”
অনেক সাক্ষাৎকারে লেখালেখির ক্ষেত্রে স্বামীর সমর্থনের প্রশংসা করলেও মাই স্টোরিতে তিনি বলেন যে, স্বামী তাকে সমর্থন দিয়েছিলেন এজন্য যে, তার লেখালেখি ছিলো স্বামীর উপার্জনের উৎস। দীর্ঘ অসুখে ভুগে তার স্বামী মারা যান। পরে তিনি রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছিলেন কিন্তু ব্যর্থ হন। এক মুসলমান তরুণকে বিয়ে করতে ৬৫ বছর বয়সে ধর্মান্তরিত হন তিনি। ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হবার পরে তিনি যুক্তি দেখান, বিশ্বে নারীর জন্য সবচেয়ে সুন্দর পোশাক হচ্ছে পর্দা। নিরাপত্তার বোধ থেকে তখন সার্বক্ষণিক তিনি পর্দা পরতেন। ধর্মান্তর প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে, জীবনভর তিনি একাকীত্ব বোধ করতেন। রাতে ঘুমোতেন বালিশ বুকে নিয়ে। কিন্তু এখন আর তিনি একা বোধ করেন না। ইসলাম তাকে সঙ্গ দেয়। তার মতে, পৃথিবীতে ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা নারীকে ভালোবাসা ও সুরক্ষা দিয়েছে। কিন্তু ২০০৬ সালে কোচিতে একটি প্রকাশনা উৎসবে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ধর্মান্তরিত হবার জন্যে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত এবং তিনি তার মুসলিম বন্ধুদের প্রতারণাপূর্ণ আচরণে বিভ্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া দাবি করেন যে, তার কয়েক লাখ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার, বইপত্র ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্রসহ সমস্ত সম্পদ মুসলমানরা লুট করেছে।
তার নাম কমলা দাস, মাধবকুট্টি অথবা কমলা সুরাইয়া। ১৯৮৫ সালে মার্গারেট আর্চনার, ডরিস লেসিং ও নাদিন গার্ডিমারের সাথে নোবেল পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় তার নাম ওঠে। শেষ পর্যন্ত নোবেল পুরস্কার পাননি। তবে এশিয়ান পোয়েট্রি প্রাইজ, কেন্ট অ্যাওয়ার্ড, এশিয়ান ওয়ার্ল্ড প্রাইজ, সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা অর্জন করেন তিনি। ৩১ মে ২০০৯ পুনেতে তার জীবনাবসান হয়।

ঔপনিবেশিক চোখে যৌনতার ভূমিকা

গত শতকের এই চার নারীবাদী লেখিকা নিজেদের আলাদা আলাদা চরিত্র সত্ত্বেও নারীর পক্ষে কথা বলার চেষ্টা করেছেন। লেখালেখির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বতন্ত্র মূল্যবোধ। অনেক সময় হয়ত সেগুলোককে মনে হয়েছে বিভ্রান্তিকর, বৈপরীত্যমূলক। এদের লেখা পড়ে কেউ হয়ত বলতে পারেন যে, সামগ্রিক অর্থে নারীত্ব এক ধরনের তত্ত্বগত মিথ যা অতীন্দ্রিয় উপায়ে নারীর বহুমাত্রিক মিথের সাথে সম্পর্কযুক্ত। এই প্রতিযুক্তি খারিজ করে দেবার উপায় নেই। কিন্তু একজন নারী হিসেবে (নারীবাদী হিসেবে নয়) সব ধরনের পরিস্থিতিকে আমি নিজের জন্য সত্য বলে উপলব্ধি করি। কোনোদিন হয়ত আমিও মৈত্রেয়ী, কমলা, অমৃতা বা কমলা হতে পারতাম। মৈত্রেয়ী কেন কমলার মতো হলো না অথবা কমলা কেন কুন্তলার মতো হয়নি, কেন মৈত্রেয়ী ইলিয়াদের সাথে তার সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠা দিতে পারেনি, কমলা যেমনটা পেরেছে-এ ধরনের যুক্তিগুলোতে সুশৃঙ্খল চিন্তার ছাপ নেই।
আমার মতে, কুন্তুলা থেকে কমলা পর্যন্ত নারীমনের যে রূপান্তর তার কারণ হচ্ছে ভারতে নারীবাদের বিকাশ। ভারতীয় নারীবাদের কারণ ও অভিপ্রকাশের জায়গাটি পশ্চিমা দুনিয়ার নারীবাদী অভিপ্রকাশের চেয়ে আলাদা। পশ্চিমের উপনেবিশপূর্ব সামাজিক কাঠামো এবং নারীর যে ভূমিকা দেখা গিয়েছিলো সেটি তাত্ত্বিকভাবে নারীবাদে রূপলাভ করে এবং তা কোনো অর্থেই ব্যক্তিক ব্যাপার ছিলো না, ছিলো অনেক বেশি সমাজতাত্ত্বিক ব্যাপার। নারী জনগোষ্ঠীকে দেখা হতো পুরুষ জনগোষ্ঠীর সমকক্ষ হিসেবে। কিন্তু নারীর ব্যক্তিসত্তা সামন্তযুগের পিতৃতান্ত্রিক সমাজের মতোই পিউরিটান ছিল। উপনিবেশপূর্ব ভারতীয় সমাজে পুরুষেরা বহুবিবাহ করতে পারত। এমনকি ভারতের অনেক পুরুষ বুদ্ধিজীবী, লেখক ও রাজনীতিবিদ পর্যন্ত প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পরে আরেকটি বিয়ে করেছেন। কিন্তু এমন একটিও উদাহরণ নেই যে, বিধবা হবার পরে কোনো নারী সেই সময়ে আবার বিয়ে করতে পেরেছেন। ব্রিটিশ শাসনের সেই যুগে যদিও বিধবা বিবাহের আইনি বৈধতা ছিলো। নারীদের শিক্ষা দেওয়া হয় বিসর্জনের দেবী হতে, সিমোন দ্য ব্যুভোয়াঁ তার দ্য সেকেন্ড সেক্স বইতে যেমনটা লিখেছেন, নারীদের মা, মাটি, মাতৃভূমি, কুমারি, প্রকৃতি প্রভৃতি মিথ বা কল্পিত আদর্শের ফাঁদে ফেলা হয়। এর মাধ্যমে উধাও হয় তাদের ব্যক্তিসত্তা ও স্বতন্ত্র অবস্থান। উপনিবেশপূর্ব নারীবাদীরা তাই লেখেন ‘সংসারে নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য’ অথবা ‘ভারতীয় পুরাণে কিংবদন্তী নারী’ জাতীয় রচনা। আধিপত্যশীল পিতৃতান্ত্রিক সমাজের মতাদর্শই সেখানে উঠে আসে। ভারতীয় সংস্কৃতিতে ‘নারীত্বে’র ধারণা পুনর্নিমাণের জন্য এক ধরনের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন রূপলাভ করে এবং এতেও ব্যক্তিক নারীবাদকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়। কুন্তলা এবং মৈত্রেয়ী সেই উপনিবেশ-পূর্ব সমাজেরই উপজাত।
বর্তমানে ভারতে সবচেয়ে বৃহৎ ও মূলধারার নারী সংগঠন হচ্ছে অল ইন্ডিয়া উইমেনস কনফারেন্স। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একটি অঙ্গ সংগঠন হিসেবে বহুস্তর বিশিষ্ট এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৭ সালে। আন্দোলনের অঞ্চলগত বৈচিত্র ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সংস্থাটি সবসময় সচেষ্ট থেকেছে। কোলকাতায় মৈত্রেয়ী-ইলিয়াদ সাক্ষাতের এক বছর পরে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ১৯৩১ সালে করাচি প্রস্তাব পাস করে। স্বাধীন ভারতের রূপরেখা হিসেবে ‘স্বরাজ’ ঘোষণা করা হয়। এতেও নারী-অধিকারের বিষয়টি খুবই সীমিত আকারে উল্লে¬খ ছিলো। স্বরাজ-এর একটি ধারায় নারী অধিকার সুরক্ষার প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয় শ্রমিক অধিকারের অংশ হিসেবে!
উপনিবেশ-পূর্ব ভারতের তুলনায় উপনিবেশ-উত্তর ভারতের পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে অনেক ভিন্ন। এ সময় নারী-শিক্ষার বিপুল বিস্তার ঘটতে থাকে। যে বাইনারিগুলো জেন্ডারভাবনার আধিপত্যশীল দার্শনিক ও রাজনৈতিক ভিত্তিভূমি তৈরি করেছিল, তাকে ভেঙেচুরে নতুন রূপ দেয় বৈষম্যমূলক পিতৃতান্ত্রিক পরিবার-কাঠামো: বয়স, সামাজিক মর্যাদা, পুরুষের সাথে সম্পর্ক, বিয়ে, সন্তান জন্মদান থেকে শুরু করে পিতৃতান্ত্রিক আরও কিছু ব্যবস্থা যেমন যৌতুক, জাতিভেদ, রক্তসম্পর্ক, গোষ্ঠী, গ্রাম, বাজার ও রাষ্ট্র প্রভৃতি। এই পিতৃতান্ত্রিক প্রতিবেশ ‘নারীসত্তা’র অধিকারের প্রশ্নকে ‘বিরোধিতা’ হিসেবে বিবেচনা করে। কমলা দাস ও অমৃতা প্রীতমকে আমি সমর্থন করি আর সেজন্যেই এই লেখা। অনেক তাত্ত্বিক আছেন যারা সবসময় চেষ্টা করেন নারীবাদ থেকে বিচ্ছিন্ন করে যৌনতার একটি স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করতে। আদতে যা কখনো হতে পারে না। তাদের সংজ্ঞায়িত নারীবাদে পুরুষ-আধিপত্যবাদী মতাদর্শ প্রতিরোধের কোনো ধারণা নেই। তারা মনে করে যে, এ ধরনের আধিপত্যবাদ মোকাবেলার ক্ষেত্রে যৌনতার কোন ভূমিকা থাকতে পারে না। বিশ শতকের উপনিবেশিক ভারতে নারীদের লেখালেখি যদি হয় সামাজিক উত্তরাধিকার-পরম্পরা ও স্বতন্ত্র ভারতীয় পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা, উপনিবেশ-উত্তর ভারতে নারীবাদী তর্কবিতর্ক হয়েছে নারী-যৌনতাবাদীদের চর্চিত পথেই।

শেষপাতার আহ্বান… ।। ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস…

শেষপাতার আহ্বান…

 ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস…

যৌবনে একবার খুব ঝড় ওঠে। টকটকে ফর্সা সুফিয়া কামাল মডেলের নানীমা পানসুপুরি মুখে বলিয়া চলেন ‘তোর যৌবন আচ্চে। এখন এ্যাক্না কন্যা লাগবে’। আমরা বুঝি নাই, জানি নাই কিছু। তবে কাঁচা রাস্তার ওপার থেকে বিরাট ময়রার বিল পার হইয়া একটা তুমুল ঝড় আসিয়াছিল— এই শরীরে। তখন কবিতা হইয়া ওঠে মন, পৌষসন্ধ্যার শরীরে লাগে করুণ কাঁপুনি। তাতে ছন্দ ওঠে। বিশ্বাস বপন হয়। কুঁড়িরা ভর করে মনের কোণে। কাঁচা শরীরে সেই বাউল বাতাস হানা দিলে তরঙ্গ উপচিয়া পড়ে। দূরে ঘনকালোমেঘ এক চিক্কন সরু বাদামি রেখায় মাঝ আকাশে ছোপ ছোপ বর্ণে বিকশিত হইয়া ওঠে। সেখানে কবিতা আসিয়াছিল থরো থরো নিথর নিমগ্নতায়। কামুক স্পন্দনে কাঁপিয়া। এই কী সেই ‘এ্যক্না কন্যা’! আমরা বুঝি নাই। লম্বা চুল উড়াইয়া মেঘগুচ্ছ সাতমহলার স্বপ্নপুরীর ক্ষুব্ধতায় মাতিয়া দেয়। গম্ভীর চুম্বনে তখন শ্বাস ওঠে। উড়ে আসে অনেক আনন্দ-অক্ষরমালা। বইয়ের পাতায়, খাতার কোণায়, ওড়ানো চিরকুটে চিঠির কবুতরডানা সুখসায়রে ভাইসা বেড়ায়। কাঁঠাল গাছের ফুল ওঠা মুচির গন্ধ তখন বাইরের বারান্দায় চঞ্চল-কনে-মুখ ধরা পড়ে। সে ফুড়–ৎ বর্ণে ইশারায় টানে। পালিয়া বেড়ায়; নিকানোপদধ্বনিতে ঝংকার ওঠায়। বেলোয়ারি বোল গমগমা হয়। মহলা সাজে নতুন সাজে পরিণীতা হয়। মুচির গায়ে গ্রীবাময় কাঠঠোকরা আরও গ্রীবাভঙ্গি করে— স্মরণের লজ্জার ছবি ওঠায়। সত্যিই সেদিন উত্তরা বাতাস বাউল হইয়া বলিয়াছিল : `তোমার মনে প্রচুর কামিনী আসিয়াছে। তুমি পশ্চিমা বাতাসের জন্য প্রার্থনা কর।‘ আহা! তারপর সেই ঈশ্বরপ্রলাপ কীরূপে অসীমে মিলিয়া গেল, বুকের কন্দরে গৃহকাতর রচনা করিল, জানি না। তবে ঝড় ওঠা সেই বাউল শরীর আর সাতমহলার রুদ্রবীণা এখনও ছাইয়া চলে গহনের কর্ণপাতে, নবকিশোদলের রাঙা শতদলে জীবনের নবপ্রদীপ জ্বলিয়া তোলে, খুব নবীনরূপে চিরকালের জন্য তা হাঁটিয়া বেড়ায়, এই তো ঝড় ওঠা বাউল বাতাস…

লিখুন… পরবর্তী সংখ্যায়

 ই-যোগাযোগ :shiqbal70@gmail.com অথবা saikatarefeen@gmail.com

ফোন : ০১৭১৯১৩২৬৫১ ॥ এ বিষয়ে লেখা পাঠানোর শেষ তারিখ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪ খ্রি.

সবুজপত্রে প্রকাশিত লেখার পূর্ণ-তালিকা

 বৈশাখ : ১৩২১

মুখপত্র (প্রবন্ধ)   :    সম্পাদক

সবুজপত্র (প্রবন্ধ)      :    বীরবল

সবুজের অভিযান (কবিতা)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

হালদার-গোষ্ঠী (গল্প)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সবুজ পাতার গান (কবিতা)  :    সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

জ্যৈষ্ঠ : ১৩২১

সাহিত্য-সম্মিলন (প্রবন্ধ):    প্রমথ চৌধুরী

বাংলা ছন্দ (প্রবন্ধ)    :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমরা চলি সমুখ পানে (কবিতা)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

হৈমন্তী (গল্প)    :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গমনাগমন (গল্প):    অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

যৌবনে দাও রাজটীকা (প্রবন্ধ):    বীরবল

আষাঢ় : ১৩২১

শঙ্খ (কবিতা)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আষাঢ় (প্রবন্ধ)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বোষ্টমী (গল্প)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

খেয়ালের জন্ম (কবিতা):    প্রমথ চৌধুরী

ভারতবর্ষের ঐক্য (প্রবন্ধ)    :    প্রমথ চৌধুরী

বর্ষার কথা (কবিতা)   :    বীরবল

আষাঢ়ের গান (কবিতা):    সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

শ্রাবণ : ১৩২১

সর্বনেশে (কবিতা):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বাস্তব (প্রবন্ধ)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বাংলা ছন্দ (প্রবন্ধ)    :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

স্ত্রীর পত্র   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পত্র  :    বীরবল

উপমা ও অনুপ্রাস (প্রবন্ধ)    :    অজিতকুমার চক্রবর্তী

সহজিয়া (কবিতা):    দ্বিজেন্দ্রনারায়ণ বাগচি

দেবতা (কবিতা):    কালিদাস রায়

ভাদ্র : ১৩২১

লোকহিত (প্রবন্ধ):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভাইফোঁটা (গল্প)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পাড়ি (কবিতা)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সমাজের জীবন (প্রবন্ধ):    প্রফুল চন্দ্র চক্রবর্তী

মন্তব্য     :    সম্পাদক

অনার্য্য বাঙ্গালী (প্রবন্ধ):    বীরেন্দ্রকুমার বসু

ইউরোপে কুরুক্ষেত্র (প্রবন্ধ)   :    প্রমথ চৌধুরী

আশ্বিন : ১৩২১

আমার জগৎ (প্রবন্ধ)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

শেষের রাত্রি (গল্প)    :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

উত্তরা পথে রাষ্ট্রীয় ঐক্য (প্রবন্ধ)   :    রমাপ্রসাদ চন্দ

সাহিত্যে আভিজাত্য (প্রবন্ধ)   :    মহীতোষকুমার চৌধুরী

কার্তিক : ১৩২১

সন্ধ্যার যাত্রী (কবিতা)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অপরিচিতা (গল্প):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

শেষ প্রণাম (কবিতা)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

যৌথ পরিবার (প্রবন্ধ)  :    নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত

হাসি (প্রবন্ধ)    :    সতীশচন্দ্র ঘটক

নারীর পত্র [বীরবলের মারফত প্রাপ্ত] (প্রবন্ধ)    :    জনৈক বঙ্গনারী

নারীর পত্রের উত্তর (প্রবন্ধ)   :    বীরবল

অগ্রহায়ণ : ১৩২১

বর্তমান সভ্যতা বনাম বর্তমান যুদ্ধ (প্রবন্ধ):    প্রমথ চৌধুরী

ছবি (কবিতা)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

জ্যাঠামশাই (গল্প):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তাজমহল (কবিতা)    :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ফরাসী গীতাঞ্জলির ভূমিকা [আঁদ্রে গীদ্ তাঁর কৃত গীতাঞ্জলির অনুবাদে যে ভূমিকা লিখেছেন তার বাংলা অনুবাদ] (প্রবন্ধ):    ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী

তেপাটি [‘তেপাটি’ নামটি বীরেন্দ্রচন্দ্র বসু কর্তৃক প্রদত্ত (কবিতা):    প্রমথ চৌধুরী

পৌষ : ১৩২১

চঞ্চলা (কবিতা)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

লড়াইয়ের মূল (প্রবন্ধ)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তাজমহল (কবিতা)    :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

খৃষ্টধর্ম [যীশুখৃষ্টের জন্মদিনে শান্তিনিকেতন আশ্রমে কথিত (কবিতা)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

নূতন ও পুরাতন (প্রবন্ধ)    :    প্রমথ চৌধুরী

শচীশ (গল্প)    :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মাঘ : ১৩২১

মা-হারা   :    সরযুবালা দাসগুপ্তা

উপহার (কবিতা):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দামিনী (গল্প)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিচার (কথিকা):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সাহিত্যে বাস্তবতা (প্রবন্ধ)    :    রাধাকমল মুখোপাধ্যায়

বস্তুতন্ত্রতা বস্তু কি? (প্রবন্ধ)    :    প্রমথ চৌধুরী

ফাল্গুন : ১৩২১

শ্রী বিলাস (গল্প):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দুই নারী (কবিতা)    :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কর্মযজ্ঞ [হিত সাধন মণ্ডলীর প্রথম সভাধিবেশনে কথিত বক্তৃতার সারমর্ম] (প্রবন্ধ):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অভিভাষণ [উত্তরবঙ্গ সাহিত্য সম্মিলনে পঠিত]    :    প্রমথ চৌধুরী

এবার (কবিতা)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আবার (কবিতা):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

চৈত্র : ১৩২১

বসন্তের পালা [ভূমিকা] (গান):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ফাল্গুনী (নাটক)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বৈশাখ : ১৩২২

ঘরে-বাইরে (উপন্যাস)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমার গান (কবিতা)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তুমি-আমি (কবিতা)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ডায়রি (প্রবন্ধ)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সম্বন্ধ (প্রবন্ধ)   :    ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী

অন্নপূর্ণা (নাটক):    সরযুবালা দাসগুপ্তা

জ্যৈষ্ঠ : ১৩২২

কবির-কৈফিয়ৎ (প্রবন্ধ):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘরে-বাইরে (উপন্যাস)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

চুট্কি (প্রবন্ধ)   :    বীরবল

হিতসাধন (কথিকা)    :    বিধুশেখর ভট্টাচার্য্য

দ্বিজেন্দ্রলালের স্মৃতিসভায় কথিত (প্রবন্ধ)   :    প্রমথ চৌধুরী

সোনার কাঠি (প্রবন্ধ)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আষাঢ় : ১৩২২

ঘরে-বাইরে (উপন্যাস)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বেদনা (কবিতা):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

যৌবনের পত্র (কবিতা):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সুরো (গল্প):    মাধুরীলতা দেবী

ছবির অঙ্গ (প্রবন্ধ)    :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভাষার কথা (প্রবন্ধ)   :    প্রমথ চৌধুরী

অব্যক্ত বাসনা [প্রাচীন ফরাসী কবিতা হতে] (কবিতা)  :    প্রিয়নাথ সেন

শ্রাবণ : ১৩২২

ঘরে-বাইরে (উপন্যাস)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অনাদৃতা (গল্প)  :    মাধুরীলতা দেবী

নব্য-দর্শন [মুখপত্র] (সবুজপত্র সম্পাদকের কাছে লেখা পত্র) (প্রবন্ধ):    প্রফুলকুমার চক্রবর্তী

 

সাহিত্যে খেলা    :    বীরবল

টীকা টিপ্পনি (প্রবন্ধ)   :    —-

যাত্রা (কবিতা)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভাদ্র ও আশ্বিন : ১৩২২

ঐতিহাসিক (প্রবন্ধ)    :    কিরণশঙ্কর রায়

ঘরে-বাইরে (উপন্যাস)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

চোর [ডিকিন্সেরDr. Marigold গল্পের আভাসে রচিত] (গল্প)   :    মাধুরীলতা দেবী

আদর্শ (প্রবন্ধ)   :    ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী

প্রিগ্ (প্রবন্ধ)    :    বীরেন্দ্রকুমার বসু

কৃপণতা (প্রবন্ধ)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অজানা (কবিতা):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

শরৎ (প্রবন্ধ)    :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

টীকা টিপ্পনি (সমালোচনা)    :    —

স্ত্রী শিক্ষা (প্রবন্ধ):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কার্তিক : ১৩২২

বর্তমান বঙ্গ-সাহিত্য (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

অভিনবের ডায়ারী [রসের অলৌকিকত্ব] (প্রবন্ধ)  :    সুরেন্দ্রনাথ দাস গুপ্ত

বলাকা (কবিতা):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘরে-বাইরে (উপন্যাস)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমার তুমি (কবিতা)  :    কালিদাস রায়

অগ্রহায়ণ : ১৩২২

নূতন বসন (কবিতা)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘরে-বাইরে (উপন্যাস)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অলঙ্কারের সূত্রপাত (প্রবন্ধ)   :    প্রমথ চৌধুরী

টিকা ও টিপ্পনি [লেখার উদ্দেশ্য] (প্রবন্ধ)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পৌষ : ১৩২২

শিক্ষার বাহন (প্রবন্ধ)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

নব্য দর্শন (প্রবন্ধ)    :    প্রফুলকুমার চক্রবর্তী

পুস্তক-প্রশংসা [রঙ্গ ও ব্যঙ্গ]   :    প্রমথ চৌধুরী

ঘরে-বাইরে (উপন্যাস)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

শেক্সপিয়র [কবির মৃত্যুর তিনশো বছর পরের স্মৃতি-বার্ষিক উপলক্ষে] (কবিতা)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

শিক্ষা বিস্তার (প্রবন্ধ)   :    ব্রজেন্দ্রনাথ শীল

মনীষী-মঙ্গল [প্রাচ্য ও প্রাতীচ্যে প্রাপ্ত-পূজা, বিজ্ঞানাচার্য, বহুমানসম্পদ ডাক্তার জগদীশচন্দ্র বসুর সংবর্দ্ধনা উপলক্ষে] (কবিতা)  :    সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

মাঘ : ১৩২২

ঘরে-বাইরে (উপন্যাস)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বৈরাগ্য সাধন (নাটক)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আর্য্যধর্মের সহিত বাহ্যধর্মের যোগাযোগ (প্রবন্ধ)   :    প্রমথ চৌধুরী

শিক্ষার নব আদর্শ (প্রবন্ধ)   :    বীরবল

ফাল্গুন : ১৩২২

রূপ (কবিতা)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘরে-বাইরে (উপন্যাস)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

চেয়ে দেখা (কবিতা)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আর্য্য-সভ্যতার সহিত বঙ্গ-সভ্যতার যোগাযোগ (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

কন্গ্রেসের আইডিয়াল্ (প্রবন্ধ) :    বীরবল

মধ্যাহ্নে (কবিতা):    প্রিয়নাথ সেন

চৈত্র : ১৩২২

ছাত্র শাসনতন্ত্র (প্রবন্ধ)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

চার-ইয়ারি কথা (গল্প):    প্রমথ চৌধুরী

‘যে কথা বলিতে চাই’ (কবিতা):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ছাত্রের পত্র (প্রবন্ধ)    :    সুবোধ চট্টোপাধ্যায়

নামশূন্যা কন্যা (কবিতা):    দেবেন্দ্রনাথ সেন

বৈশাখ : ১৩২৩

নববর্ষের আশীর্বাদ (কবিতা)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পত্র (প্রমথ চৌধুরীকে লেখা)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পত্র (‘সবুজপত্র’ সম্পাদককে লেখা)    :    বীরবল

চার-ইয়ারি কথা (গল্প):    প্রমথ চৌধুরী

জাপান-যাত্রীর পত্র:    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

জ্যৈষ্ঠ : ১৩২৩

ফরাসী সাহিত্যের বর্ণ-পরিচয় [রামমোহন লাইব্রেরিতে পঠিত] (প্রবন্ধ):    প্রমথ চৌধুরী

চার-ইয়ারি কথা (গল্প):    প্রমথ চৌধুরী

জাপান-যাত্রীর পত্র:    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আষাঢ় : ১৩২৩

সমুদ্র যাত্রা [মার্কিন যাত্রা নামক পুস্তকের মুখপত্র রূপে লেখা] (প্রবন্ধ):    প্রমথ চৌধুরী

জাপান-যাত্রীর পত্র:    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পুস্তক-প্রশংসা [তীর্থ ভ্রমণ] (সমালোচনা)   :    কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য্য

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের হাসির গান [ফিনিক্স লাইব্রেরিতে কথিতা (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

প্রতœতত্ত্বের পারস্য-উপন্যাস (প্রবন্ধ):    বীরবল

আহুতি (গল্প)   :    প্রমথ চৌধুরী

শ্রাবণ : ১৩২৩

জাপান-যাত্রীর পত্র:    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ্রাম্য-সাহিত্য সভা (কথিকা)  :    কিরণশঙ্কর রায়

সোদাহরণ অলঙ্কার (প্রবন্ধ)   :    ভূপেন্দ্রনাথ মৈত্র

পত্র (কবিতা)   :    সতীশচন্দ্র ঘটক

স্বপ্ন-তত্ত্ব (কথিকা)    :    সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর

টীকা ও টিপ্পনি (প্রবন্ধ):    বীরবল

ভাদ্র : ১৩২৩

জাপান-যাত্রীর পত্র:    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বড় বাবুর বড়দিন (গল্প)    :    প্রমথ চৌধুরী

একটি জরুরী প্রস্তাব (প্রবন্ধ)  :    ভূপেন্দ্রনাথ মৈত্র

কবির বিদায় [Richard Milton-Gi Poet’s Allegory অবলম্বনে লেখা] (গল্প)  :    কিরণশঙ্কর রায়

 

আশ্বিন ও কার্তিক : ১৩২৩

জাপানের পত্র (কথিকা):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

নভেল কেন পড়ি (প্রবন্ধ)    :    ননীবালা গুপ্তা

বাংলা-সাহিত্যে বাংলা ভাষা (প্রবন্ধ):    হারিতকৃষ্ণ দেব

ফরাসী ও জার্মান (ভাষার কথা) [ফরাসী দার্শনিক Bontroix-এর Philosophy অবলম্বনে লেখা (প্রবন্ধ)   :    সতীশচন্দ্র ঘটক

হিন্দু সঙ্গীত (প্রশ্ন) [সবুজপত্র সম্পাদককে লেখা] (প্রবন্ধ)    :    বিশ্বপতি চৌধুরী

হিন্দু সঙ্গীত [উত্তর] (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

বাঙ্গলার গান (প্রবন্ধ)  :    অমরবন্ধু গুহ

রাগ ও মেলডি (প্রবন্ধ):    সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর

স্বপ্নহার [Richard Middleton-এর Children of the Moon অবলম্বনে লেখা (গল্প)   :    কিরণশঙ্কর রায়

প্রাণ ও মরণ (কবিতা):    সুরেশানন্দ ভট্টাচার্য্য

সনেট (কবিতা)  :    প্রমথ চৌধুরী

অগ্রহায়ণ : ১৩২৩

জাপানের পত্র     :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্রিয়নাথ সেন (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

দাদার ডায়েরী (প্রবন্ধ)  :    ধূর্জটীপ্রসাদ মুখোপধ্যায়

শিশু সাহিত্য (প্রবন্ধ)   :    বীরবল

দরবেশের উপদেশ :    উপেন্দ্রনাথ মৈত্রেয়

একটি সাদা গল্প (গল্প)  :    প্রমথ চৌধুরী

পৌষ: ১৩২৩

সুরের কথা (প্রবন্ধ)    :    বীরবল

বিয়ের সম্বন্ধ (গল্প)    :    ভবতারণ সরকার

সঙ্গীত পরিচয়    :    ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী

সাহিত্যের ভাষা (প্রবন্ধ):    প্রমথ চৌধুরী

মাঘ : ১৩২৩

নতুন কিছু  :    বরদাচরণ গুপ্ত

দাদার ডায়েরী (প্রবন্ধ)  :    ধূর্জটীপ্রসাদ মুখোপধ্যায়

স্বপ্ন ও জাগরণ (গল্প)  :    বীরেশ্বর মজুমদার

সজীব অতীত (প্রবন্ধ)  :    বীরেন্দ্র্্রকুমার বসু

বাঙ্গলার ইতিহাস (প্রবন্ধ)    :    অরুণচন্দ্র সেন

তারিখের শাসন (প্রবন্ধ):    কিরণশঙ্কর রায়

সমুদ্র বক্ষে (গল্প):    যোগেন্দ্রনাথ সরকার

দাঁড় কাক (গল্প):    সতীশচন্দ্র ঘটক

শিশু শিক্ষা (প্রবন্ধ)    :    মৃগেন্দ্রনাথ মিত্র

ফাল্গুন : ১৩২৩

আমাদের শিক্ষা (প্রবন্ধ):    প্রমথ চৌধুরী

সত্যনিষ্ঠা (প্রবন্ধ):    নরেশচন্দ্র গুপ্ত

শিক্ষার লক্ষ (প্রবন্ধ)   :    অতুলচন্দ্র গুপ্ত

*আমাদের অহঙ্কার :    কিরণশঙ্কর রায়

দাদার ডায়েরী (প্রবন্ধ)  :    ধূর্জটীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়

লোক শিক্ষা (প্রবন্ধ)   :    বরদাচরণ গুপ্ত

রূপের কথা (প্রবন্ধ)   :    বীরবল

*জীবেন্দ্র সিংহরায়ের ‘প্রমথ চৌধুরী’ নামক গ্রন্থে সংকলিত সবুজপত্রের রচনা-তালিকায় এর উল্লেখ নেই। বিজিত কুমার দত্ত সম্পাদিত সেরা সবুজপত্র সংগ্রহ, প্রথম খণ্ডে লেখাটি সন্নিবেশিত হয়েছে।

চৈত্র : ১৩২৩

সম্পাদকের নিবেদন     :    —-

শিশুশিক্ষার মূলমন্ত্র:    শরৎকুমারী চৌধুরাণী

আমাদের অহঙ্কার (প্রবন্ধ)    :    কিরণশঙ্কর রায়

পূর্ববঙ্গবাসীর উক্তি:    সুশীলকুমার দাস গুপ্ত

ভাষার কথা (প্রবন্ধ)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ফাল্গুন (প্রবন্ধ)   :    বীরবল

সালতামামি  :    প্রমথ চৌধুরী

বৈশাখ : ১৩১৪

সম্পাদকের কৈফিয়ৎ    :    —-

সাহিত্যের সার্থকতা (প্রবন্ধ)   :    বীরবল

লিখিবার ভাষা [বঙ্কিমচন্দ্রের মত] (প্রবন্ধ):    প্রমথ চৌধুরী

বর্তমান সাহিত্য (প্রবন্ধ):    বরদাচরণ গুপ্ত

জাপানের কথা (প্রবন্ধ)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভাষার কথা (প্রবন্ধ)   :    নলিনীকান্ত ভট্টশালী

মন্তব্য     :    সম্পাদক

জ্যৈষ্ঠ : ১৩২৪

বৈজ্ঞানিক ইতিহাস (প্রবন্ধ)   :    অতুলচন্দ্র গুপ্ত

ভাষার কথা (প্রবন্ধ)   :    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

ভাষার কথা : মন্তব্য    :    সম্পাদক

পরমায়ু (কবিতা):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

একটি ঘটনা (গল্প)    :    প্রবোধ ঘোষ

ধরতাই বুলি (প্রবন্ধ)   :    ধূর্জটীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়

টী-পার্টি (গল্প)  :    হারিতকৃষ্ণ দেব

তপস্বিনী (গল্প)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আষাঢ় : ১৩২৪

মুখরক্ষা (গল্প)   :    সতীশচন্দ্র ঘটক

সংস্কৃতের প্রভাব ও অনুবাদ সাহিত্য (প্রবন্ধ):    দয়ালচন্দ্র ঘোষ

পয়লা নম্বর (গল্প):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কৌতুকময়ী (কবিতা)   :    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

শ্রাবণ : ১৩২৪

প্রাণের কথা [ভবানীপুর সাহিত্য সমিতিতে কথিত] (প্রবন্ধ)    :    প্রমথ চৌধুরী

কথা ও সুর (প্রবন্ধ)   :    প্রমথ চৌধুরী

বাঙ্গলা ভাষার কুলের খবর (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

অহল্যা (প্রবন্ধ)  :    বীরবল

দুখানি চিঠি [প্রমথ চৌধুরীকে লেখা] :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

নূতন ও পুরাতন (প্রবন্ধ)    :    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

 

ভাদ্র : ১৩২৪

সঙ্গীতের মুক্তি (প্রবন্ধ)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

স্বামী-স্ত্রী (প্রবন্ধ):    বরদাচরণ গুপ্ত

‘অচলায়তন’ (সমালোচনা):    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

শিক্ষা ও সমস্যা (প্রবন্ধ):    প্রবোধ চট্টোপাধ্যায়

আশ্বিন ও কার্তিক : ১৩২৪

অন্নচিন্তা (প্রবন্ধ):    অতুলচন্দ্র গুপ্ত

সাহিত্য-বিচার (প্রবন্ধ)  :    শিশিরকুমার সেন

আচার ও বিচার (কথিকা)   :    দয়ালচন্দ্র ঘোষ

শরৎ (কবিতা)  :    প্রমথ চৌধুরী

কংগ্রেসের দলাদলি (প্রবন্ধ)    :    বীরবল

আমার ধর্ম (প্রবন্ধ)    :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বুদ্ধিমানের কর্ম নয় (কথিকা):    বরদাচরণ গুপ্ত

দুখানি ফরাসী চিঠি [বেলজিয়ামের লেখক Macterlinek এবং ফরাসী লেখক RomainRolland কর্তৃক অমিয়চন্দ্র চক্রবর্তীকে লেখা]   :    সম্পাদক

গীতি কবিতা (প্রবন্ধ)  :    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

সনেট (কবিতা)  :    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

অগ্রহায়ণ : ১৩২৪

বাংলার ভবিষ্যৎ [মির্জাপুর ফিনিক্স ইউনিয়ন লাইব্রেরিতে পঠিত] (প্রবন্ধ)   :    প্রমথ চৌধুরী

বাংলার বেখাপ বর্ণমালা (প্রবন্ধ)    :    সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর

‘পঞ্চম’ (প্রবন্ধ)    :    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

পৌষ : ১৩২৪

পাত্র ও পাত্রী (গল্প)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভদ্রতা (কথিকা)  :    ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী

লাভালাভ (প্রবন্ধ):    বিশ্বপতি চৌধুরী

‘ঘরে-বাইরে’ (সমালোচনা):    অরবিন্দ সেন

মাঘ : ১৩২৪

শক্তিমানের ধর্ম (প্রবন্ধ):    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

সুর ও তাল (প্রবন্ধ)   :    শিশিরকুমার সেন

গ্রীসে ভাষার লড়াই (প্রবন্ধ)   :    নীরেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী

পত্র (নববাণী হতে উদ্ধৃত)    :    প্রমথ চৌধুরী

বালাই (গল্প)    :    প্রবোধ ঘোষ

তোতা কাহিনী (গল্প)       রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ফাল্গুন : ১৩২৪

বেহিসাবের নিকাশ (প্রবন্ধ)   :    বরদাচরণ গুপ্ত

জাতীয়জীবনে সাহিত্যের উপযোগিতা (প্রবন্ধ):    বীরেশ্বর মজুমদার

হৈরা [মানিকগঞ্জের মৌখিক ভাষায় লেখা] (গল্প)  :    সুরেশানন্দ ভট্টাচার্য্য

বিদ্যাপতি (প্রবন্ধ):    সুরেশচন্দ্র সেন

বাজে তর্ক (গল্প):    কান্তিচন্দ্র সেন

চৈত্র : ১৩২৪

ছন্দ (প্রবন্ধ)    :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ফরমায়েসি-গল্প (গল্প)  :    প্রমথ চৌধুরী

বৈশাখ: ১৩২৫

মুক্তি (কবিতা)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভারতবর্ষ [মানসী মূর্তি] (কথিকা)  :    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

নব-বিদ্যালয় (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

গুরু (প্রবন্ধ)    :    সন্তোষচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

নববর্ষ(প্রবন্ধ)   :    বিশ্বপতি চৌধুরী

পত্র (কথিকা)   :    বীরবল

দেশের কথা (প্রবন্ধ)   :    প্রমথ চৌধুরী

জ্যৈষ্ঠ : ১৩২৫

বাঙ্গালীর শিক্ষা (প্রবন্ধ):    অতুলচন্দ্র গুপ্ত

বিবাহের পণ (কথিকা)  :    হরপ্রসাধ বাগচী

নবীন সাহিত্যিক (প্রবন্ধ):    বরদাচরণ গুপ্ত

পত্র (কথিকা)   :    বীরবল

রবীন্দ্রনাথের পত্র [প্রমথ চৌধুরীকে লেখা]   :    সম্পাদক

ছিন্নপত্র (কবিতা):    রবীন্দ্রানাথ ঠাকুর

আষাঢ় : ১৩২৫

নব-বিদ্যালয় [রবীন্দ্রনাথকে লেখা] (প্রবন্ধ):    প্রমথ চৌধুরী

দু-দু-বার (গল্প):    বিশ্বপতি চৌধুরী

কালো-মেয়ে (কবিতা)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্র্যাকটিকাল (প্রবন্ধ)    :    কিরণশঙ্কর রায়

সমুদ্রের ডাক (গল্প)    :    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

INDIAN LITERATURE (প্রবন্ধ):    Pramatha Chaudhuryশ্রাবণ : ১৩২৫

বই পড়া [কটেজ লাইব্রেরি ও ভবানীপুর ইনস্টিটিউটের সাহিত্য শাখার অধিবেশনে পঠিত] (প্রবন্ধ)    :    প্রমথ চৌধুরী

সাহিত্যের জাত রক্ষা (প্রবন্ধ)  :    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

ছোট গল্প (গল্প)  :    প্রমথ চৌধুরী

‘এত্তো বড়’ কিম্বা ‘কিছু নয়’ (কথিকা)  :    বীরবল

ছোট্ট কালী বাবু [তেপাটি] (কবিতা):    প্রমথ চৌধুরী

ভাদ্র : ১৩২৫

পত্র (কথিকা)   :    বীরবল

শাস্ত্র ও স্বাধীনতা (প্রবন্ধ)    :    দয়ালচন্দ্র ঘোষ

পয়ার [সত্যেন্দ্রনাথ দত্তকে লেখা] (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

একটি সত্যি গল্প (গল্প):    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

বন্ধু (গল্প):    বীরেশ্বর মজুমদার

আশ্বিন : ১৩২৫

স্বর্গীয় চন্দ্রনাথ বসুর পত্র [রবীন্দ্রনাথকে লেখা]    :

পত্র (কথিকা)   :    বীরবল

সাহিত্যের জাতরক্ষা [দ্বিতীয় প্রস্তাব] (প্রবন্ধ):    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

রোম [প্রথম প্রস্তাব] (প্রবন্ধ)  :    অতুলচন্দ্র গুপ্ত

নব-বিদ্যালয় (ভাষা শিক্ষা) [রবীন্দ্রনাথকে লেখা]:    প্রমথ চৌধুরী

কার্তিক অগ্রাহায়ণ : ১৩২৫

গ্রীস ও রোম [ফরাসী ঐতিহাসিক— Liavisse-এর Vue Generale do Li’ Histoire Politiq to do Li Europe নামক গ্রন্থ হতে অনূদিত] (প্রবন্ধ):    ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী

একটি প্রেমের গান (প্রবন্ধ)   :    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

বাঙলা কি পড়ব? (প্রথম প্রস্তাব):    প্রমথ চৌধুরী

একখানি ছোট্ট উপন্যাস (প্রবন্ধ)    :    বীরেশস্ব মজুমদার

বাঙলা ভাষার কুলজী [কৃষ্ণনগর নদীয়া সাহিত্য পরিষদের পঞ্চম বার্ষিক অধিবেশনে পঠিত] (প্রবন্ধ)    :    সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়

রাম ও শ্যাম (গল্প)    :    বীরবল

পৌষ : ১৩২৫

‘একতারা’ [দ্বিজেন্দ্র নারায়ণ বাগচী প্রণীত] (সমালোচনা)  :    সতীশচন্দ্র ঘটক

সাহিত্য ও নীতি (প্রবন্ধ):    যতীন্দ্রনাথ বসু

অবরোধের কথা (প্রবন্ধ):    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

রুবেইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম [অনূদিত] (কবিতা)   :    কান্তিচন্দ্র ঘোষ

দেশের কথা (প্রবন্ধ)   :    প্রমথ চৌধুরী

মাঘ : ১৩২৫

ভূতের বোঝা (প্রবন্ধ)  :    দয়ালচন্দ্র ঘোষ

অভিভাষণ [আদি ব্রাহ্ম সমাজের উৎসবে পঠিত [প্রবন্ধ)  :    অশুতোষ চৌধুরী

খাঁটি বাঙালী (প্রবন্ধ)   :    কিরণশঙ্কর রায়

পাটেল-বিল্ [কলিকাতা ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে পাটেল বিলের সমর্থন সভায় সভাপতির বক্তৃতা] (প্রবন্ধ)  :    অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দেবী (কবিতা)  :    কালিদাস রায়

ফাল্গুন : ১৩২৫

নীতি শিক্ষা [প্রথম প্রস্তাব] (প্রবন্ধ)  :    স্কুল মাষ্টার

ভারতবর্ষ সভ্য কি না? (প্রবন্ধ):    বীরবল

নব-বসন্ত (গল্প)  :    প্রিয়ম্বদা দেবী

স্বর্গ-মর্ত্য (নাটক):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পাটেল-বিল্ (প্রবন্ধ)   :    ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী

চৈত্র : ১৩২৫

একটা অসম্ভব গল্প (গল্প)    :    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

সামাজিক সাহিত্য (প্রবন্ধ)    :    বরদাচরণ গুপ্ত

আর্য্যামি (প্রবন্ধ):    অতুলচন্দ্র গুপ্ত

*সম্পাদকের নিবেদন (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

*জীবেন্দ্র সিংহ রায়ের ‘প্রমথ চৌধুরী’ নামক গ্রন্থে সংকলিত সবুজপত্রের রচনা-তালিকায় এর উল্লেখ নেই মূল পত্রিকায় আছে।

বৈশাখ: ১৩২৬

গান  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথের পত্র  :    —–

খোলা চিঠি  :    প্রমথ চৌধুরী

সম্পাদকের নিবেদন (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

নববর্ষ (প্রবন্ধ)  :    বীরবল

ভবভূতি (কবিতা):    শৈলেন্দ্রকৃষ্ণ লাহা

প্রতিধ্বনি (কবিতা)    :    শৈলেন্দ্রকৃষ্ণ লাহা

প্রেম (কবিতা)   :    কান্তিচন্দ্র ঘোষ

রূপ (কবিতা)   :    সুরেশানন্দ ভট্টাচার্য্য

উড়ো-চিঠি  :    মৃত্যুঞ্জয়

মুক্তির ইতিহাস (গল্প)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী (প্রবন্ধ)  :    অতুলচন্দ্র গুপ্ত

জ্যৈষ্ঠ : ১৩২৬

ওমর-খৈয়াম (প্রবন্ধ)   :    প্রমথ চৌধুরী

উপকথা [ফরাসী হতে অনুদিত] (প্রবন্ধ)   :    প্রমথ চৌধুরী

অতীতের বোঝা (প্রবন্ধ):    ওয়াজেদ আলি

নেশার জের (গল্প)    :    কান্তিচন্দ্র ঘোষ

সাহিত্য-চর্চা [G. LAN SON-র ফরাসী হতে] (প্রবন্ধ)   :    ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী

দু-ইয়ারকি (প্রবন্ধ)    :    প্রমথ চৌধুরী

*——   :               —-

*জীবেন্দ্র সিংহরায়ের প্রথম চৌধুরী গ্রন্থে সংকলিত সবুজপত্রের রচনা-তালিকায় ৭ নম্বরে সরলাদেবী চৌধুরাণীর ‘সচ্চিদানন্দ’ নামে লেখাটি সন্নিবেশিত হয়েছে। যা মুল পত্রিকায় নেই।

আষাঢ় : ১৩২৬

ঝিলে জঙ্গলে শীকার [কুমুদনাথ চৌধুরী প্রণীত ‘Sport in Jheel and Jungle’ নামক ইংরেজি গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ] (গল্প):    প্রিয়ম্বদা দেবী অনূদিত

আমাদের শিক্ষা ও বর্তমান জীবন সমস্যা (প্রবন্ধ):    প্রমথ চৌধুরী

কথিকা    :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

একখানি পত্র:    রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী

মুক্তি (গল্প):    কান্তিচন্দ্র ঘোষ

শ্রাবণ : ১৩২৬

কথিকা    :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঝিলে জঙ্গলে শীকার (গল্প)   :    প্রিয়ম্বদা দেবী অনূদিত

পত্র  :    শিশিরকুমার সেন

ইঙ্গ সবুজপত্র (প্রবন্ধ)   :    বীরবল

ঝুপ্ ঝুপ্-চুপ [ঢাকা-মানিকগঞ্জের মৌখিক ভাষায় লেখা (গল্প)]:    সুরেশানন্দ ভট্টাচার্য্য

মানুষ ও সমাজ (প্রবন্ধ):    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

ভাইবোন (গল্প)  :    প্রবোধ ঘোষ

ভাদ্র : ১৩২৬

*কথিকা (বিজ্ঞাপন রহস্য)    :    প্রমথ চৌধুরী

ভারতের নারী (প্রবন্ধ)  :    বীরেন্দ্রকুমার দত্ত

মেয়ের বাপ (গল্প):    প্রবোধ ঘোষ

মিলনাকাক্সক্ষা (কবিতা):    কান্তিচন্দ্র ঘোষ

বিরহাকাক্সক্ষা (কবিতা):    কান্তিচন্দ্র ঘোষ

সোহাগ (কবিতা):    কুমুদরঞ্জন মলিক

কবি (কথিকা)   :    কান্তিচন্দ্র ঘোষ

উন্মদয়ন্তী জাতক [জাতক মালা হতে অনূদিত] (গল্প)   :    সুরেশানন্দ ভট্টাচার্য্য

মাহদেব (কবিতা):    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

নবীনের প্রতি (কবিতা):    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

*জীবেন্দ্র সিংহরায়ের ‘প্রমথ চৌধুরী’ নামক গ্রন্থে সংকলিত সবুজপত্রের রচনা-তালিকায় ১ নম্বরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কণিকা’ (গল্প) সন্নিবেশিত হয়েছে। যা মূল পত্রিকায় নেই।

আশ্বিন : ১৩২৬

নতুন রূপকথা (গল্প)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দৃষ্টি (কবিতা)   :    হেমেন্দ্রলাল রায়

ঝিলে জঙ্গলে শীকার (গল্প)   :    প্রিয়ম্বদা দেবী অনূদিত

বিসর্জন (গল্প)   :    বীরেশ্বর মজুমদার

কার্তিক : ১৩২৬

বাঁশি (কথিকা)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সভ্যতার কষ্টিপাথর (প্রবন্ধ)   :    ওয়াজেদ আলি

ঝিলে জঙ্গলে শীকার (গল্প)   :    প্রিয়ম্বদা দেবী অনূদিত

আনন্দ মঠ (সমালোচনা):    কিরণশঙ্কর রায়

উপকথা (কথিকা):    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

অগ্রহায়ণ : ১৩২৬

অদৃষ্ট? [Henri Barbuse-এর ফরাসী হতে] (গল্প):    ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী

অদৃষ্ট (গল্প)    :    প্রমথ চৌধুরী

নবযুগের কথা [চন্দননগর প্রবর্তক পাবলিশিং হাউস হতে প্রকাশিত] (প্রবন্ধ):    অতুলচন্দ্র গুপ্ত

বাদল ধারা (কবিতা)  :    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার

কথিকা    :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পৌষ : ১৩২৬

বন্ধু (গল্প):    সরলা দেবী

উড়ো চিঠি :    অশান্ত

শিল্পী (গল্প):    কান্তিচন্দ্র ঘোষ

ভারতের নারী (পত্র) [সবুজপত্র সম্পাদককে লেখা]:    রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

আলো ও ছায়া (গল্প)   :    প্রবোধ ঘোষ

ঝিলে জঙ্গলে শীকার (গল্প)   :    প্রিয়ম্বদা দেবী অনুদিত

ডিমোক্রাসি (প্রবন্ধ)    :    ধূর্জটীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়

মাঘ: ১৩২৬

প্রাচ্যে শক্তিবাদ [Paul Rienski –এর Political and Intellectual currents in the Far East] (প্রবন্ধ)  :    প্রিয়রঞ্জন সেনগুপ্ত

সাহিত্য বনাম পলিটিক্স (প্রবন্ধ):    বীরবল

টীকা ও টিপ্পনি (প্রবন্ধ):    বীরবল

ফাল্গুন ও চৈত্র : ১৩২৬

আমার কথা (গল্প)    :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রেনার কয়েক পৃষ্ঠা

(ফরাসি থেকে অনূদিত):    —

পত্র  :    বীরবল

বাপ ও ছেলে (গল্প)    :    সতীশচন্দ্র ঘটক

রায়তের কথা (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

বৈশাখ : ১৩২৭

সম্পাদকের নিবেদন (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

অশান্তের দল (কবিতা)  :    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

পত্র :    —

শাস্ত্র ও স্বাধীনতা (প্রবন্ধ)    :    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

ফাঁকা (গল্প)    :    সতীশচন্দ্র ঘটক

প্রজাস্বত্বের কথা (প্রবন্ধ):    হৃষীকেশ সেন

আর্য্য অনার্য্য (প্রবন্ধ)  :    সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়

পাগল (কবিতা)  :    যোগীন্দ্রনাথ রায়

পত্র  :    বীরবল

জ্যৈষ্ঠ : ১৩২৭

নব-রূপকথা (প্রবন্ধ)   :    প্রমথ চৌধুরী

ওমর খৈয়াম (প্রবন্ধ)   :    তরিকুল আলম

টীকা ও টিপ্পনি (প্রবন্ধ):    প্রমথ চৌধুরী

উপকথা (প্রবন্ধ)  :    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

মন বদলানো (প্রবন্ধ)   :    মণিগুপ্ত

পলাশ (কবিতা)  :    যোগীন্দ্রনাথ রায়

মাভৈঃ (কবিতা)  :    যোগীন্দ্রনাথ রায়

স্বাভাবিক নেতা (প্রবন্ধ):    হৃষীকেশ সেন

সত্য-দৃষ্টি (কবিতা)    :    অমিয় চক্রবর্তী

স্মৃতির ক্ষণিকতা (কবিতা)   :    অমিয় চক্রবর্তী

মোসলেম ভারত (প্রবন্ধ):    প্রমথ চৌধুরী

আষাঢ় : ১৩২৭

আষাঢ়ের গল্প (গল্প)    :    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

*জয়দেব   :    প্রমথ চৌধুরী

অনুরোধ (কবিতা)    :    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

প্রজস্বত্বের কথা-২ (প্রবন্ধ)    :    হৃষীকেশ সেন

* জয়দেব’ লেখাটি মূল পত্রিকায় নেই। জীবেন্দ্র সিংহ রায় তাঁর প্রমথ চৌধুরী গ্রন্থের পরিশিষ্টের তালিকায় লেখাটি ২নম্বরে দেখিয়েছেন।

শ্রাবণ : ১৩২৭

বৈশ্য (প্রবন্ধ)    :    অতুলচন্দ্র গুপ্ত

পুতলি (গল্প)    :    কান্তিচন্দ্র ঘোষ

‘দ্বীপান্তরের বাঁশি’ (প্রবন্ধ):    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

বিচার [Oscar Wilde : The House of Judgement অবলম্বনে] (গল্প)  :    পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়

চিঠি (কবিতা)   :    সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

আজ ঈদ (প্রবন্ধ):    তরিকুল আলম

আদিম মানব (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

ভাদ্র : ১৩২৭

শিল্পীর সাধনা (গল্প)   :    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

অভিভাষণ (প্রবন্ধ)    :    প্রমথ চৌধুরী

বিলাতের পত্র:    সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়

কৈফিয়ৎ (প্রবন্ধ):    প্রমথ চৌধুরী

আশ্বিন : ১৩২৭

রামমোহন রায় (প্রবন্ধ):    প্রমথ চৌধুরী

নন্-কো-অপারেশন (গল্প)    :    তারাদাস দত্ত

কবি কথা (কবিতা)   :    কান্তিচন্দ্র ঘোষ

উড়ো চিঠি :    অশান্ত

গত কংগ্রেস (প্রবন্ধ)   :    বীরবল

কার্তিক : ১৩২৭

কাব্য ও কল্পনা [প্রমথ চৌধুরীর সভাপতিত্বে রামমোহন লাইব্রেরি হলে এক অধিবেশনে পঠিত] (প্রবন্ধ)   :    শৈলেন্দ্রকৃষ্ণ লাহা

প্রজাস্বত্বের কথা ৩ [বীরবলকে লেখা] (প্রবন্ধ)   :    হৃষীকেশ সেন

রমণী (কবিতা)  :    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

রাস্কেল (গল্প)    :    প্রবোধ ঘোষ

বিলাতের পত্র (প্রবন্ধ)  :    সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়

বাঙলার কথা (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

ভুল স্বীকার:    প্রমথ চৌধুরী

অগ্রহায়ণ : ১৩২৭

বাঙালী পেট্রিয়টি [জনৈক বন্ধুকে লেখা] (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

রামমোহন রায় ও যুগধর্ম (প্রবন্ধ)   :    জ্ঞানেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য

প্রেমের সমাধি (কবিতা):    কান্তিচন্দ্র ঘোষ

মুখ চেনা (কথিকা)    :    তারাদাস দত্ত

ত্যাগী (কথিকা)  :    কান্তিচন্দ্র ঘোষ

পুরোনো কথা (প্রবন্ধ) [A SUPPERSSED MEMORIAL Reprinted from ‘The Englishman’]      :                বীরবল

পৌষ : ১৩২৭

উকিলের কথা [সবুজপত্র সম্পাককে লেখা (পত্র)  :    জুনিয়র উকিল

গৌরীদানের ফল (গল্প)  :    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

প্রাপ্তি (কবিতা)  :    যোগীন্দ্রনাথ রায়

বাঙালী যুবকের মনের কথা [প্রমথ চৌধুরীকে লেখা ৩টি পত্র] (প্রবন্ধ)    :    —–

সহজিয়া (কবিতা):    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

দুইবন্ধু [Guy de Maupassant-র ফরাসী হতে] (গল্প)   :    ননীমাধব চৌধুরী

‘ডেষ্ট্রাকটির’-এর ওজর (কথিকা)    :    মনি গুপ্ত

ভুল (ছোটগল্প)   :    প্রবোধ ঘোষ

মাঘ : ১৩২৭

উড়ো-চিঠি  :    মৃত্যুঞ্জয়

‘দাস-মনোভাব’ (প্রবন্ধ)   :    নগেন্দ্রকুমার গুহ রায়

প্রকৃতির অভিসার (কবিতা)   :    ভূপেন্দ্রলাল সেন চৌধুরী

প্রকৃতির প্রতি (কবিতা):    ভূপেন্দ্রলাল সেন চৌধুরী

বন্ধু (পাঁচটি চিঠি)    :    প্রবোধ ঘোষ

বাঙালী যুবক ও নন্-কো অপারেশন [‘সবুজপত্র’ সম্পাদককে লেখা] (প্রবন্ধ):    অমৃতকন্ঠ চট্টোপাধ্যায়

শ্রী রবীন্দ্রনাথ ও যুগসাহিত্য (প্রবন্ধ):    জ্ঞানেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য

#ফাল্গুন : ১৩২৭

আমাদের একমাত্র কর্তব্য [[Leon Chenoy-এর ফরাসী হতে](প্রবন্ধ)  :    ইন্দিরা দেবী চৌধুরী

বসন্ত বাতাসে (কবিতা):    প্রিয়ম্বদা দেবী

মায়ের প্রতিশোধ [Manupassant- এর ফরাসী হতে] (গল্প)  :    ননীমাধব চৌধুরী

আবুল ফজলের পত্র [বীরবলকে লেখা নন্ কো-অপারেশন মুভমেন্ট প্রসঙ্গে]   :    আবুল ফজল

একখানি পত্র:    ****

*সেবিকা (কথিকা)    :    কান্তিচন্দ্র ঘোষ

গীতায় অর্জুন (প্রবন্ধ)  :    জ্ঞানেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য

*‘সেবিকা’ কথিকা হিসেবে মূলপত্রিকায় স্থান পেয়েছে; কিন্তু জীবেন্দ্র সিংহরায়ের প্রমথ চৌধুরী গ্রন্থে সংকলিত সবুজপত্রের তালিকায় ‘কবিতা’ হিসাবে দেখানো হয়েছে।

#চৈত্র : ১৩২৭

গাছ [মোটামুটি কথা] (কথিকা)    :    সতীশচন্দ্র ঘটক ও যতীন্দ্র

দাস্যভাব [অধ্যাপক হীরেন্দ্রমোহন দাসের সভাপতিত্বে¡ পাটনা ‘সবুজ সঙ্ঘে’ পঠিত] (প্রবন্ধ)  :    রঙীন হালদার

মন্তব্য:    প্রমথ চৌধুরী

সম্পাদকের নিবেদন (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

#জীবন্দ্র সিংহরায় ‘প্রমথ চৌধুরী’ নামক গ্রন্থে সংকলিত সবুজপত্রের রচনা-তালিকা প্রণয়নে ফাল্গুন ও চৈত্র সংখ্যা দুটি একত্র করে একটি সংখ্যায় দেখিয়েছেন। মূল পত্রিকায় সংখ্যা দুটি পৃথক-পৃথক ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। এতে ফাল্গুন সংখ্যায় ‘আমাদের একমাত্র কর্তব্য’ শীর্ষক লেখাটি তিনি তালিকায় স্থান দেন নি।

* শ্রাবণ : ১৩২৮

[Slave-Mentality বা শূদ্র-আত্মা ] (প্রবন্ধ):    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

দেশের শিক্ষা (প্রবন্ধ)   :    সতীশচন্দ্র ঘটক

রুশীয় কৃষক [বৃত্তান্তগুলিSir Donald Mackenzie Wallace KZ Russian] (গল্প):    হৃষীকেশ সেন

আমার খুড়ো [Maupassant-র ফরাসী হতে] (গল্প)   :    ননীমাধব চৌধুরী

কুজ্যাঁর ভবিষ্যত [George Duhamel এর Civilisation হতে অনুবাদ] (গল্প)  :    কিরণশঙ্কর রায়

সম্পাদকের নিবেদন (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

* বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় সংখ্যা বের হয় নি।

ভাদ্র : ১৩২৮

আমাদের সঙ্গীত [সঙ্গীত সঙ্ঘের বার্ষিক উৎসবে উক্ত] (প্রবন্ধ):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

শিক্ষার মিলন (প্রবন্ধ)  :    **

অভিভাষণ (প্রবন্ধ)    :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পট (গল্প):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অভিনন্দন (রবীন্দ্রনাথকে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ) (প্রবন্ধ)    :    হীরেন্দ্রনাথ দত্ত

আশীর্বচন [রবীন্দ্রনাথকে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি] (প্রবন্ধ)  :    হরপ্রসাদ শাস্ত্রী

রবি-প্রশস্তি (কবিতা)   :    যতীন্দ্রমোহন বাগচী

আশ্বিন : ১৩২৮

নির্বাসিতের আত্মকথা (কথিকা):    ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী

কবি মধুসূদন (কবিতা):    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

বিদ্রোহী (কবিতা):    সতীশচন্দ্র ঘটক

দরিদ্র-নারায়ণায়নমঃ [সবুজপত্র সম্পাদককে] (কথিকা):    জ্ঞানেন্দ্রনাথ ভট্টচার্য্য

উড়ো চিঠি  :    হাবিলদার

হিন্দু জাতির পরিণাম (প্রবন্ধ):    রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

টিপ্পনী (প্রবন্ধ)   :    বীরবল

ভারতের শিক্ষার আদর্শ [রবীন্দ্রনাথেরThe centre of Indian culture নামক গ্রন্থের অনুবাদ (প্রবন্ধ)    :    অমূল্যরতন প্রামাণিক

নারীর পত্র (প্রবন্ধ)    :    জনৈক বঙ্গনারী

কার্তিক ও অগ্রহায়ণ : ১৩২৮

লেখকের প্রার্থনা [Jean Richard Bloch-এর cernva test mort নামক ফরাসী গ্রন্থ হতে] (প্রবন্ধ)    :    ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী

ভারতের শিক্ষার আদর্শ [রবীন্দ্রনাথের পবহঃৎব ড়ভ ওহফরধহ পঁষঃঁৎব নামক গ্রন্থের অনুবাদ (প্রবন্ধ)   :    অমূল্যরতন প্রামাণিক

পত্র :    বীরবল

ফরাসী-কবি ‘বোদলেয়ার’ (প্রবন্ধ)    :    নলিনীকান্ত গুপ্ত

বিলাত প্রবাসীর পত্র:    —-

বেদুঈন (কবিতা):    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

উড়ো-চিঠি  :    অতিথি

**নৃত্য-শিক্ষক[Maupassant-র ফরাসী হতে] (গল্প):    —-

**মূল পত্রিকায় গল্পের লেখকের নাম নেই। কিন্তু জীবেন্দ্র সিংহরায়ের ‘প্রমথ চৌধুরী’ নামক গ্রন্থে সংকলিত সবুজপত্রের রচনা-তালিকায় ননীমাধব চৌধুরী বলে উল্লেখ হয়েছে।

**মূল পত্রিকায় গল্পের লেখকের নাম নেই। কিন্তু জীবেন্দ্র সিংহরায়ের ‘প্রমথ চৌধুরী’ নামক গ্রন্থে সংকলিত সবুজপত্রের রচনা-তালিকায় ননীমাধব চৌধুরী বলে উল্লেখিত হয়েছে।

পৌষ : ১৩২৮

ভারতের শিক্ষার আদর্শ [রবীন্দ্রনাথেরThe centre of Indian culture নামক গ্রন্থের অনুবাদ] (প্রবন্ধ)    :    অমূল্যরতন প্রামাণিক

যুগল-পত্র [বার্লিন থেকে]:    দিলীপ কুমার রায় ও সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

জার্মানী সম্বন্ধে দুই চারিটি সাধারণ কথা (প্রবন্ধ)  :    দিলীপ কুমার রায়

দিল-মহলের গল্প (গল্প):    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

গেল মাঘ (কবিতা)    :    প্রিয়ম্বদা দেবী

*ফাল্গুনের সাড়া (কবিতা)    :    প্রিয়ম্বদা দেবী

*লেখাটি জীবেন্দ্র সিংহরায়ের ‘প্রমথ চৌধুরী’ নামক গ্রন্থে সংকলিত সবুজপত্রের রচনা-তালিকায় স্থান পায়নি। মূল পত্রিকায় তা সন্নিবেশিত হয়েছে।

মাঘ ও ফাল্গুন : ১৩২৮

ভারতের শিক্ষার আদর্শ [রবীন্দ্রনাথেরThe centre of Indian culture নামক গ্রন্থের অনুবাদ] (প্রবন্ধ)    :    অমূল্যরতন প্রামাণিক

স্বর্ণ বনাম লৌহ (কথিকা)    :    দয়ালচন্দ্র ঘোষ

সিদ্ধি (গল্প):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বসন্তের বাণী (প্রবন্ধ)   :    বীরবল

চিরন্তনী (কর্থিকা):    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

‘গীতাঞ্জলি ও সত্য কবিতা’ [আলোচনা] (প্রবন্ধ)   :    অমিয়চন্দ্র চক্রবর্তী

বকশীস [মানিকগঞ্জের মৌখিক ভাষায় লেখা] (গল্প)    :    সুরেশানন্দ ভট্টাচার্য্য

ক্বঃপন্থা [বিজলী হতে উদ্ধৃত] (প্রবন্ধ)     :    বীরবল

জেনোয়া কনফারেন্স (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

চৈত্র ও বৈশাখ : ১৩২৮/২৯

জাপানের জাতীয়তা [রবীন্দ্রনাথের‘Natalism in Japan’এর অনুবাদ’ (প্রবন্ধ)    :    অমূল্যরতন প্রামাণিক

পঁচিশে বৈশাখ (কবিতা):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

যুদ্ধের কথা (প্রশ্ন) [অতুলচন্দ্র গুপ্তকে লেখা (প্রবন্ধ) (প্রশ্ন)  :    বীরবল

যুদ্ধের কথা (উত্তর) [বীরবলকে লেখা] (প্রবন্ধ)  :    অতুলচন্দ্র গুপ্ত

যুদ্ধের কথা (প্রত্যুত্তর)     :    বীরবল

জুলি রোমেন [Maupassant-র ফরাসী হতে] (গল্প)   :    ননীমাধব চৌধুরী

গৃহ-লক্ষ্মী (কথিকা)    :    সোনামাখা দেবী

আমাদের শিক্ষা-সঙ্কট [আত্মশক্তি হতে উদ্ধৃত] (প্রবন্ধ)  :    বীরবল

*———–           :               ——-

*জীবেন্দ্র সিংহরায় ‘প্রমথ চৌধুরী’ নামক গ্রন্থে সংকলিত সবুজপত্রের রচনা-তালিকার ৯ নম্বরে বীরবলের ‘আমাদের শিক্ষা সঙ্কট’ [২] শিরোনামে লেখাটি সন্নিবেশিত করেছেন। যা মূল পত্রিকায় নেই।

জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় : ১৩২৯

পত্র (গ্রীক থেকে):    সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়

সাহিত্যের সমদর্শন (প্রবন্ধ)   :    জ্ঞানেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য

আমাদের মত-বিরোধ [মাসিক বসুমতী হতে উদ্ভূত (প্রবন্ধ)   :    প্রমথ চৌধুরী

দুখানি চিঠি [Anti-Intelletualism] (ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে লেখা)  :    প্রমথ চৌধুরী

বর্ষা (প্রবন্ধ)    :    বীরবল

আমাদের ভাষা-সঙ্কট [শঙ্খ হতে উদ্ধৃত] (প্রবন্ধ)  :    বীরবল

* আমাদের ভাষা-সঙ্কট [বিজলী হতে উদ্ধৃত] (প্রবন্ধ)   :    বীরবল

সত্যেন্দ্রনাথ [বিজলী হতে উদ্ধৃত] (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

বুল-দ্য-সুইফ বা চর্বির গোলা[Manpassant-র ফরাসী হতে] (গল্প)    :    ননীমাধব চৌধুরী

*লেখাটি মূল পত্রিকায় আছে। কিন্তু জীবেন্দ্র সিংহরায় ‘প্রমথ চৌধুরী’ গ্রন্থে সংকলিত সবুজপত্রের রচনা-তালিকা হতে তা পরিহার করেছেন।

**ভাদ্র : ১৩৩২

সম্পাদকের কৈফিয়ৎ (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

চরকা (প্রবন্ধ)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অন্ধকার (কবিতা)    :    যতীন্দ্রমোহন বাগচী

সবুজের হিন্দুয়ানী (প্রবন্ধ)    :    অতুলচন্দ্র গুপ্ত

চিত্তরঞ্জন (প্রবন্ধ):    প্রমথ চৌধুরী

অতীত (কবিতা):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্রভাতী (কবিতা):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

একদা (কবিতা)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পত্র :    ধুর্জটীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়

গত হিন্দুসভা (প্রবন্ধ)  :    বীরবল

কণা বচন (প্রবন্ধ)    :    বীরবল

**১৪২৯ শ্রাবণ সংখ্যা থেকে ১৩২২ শ্রাবণ সংখ্যা পর্যন্ত পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ ছিল।

আশ্বিন : ১৩৩২

সন্ন্যাসীর আত্মকাহিনী    :    জনৈক গৃহিণী

রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকার (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

শুভ-দৃষ্টি (কবিতা)    :    যতীন্দ্রমেহান বাগচী

মাধুরী     :    মন্মথ রায়

রবি-শস্য (প্রবন্ধ):    প্রমথ চৌধুরী

অপলাপ (কবিতা):    সুধীন্দ্রনাথ দত্ত

খেয়াল-খাতায় (কবিতা):    কান্তিচন্দ্র ঘোষ

বীরবলের পত্র    :    বীরবল

পাঠকের কথা    :    যথীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত

সম্পাদকের কথা (প্রবন্ধ):    প্রমথ চৌধুরী

স্বরাজ সাধন (প্রবন্ধ)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কার্তিক : ১৩৩২

শেষ বর্ষণ (নাটিকা)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ধর্মশাস্ত্র (প্রবন্ধ)  :    অতুলচন্দ্র গুপ্ত

প্রাইজ (প্রবন্ধ)   :    প্রবোধচন্দ্র ঘোষ

নব কমলাকান্ত    :    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

নর্মাল:    ধূর্জটীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়

সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়  :    ফণিভূষণ চক্রবর্তী

অগ্রহায়ণ : ১৩৩২

পাঠকের কথার জের    :    প্রসন্নকুমার সমাদ্দার

ভারতচন্দ্র (কবিতা)    :    শৈলেন্দ্রকৃষ্ণ লাহা

ক্ষুধা  :    সতীশচন্দ্র ঘটক

মানবী (কবিতা):    সুধীন্দ্রনাথ দত্ত

কোপাই    :    প্রমথনাথ বিশী

গল্প লেখা   :    প্রমথ চৌধুরী

যজ্ঞফল    :    মন্মথ রায়

বিজয়া দশমী (ভার্জল যাত্রা)  :    দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর

সনেট (কবিতা)  :    কান্তিচন্দ্র ঘোষ

ভক্তির ভারে (কবিতা)  :    যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত

তরুণ পত্র (প্রবন্ধ)    :    প্রমথ চৌধুরী

পুজোর ছবি (প্রবন্ধ)   :    বীরবল

গড্ডলিকা (প্রবন্ধ):    প্রমথ চৌধুরী

পৌষ : ১৩৩২

সমসাময়িক সাহিত্য (প্রবন্ধ)   :    নলিনীকান্ত গুপ্ত

চিত্তরঞ্জন (প্রবন্ধ):    সতীশচন্দ্র ঘটক

পণের মুক্তি  :    হেমেন্দ্রলাল রায়

ঝরণা ধারা (কবিতা)  :    যতীন্দ্রমোহন বাগচী

মঁস্যো পিজনো (অনুবাদ):    ননীমাধব চৌধুরী

সম্পাদকের নিবেদন (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

প্রজাস্বত্ব আইনের নূতন বিল (প্রবন্ধ):    প্রমথ চৌধুরী

নাতনীর উদ্দেশ্যে (কবিতা)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গান  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মাঘ : ১৩৩২

ভারতবর্ষের জিওগ্রাফি (প্রবন্ধ):    প্রমথ চৌধুরী

বংশীধারী   :    প্রমথনাথ চৌধুরী

কবি সুরেশচন্দ্র ও ঐন্দ্রজালিক (প্রবন্ধ)    :    দিলীপ কুমার রায়

সম্পাদকের দরবার (প্রবন্ধ)   :    প্রমথ চৌধুরী

শীত (কবিতা)   :    প্রিয়ম্বদা দেবী

ক্ষণিক স্বপন:    হেমেন্দ্রলাল রায়

চাবুক (কবিতা)  :    যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত

দুখানি চিঠি:    প্রমথ চৌধুরী

পত্র (১)   :    সুভাষচন্দ্র বসু

পত্র (২)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ফাল্গুন : ১৩৩২

পেনাঙের পথে    :    সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়

পদ্মা ও রবীন্দ্রনাথ:    প্রমথনাথ বিশী

প্রসাধন    :    যতীন্দ্রমোহন বাগচী

বিদায় (কবিতা)  :    যতীন্দ্রমোহন বাগচী

অবাধ্য    :    গোষ্ঠবিহারী মুখোপাধ্যায়

কেদারা ছায়ানট-যৎ-   :    দিলীপ কুমার রায়

চাষী  :    অতুলচন্দ্র গুপ্ত

দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পত্র  :    —-

নাটোরের মহারাজা (প্রবন্ধ)   :    প্রমথ চৌধুরী

চৈত্র : ১৩৩২

পেনাঙের পথে    :    সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়

কথা ও কাজ (প্রবন্ধ)  :    বরদাচরণ গুপ্ত

বাঙ্গালীর কবিত্ব (প্রবন্ধ):    নলিনীকান্তগুপ্ত

গাছ (প্রবন্ধ)    :    সতীশচন্দ্র ঘটক

লোহার ব্যথা (কবিতা)  :    যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত

কাগজ (প্রবন্ধ)   :    বীরবল

দোল পূর্ণিমায় (কবিতা):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দীপালি সংঘ (প্রবন্ধ)   :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বৈশাখ : ১৩৩৩

কিমাশ্চর্য্যমতঃপরম:    প্রসন্নকুমার সমাদ্দার

ভূতের কথা (গল্প):    নিবারণচন্দ্র দাসগুপ্ত

সোনার তরী (প্রবন্ধ)   :    প্রমথনাথ বিশী

সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের পত্র (কবিতা)    :    —

সামান্য কারণে [অনুবাদ] (নাটক)  :    ননীমাধব চৌধুরী

*২সাধুমার কথা (প্রবন্ধ):    বীরবল

*১ভারতবর্ষে [অনুবাদ সাহিত্য] (প্রবন্ধ)   :    শ্রী ইন্দিরা দেবী

*২জীবেন্দ্র সিংহরায়ের তালিকায় লেখকের নাম অজ্ঞাত হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু বিজিতকুমার দত্তের সেরা সবুজপত্র সংগ্রহর শেষ খণ্ডে তা বীরবলের লেখা হিসাবে দেখানো হয়েছে।

*১লেখাটির লেখক অজ্ঞাত হিসাবে তালিকাভুক্ত করেছেন জীবেন্দ্র সিংহ রায়। কিন্তু সেরা সবুজপত্র সংগ্রহর শেষ খণ্ডে তাঁর লেখক শ্রী ইন্দিরা দেবী বলে উল্লিখিত হয়েছে।

জ্যৈষ্ঠ : ১৩৩৩

শ্রদ্ধার স্মরণ (প্রবন্ধ)   :    গোপালচন্দ্র হালদার

গাছ (প্রবন্ধ)    :    সতীশচন্দ্র ঘটক

দিলী সহরে ফল্গুনী:    অবনীনাথ রায়

ফাল্গুনী    :    সত্যচরণ সরকার

রাষ্ট্র ও ধর্ম (প্রবন্ধ)   :    গোষ্টবিহারী মুখোপাধ্যায়

কলকাতার দাঙ্গা (প্রবন্ধ):    বীরবল

*২সাধুমার কথা (গ্রল্প)  :    বীরবল

*১ভারতবর্ষে [অনুবাদ সাহিত্য] (প্রবন্ধ)   :    শ্রী ইন্দিরা দেবী

দু’টি কথা (কবিতা)   :    জাহাঙ্গীর বকিল

*২ ঐ

*১ ঐ

আষাঢ় : ১৩৩৩

রায়তের কথা (প্রবন্ধ)  :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রায়তের কথা (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

কাব্য-জিজ্ঞাসা (প্রবন্ধ)  :    অতুলচন্দ্র গুপ্ত

চিত্র ও চৈতালী   :    প্রমথনাথ বিশী

৫। বিধি নিষেধ ও মানব প্রকৃতি    :    প্রসন্নকুমার সমাদ্দার

৬। রবীন্দ্রনাথ (কবিতা):    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

৭। ফুলের বিয়ে (প্রবন্ধ):    সতীশচন্দ্র ঘটক ও জ্যোতি বাচষ্পতি

*২৮। ভারতবর্ষে (অনুবাদ সাহিত্য) (প্রবন্ধ)    :    শ্রী ইন্দিরা দেবী

*১৯। সাধুম’ার কথা (গল্প)  :    বীরবল

*২ ঐ

*১ ঐ

শ্রাবণ : ১৩৩৩

বাঙলা ভাষা আর বাঙালী জাতের গোড়ার কথা (প্রবন্ধ):    সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়

কাব্য-জিজ্ঞাসা (প্রবন্ধ)  :    অতুলচন্দ্র গুপ্ত

*১ সাধুমা’র কথা (গল্প):    বীরবল

*২ ভারতবর্ষে (অনুবাদ সাহিত্য) (প্রবন্ধ)  :    শ্রী ইন্দিরা দেবী

* ভাদ্র : ১৩৩৩

* সম্ভবত সংখ্যাটি বের হয়নি।

আশ্বিন : ১৩৩৩

রবীন্দ্রনাথের পত্র  :    —

ভ্রাম্যমাণের দিন পঞ্জিকা (প্রবন্ধ)    :    প্রমথ চৌধুরী

বাঙলা ভাষা আর বাঙালী জাতের গোড়ার কথা (প্রবন্ধ):    সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়

দ্বন্দ্ব (কবিতা)   :    সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী

শ্যাম রাখি কি কুল রাখি:    প্রসন্নকুমার সমাদ্দার

উভয় সঙ্কট (প্রবন্ধ)   :    প্রমথ চৌধুরী

নারীর দান (কবিতা)  :    জাহাঙ্গীর বকিল

*২ সাধুমা’র কথা (গল্প):    বীরবল

*১ ভারতবর্ষে [অনুবাদ সাহিত্য] (প্রবন্ধ)  :    শ্রী ইন্দিরা দেবী

চুপ চুপ (প্রবন্ধ)  :    বীবরল

*২ ঐ

*১ ঐ

কার্তিক ও অগ্রহায়ণ : ১৩৩৩

গাছ (প্রবন্ধ)    :    সতীশচন্দ্র ঘটক ও জ্যোতি বাচষ্পতি

বাঙলার সমাজ ও সাহিত্যে মানবতার বিকাশ (প্রবন্ধ)   :    রমেশ বসু

রবীন্দ্রনাথ  :    দিলীপকুমার রায়

কাব্য-জিজ্ঞাসা (প্রবন্ধ)  :    অতুলচন্দ্র গুপ্ত

সমালোচনা (প্রবন্ধ)    :    প্রমথ চৌধুরী

পাবনার কথা (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

গণেশ:    অতুলচন্দ্র গুপ্ত

*২সাধুমা’র কথা (গল্প)  :    বীরবল

নটরাজের নৈবেদ্য  :    গোপাল হালদার

গীত-পঞ্চক (গান):    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

*২ ঐ

পৌষ : ১৩৩৩

রবীন্দ্রনাথ  :    দিলীপ কুমার রায়

কথা-সাহিত্য (প্রবন্ধ)   :    প্রমথ চৌধুরী

ভারতের শিল্পী (প্রবন্ধ)  :    কুমারলাল দাস গুপ্ত

*২সাধুমার কথা (গল্প)  :    বীরবল

মনের পথে (প্রবন্ধ)    :    বীরবল

নূতন লেখক (প্রবন্ধ)   :    প্রমথ চৌধুরী

জানি না   :    জাহাঙ্গীর বকিল

গাছের ভিতরটা (প্রবন্ধ):    সতীশচন্দ্র ঘটক ও জ্যোতি বাচষ্পতি

*১ভারতবর্ষে [অনুবাদ সাহিত্য] (প্রবন্ধ)   :    শ্রী ইন্দিরা দেবী

*২ ঐ

*১ ঐ

মাঘ : ১৩৩৩

অভিভাষণ (প্রবন্ধ)    :    প্রমথ চৌধুরী

পেন্সনের পর (গল্প)    :    কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

উপসংহার   :    দিলীপ্রবাসী বঙ্গসাহিত্য সন্মিলনের সভাপতি

দিল্লীর সন্মিলনী ও ‘ডাকঘর’           :               অবনীনাথ চৌধুরী

ফাল্গুন : ১৩৩৩

সৌন্দর্যতত্ত্ব সম্বন্ধে কয়েকটি কথা (প্রবন্ধ)   :    সুবোধ মুখোপাধাধ্যায়

গাছ (প্রবন্ধ)    :    সতীশচন্দ্র ঘটক ও জ্যোতি বাচষ্পতি

*২সাধুমা’র কথা (গল্প)  :    বীরবল

কাব্য-জিজ্ঞাসা (প্রবন্ধ)  :    অতুলচন্দ্র গুপ্ত

একখানি পত্র [রবীন্দ্রনাথকে লেখা]   :    প্রশান্ত মহালানবিশ

*২ ঐ

চৈত্র : ১৩৩৩

বীরবল (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

সুন্দর ও সৌন্দর্য  :    যামিনীকান্ত সেন

অভিভাষণ  :    মিসেস আর.এস.হোসেন

*২সাধুমা’র কথা (গল্প)  :    বীরবল

সিন্ধু পারে (কবিতা)   :    শ্রী

*২ ঐ

বৈশাখ : ১৩৩৪

শেষ মধু (কবিতা)    :    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অনু-হিন্দুস্থান (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

গাছ (প্রবন্ধ)    :    সতীশচন্দ্র ঘটক

চৈতালি    :    প্রমথনাথ বিশী

পাখির কথা:    …

জ্যৈষ্ঠ ও অষাঢ় : ১৩৩৪

ভ্রাম্যমাণের জল্পনা  :    দিলীপকুমার রায়

গানের কথা:    ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়

বীরবলের পত্র (প্রবন্ধ)  :    বীরবল

পরিচ্ছদ কলা:    যামিনীকান্তসেন

গাছ (প্রবন্ধ)    :    সতীশচন্দ্র ঘটক

লেখা (প্রবন্ধ)   :    প্রমথ চৌধুরী

সাধুমার কথা (গল্প)   :    বীরবল

**শ্রাবণ ও ভাদ্র : ১৩৩৪

বঙ্কিম সাহিত্যে মানবতার আদর্শ (প্রবন্ধ)   :    রমেশ বসু

ভ্রাম্যমাণের জল্পনা  :    দিলীপ কুমার রায়

বার্ধক্য ও বৃদ্ধের আবদার:    নিবারণচন্দ্র দাসগুপ্ত

চীন ও ইউরোপ (অনুবাদ)   :    ননীমাধব চৌধুরী

রবীন্দ্রনাথ ও টম্সম্ (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

ফরাসী সাহিত্য (প্রবন্ধ):    প্রমথ চৌধুরী

পূর্ব ও পশ্চিম (প্রবন্ধ)  :    প্রমথ চৌধুরী

পূর্ব ও পশ্চিম (প্রবন্ধ)  :    প্রবোধচন্দ্র বাগচী

বর্ষশেষ (সম্পাদকের নিবেদন):    প্রমথ চৌধুরী।

** এরপর পত্রিকাটির আর কোন সংখ্যা প্রকাশিত হয় নি।

[সহায়তা : ড. রঘুনাথ ভট্টাচার্য প্রণীত সবুজপত্র গোষ্ঠীর সাহিত্য-ভাবনা ॥ দশদিক, ঢাকা, ২০০৪]

সবুজপত্রের শতবর্ষ স্মরণ (১৯১৪-২০১৪) বিশেষ ক্রোড়পত্র

ক্রোড়পত্র
সবুজপত্রর শতবর্ষস্মরণ
(১৯১৪-২০১৪)

উৎসর্গ
সরদার ফজলুল করিম
বিরল উজ্জ্বল বাতিঘর ছিলেন…
জন্ম : ১৯২৫ মৃত্যু : ২০১৪

শতবর্ষের সবুজপত্র  ।। অভিমত
সবুজপত্র ।। হাসান আজিজুল হক
সবুজপত্রের শতবর্ষ পূর্ণ হচ্ছে। এই পত্রিকা প্রকাশের পিছনে একটা নতুন ভাবনা ছিল। তার ওপর এই পত্রিকার সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী। নতুন মাত্রা তো থাকবেই। একশ বছর আগে সবুজপত্র যে নেতৃত্ব দিয়েছিল, রবীন্দ্রনাথকে সঙ্গে নিয়ে তারা যে কাজটি করতে শুরু করলেন, তখনকার বাংলা ভাষার সঙ্গে আজকের ভাষার সম্পর্ক শেষপর্যন্ত কী দাঁড়ালো, সেই জায়গা থেকে আজকের ভাষা-পরিস্থিতি একটু বুঝে নেওয়া দরকার।
এখানে একটা ব্যাপার, সবুজপত্রের সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো। রবীন্দ্রনাথের লেখালেখির মধ্যে পরিবর্তন এলো। সেটা কি সবুজপত্রের জন্যেই? মনে রাখতে হবে সাধুভাষাতে লেখাও সবুজপত্রে ছাপা হতো। তবু চলিত প্রমিত ভাষার চলটা সবুজপত্রেই শুরু হয়েছিল। ভাষা এমনি পাল্টায় না। এটা যান্ত্রিক কোনো বিষয় নয়। নিশ্চয়ই সমসাময়িক, আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা, মানুষের জীবনযাত্রা, তার স্বপ্ন দেখা, বাস্তব আচরণ এগুলোও পাল্টে যাচ্ছিল বা পাল্টাতে শুরু করেছিল। কথা কঠিনই হোক বা সহজই হোক, প্রকাশটা সহজ হওয়া দরকার প্রমথ চৌধুরীই এটা প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন।
সবুজপত্রের প্রথম প্রকাশ ১৩২১-এর ২৫শে বৈশাখ। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে। আমি সবুজপত্রের বেশি কপি হাতে পাই নি। তবে সবুজপত্রের অনেক লেখা দেখেছি, প্রমথ চৌধুরীর অনেক লেখাই পড়েছি। আমার কাছে ছিলো, হয়তো এখনও আছে, বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত প্রমথ চৌধুরীর গল্প। যে সময়টার কথা বলছি সে সময়টায় পৃথিবীই ঢুকছিল এক নতুন বাস্তবতায়। বলকান রাষ্ট্রগুলির ওপর নজর পড়ল ইউরোপের প্রায় সবদেশের। অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্য, তুরস্ক সাম্রাজ্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়লÑবিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেল ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়া। সাম্রাজ্য ভেঙে না ফেললে নতুন বিশ্ব গড়ে তোলা যাচ্ছে না।
এক যুদ্ধে সেটা ঘটবার ছিলো নাÑসে জন্য আরও একটা যুদ্ধের প্রয়োজন পড়লো একুশ বছর পর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আরবরা স্বাধীনতা চাইলো তুরস্ক সাম্রাজ্যে থেকে, ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়ে গেলো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক হয়ে গেল ইউরোপ। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পালে লাগল হাওয়া। এই সময়টাই সবুজপত্রের আত্মপ্রকাশের কাল। গতি চাই, খোলস ঝেড়ে ফেলতে চাই, পুরনোকে বিদায় করতে চাই, নতুনের আবাহন চাই। এই হলো সবুজপত্র প্রকাশের পটভূমি।
রবীন্দ্রনাথ তখন মাঝবয়সী। ১৯১৩-তে তিনি নোবেল পেলেন। গোটা বিশ্বের সামনে ভারতের বিশাল ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ। গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন শুরু, হিন্দু-মুসলমানের জন্যে সাময়িক একটা সম্প্রীতি-বন্ধন তৈরি হয়েছে। বৃটিশ বিরোধিতার জন্য পশ্চাদমুখী খিলাফত আন্দোলনের সঙ্গে গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন এক হয়েছে। গতি, আত্মশক্তি, দ্রোহ দেখা দিচ্ছে সমাজের মধ্যে। সাহিত্যেও তার প্রতিফলন যে পড়বে সেটা স্বাভাবিক। সবুজপত্র এই সময়কার পত্রিকা। সাহিত্যে ভাষাবদলের একটা সূত্র এখান থেকেই মেলে। রবীন্দ্রনাথও তো চলছেন গতি প্রগতির ভিতর দিয়েই। তাঁর চিন্তা প্রসারিত হচ্ছে বিশ্বের দিকে, সাহিত্যে পড়ছে তার ছাপ। প্রমথ চৌধুরী তো অসাধারণ মানুষ। বৃদ্ধিবৃত্তির চর্চায় তার মতো মানুষ দুর্লভ। তাঁকে আধুনিকতার অগ্রদূত বললে মিথ্যে বলা হয় না। সবুজপত্রে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় লিখতেন। তখনকার বিশ্বের সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে এঁদের পরিচয়। আধুনিক চিন্তার সঙ্গে আধুনিক ভাষা দেখা দেবে না কেন? রবীন্দ্রনাথের ভাণ্ডার অক্ষয়তাঁর প্রতিভা, তখন তো বটেই, আজও উত্তুঙ্গ। তাঁর হাতে ভাষা পেল সহজগতি, চিন্তার পরিচ্ছন্নতা, অদৃষ্টপূর্ব। কাব্যসৃষ্টিও বিশ্বমানের। কে কাকে সমৃদ্ধ করেছে বলা মুশকিল। সবুজপত্র রবীন্দ্রনাথকে, না রবীন্দ্রনাথ সবুজপত্রকে।
আমার মনে হয় সবুজপত্র সম্পর্কে সঠিক ধারণা করতে গেলে সবুজপত্র পড়তে হবে। সত্তর, আশি বা একশ বছর পরে সবুজপত্রের ভাষার যে রীতিটা কি টিকে গেছে? এটা কি থাকবে?

ক্ষণজন্মা সবুজপত্র ।। মাহবুবুল হক
শতবর্ষ আগে বিশ শতকের গোড়ায় যে বিখ্যাত মাসিক সাহিত্য পত্রিকাটি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পালাবদল রচনায় আসামান্য অবদান রেখেছিল তার নাম সবুজপত্র। এর সম্পাদক ছিলেন বাংলাদেশের পাবনার বিখ্যাত চৌধুরী বংশের সন্তান প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬)। তাঁর ছোটবেলা কেটেছে পাবনায়। কৈশোরের দিনগুলি কৃষ্ণনগরে। যৌবনে কিছুকাল ছিলেন বিলেতে তারপর কলকাতায়। আর তাঁর শেষ জীবন কেটেছে কলকাতায় ও শান্তিনিকেতনে। তিনি ছিলেন দর্শনে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছিলেন ইংরেজি সাহিত্যে। আর ব্যারিস্টারি পাস করেছিলেন বিলেত থেকে। ছাত্রাবস্থায় সখের বশে শিখেছিলেন ফরাসি ভাষা।
চিন্তা ও মননে প্রমথ চৌধুরী ছিলেন যুক্তিবাদী। সূক্ষ্ম রসবোধ, ইহজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি, মার্জিত রুচিবোধ, নাগরিক সংস্কৃতি ইত্যাদি মানস বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন তিনি। তাঁর সম্পাদিত সবুজপত্রে এসব গুণের প্রতিফলন ঘটেছিল। এই পত্রিকাকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল তরুণ লেখকদের একটি দল। তাঁরা পরিচিত হয়েছিলেন ‘সবুজপত্র গোষ্ঠী’ নামে। এঁরা ছিলেন যুক্তিনিষ্ঠ, বিশ্বমুখী, বুদ্ধিবাদী, ও পরিশীলিত রুচির অধিকারী।
সবুজপত্রের লেখকরা প্রমথ চৌধুরীর নেতৃত্বে এক নতুন সাহিত্য আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। সেই আন্দোলনের চালিকাশক্তি ছিল তারুণ্য ও যৌবন। সবুজপত্রের প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ২৫এ বৈশাখ ১৩২১ বঙ্গাব্দে (৭ই মে ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দ)। এই সংখ্যায় সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয় ‘সবুজপত্র : মুখপত্র ওঁ প্রাণায় স্বাহা’ শিরোনামে। সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী তাতে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, নিছক নতুন কিছু করার তাগিদ থেকে নয়, বরং বাঙালির জীবনে যে নতুনত্ব এসে পড়েছে তাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার লক্ষ্যেই এই পত্রিকাটির প্রকাশ। পাশ্চাত্য সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রভাবে বাঙালির জীবনে যে জড়তামুক্তি ঘটছে সেই ধারায় নতুন সাহিত্য সৃষ্টি সবুজপত্রের লক্ষ। সম্পাদক  লেখেন:
যে সব লেখায় নবজীবনের আদর্শ প্রতিফলিত হবে তাকেই সযতেœ সবুজপত্রাধারে রক্ষিত করা হবে। … দেশের অতীত ও বিদেশের বর্তমান, এই দুটি প্রাণশক্তির বিরোধ নয়, মিলনের উপর আমাদের সাহিত্যের ও সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। আশা করি, বাঙলার পতিত জমি সেই মিলনক্ষেত্র হবে। সেই পতিত জমি আবাদ করলেই তাতে যে সাহিত্যের ফুল ফুটে উঠবে, তাই ক্রমে জীবনের ফলে পরিণত হবে। … আমাদের এই ক্ষুদ্র পত্রিকা, আশা করি, এ-বিষয়ে লেখকদের সহায়তা করবে।
তরুণ লেখকদের সবুজপত্রে সাহিত্যচর্চার আহ্বান জানিয়ে সম্পাদকীয়তে লেখা হয় : ‘আমাদের বাংলা ঘরের খিড়কি দরজার ভিতর প্রাচীন ভারতবর্ষের হাতি গলাবার চেষ্টা করতে হবে। আমাদের গৌড় ভাষার মৃৎকুম্ভের মধ্যে সাত সমুদ্রকে পাত্রস্থ করতে হবে।’ পাশ্চাত্য সাহিত্যের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের যোগসূত্র রচনার আহ্বান জানিয়ে সবুজপত্রের প্রথম সংখ্যাতেই প্রমথ চৌধুরী  লেখেন :
ইউরোপের স্পর্শে আমরা, আর কিছু না হোক, গতি লাভ করেছি, অর্থাৎ মানসিক ও ব্যবহারিক সকল প্রকার জড়তার হাত থেকে কথঞ্চিৎ মুক্তি লাভ করেছি। এই মুক্তির ভিতর যে     আনন্দ আছে সেই আনন্দ হতেই আমাদের নবসাহিত্যের সৃষ্টি। সুন্দরের আগমনে হীরা মালিনীর ভাঙা মালঞ্চে যেমন ফুল ফুটেছিল, ইউরোপের আগমনে আমাদের দেশে তেমনি সাহিত্যের ফুল ফুটেছে। তার ফল কি হবে, সে কথা না বলতে পারলেও এই ফুল ফোটা যে বন্ধ করা উচিত নয়, এই হচ্ছে আমাদের দৃঢ় ধারণা। সুতরাং যিনি পারেন, তাঁকেই আমরা ফুলের চাষ করবার উৎসাহ দেব।
প্রথম সংখ্যায় বীরবল ছদ্মনামে প্রমথ চৌধুরীর ‘সবুজপত্র’ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়। উদ্বোধনী এ সংখ্যাটিতে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত ‘সবুজের অভিযান’ কবিতাটি ছিল নবযাত্রার প্রেরণাদীপ্ত। ঐ সংখ্যাটিতেই প্রকাশিত হয় তাঁর আরও দুটি লেখা : ‘বিবেচনা ও অবিবেচনা’ (প্রবন্ধ) ও ‘হালদার গোষ্ঠী’ (গল্প)।  এছাড়া ঐ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল  সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘সবুজ পাতার গান’ কবিতাটি।
সবুজপত্র ছিল মূলত প্রবন্ধনির্ভর পত্রিকা। তবে বিষয়বৈচিত্র্য সৃষ্টির জন্যে কবিতা, গল্প, ধারাবাহিক উপন্যাস, টীকাটিপ্পনী ইত্যাদি পরিবেশিত হতো। পরে সবুজপত্রে প্রকাশিত লেখার ওপর আলোচনাও প্রকাশিত হতে থাকে। এই পত্রিকার বিশেষ কিছু লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য ছিল। এতে মনোরঞ্জনমূলক কোনো ফিচার থাকত না। এমনকী কোনো বিজ্ঞাপনও ছাপা হতো না। সবুজপত্রে কখনো কোনো ছবি বা কোনো রকম অলংকরণ  মুদ্রিত হয়নি। সবুজপত্রের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন শিল্পী নন্দলাল বসু। প্রচ্ছদ ছিল গাঢ় সবুজ রঙের। তার ওপরে একটা সাদা তালপাতা চিত্রিত হয়েছিল। তালপাতা ছিল ভারতবর্ষের প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতীক আর সবুজ পাতা ছিল নবজীবনের বাণীবাহক।
সবুজপত্র বাংলা সাহিত্যে পালাবদলের সূচনা করেছিল। উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে বাঙালি লেখকদের মনোজগতে ইতিহাস-চেতনা ও সামাজিক নীতিবোধের যে ব্যাপক প্রকাশ ঘটেছিল সে ধারায় এনেছিল লক্ষণীয় পরিবর্তন। এখানে প্রকাশিত বিভিন্ন রচনায় প্রাধান্য পেয়েছিল সামাজিক নানা সংস্কার থেকে সার্বিক মানসমুক্তির আকাক্সক্ষা  এবং সেই সঙ্গে বুদ্ধিবাদিতা, যুক্তিবোধ, ও রুচিশীলতা।
সবুজপত্র ছিল যৌবন ও তারুণ্যের দীপ্তিময় পত্রিকা। এই গোষ্ঠীর প্রধান লেখক ছিলেন দুজন : প্রমথ চৌধুরী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অন্য লেখকদের মধ্যে ছিলেন : অতুলচন্দ্র গুপ্ত, কিরণশঙ্কর রায়, সতীশচন্দ্র ঘোষ, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বিশ্বপতি চৌধুরী, হারীতকৃষ্ণ দেব, বরদাচরণ গুপ্ত, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী, প্রফুল্লকুমার চক্রবর্তী, সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বীরেশ্বর সেন ও ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী প্রমুখ।
পত্রিকাটিকে ঘিরে যে তরুণ লেখকগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল তাঁদের আসর বসত প্রমথ চৌধুরীর বাড়িতে। সেই আসরে তাঁরা সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, অর্থনীতি ইত্যাদি নানা বিষয়ে আলোচনায় মেতে উঠতেন। সেটি ছিল আধুনিক বিদ্যাচর্চার এক ধরনের ঘরোয়া আসর। সেখানে অঁরি বের্গসঁ, ম্যাকস প্ল্যাঙ্ক, বার্ট্রান্ড রাসেল, জর্জ বার্নার্ড শ, বেনেদেত্তো ক্রোচে, সিগ্মুন্ড্ ফ্রয়েড, জন য়ুং, আলফ্রেড অ্যাডলার প্রমুখ ইউরোপীয় মনীষীদের কর্ম ও অবদান নিয়ে আলোচনা হত। এইসব আলোচনার প্রভাব সবুজপত্রের লেখকদের লেখায় পড়েছিল। ফলে বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্য আধুনিক মননশীল ধারায় উত্তরণ ঘটেছে।
বাংলা সাহিত্যে কয়েকটি দিক থেকে সবুজপত্র সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো যুক্তিবোধ ও ইহজাগতিকতার আলোকে বিষয় বিচার, মুক্তবুদ্ধির চর্চা, সংস্কৃতিসাধনা, জ্ঞান-বিজ্ঞান আলোচনা, আবেগমুক্ত বস্তুনিষ্ঠতা ইত্যাদি। আর অন্যদিকে সবুজপত্রের লেখকের রচনারীতির লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছিল চলিত গদ্যরীতি ও সরল প্রকাশভঙ্গি অনুসরণ।
কেবল খাঁটি সাহিত্যচর্চাতেই সবুজপত্র সীমাবদ্ধ ছিল না। তার আলোচনার পরিমণ্ডল ছিল বহু বিস্তৃত। সাহিত্যের পাশাপাশি আধুনিকতা, ইতিহাস, দর্শন, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, সমাজবিদ্যা, রাষ্ট্রনীতি, প্রতœতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব¡ ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে সম্প্রসারিত ছিল আলোচনার ক্ষেত্র। বাঙালি লেখকরা যেন চিন্তা ও মননে পাশ্চাত্যের আধুনিক লেখকদের সমপর্যায়ের হয়ে ওঠেন এই ছিল পত্রিকাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। এ কাজে পুরোধা ভূমিকা নিয়েছিলেন প্রমথ চৌধুরী। পত্রিকাটির মননশীলতা, বাগবৈদগ্ধ ইত্যাদি  সেকালে আকৃষ্ট করেছিল বাঙালি বিদগ্ধ ও রসগ্রাহী পাঠকদের।
সবুজপত্র সম্পাদনায় প্রমথ চৌধুরীকে সাহায্য করতেন মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় ও সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী। এই পত্রিকার অন্যতম প্রাণপুরুষ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন এই পত্রিকার সঙ্গে। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা ও সমাজভাবনামূলক কিছু প্রবন্ধ এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ‘কালান্তর’ গ্রন্থে সংকলিত তাঁর ‘বাতায়নিকের পত্র’ প্রবন্ধটি এখানে প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর ‘অপরিচিতা’,
‘হৈমন্তী’, ‘স্ত্রীর পত্র’, ‘পয়লা নম্বর’ ইত্যাদি গল্পও প্রকাশিত হয়েছিল সবুজপত্রে। এ ছাড়া এই পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর ‘ঘরে বাইরে’ ও ‘চার অধ্যায়’ উপন্যাস। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের মনোজগতে এবং ভাষরীতির আধুনিকতার বিকাশে সবুজপত্র বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। এটি সবুজপত্রের বিশেষ অবদান। রবীন্দ্রনাথ তাই সবুজপত্র ও প্রমথ চৌধুরীর কাছে ঋণ স্বীকার করেছিলেন অকুণ্ঠভাবে। ১৯৪১ সালে প্রমথ চৌধুরীর সংবর্ধনা উপলক্ষে প্রকাশিত ‘প্রমথ চৌধুরীর গল্পসংগ্রহ’ গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন :
প্রমথর আহ্বানমাত্রে সবুজপত্র বাহকতায় আমি তাঁর পার্শ্বে এসে দাঁড়িয়েছিলুম। প্রমথনাথ     এই পত্রকে যে একটি বিশিষ্টতা দিয়েছিলেন তাতে আমার তখনকার রচনাগুলি সাহিত্য-সাধনার একটি নূতন পথে প্রবেশ করতে পেরেছিল। … সবুজপত্রে সাহিত্যের এই একটি নূতন ভূমিকা রচনা প্রমথর প্রধান কৃতিত্ব। আমি তাঁর কাছে ঋণ স্বীকার করতে কখনও কুণ্ঠিত হইনি।
সুনীতিকুমারের ভাষাতত্ত্ব বিষয়ক প্রথম প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় সবুজপত্রে। অতুল গুপ্ত তাঁর ‘কাব্যজিজ্ঞাসা’ গ্রন্থের অলংকার বিষয়ক প্রবন্ধগুলি এখানেই প্রথম প্রকাশ করেছিলেন।
প্রমথ চৌধুরীর নেতৃত্বে সবুজপত্র বাংলা ভাষারীতিতে যে আন্দোলনের সূচনা করে তা হল চলিত ভাষারীতির একচেটিয়া প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। অমার্জিত কথ্যবুলিকে সযতেœ পরিহার করে সবুজপত্রের মাধ্যমে মার্জিত রুচিশীল পরিশীলিত চলিত রীতিতে তিনি গদ্য চর্চার আন্দোলনে ব্রতী হন। এই আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল।
সবুজপত্র ছিল ক্ষণজন্মাআক্ষরিক ও ব্যঞ্জিত এ দুঅর্থেই। এই পত্রিকা ঘিরে রবীন্দ্রনাথ অনেক ঊঁচু আশা পোষণ করেছিলেন। প্রবীণতার বর্ণহীন, নীরস মরুভূমিতে তিনি এই পত্রিকাকে মরূদ্যান বা ওয়েসিস হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। সর্বব্যাপী জ্যাঠামির চাপের মধ্যেও পত্রিকাটি যেন দীর্ঘকাল সজীব থাকে সেই প্রত্যাশা ছিল তাঁর। কিন্তু প্রায় তেরো বছর অনিয়মিত চলার পর সবুজপত্র ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
সবুজপত্র ছিল আধুনিক চিন্তা-চেতনার মুখপত্র। তাতে সজীব চলিত ভাষা, যুক্তিনির্ভর নির্মেদ ও নিরাবেগ রচনারীতি, মননঋদ্ধ রচনা ও আধুনিক পাশ্চাত্য সাহিত্যচিন্তার প্রকাশ ঘটেছিল। এ কারণে পত্রিকাটি বিভিন্ন প্রতিকূলতার মুখে পড়ে। চিত্তরঞ্জন দাশের সম্পাদনায় বিপিনচন্দ্র পাল পরিপুষ্ট ‘নারায়ণ পত্রিকা’ রক্ষণশীল মনোভাব নিয়ে প্রমথ চৌধুরীর চলিত ভাষা ও আধুনিক চিন্তাধারা প্রবর্তনের প্রয়াসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তবে তাদের প্রচেষ্টা বিফলে যায়। ক্রমে চলিত ভাষা ও আধুনিক চিন্তাধারার ধারক সবুজপত্রের জয় হয়।

সবুজপত্র : শতবর্ষের সজীবতা ।। অনিরুদ্ধ কাহালি
অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যালোচনার পরে এখন এটি প্রতিষ্ঠিত যে, কোনো অভিজাত ভাষা থেকে কিংবা কোনো কৃত্রিম বা বিশেষ প্রক্রিয়ায় বাংলা ভাষার জন্ম হয়নি। বাংলা ভাষার সৃষ্টি একেবারেই স্বতঃস্ফূর্ত এবং প্রাকৃত অর্থাৎ সাধারণ মানুষের মুখে ব্যবহৃত ভাষা বহু বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। যে ভাষার জন্ম রহস্যের মধ্যেই সাধারণ মানুষ এবং মুখের ভাষার সম্পর্ক আছে সেই ভাষা-আশ্রিত যে সাহিত্য সেই সাহিত্যের বাহনও হবে মুখ নিঃসৃত বাংলা ভাষাসাধারণ বুদ্ধি-বিবেচনা তাই বলে। কিন্তু বাংলা গদ্যের সূচনালগ্নে তা ঘটেনি। তবে এই সূচনাকাল নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। আমরা আসলে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগকেন্দ্রিক যে গদ্যচর্চা তাকেই সূচনা হিসেবে অভিহিত করেছি। যদিও সে-গদ্য সাহিত্য হয়ে উঠেছে আরো পরে, তারপরেও নিঃসন্দেহে বলা যায় গদ্যসাহিত্যের মুখপাতটা সেখানেই। এগুলো সবই এখন সর্বজন স্বীকৃত প্রত্যয়।
কিন্তু যে গদ্যের চর্চা শুরু হলো ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে তার সঙ্গে আজকের গদ্যের পার্থক্যটা অনেক। না হওয়ারও কারণ নেই। সময়টাও মধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে অনেকদুই শত বৎসরের অধিককাল। মহাকালের বিবেচনায় সময়টা হয়তো অনেক বড় নয়, কিন্তু সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ইতিহাসে একেবারে কমও নয়। গদ্যের এই যে প্রবাহ সেই প্রবহমানতায় রয়েছে বহু মানুষের এবং প্রতিষ্ঠানের সচেতন বা স্বতঃস্ফূর্ত অবদান। একথাটিও সবারই জানা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের অঙ্কুরোদ্গম হয়েছিল সাময়িকপত্রে। ব্যক্তি চিন্তাও সাময়িকপত্রের আশ্রয়ে ব্যষ্টির আকাক্সক্ষায় পরিণত হয়েছে। ঠিক সেই ঘটনাটিই ঘটেছিল আজ থেকে শত বৎসর আগে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যপ্রেমী পণ্ডিত প্রমথ চৌধুরীর একই সঙ্গে শেকড়-সন্ধানী ও ভবিষ্যদ্মুখি চিন্তা স্বল্প কিছু মানুষের ঐকান্তিক সমর্থন নিয়ে বাংলা সাহিত্যের ক্রমবর্ধিষ্ণু গদ্যধারাটিকে বেগবান এবং নবপল্ল¬বে সমৃদ্ধ করেছিল সবুজপত্র পত্রিকা। ব্যাপক প্রতিবাদের মুখেও সবুজপত্র সম্পাদকের অনড় অবস্থান এবং রবিকবির সর্বাত্মক সমর্থন সবুজপত্রের চলার গতিকে করেছিল দৃঢ় ও অপ্রতিরোধ্য। একদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সর্বব্যাপ্ত প্রতিভা অন্যদিকে মাত্র কয়েকদিন আগে পাওয়া নবেল প্রাইজের খ্যাতি-অখ্যাতি(?) তখন ছিল সবুজপত্রের বড় পুঁজি। সাহিত্যে চলিত রীতি প্রবর্তন-প্রয়াস সবুজপত্রের মাধ্যমেই প্রথম হয়েছিল এমন নয়। তার পূর্বের ইতিহাসও একেবারে ক্ষুদ্র নয়। গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগের প্রারম্ভেই প্রকাশিত মাসিক পত্রিকার (১৮৫৪) কথা অবশ্যই উল্লে¬খ করতে হয়। বিভিন্ন কারণ ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ চলতেই পারে কেন সেই উদ্যোগ সফল হল না। চিন্তা ও বোধগত অসম্পূর্ণতা-তো থাকতেই পারে। কিন্তু ভাবনাটিকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হবে। এর সঙ্গে পাঠক ও বুদ্ধিজীবী মহলের মানসিক প্রস্তুতির কথাও বিবেচনায় রাখা কর্তব্য। এরপর বিচ্ছিন্ন বিছিন্ন চেষ্টা কিংবা একক প্রয়াস বলাই হয়তো ভাল স্বামী বিবেকানন্দের রচনা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কিছু পত্র-জাতীয় সৃষ্টিকর্ম, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কিছু প্রয়াস বির্তক থাকা সত্ত্বেও এ-প্রসঙ্গে উলে¬খযোগ্য। এই চিন্তার প্রথম উদ্গাতার সম্মান যদি কাউকে দিতে হয় তবে তিনি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর হওয়াই যুক্তিসঙ্গতইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিত তাতে রক্ষিত হয়। কিন্তু কোনো আয়োজন ও চিন্তাই সেই কাজটি স¤পন্ন করতে পারেনি যার জন্য যুগ যুগ ধরে পাঠক তৃষ্ণার্ত ছিল নিজের অজান্তেই। ভারতচন্দ্রের পরে সার্ধশত বৎসরেরও অধিককাল অপেক্ষা করতে হয়েছিল১৯১৪ সনে সবুজপত্রের আবির্ভাব পর্যন্ত। সবুজপত্র হারিয়ে যায়নি ফুরিয়েও যায়নি তার কারণ এর ভেতরের অবিনাশী প্রণোদনার জন্য। এর সংহত ও পরিকল্পিত উদ্যোগ সর্বজনের প্রাণের খোরাক যোগাতে পেরেছিল। বাঙালি পাঠক নিজের রূপকে নিজের ভাষায় মূর্ত হতে দেখেছিল প্রথম এই পত্রিকার রচনাসমূহে। ফলে প্রচুর বিরোধিতার পরেও টিকে গিয়েছিল সবুজপত্র। এই সবুজপত্র টিকে গেল বা শতবর্ষ পরেও অবশ্য স্মরণীয় হয়ে রইল তা কি শুধু সাহিত্যে চলিত ভাষা প্রচলনের জন্যই। তা কিন্তু মনে হয় না। অবশ্যই চলিত ভাষা-চর্চা প্রধান কারণ, কিন্তু তার সঙ্গে আরও অনেক কারণও ছিল। আমাদের সাহিত্যে চলিত রীতির প্রয়োগ তখন হয়ে উঠেছিল সেই সময়ে অনিবার্য দাবিÑ সময়ের অন্তঃস্রোতে যেন সেই দাবি তৈরি হয়েছিল বহু যুগের বহু মানুষের সম্মিলিত আকাক্সক্ষার যোগফল হিসেবে। পক্ষ-বিপক্ষ ডামাডোলে তখন তা যত দৃশ্যমান ছিল শতবর্ষের এপার থেকে এখন তা আরো অনেক বেশি প্রয়োজনীয় ও অবশ্যম্ভাবী যে ছিল তা সহজ অনুমেয়। তাই সবুজপত্রের প্রধান অবদান হিসেবে মুখের ভাষার ব্যবহারই ইতিহাসে অক্ষয় স্বীকৃতি পেয়ে গেল।
এই মহৎ কীর্তির বাইরেও বাঙালি জীবনে সবুজপত্রের অবদান অনেক। ব্রাহ্মণ্যপ্রথার আধিপত্যে যে বর্ণ বিভাজন বাঙালি জীবনে অশনি সংকেত হয়ে দেখা দিয়েছিল তা কখনোই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি সত্যি কিন্তু তার কালোস্রোত ক্ষীণকায় হলেও বহমান ছিল সর্বদাই। বর্ণবিদ্বেষ সংক্রামিত হয়েছিল ভাষা-সংস্কৃতিতেও। এটি বৈদিক যুগের সময় থেকেই অন্তঃস্রোতের মত বহমান ছিল। কিন্তু সব সময়ই শেষ পর্যন্ত প্রাকৃতজনই মূলধারাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। বাংলা ভাষা তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ, একই সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতিও। সবুজপত্র তার ভাষাকে সর্বজন-বোধ্য করে সেই সত্যকেই প্রতিষ্ঠা দিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিচয় দিয়েছিল। এই অসাম্প্রদায়িকতা ছিল সবুজপত্রের মৌল শক্তি। শুধু ভাষা-নির্বাচন নয় লেখার বক্তব্যে, লেখক বাছাইতে সর্বত্রই এই প্রবণতা ছিল অটুট। নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে এই পত্রিকার লেখক ছিলেন। এখানে লিখেছেন শ্রীসরলা দেবী, প্রিয়ম্বদা দেবী, সোনামাখা দেবী, অনিন্দিতা দেবী, শ্রীইন্দিরা দেবীÑ বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে নারী স্বাধীনভাবে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করছে সবুজপত্রের মত পত্রিকায় তৎকালের প্রথম সারির লেখকদের পাশাপাশি, একই সঙ্গে লিখছেন ওয়াজেদ আলি, তারিকুল আলম প্রমুখ। সময়ের বিবেচনায় এই উদারতা নিঃসন্দেহে সাহসী পদক্ষেপ। বঙ্গভঙ্গ এবং বঙ্গভঙ্গ রদের মধ্য দিয়ে বাঙালি জীবনে যে পরিবর্তনের হওয়া বইছিল সবুজপত্র যেন সেই চেতনারই বাহক হয়ে উঠেছিল।
সবুজপত্রকে কেন্দ্র করে যে লেখক গোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল এবং যাঁদের কেন্দ্র করে বসত ‘সবুজ সভা’ তাঁরা সবাই জ্ঞান-বিদ্যা-পাণ্ডিত্যে বিশেষ করে মননশীলতায় ছিলেন অসাধারণ। তাঁদের মননচর্চায় নতুন পথ নির্দেশ করেছিল সবুজপত্র। সাহস করে এ-কথাটিও বলা চলে পরবর্তী সময়ে বাঙালির জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতি, গবেষণা-সৃষ্টিশীলতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে এঁরাই দীর্ঘ সময় পরিস্রুত মানসিকতার লালন করেছেন এবং নেতৃত্বের পুরোভাগে ছিলেন। স্ব-স্ব যোগ্যতায় তাঁরা আলোকিত ছিলেন সত্য কিন্তু একত্র হওয়ার ফলে যে সংঘচেতনা জন্ম দিয়েছিল তা আমাদের সামগ্রিক জীবন-বিন্যাসের বাতিঘরে পরিণত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এঁদের অনেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে যশস্বী হয়েছিলেন। নতুন লেখক-গবেষক সৃষ্টির ক্ষেত্রেও সবুজপত্রের ভূমিকা অগ্রগণ্য। কোনো কোনো লেখক পাণ্ডিত্যে নমস্য ছিলেন সত্য কিন্তু লেখার বেলায় বড় অনীহা ছিল তাঁদের। তাঁরা খুব বেশি লেখেননি কিন্তু যেটুকু লিখেছেন তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে নব চেতনার ঔজ্জ্বল্যে।
হয়তো বলা যাবে না প্রথম, কিন্তু ধর্মের খোলস থেকে বেরিয়ে সংস্কারমুক্ত সর্বজনীন এবং শেকড়-সন্ধানী দৃষ্টি দিয়ে বাঙালি তথা ভারত-সংস্কৃতির রূপ-রূপান্তর অবলোকন সবুজপত্রের আরেকটি বড় কীর্তি। ইতিহাস-ধর্ম-রাষ্ট্র-দর্শন-শিক্ষা-সঙ্গীত-উৎসবসহ পারিবারিক জীবন অর্থাৎ বাঙালি জীবনের বহু প্রান্তস্পর্শী বিচার-বিবেচনা স্থান পেত সবুজপত্রে। শুধু সমালোচনা নয়, থাকত দিক্নির্দেশনাও। বয়সে তুলনামূলকভাবে প্রাজ্ঞ না হলেও চিন্তার অগ্রগামিতায় ও প্রাগ্রসর ভাবনায় সবুজপত্রের সৈনিকরা তখন সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন অনেকটাই। তাই বিরুদ্ধ সমালোচনা সবুজপত্রের কপালে কম জোটেনি। কিন্তু নতুনের আবাহনে পিছ-পা হননি তাঁরা। সমকালে সমালোচিত হলেও শতবর্ষ পরের বাঙালি হিসেবে বুঝতে সমস্যা হয় না তাঁদের চিন্তার মৌলিকতা এবং দূরদৃষ্টির প্রখরতা তখন কতটা প্রয়োজনীয় ছিল। তবে বার/তের বছরের সব সংখ্যায়ই সব রচনা থাকত তা অবশ্যই না। কখনো কখনো একটি লেখা নিয়েই প্রকাশিত হয়েছে একটি সংখ্যাতারপরও থেমে থাকেনি সবুজপত্র।
রবীন্দ্রনাথই যেহেতু সবুজপত্রের প্রধান লেখক, যদিও শুধু সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করলে তাঁকে খর্ব করে দেখা হয়, তাই বুঝতে অসুবিধা হয় না সবুজপত্রের অনেকটা অংশ জুড়ে থাকত সাহিত্য। সাহিত্যের নানা দিকসৃষ্টিশীল সাহিত্যতো ছিলই সে-সঙ্গে ছিল সমালোচনা, গবেষণা ইত্যাদি। সাহিত্যকর্মের বিচিত্রমুখি ব্যবচ্ছেদ চলতো নানা জনের। এ-ক্ষেত্রে তিনটি প্রসঙ্গ গুরুত্ব দিয়ে বলা যায় : ক. সাহিত্যতত্ত্ব ও সৌন্দর্যতত্ত্ব বিষয়ক প্রবন্ধশুধু সৃষ্টি করা নয়, সৃষ্টির যথার্থ মান বিচারের মাপকাঠি তৈরির আকাক্সক্ষাও অভিব্যক্ত হয় এই সব লেখায়; ভারতীয় অলঙ্কার শাস্ত্রের প্রতিও গভীর অভিনিবেশ ছিল সবুজপত্রের লেখকদের; খ. তুলনামূলক সাহিত্য বিচার-পদ্ধতি বঙ্কিমচন্দ্রের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে শুরু হলেও সবুজপত্রে পাতায়ও তা গুরুত্বের সঙ্গে সন্নিবেশিত হয়েছে। এ-কথা সবারই জানা তুলনামূলক পদ্ধতিতে সাহিত্য বিচারের ক্ষেত্রে প্রমথ চৌধুরী অবদান তাৎপর্যপূর্ণ; গ. অনুবাদমধ্যযুগ থেকেই আমাদের সাহিত্যে বিচিত্র ভাষা থেকে অনুবাদ শুরু হয়। পরিশীলিত ও পরিমার্জিত অনুবাদেও সবুজপত্রের কৃতিত্ব অনস্বীকার্য।
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে নারী-বিষয়ক চিন্তাতেও সবুজপত্রের প্রাতিস্বিকতা নিঃসন্দেহে স্মরণযোগ্য। নারী-সম্পর্কে ভারতবর্ষীয় বিশ্বাসের বাইরে গিয়ে নারীর আত্মিক মুক্তির প্রসঙ্গ জোর দিয়ে প্রচার করেছিলে পত্রিকাটি। আগেই দেখেছি যে, নারী লেখকদের লেখা প্রায়শই ছাপা হয়েছে এই পত্রিকায়। অবস্থানগত কারণে, নিজস্ব পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রভাব ও সাগ্রহে অর্জিত শিক্ষা-দীক্ষার কথা বিবেচনা করে ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণির কথা বাদ দিলেও আরো বেশ কয়েকজন নারী লেখকের লেখা ছাপা হয়েছিল বিভিন্ন সংখ্যায়। শুধু নারী লেখকবৃন্দই নন পুরুষ লেখকরা নারীর পক্ষ হয়ে তাঁদের শৃঙ্খলমুক্তির প্রয়াস চালিয়ে ছিলেন। পুরুষ-লেখক নারীর ছদ্মনামে সমাজে নারীদের প্রকৃত অবস্থা চিত্রণেরও চেষ্টা করেছেন। ‘গৃহ-লক্ষ্মী’র মধুর সম্বোধনের কারণে এক ধরনের মায়ার জালে আবদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে পুরুষের পাশাপাশি বিশ্বের বিচিত্র কর্মযজ্ঞে অংশগ্রহণের আহ্বান ছিল নারী-বিষয়ক বিভিন্ন প্রবন্ধে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত গল্প ‘স্ত্রীর পত্র’ও প্রকাশিত হয় সবুজপত্রে। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই নারী-ভাবনা সত্যিই বিস্ময়কর।
সবুজপত্রের বড় বিশেষত্ব হচ্ছে এর সময়-সমাজ সচেতনতা। সময় ও রাজনীতি তখন নানা যৌক্তিক কারণেই ছিল পরিবর্তমান। ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি তখন আমাদের সংস্কৃতির ওপর আছড়ে পড়ার চেষ্টা করছে আর বিপরীত দিকে বিভিন্নভাবে উপনিবেশ-বিরোধী মানসিকতা তৈরি হচ্ছে ভারতবাসীর মনে। রাজনৈতিক অঙ্গনে তখন তার প্রভাব গভীরতর হচ্ছে। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গের গ্রহণ-বর্জন নিয়ে চলছে দোদুল্যমানতা। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তখন সুনির্দিষ্ট এজেন্ডার দিকে একাগ্র হচ্ছে। এই অবস্থার আঁচ থেকে দূরে ছিল না সবুজপত্র। সবুজপত্র গা ভাসায়নি তথাকথিত আধুনিকতার জোয়ারে আবার কট্টর পন্থা অবলম্বন করে দ্বার রুদ্ধও করে দেয়নি। তার দৃষ্টি ছিল ভারতবর্ষের দিকে। যা কিছু ভারতবাসীর জন্য ছিল সর্দ্থক তাকেই গ্রহণ করেছে সবুজপত্র; তার পক্ষেই ছিল পত্রিকাটির অবস্থান। সবুজপত্রের অন্তর্গত প্রণোদনাই ছিল তা। তার জন্য যদি কোনো বিশ্বাস ভাঙতে হয় সবুজপত্র তাতেও ভীত হয়নি। যাকে সত্য বলে জেনেছে সবুজপত্র তা জোরের সঙ্গে প্রকাশ করেছে। আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সমাজ-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সাজুয্যপূর্ণ ও ক্রমোন্নয়নে সহায়ক যে-কোনো কিছু গ্রহণের ব্যাপারে সবুজপত্রের উদারতা ছিল অসাধারণ।
এমনিভাবে আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি-ভাষা-ঐতিহ্যকে নানা দিক দিয়ে নবতর চৈতন্যের আলোকে সমৃদ্ধ করেছিল সবুজপত্র। এই পত্রিকার প্রাণপুরুষ ছিলেন প্রমথ চৌধুরী আর এর চালিকাশক্তি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই দুইজনের সঙ্গে ছিলেন আরো কয়েকজন যাঁদের চিন্তার উৎকর্ষে ভারতের ভাবজগতে নবতরঙ্গের সঞ্চার হয়েছিল। সবুজপত্র আসলে আমাদের সংস্কৃতির মূল প্রবাহকে স্পর্শ করতে পেরেছিল এবং এই প্রবাহে নতুন চিন্তা-চেতনার জলসিঞ্চন করে তাকে বেগবান করেছিল। শতবর্ষ আগের সেই মহৎ কীর্তি যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকেও কখনো ম্ল¬ান হয়নি। শতবর্ষ পরের বাংলা ভাষা-সাহিত্য ও বাঙালির সংস্কৃতি আজও তা ধারণ করে রয়েছে প্রাণবান।

সবুজপত্রর প্রথমত্ব, প্রমথত্ব ।। মাসুদ রহমান
প্রমথ চৌধুরীর (১৮৬৮-১৯৪৬) নামের প্রথমাংশ উচ্চারণে যে ধ্বনিবিপর্যয় (metathesis) ঘটে যায় তার একটি কাব্যিক স্বীকৃতিও রয়েছে। ‘তুমি : বিশ বছর আগে ও পরে’ নামীয় রফিক আজাদের সুখ্যাত প্রেমের কবিতার শুরুতে উত্তম পুরুষ (উত্তম প্রেমিক নয়, কারণ প্রেমের কথাটি কোনোদিনই সে বলে নি ভালবাসার জনকে) আত্মকথনে জানাচ্ছে কৈশোরকালের কথা : ‘তুমি যেসব ভুল করতে সেগুলো খুবই মারাত্মক ছিলো। তোমার/ কথায় ছিলো গেঁয়ো টান, অনেকগুলো শব্দের করতে ভুল উচ্চারণ:/ ‘প্রমথ চৌধুরী’কে তুমি বলতে ‘প্রথম চৌধুরী’।’ তবে সত্যিই প্রমথ চৌধুরী বাংলা ভাষাসাহিত্যের নানা প্রসঙ্গে প্রথম ব্যক্তিত্ব। যেমন, চলিতরীতির প্রবর্তনা, বাংলায় ফরাসি সাহিত্যের রূপভাবের প্রচলন প্রচেষ্টা, ‘শিল্প জীবনের জন্য বা মানুষের জন্য’Ñএই মতবাদের পরিবর্তে ‘শিল্প মানুষের জন্য’ এমন তত্ত্বের প্রচারণা ইত্যাদি। শেষোক্ত কারণে তাঁর পিতৃদত্ত প্রমথ নামটিও সার্থক; শিবপারিষদের ন্যায় আনন্দ-স্ফূর্তিই ছিল তাঁর শিল্পভাবনার ভিত্তি ও সৌধ। এসবেরই সর্বাত্মক সাক্ষ্য দেয় তাঁর মানসপুত্র সবুজপত্র। রচনাবলিতে শিল্পীব্যক্তিত্ব প্রমথ চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় ঘটে। সবুজপত্র প্রমথ চৌধুরী নামক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে আমাদের প্রবেশাধিকার দেয়। আমরা আজ সবুজপত্রের পাতা ওল্টাতেই বসেছি।
মুখের কথাকে সাহিত্যে ব্যবহার করা কোনো দেশেই সহজভাবে ঘটে নি। নীরেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী এই সবুজপত্রেই সংবাদ দিয়েছিলেন যে, সভ্যতার অন্যতম সূতিকাগার গ্রিসেও উনিশ শতকের শেষে মৌখিক ভাষায় ভ্রমণকাহিনি লিখে চংরপযধৎর নামে একজন রক্ষণশীলদের ক্ষিপ্ত করে তোলেন। তবে সেই ভাষাভঙ্গিতে উৎসাহী হয়ে একজন তো বাইবেলের অনুবাদও করে ফেলেন। আর তাতে দাঙ্গা বেঁধে যায়, একজন নিহতও হয়। বাংলাদেশে উনিশ শতকের প্রথমার্ধের শেষদিকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সহজ-বোধগম্য শব্দ প্রয়োগের কারণে ভট্টাচায্যিদের দুয়োধ্বনি শুনেছিলেন। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে কথ্যশব্দ ব্যবহারের জন্যে প্যারীচাঁদ মিত্রকেও বিরূপ সমালোচনা সইতে হয়। সেই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী অর্থাৎ বিংশ শতাব্দিতেও প্রমথ চৌধুরীকে চলিত ভাষারীতি প্রচলনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখে পড়তে হয়। তবে প্রমথের পথচলা ছিল অনেকটা সুসংহত ও কিছূটা দলগত। তাঁর শুধু একটি পত্রিকাই ছিল না, শক্তিশালী সাহিত্যিক গোষ্ঠিও তৈরি করে নিয়েছিলেন। সামাজিকভাবে এঁরা বেশ প্রভাবশালীই ছিলেন। উকিল-ব্যারিস্টার-রাজনীতিক তো বটেই, ভাষাবিদ অধ্যাপক থেকে খাঁটি বিজ্ঞানীও ছিলেন সবুজপত্রীদের মধ্যে। আর সবচেয়ে বড়ো প্রভাবশালী হিসেবে তো ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তবে রবীন্দ্রনাথ আগে কিছু পত্র-ভ্রমণসাহিত্যে চলিত রীতির ব্যবহার করলেও এবং তার তাগিদ অনুভব করলেও ঠিক সাহস করে উঠতে পারছিলেন না, সবুজপত্র যখন ‘আসরে অবতীর্ণ’ হয় তখনই তিনি এব্যাপারে সম্পূর্ণ নির্ভার হন। সবুজপত্র পর্ব থেকে রবীন্দ্রনাথ চলিতরীতিকে স্থায়ীভাবে অবলম্বন করেন এবং আর চলিতভাষারীতি এক মান্যতা পায়। এখানে বলা ভাল, সবুজপত্রের সব লেখাই কিন্তু চলিতরীতিতে ছিল না। স্বয়ং প্রমথ চৌধুরীর সাধুভাষায় রচিত ‘জয়দেব’ প্রবন্ধটি মুদ্রিত হতে দেখা যাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথসহ আরো কারো কারো সাধুরীতির গদ্য ছাপা হয়েছে। বস্তুত আর্টের প্রশ্নটিই প্রমথের কাছে প্রধান ছিল। তবে ভাষাসাহিত্যের ইতিহাসে চলিতরীতির প্রবর্তনাই সবুজ-পত্রের প্রথম অবদান হিসেবে স্বীকৃত। অবশ্য প্রমথ চৌধুরী নিজেও মেনে নিয়েছেন পত্রিকাটি একেবারে মৌখিক ভাষার নিকটস্থ রীতি চালু করতে পারে নি। তবে সেটি যেমন পরোপুরি সম্ভব নাÑতাহলে তো আর আর্ট থাকে না, তেমনি যতটুকু সম্ভব তা-ও একযুগে ঘটে না। থাকতে হয় ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। সবুজপত্র চলিত রীতি প্রবর্তনে পথিকৃৎ, এটিও একটি পত্রিকার জন্যে কম গৌরবের কথা নয়।
যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যেত না, তারই উপনিবেশ ছিল বাংলা-ভারত। স্বভাবতই শাসকের শিল্প-সংস্কৃতিকেই অনুকরণ-অনুসরণ করেছে শাসিতসমাজ। কিন্তু আর সব সভ্যতাসমৃদ্ধ দেশের কী অবস্থা। প্রাবাদিক উক্তি ছিল: একজন শিক্ষিত মানুষের দুটি দেশএকটি তার জন্মভূমি অপরটি ফ্রান্স। সেকালে ফ্রান্সের সাথে অপরাপর ইউরোপীয় দেশের কিংবা আমেরিকার সামাজিক জীবনের পার্থক্য প্রভূত ছিল না, কিন্তু ফ্রান্স শিল্প ভাবনা ও চর্চায় কয়েক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিল। নানা নিরীক্ষা ও মতবাদের মধ্য দিয়ে কঠিন বাস্তবতা যেরূপ শৈল্পিক আবরণে উপস্থাপিত হচ্ছিল ফরাসি সাহিত্যে, ‘ক্লেদজ কুসুম’ বদলেয়ারের এই কাব্যনাম হতে পারে তার শিরোনাম। পাঁড় পাঠক প্রমথ ফরাসি শিল্পসাহিত্য সম্পর্কে আগেভাগেই জেনেছিলেন, প্রণয়িণী-পরিণীতা ইন্দিরা দেবীও তাঁর ফরাসীচর্চায় সহায়ক হয়েছিলেন। প্রসঙ্গত, প্রমথ চৌধুরীর প্রথম মুদ্রিত রচনাই ছিল ফরাসি গল্পের অনুবাদ। প্রস্পার মেরিমের ‘ফুলদানি’ নামক গল্পটি বেরিয়েছিল ‘সাহিত্য’ পত্রিকায়। রবীন্দ্রনাথ ‘সাহিত্যে’র ঐ সংখ্যাটি সমালোচনা করতে যেয়ে ‘ফুলদানি’ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘ …এই গল্পটি সুন্দর কিন্তু ইহা বাঙ্গালা অনুবাদের যোগ্য নহে।…সামাজিক প্রথার পার্থক্যহেতু মূল ঘটনাটি আমাদের কাছে সম্পূর্ণ মন্দই বোধ হইতে পারে।’ প্রমথের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় ‘আত্মকথায়’ : ‘…এ জাতীয় গল্প যে বঙ্গসাহিত্যে চলতে পারে না, সে কথা মানি নি। …তারপরেই আমি প্রস্পার মেরিমের ‘কার্মেন’ তর্জ্জমা করি। কিন্তু সেটি শেষ করতে পারি নি বলে প্রকাশ করি নি। কার্মেন অনুবাদের কারণ, তার বিষয়বস্তু ‘ফুলদানি’র চেয়ে ঢের বেশি অসামাজিক।’
প্রমথ চৌধুরী অবশ্য সবুজপত্র প্রকাশনাকালে অনুবাদের বদলে মৌলিক গল্প রচনায় মনোযোগী হন। ‘চার-ইয়ারি গল্পে’র সবকটিই অবশ্য পাশ্চাত্যকে পটভূমি করেছে, সে চারজনের কাহিনি সেকালের পক্ষে অসামাজিক কিনা সে প্রশ্নের চেয়ে গুরু তথ্য হলো ঘটনাচতুষ্টয় অভিনব-অভাবনীয় ছিল। ওদিকে রবীন্দ্রনাথ সবুজপত্রে ধারাবাহিকভাবে লিখলেন ‘চতুরঙ্গ’: এ উপন্যাসে এক প্রধান চরিত্র নাস্তিক, একজন বিয়ে করতে যায় গর্ভবতী নারীকে, আবার একজন বিধবা মিলনের আশায় অন্ধকার রাত্রে পুরুষের ঘরে প্রবেশ করে। ‘চতুরঙ্গ’ সাধুভাষায় লিখিত হলেও সবুজপত্রে পরবর্তীকালে প্রকাশিত রবীন্দ্রউপন্যাস ‘ঘরে-বাইরে’ চলিত রীতিতে রচিতসেটির অনুষঙ্গ পরকীয়া প্রেম। এসব প্রসঙ্গ ও বিবরণ ‘প্রবাসী’ পত্রিকার পক্ষে আপত্তিকর হতো বলে মনে করেন অন্নদাশঙ্কর রায়। আর রবীন্দ্রনাথের স্বীকারোক্তি : ‘প্রমথনাথ এই পত্রকে যে একটি বিশিষ্টতা দিয়েছিলেন তাতে আমার তখনকার রচনাগুলি সাহিত্য-সাধনার একটি নূতন পথে প্রবেশ করতে পেরেছিল। প্রচলিত অন্য কোনো পরিপ্রেক্ষণীর মধ্যে তা সম্ভবপর হতে পারত না। সবুজ-পত্রে সাহিত্যের এই একটি নূতন ভূমিকা রচনা প্রমথের প্রধান কৃতিত্ব। আমি তাঁর কাছে ঋণস্বীকার করতে কখনও কুণ্ঠিত হই নি।’
প্রমথ চৌধুরী ফরাসি গল্প আর অনুবাদ না করলেও সবুজপত্রে লিখেছেন ‘ফরাসী সাহিত্যের বর্ণপরিচয়’ (জ্যৈষ্ঠ ১৩২৩; পূর্বে রামমোহন লাইব্রেরিতে পঠিত)। তাঁর ও অন্য সবুজপত্রীদের লেখায় ফ্রেঞ্চঅনুরাগ প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি রবীন্দ্রনাথের সম্মান রক্ষার্থেও ফরাসিজাতির সাহায্য নিয়েছেন। সেসময় ‘সাহিত্য’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘নারায়ণ’ প্রভৃতি পত্রিকা নিয়মিতভাবে রবীন্দ্রনাথের প্রতি বিষোদ্গার করতো। রবীন্দ্রনাথের পক্ষে বিশেষভাবে দাঁড়িয়েছিল ‘প্রবাসী’, ‘ভারতী’ আর এই ‘সবুজ-পত্র’। পত্রিকার প্রকাশনাই তো রবীন্দ্রনাথকে যথোচিত মর্যাদায় তুলে ধরার জন্যে। নোবেলপ্রাপ্তির পর যখন রবীন্দ্রবিদূষকরা একজোট হয়, তখন রবীন্দ্রজন্মমাসে সবুজপত্রের যাত্রারম্ভ। তো যে ফরাসি সাহায্যের কথা বললাম তা হলো, ১৩২৪ এর আশ্বিন-কার্তিক সংখ্যায় ফরাসী মনীষী-সাহিত্যিক মেটারলিংক ও রোমাঁ রোলাঁর চিঠি মুদ্রণ। চিঠিদুটোতে সপ্রশংস রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ছিল।
প্রমথ চৌধুরীর ফরাসিপ্রীতি ও ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ মতের পরিপোষণা পরস্পর পরিপূরক। তথ্যের আকর, তত্ত্বের প্রচার, কিংবা শিক্ষার বাহন না হয়ে কীভাবে শিল্পকে শুধুই আর্ট বা শিল্প  হতে হয় তার নমুনা-নিদর্শন হিসেবে প্রমথ চৌধুরী ও তাঁর পত্রিকার সৃজনীসাহিত্যসম্ভার পাঠ করা যায়। কিন্তু প্রবন্ধরাজি কি সর্বাংশে তাই। প্রমথ চৌধুরী নিজে যে লিখেছেন ‘আমাদের শিক্ষা’, ‘বাঙ্গলার ভবিষ্যৎ’, সেগুলোকে কি আর্ট হিসেবে ধরবো না? কিংবা ‘বার্ণাড শ’ সনেটে যে বললেন, ‘এ জাতে শেখাতে পারি জীবনের মর্ম/ হাতে যদি পাই আমি তোমার চাবুক।’সেকি এক ধরনের উদ্দেশ্যমূলকতা নয়?
প্রমথ চৌধুরী যে জাতিকে জীবনের মর্ম বোঝাতে চেয়েছিলেন, সেই জাতির প্রশ্নে তিনি কিন্তু সেকালের অনেকের মতো বিখণ্ডিত চেতনা ধারণ করতেন না। তাই নিজে লিখেছেন, ‘ভারতবর্ষের ঐক্য’, ‘মোসলেম ভারত’। ছাপিয়েছেন, আবুল ফজলের পত্র, জাহাঙ্গীর বকিলের কবিতা। শিল্পী-সাহিত্যিকের ক্ষেত্রে ধর্ম পরিচয় বিবেচ্য কিনা তা তর্কের বিষয়, তবে সমাজ-ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে এই পরিমাপকটি ধরতে হচ্ছে। জাত্যভিমানী-আত্মমগ্ন মুসলমানরা দীর্ঘদিন আধুনিক শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতি বিমুখ-বিরূপ ছিল। অনেক বাঙালি মুসলমান যেমন বাংলা লিখতে অনিচ্ছুক ছিল, তেমনি অনেক হিন্দু বিশ্বাস করতো মুসলমানরা বাংলা লিখতে অপারগ। গদ্যে মীর মশাররফ হোসেন ও কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম এই ধারা ও ধারণার পরিবর্তন ঘটান। সবুজপত্র নতুন পথসৃষ্টিকারী ও নব পথিকের আশ্রয়স্থলও ছিল। সেকালের বিবেচনায় বাঙালি মুসলমানের বেশকিছু লেখা সবুজপত্রে স্থান পেয়েছিল। বাঙালি মুসলিম প্রবন্ধকারের মধ্যে ছিলেন, তরিকুল আলম, ওয়াজেদ আলী। কেউ বা নজরুল প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইবেন। করাচি থেকে নজরুল পারসিক কবি হাফিজের একটি রুবাইয়ের অনুবাদ ‘আশায়’ শিরোনামে পাঠিয়েছিলেন সবুজপত্রে। প্রমথ চৌধুরী সে লেখা মনোনীত করেন নি। পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় কবিতাটি নিজ উদ্যোগে ‘প্রবাসী’তে পাঠান ও সেখানে সেটি ছাপা হয়। নজরুলের লেখা ছাপা না হওয়া বা সবুজপত্রের মনোনয়ন দেওয়া না দেওয়ার মধ্যে লেখক বা পত্রিকা কারো সম্পর্কেই কোনো নেতিধর্মি সিদ্ধান্তে আসা উচিত হবে না, কারণ ওদুটোর মধ্যে এমন ঘটনা-দুর্ঘটনা হামেশাই ঘটে থাকে। পবিত্র গাঙ্গুলীকে এ প্রসঙ্গে চিঠিতে নজরুল যে মন্তব্য করেছিলেন সেটিই প্রণিধানযোগ্য‘‘প্রবাসী’তে বেরিয়েছে সবুজপত্রে পাঠানো কবিতা, এতে কবিতার মর্যাদা বেড়েছে কি কমেছে, তা আমি ভাবতে পারছি না। সবুজপত্র-এর নিজস্ব আভিজাত্য থাকলেও ‘প্রবাসী’র মর্যাদা একটুকুও কম নয়। প্রচার আরও বেশী।’
হ্যাঁ, সবুজপত্রের প্রচার সীমিত ছিল, কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল। মুদ্রণপ্রমাদ ছিল অত্যধিক। প্রচ্ছদের তালপাতাটি নন্দলাল বসুর আঁকা বটে, কিন্তু সেই একই চিত্র, প্রায় একইরকমের সবুজ রঙে প্রতি সংখ্যার প্রচ্ছদ একঘেয়ে এবং সেই কারণে আটপৌরে পর্যায়ে পেীঁছেছিল। বের হতো অত্যন্ত অনিয়মিতভাবে। লেখক সংখ্যাও ছিল অত্যল্প। শেষোক্ত সমস্যা হয়তো স্বাভাবিক, পত্রটির যে আদর্শ ও মান তার জন্যে বেশি বেশি লেখক পাওয়ার আশা বৃথা। ওদিকে সবুজপত্রী বলতে আমরা যাঁদেরকে জানি, তাঁরা বেশিরভাগই ব্যস্ত মানুষ, পত্রিকা প্রকাশনার দেখভাল পরের কথা নিয়মিত লেখাও তাঁদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। কাজেই সম্পাদক প্রমথ ও পৃষ্ঠপোষক রবীন্দ্রনাথকে এর পাতা ভরাতে হতো। কিছু সংখ্যায় শুধু এদুজনেরই লেখা মুদ্রিত হয়েছে। এমনকি সম্পাদকীয় ছাড়া সব লেখাই রবীন্দ্রনাথের, এমন সংখ্যাও আছে। এ নিয়ে পত্রিকা সম্পাদনায় সম্পাদকের ভূমিকা প্রশ্নে বেশ রঙ্গরসিকতাও হয়েছে সেকালের সাহিত্যিক মহলে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও এবিষয়ে তাঁর অস্বস্তির কথা বলেছেন প্রমথ চৌধুরীকে।
সবুজপত্রের লেখকরাই যখন ধারাবাহিক ছিলেন না, তখন পত্রিকার উত্তরসূরির অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন জাগে ; সবুজপত্র কি অনুসরিত হয়েছে? অনেকেই ‘কল্লে¬াল’-এর কথা বলে থাকেন। ‘কল্লে¬ালে’র কুশীলব, তিরিশের পাঁচকবির কেউ কেউ প্রমথ চৌধুরীকেই সাহিত্যগুরু মেনেছেন। প্রমথ চৌধুরী এই গুরুত্ব লাভ করেছিলেন প্রচলকে পেরিয়ে একটা নতুন কিছু আনার আবাহন-গীত শোনানোর কারণে। সবুজপত্র তো নবীনের প্রতি স্বাগতপত্র। সবুজপাতা মানে ফুল ও ফলের সম্ভাবনার বার্তা। পাতার সঙ্গে ফুলের কিংবা ফুলের সঙ্গে ফলের রূপে ও গুণে মোটেও সমিল থাকে না, তবু পাতা-ফুল-ফল এক ধারাবাহিক কর্মযজ্ঞ। এই ধারাবাহিকতা যে অস্বীকার করবে সে অজ্ঞান কিংবা অবোধ। সেকালে শুধু ‘প্রবাসী’ নয় আরো কিছুু পত্রিকার প্রচার সবুজপত্রের তুলনায় অধিক ছিল, তাদের মর্যাদাও হয়তো কম ছিল না, তবে সবুজপত্র যে আভিজাত্যে অনন্য ছিল, সেকথা তো নজরুলই জানিয়ে গেছেন। আজ ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণে সবুজপত্রের অভিনবত্ব বেশি করে চোখে পড়ছে।

 

প্রমথ চৌধুরীর লেখা থেকে…

বঙ্গ সাহিত্যের নবযুগ

নানারূপ গদ্যপদ্য লেখবার এবং ছাপবার যতটা প্রবল ঝোঁক যত বেশি লোকের মধ্যে আজকাল এ দেশে দেখা যায়, তা পূর্বে কখনো দেখা যায় নি। এমন মাস যায় না, যাতে অন্তত একখানি মাসিক পত্রের না আবির্ভাব হয়। এবং সে-সকল মাসিক পত্রে সাহিত্যের সকলরকম মালমসলার কিছু-না-কিছু নমুনা থাকেই থাকে। সুতরাং এ কথা অস্বীকার করবার জো নেই যে, বঙ্গ সাহিত্যের একটি নতুন যুগের সূত্রপাত হয়েছে। এই নবযুগের শিশুসাহিত্য আঁতুড়েই মরবে কিংবা তার একশো বৎসর পরমায়ু হবে সে কথা বলতে আমি অপারগ। আমার এমন কোনো বিদ্যে নেই, যার জোরে আমি পরের কুষ্ঠি কাটতে পারি। আমরা সমুদ্রপার হতে যে-সকল বিদ্যার আমদানি করেছি, সামুদ্রিক বিদ্যা তার ভিতর পড়ে না। কিন্তু এই নবসাহিত্যের বিশেষ লক্ষণগুলির বিষয় যদি আমাদের স্পষ্ট ধারণা জন্মায়, তা হলে যুগধর্মানুযায়ী সাহিত্যরচনা আমাদের পক্ষে অনেকটা সহজ হয়ে আসবে। পূর্বোক্ত কারণে, নব্য লেখকরা তাঁদের লেখায় যে হাত দেখাচ্ছেন, সেই হাত দেখবার চেষ্টা করাটা একেবারে নিষ্ফল নাও হতে পারে।

প্রথমেই চোখে পড়ে যে, এই নবসাহিত্য রাজধর্ম ত্যাগ করে গণধর্ম অবলম্বন করছে। অতীতে অন্য দেশের ন্যায় এ দেশের সাহিত্যজগৎ যখন দু-চারজন লোকের দখলে ছিল, যখন লেখা দূরে থাক পড়বার অধিকারও সকলের ছিল না, তখন সাহিত্যরাজ্যে রাজা সামন্ত প্রভৃতি বিরাজ করতেন। এবং তাঁরা কাব্য দর্শন ও ইতিহাসের ক্ষেত্রে মন্দির অট্টালিকা স্তূপ স্তম্ভ গুহা প্রভৃতি আকারে বহু চিরস্থায়ী কীর্তি রেখে গেছেন। কিন্তু বর্তমান যুগে আমাদের দ্বারা কোনোরূপ প্রকাণ্ড কাণ্ড করে তোলা অসম্ভব এই জ্ঞানটুকু জন্মালে আমাদের কারো আর সাহিত্যে রাজা হাবার লোভ থাকবে না। এবং শব্দের কীর্তিস্তম্ভ পড়বার বৃথা চেষ্টায় আমরা দিন ও শরীর পাত করব না। এর জন্য আমাদের কোনোরূপ দুঃখ করাবার আবশ্যক নেই। বস্তুজগতের ন্যায় সাহিত্যজগতেরও প্রাচীন কীর্তিগুলি দূর থেকে দেখতে ভালো, কিন্তু নিত্যব্যবহার্য নয়।

দর্শনের কুতবমিনারে চড়লে আমাদের মাথা ঘোরে, কাব্যের তাজমহলে রাত্রিবাস করা চলে না, কেননা অত সৌন্দর্যের বুকে ঘুমিয়ে পড়া কঠিন। ধর্মের পর্বতগুহার অভ্যন্তরে খাড়া হয়ে দাঁড়ানো যায় না, আর হামাগুড়ি দিয়ে অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ালেই যে কোনো আমূল্য চিন্তামণি আমাদের হাতে ঠেকতে বাধ্য এ বিশ্বাসও আমাদের চলে গেছে। পুরাকালে মানুষে যা-কিছু গড়ে গেছে তার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে সমাজ হতে আলগা করা, দু-চারজনকে বহু লোক হতে বিচ্ছিন্ন করা। অপরপক্ষে নবযুগের ধর্ম হচ্ছে, মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলন করা, সমগ্র সমাজকে ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ করা; কাউকেও ছাড়া নয়, কাউকেও ছাড়তে দেওয়া নয়। এ পৃথিবীতে বৃহৎ না হলে যে কোনো জিনিস মহৎ হয় না, এরূপ ধারণা আমাদের নেই; সুতরাং প্রাচীন সাহিত্যের কীর্তির তুলনায় নবীন সাহিত্যের কীর্তিগুলি আকারে ছোটো হয়ে আসবে কিন্তু প্রকারে বেড়ে যাবে, আকাশ আক্রমণ না করে মাটির উপর অধিকার বিস্তার করবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে কাব্যদর্শনাদি আর গাছের মতো উঁচুর দিকে ঠেলে উঠবে না, ঘাসের মতো চারি দিকে চারিয়ে যাবে। এক কথায়, বহুশক্তিশালী স্বল্পসংখ্যক লেখকের দিন চলে গিয়ে স্বল্পশক্তিশালী বহুসংখ্যক লেখকের দিন আসছে। আমাদের মনোজগতে যে নবসূর্য উদয়োন্মূখ, তার সহস্র রশ্মি অবলম্বন করে অন্তত ষষ্টিসহস্র বালখিল্য লেখক এই ভূভারতে অবতীর্ণ হবেন। এরূপ হবার কারণও সুস্পষ্ট। আজকাল আমাদের ভাববার সময় নেই, ভাববার অবসর থাকলেও লেখবার যথেষ্ট সময় নেই, লেখবার অবসর থাকলেও লিখতে শেখবার অবসর নেই; অথচ আমাদের লিখতেই হবে, নচেৎ মাসিক পত্র চলে না। এ যুগের লেখকেরা যেহেতু গ্রন্থকার নন শুধু মাসিক পত্রের পৃষ্ঠপোষক, তখন তাঁদের ঘোড়ায় চড়ে লিখতে না হলেও ঘড়ির উপর লিখতে হয়; কেননা মাসিক পত্রের প্রধান কর্তব্য হচ্ছে, পয়লা বেরনো। কি যে বেরল তাতে বেশি কিছু আসে-যায় না। তা ছাড়া, আমাদের সকলকেই সকল বিষয়ে লিখতে হয়। নীতির জুতোসেলাই থেকে ধর্মের চণ্ডীপাঠ পর্যন্ত সকল ব্যাপারই আমাদের সমান অধিকারভুক্ত। আমাদের নবসাহিত্যে কোনোরূপ ‘শ্রমবিভাগ’ নেইতার কারণ, যে ক্ষেত্রে ‘শ্রম’ নামক মূল পদার্থেরই অভাব, সে স্থলে তার বিভাগ আর কি করে হতে পারে?

তাই আমাদের হাতে জন্মলাভ করে শুধু ছোটোগল্প, খণ্ডকাব্য, সরল বিজ্ঞান ও তরল দর্শন। দেশকালপাত্রের সমবায়ে সাহিত্য যে ক্ষুদ্রধর্মাবলম্বী হয়ে উঠেছে, তার জন্য আমার কোনো খেদ নেই। একালের রচনা ক্ষুদ্র বলে আমি দুঃখ করি নে, আমার দুঃখ যে তা যথেষ্ট ক্ষুদ্র নয়। একে স্বল্পায়তন, তার উপর লেখাটি যদি ফাঁপা হয় তা হলে সে জিনিসের আদর করা শক্ত, বাল্য গাল্যভরা হলেও চলে, কিন্তু আংটি নিরেট হওয়া চাই। লেখকরা এই সত্যটি মনে রাখলে গল্প স্বল্প হয়ে আসবে, শোক শ্লোকরূপ ধারণ করবে, বিজ্ঞান বামনরূপ ধারণ করেও ত্রিলোক অধিকার করে থাকবে, এবং দর্শন নখদর্পণে পরিণত হবে। যাঁরা মানসিক আরামের চর্চা না করে ব্যায়ামের চর্চা করেছেন, তাঁরা সকলেই জানেন যে, যে সাহিত্যে দম নেই তাতে অন্তত কস (মৎরঢ়) থাকা আবশ্যক।

বর্তমান ইউরোপের সম্যক্ পরিচয়ে এই জ্ঞান লাভ করা যায় যে, গণধর্মের প্রধান ঝোঁক হচ্ছে বৈশ্যধর্মের দিকে; এবং সেই ঝোঁকটি না সামলাতে পারলে সাহিত্যের পরিণাম অতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। আমাদের এই আত্মাসর্বস্ব দেশে লেখকেরা যে বৈশ্যবৃত্তি অবলম্বন করবেন না, এ কথাও জোর করে বলা চলে না। লক্ষ্মীলাভের আশায় সরস্বতীর কপট সেবা করতে যে অনেকে প্রস্তুত, তার প্রমাণ ‘ভ্যালু পেয়ব্ল্ পোস্ট’ নিত্য ঘরে ঘরে দিচ্ছে! আমাদের নবসাহিত্যের যেন-তেন-প্রকারেণ বিকিয়ে যাবার প্রবৃত্তিটি যদি দমন করতে না পারা যায়, তা হলে বঙ্গসরস্বতীকে যে পথে দাঁড়াতে হবে সে বিষয়ে তিলমাত্রও সন্দেহ নেই। কোনো শাস্ত্রই এ কথা বলে না যে, ‘বাণিজ্যে বসতে সরস্বতী’। সাহিত্যসমাজে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করার ইচ্ছে থাকলে দারিদ্র্র্যকে ভয় পেলে সে আশা সফল হবে না। সাহিত্যের বাজার-দর সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান যত বাড়বে সেইসঙ্গে তার মূল্য সম্বন্ধে জ্ঞান আমাদের লোপ পেয়ে আসবে। সুতরাং আমাদের নবসাহিত্যে লোভ নামক রিপূর অস্তিত্বের লক্ষণ আছে কি না সে বিষয়ে আমাদের দৃষ্টি থাকা আবশ্যক, কেননা শাস্ত্রে বলে লোভে পাপ পাপে মৃত্যু।

এ যুগের মাসিক পত্র সকল যে সচিত্র হয়ে উঠেছে, সেটি যেমন আনন্দের কথা তেমনি আশঙ্কারও কথা। ছবির প্রতি গণসমাজের যে একটি নাড়ির টান আছে, তার প্রচলিত প্রমান হচ্ছে মার্কিন সিগারেট। ঐ চিত্রের সাহচর্যেই যত অচল সিগারেট বাজারে চলে যাচ্ছে। এবং আমরা চিত্রমুগ্ধ হয়ে মহানন্দে তাম্রকুটজ্ঞানে খড়ের ধূম পান করছি। ছবি ফাউ দিয়ে মেকি মাল বাজারে কাটিয়ে দেওয়াটা আধুনিক ব্যবসার একটা প্রধান অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ দেশে শিশুপাঠ্য গ্রন্থাবলীতেই চিত্রের প্রথম আবির্ভাব। পুস্তিকায় এবং পত্রিকায় ছেলেভুলোনো ছবির বহুল প্রচারে চিত্রকলার যে কোনো উন্নতি হবে, সে বিষয়ে বিশেষ সন্দেহ আছেকেননা সমাজে গোলাম-পাশ করে দেওয়াতেই বণিক্-বুদ্ধির সার্থকতা; কিন্তু সাহিত্যের যে অবনতি হবে, সে বিষয়ে আর কোনো সন্দেহ নেই। নর্তকীর পশ্চাৎ পশ্চাৎ সারঙ্গীর মতো, চিত্রকলার পশ্চাৎ পশ্চাৎ কাব্যকলার অনুধাবন করাতে তার পদমর্যাদা বাড়ে না। একজন যা করে অপরে তার দোষগুণ বিচার করে, এই হচ্ছে সংসারের নিয়ম। সুতরাং ছবির পাশাপাশি তার সমালোচনাও সাহিত্যে দেখা দিতে বাধ্য। এই কারণেই, যেদিন থেকে বাংলাদেশে চিত্রকলা আবার নবকলেবর ধারণ করেছে তার পরদিন থেকেই তার অনুকূল এবং প্রতিকূল সমালোচনা শুরু হয়েছে। এবং এই মতদ্বৈত থেকে সাহিত্যসমাজে একটি দলাদলির সৃষ্টি হবার উপক্রম হয়েছে। এই তর্কযুদ্ধে আমার কোনো পক্ষ অবলম্বন করবার সাহস নেই। আমার বিশ্বাস, এ দেশে এ কালের শিক্ষিত লোকদের মধ্যে চিত্রবিদ্যায় বৈদগ্ধ্য এবং আলেখ্যব্যাখ্যানে নিপুণতা অতিশয় বিরল। কারণ এ যুগের বিদ্যার মন্দিরে সুন্দরের প্রবেশ নিষেধ। তবে বঙ্গদেশের নব্যচিত্র সম্বন্ধে সচরাচর যে-সকল আপত্তি উত্থাপন করা হয়ে থাকে, সেগুলি সংগত কি অসংগত তা বিচার করবার অধিকার সকলেরই আছে; কেননা সে-সকল আপত্তি কলাজ্ঞান নয়, সাধারণ জ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত। যতদূর আমি জানি, নব্য চিত্রকরদের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ এই যে, তাঁদের রচনায় বর্ণে বর্ণে বানান ভুল এবং রেখায় রেখায় ব্যাকরণ ভুল দৃষ্ট হয়। এ কথা সত্য কি মিথ্যা শুধু তাঁরাই বলতে পারেন, যাঁদের চিত্রকর্মের ভাষার উপর সম্পূর্ণ অধিকার জন্মেছে; কিন্তু সে ভাষায় সুপণ্ডিত ব্যক্তি বাংলাদেশের রাস্তাঘাটে দেখতে পাওয়া যায় না, যদিচ ও-সকল স্থানে সমালোচকের দর্শন পাওয়া দূর্লভ নয়। আসল কথা হচ্ছে এ শ্রেণীর চিত্রসমালোচকেরা অনুকরণ অর্থে ব্যাকরণ শব্দ ব্যবহার করেন। এদের মতে ইউরোপীয় চিত্রকরেরা প্রকৃতির অনুকরণ করেন, সুতরাং সেই অনুকরণের অনুকরণ করাটাই এ দেশের চিত্রশিল্পীদের কর্তব্য। প্রকৃতি নামক বিরাট পদার্থ এবং তার অংশভূত ইউরোপ নামক ভূভাগ, এ উভয়ের প্রতি আমার যথোচিত ভক্তিশ্রদ্ধা আছে, কিন্তু তাই বলে তার অনুকরণ করাটাই যে পরমপুরুষার্থ, এ কথা আমি কিছুতেই স্বীকার করতে পারি নে। প্রকৃতির বিকৃতি ঘটানো কিংবা তার প্রতিকৃতি গড়া কলাবিদ্যার কার্য নয়কিন্তু তাকে আকৃতি দেওয়াটাই হচ্ছে আর্টের ধর্ম। পুরুষের মন প্রকৃতি-নর্তকীর মুখ দেখবার আয়না নয়। আর্টের ক্রিয়া অনুকরণ নয়, সৃষ্টি। সুতরাং বাহ্যবস্তুর মাপজোখের সঙ্গে আমাদের মানস-জাত বস্তুর মাপজোখ যে হুবহু মিলে যেতেই হবে, এমন কোনো নিয়মে আর্টকে আবদ্ধ করার অর্থ হচ্ছে প্রতিভার চরণে শিক্লি পরানো। আর্টে অবশ্য যথেচ্ছাচারিতার কোনো অবসর নেই। শিল্পীরা কলাবিদ্যার অনন্যসামান্য কঠিন বিধিনিষেধ মানতে বাধ্য, কিন্তু জ্যামিতি কিংবা গণিতশাস্ত্রের শাসন নয়। একটি উদাহরণের সাহায্যে আমার পূর্বোক্ত মতের যথার্থ্যরে প্রমাণ অতি সহজেই দেওয়া যেতে পারে। একে একে যে দুই হয় এবং একের পিঠে এক দিলে যে এগারো হয়, বৈজ্ঞানিক হিসেবে এর চাইতে খাঁটি সত্য পৃথিবীতে আর কিছুই নেই। অথচ একে একে দুই না হয়েও এবং একের পিঠে একে এগারো না হয়েও ঐরূপ যোগাযোগে যে বিচিত্র নকশা হতে পারে, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ নীচে দেওয়া যাচ্ছে

সম্ভবত আমার প্রদর্শিত যুক্তির বিরুদ্ধে কেউ এ কথা বলতে পারেন যে, ‘চিত্রে আমারা গণিতশাস্ত্রের সত্য চাই নে, কিন্তু প্রত্যক্ষ জ্ঞানের সত্য দেখতে চাই।’ প্রত্যক্ষ সত্য নিয়ে মানুষে মানুষে মতভেদ এবং কলহ যে আবহমান কাল চলে আসছে তার কারণ অন্ধের হস্তীদর্শন ন্যায়ে নির্ণীত হয়েছে। প্রকৃতির যে অংশ এবং যে ভাবটির সঙ্গে যার চোখের এবং মনের যতটুকু সম্পর্ক আছে, তিনি সেই টুকুকেই সমগ্র সত্য বলে ভুল করেন। সত্যভ্রষ্ট হলে বিজ্ঞানও হয় না আর্টও হয় না। কিন্তু বিজ্ঞানের সত্য এক, আর্টের সত্য অপর। কোনো সুন্দরীর দৈর্ঘ্য প্রস্থ এবং ওজনও যেমন এক হিসাবে সত্য, তার সৌন্দর্যও তেমনি আর-এক হিসাবে সত্য। কিন্তু সৌন্দর্য নামক সত্যটি তেমন ধরাছোঁয়ার মতো পদার্থ নয় বলে সে সম্বন্ধে কোনোরূপ অকার্ট বৈজ্ঞানিক প্রমান দেওয়া যায় না। এই সত্যটি আমরা মনে রাখলে নব্য শিল্পীর কৃশাঙ্গী মানসীকন্যাদের ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে নেবার জন্য অত ব্যগ্র হতুম না এবং চিত্রের ঘোড়া ঠিক ঘোড়ার মতো নয়, এ আপত্তিও উত্থাপন করতুম না। এ কথা বলার অর্থতার অস্থিসংস্থান, পেশীর বন্ধন প্রভৃতি প্রকৃত ঘোড়ার অনুরুপ নয়। অ্যানাটমি অর্থাৎ অস্থিবিদ্যার সাহায্যে দেখানো যেতে পারে যে, চিত্রের ঘোটক গঠনে ঠিক আমাদের শকটবাহী ঘোটকের সহোদর নয় এবং উভয়কে একত্রে জুড়িতে জোতা যায় না। এ সম্বন্ধে আমার প্রথম বক্তব্য এই যে, অস্থিবিদ্যা কঙ্কালের জ্ঞানের উপর নির্ভর করে, প্রত্যক্ষ জ্ঞানের উপর নয়। কঙ্কালের সঙ্গে সাধারণ লোকের চাক্ষুষ পরিচয় নেই; কারণ দেহতাত্ত্বিকের জ্ঞাননেত্র যাই হোক, আমাদের চোখে প্রাণীজগৎ কঙ্কালসার নয়। সুতরাং দৃষ্টজগৎক অদৃষ্টের কষ্টিপাথরে কষে নেওয়াতে পাণ্ডিত্যের পরিচয় দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু রূপজ্ঞানের পরিচয় দেওয়া হয় না। দ্বিতীয় কথা এই যে, কি মানুষ কি পশু, জীবমাত্রেরই দেহযন্ত্রগঠনের একমাত্র কারণ হচ্ছে উক্ত যন্ত্রের সাহায্যে কতকগুলি ক্রিয়া সম্পাদন করা। গঠন যে ক্রিয়াসাপেক্ষ, এই হচ্ছে দেহবিজ্ঞানের মূল তত্ত্ব। ঘোড়ার দেহের বিশেষ গঠনের কারণ হচ্ছে ঘোড়া তুরঙ্গম। যে ঘোড়া দৌড়বে না তার অ্যানাটমি ঠিক জীবন্ত ঘোড়ার মতো হবার কোনো বৈধ কারণ নেই। পটস্থ ঘোড়া যে তটস্থ, এ বিষয়ে বোধ হয় কোনো মতভেদ নেই। চিত্রার্পিত অশ্বের অ্যানাটমি ঠিক চড়বার কিংবা হাঁকাবার ঘোড়ার অনুরূপ করাতেই বস্তুজ্ঞানের অভাবের পরিচয় দেওয়া হয়। চলৎশক্তিরহিত অশ্ব, অর্থাৎ যাকে চাবুক মারলে ছিঁড়বে কিন্তু নড়বে না এহেন ঘোটক, অর্থহীন অনুকরণের প্রসাদেই জীবন্ত ঘোটকের অবিকল আকার ধারণ করে চিত্রকর্মে জন্মলাভ করে। এই পঞ্চভূতাত্মক পরিদৃশ্যমান জগতের অন্তরে একটি মানসপ্রসূত দৃশ্যজগৎ সৃষ্টি করাই চিত্রকলার উদ্দেশ্য, সুতরাং এ উভয়ের রচনার নিয়মের বৈচিত্র্য থাকা অবশ্যম্ভাবী। তথাকথিত নব্যচিত্র যে নির্দোষ কিংবা নির্ভুল এমন কথা আমি বলি না। যে বিদ্যা কাল জন্মগ্রহণ করেছে, আজ যে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গসকল সম্পূর্ণ আত্মবশে আসবে, এরূপ আশা করাও বৃথা। শিল্প হিসাবে তার নানা ত্র“টি থাকা কিছুই আশ্চর্যের বিষয় নয়। কোথায় কলার নিয়মের ব্যভিচার ঘটছে, সমালোচকদের তাই দেখিয়ে দেওয়া কর্তব্য। অস্থি নয় বর্ণের সংস্থানে, পেশী নয় রেখার বন্ধনে, যেখানে অসংগতি এবং শিথিলতা দেখা যায়, সেই স্থলেই সমালোচনার সার্থকতা আছে। অব্যবসায়ীর অযথা নিন্দায় চিত্রশিল্পীদের মনে শুধু বিদ্রোহীভাবের উদ্রেক করে, এবং ফলে তাঁরা নিজেদের দোষগুলিকেই গুণভ্রমে বুকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চান।

আমার আলোচ্য বিষয় হচ্ছে সাহিত্য, চিত্র নয়। যেহেতু এ যুগের সাহিত্যে চিত্রসনাথ হয়ে উঠেছে, সেই কারণেই চিত্রকলার বিষয় উল্লেখ করতে বাধ্য হয়েছি। আমারও প্রসঙ্গ উত্থাপন করবার অপর একটি কারণ হচ্ছে এইটি দেখিয়ে দেওয়া যে, যা চিত্রকলায় দোষ বলে গণ্য তাই আবার আজকাল এ দেশে কাব্যকলায় গুণ বলে মান্য।

প্রকৃতির সহিত লেখকদের যদি কোনরূপ পরিচয় থাকত তা হলে শুধু বর্ণের সঙ্গে বর্ণের যোজনা করলেই যে বর্ণনা হয়, এ বিশ্বাস তাঁদের মনে জন্মাত না। এবং যে বস্তু কখনো তাঁদের চর্মচক্ষুর পথে উদয় হয় নি, তা অপরের মনশ্চক্ষুর সুমুখে খাড়া করে দেবার চেষ্টারূপ পণ্ডশ্রম তাঁরা করতেন না। সম্ভবত এ যুগের লেখকদের বিশ্বাস যে, ছবির বিষয় হচ্ছে দৃশ্যবস্তু আর লেখার বিষয় হচ্ছে অদৃশ্যমন। সুতরাং বাস্তবিকতা চিত্রকলায় অর্জনীয় এবং কাব্যকলায় বর্জনীয়। সাহিত্যে সেহাইকলমের কাজ করতে গিয়ে যাঁরা শুধু কলমের কালি ঝাড়েন, তাঁরাই কেবল নিজের মনকে প্রবোধ দেবার জন্য পূর্বোক্ত মিথ্যাটিকে সত্য বলে গ্রাহ্য করেন। ইন্দ্রিয়জ প্রত্যক্ষ জ্ঞানই হচ্ছে সকল জ্ঞানের মূল। বাহ্যজ্ঞানশূন্যতা অন্তর্দৃষ্টির পরিচায়ক নয়। দূরদৃষ্টি লাভ করার অর্থ চোখে চাল্শে-ধরা নয়। দেহের নবদ্বার বন্ধ করে দিলে মনের ঘর অলৌকিক আলোকে কিংবা পারলৌকিক অন্ধকারে পূর্ণ হয়ে উঠবে, বলা কঠিন। কিন্তু সর্বলোকবিদিত সহজ সত্য এই যে, যাঁর ইন্দ্রিয় সচেতন এবং সজাগ নয় কাব্যে কৃতিত্ব লাভ করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। জ্ঞানঞ্জনশলাকার অপপ্রয়োগে যাঁদের চক্ষু উন্মীলিত না হয়ে কানা হয়েছে, তাঁরাই কেবল এ সত্য মানতে নারাজ হবেন। প্রকৃতিদত্ত উপাদান নিয়েই মন বাক্যচিত্র রচনা করে। সেই উপাদান সংগ্রহ করবার, বাছাই করবার এবং ভাষায় সাকার করে তোলবার ক্ষমতার নামই কবিত্বশক্তি। বস্তুজ্ঞানের অটল ভিত্তির উপরেই কবি-কল্পনা প্রতিষ্ঠিত। মহাকবি ভাস বলেছেন যে, ‘সুনিবিষ্ট লোকের রূপ বিপর্যয়’ করা অন্ধকারের ধর্ম। সাহিত্যে ওরূপ করাতে প্রতিভার পরিচয় দেওয়া হয় না, কারণ প্রতিভার ধর্ম হচ্ছে প্রকাশ করা, অপ্রত্যক্ষকে প্রত্যক্ষ করাপ্রত্যক্ষকে অপ্রত্যক্ষ করা নয়। অলংকারশাস্ত্রে বলে অপ্রকৃত অতিপ্রকৃত এবং লৌকিক জ্ঞানবিরুদ্ধ বর্ণনা কাব্যে দোষ হিসেবে গণ্য। অবশ্য পৃথিবীতে যা সত্যই ঘটে থাকে তার যথাযথ বর্ণনাও সব সময়ে কাব্য নয়। আলংকারিকেরা উদাহরণস্বরূপ দেখান যে, ‘গৌঃ তৃণম্ অত্তি’ কথাটা সত্য হলেও ও কথা বলায় কাবিত্বশক্তির বিশেষ পরিচয় দেওয়া হয় না। তাই বলে ‘গোরুরা ফুলে ফুলে মধুপান করছে’ এরূপ কথা বলাতে কি বস্তুজ্ঞান কি রসজ্ঞান কোনোরূপ জ্ঞানের পরিচয় দেওয়া হয় না। এ স্থলে বলে রাখা আবশ্যক যে, নিজেদের সকলপ্রকার ত্র“টির জন্য আমাদের পূর্বপুরুষদের দায়ী করা বর্তমান ভারতবাসীদের একটা রোগের মধ্যে হয়ে পড়েছে। আমাদের বিশ্বাস, এ বিশ্ব নশ্বর এবং মায়াময় বলে আমাদের পূর্বপুরুষেরা বাহ্যজগতের কোনোরূপ খোঁজখবর রাখতেন না। কিন্তু এ কথা জোর করে বলা যেতে পারে যে, তাঁরা কস্মিন্কালেও অবিদ্যাকে পরাবিদ্যা বলে ভুল করেন নি, কিংবা একলম্ফে যে মনের পূর্বোক্ত প্রথম অবস্থা হতে দ্বিতীয় অবস্থায় উত্তীর্ণ হওয়া যায়, এরূপ মতও প্রকাশ করেন নি। বরং শাস্ত্র এই সত্যেরই পরিচয় দেয় যে, অপরাবিদ্যা সম্পূর্ণ আয়ত্ত না হলে কারো পক্ষে পরাবিদ্যা লাভের অধিকার জন্মায় না, কেননা বিরাটের জ্ঞানের ক্ষেত্রেই স্বরাটের জ্ঞান অঙ্কুরিত হয়। আসল কথা হচ্ছে, মানসিক আলস্যবশতই আমরা সাহিত্যে সত্যের ছাপ দিতে অসমর্থ। আমরা যে কথায় ছবি আঁকতে পারি নে, তার একমাত্র কারণ, আমাদের চোখ ফোটবার আগে মুখ ফোটে।

এক দিকে আমরা বাহ্যবস্তুর প্রতি যেমন বিরক্ত, অপর দিকে অহং-এর প্রতি ঠিক তেমনি অনুরক্ত। আমাদের বিশ্বাস যে, আমাদের মনে যে-সকল চিন্তা ও ভাবের উদয় হয় তা এতই অপূর্ব এবং মহার্য যে, স্বজাতিকে তার ভাগ না দিলে ভারতবর্ষের আর দৈন্য ঘুচবে না। তাই আমরা অহর্নিশ কাব্যে ভাবপ্রকাশ করতে প্রস্তুত। ঐ ভাবপ্রকাশের অদম্য প্রবৃত্তিটিই আমাদের সাহিত্যে সকল অনর্থের মূল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার মনোভাবের মূল্য আমার কাছে যতই বেশি হোক-না, অপরের কাছে তার যা-কিছু মূল্য, সে তার প্রকাশের ক্ষমতার উপর নির্ভর করে। অনেকখানি ভাব মরে একটুখানি ভাষায় পরিণত না হলে রসগ্রাহী লোকের নিকট তা মুখরোচক হয় না। এই ধারণাটি যদি আমাদের মনে স্থান পেত তা হলে আমরা সিকি পয়সার ভাবে আত্মহারা হয়ে কলার অমূল্য আত্মসংযম হতে ভ্রষ্ট হতুম না। মানুষমাত্রেরই মনে দিবারাত্র নানারূপ ভাবের উদয় এবং বিলয় হয়। এই অস্থির ভাবকে ভাষায় স্থির করার নামই হচ্ছে রচনাশক্তি। কাব্যের উদ্দেশ্য ভাব প্রকাশ করা নয়, ভাব উদ্রেক করা। কবি যদি নিজেকে বীণা হিসেবে না দেখে বাদক হিসেবে দেখেন, তাহলে পরের মনের উপর অধিপত্য লাভ করবার সম্ভাবনা তাঁর অনেক বেড়ে যায়। এবং যে মুহূর্ত থেকে কবিরা নিজেদের পরের মনোবীণার বাদক হিসেবে দেখতে শিখবেন, সেই মুহূর্ত থেকে তাঁরা বস্তুজ্ঞানের এবং কলার নিয়মের একান্ত শাসনাধীন হবার সার্থকতা বুঝতে পারবেন। তখন আর নিজের ভাববস্তুকে এমন দিব্যরতœ মনে করবেন না যে, সেটিকে আকার দেবার পরিশ্রম থেকে বিমুখ হবেন। অবলীলাক্রমে রচনা করা আর অবহেলাক্রমে রচনা করা যে এক জিনিস নয়, এ কথা গণধর্মাবলম্বীরা সহজে মানতে চান নাএই কারণেই এত কথা বলা। আমার শেষ বক্তব্য এই যে, ক্ষুদ্রত্বের মধ্যেও যে মহত্ত্ব আছে, আমাদের নিত্যপরিচিতি লৌকিক পদার্থের ভিতরেও যে অলৌকিকতা প্রচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে, তার উদ্ধারসাধন করতে হলে, অব্যক্তকে ব্যক্ত করতে হলে, সাধনার আবশ্যক; এবং সে সাধনার প্রক্রিয়া হচ্ছে দেহমনকে বাহ্যজগৎ এবং অন্তর্জগতের নিয়মাধীন করা। যাঁর চোখ নেই, তিনিই মনস্বিতালাভের জন্য অন্যমনস্কতার আশ্রয় গ্রহণ করেন। নব্য লেখকদের নিকট আমার বিনীত প্রার্থনা এই যে, তাঁরা যেন দেশী বিলাতি কোনোরূপ বুলির বশবর্তী না হয়ে নিজের অন্তর্নিহিত শক্তির পরিচয় লাভ করবার জন্য ব্রতী হন। তাতে পরের না হোক, অন্তত নিজের উপকার করা হবে।

 

সবুজপত্র ও প্রমথ চৌধুরী।।৭ চিন্তকের পর্যবেক্ষণ

বাংলা সাময়িকপত্রে সবুজপত্রর অবদান

মো. হারুন-অর-রশীদ

[অধ্যাপক ও সভাপতি ॥ বাংলা বিভাগ ॥ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়]

বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিহাসে সবুজপত্রের গুরুত্ব যুগান্তকারী, ঐতিহাসিক; অপরিসীম ও অবিস্মরণীয়। উনবিংশ শতাব্দীর খ্যাতিমান, সমাজ-রাজনৈতিক-সংস্কৃতিমূলক সাময়িক পত্রপত্রিকাগুলোর গতানুগতিক বিপরীত ধারায় সবুজপত্র স্বতন্ত্র ভূমিকায় সমুজ্জ্বল। সবুজপত্র ‘চলতি হাওয়ার পন্থী’ ছিল না; ছিল উজান ঠেলা উল্টো পথের পথিক। অনেক ক্ষেত্রেই আদর্শগত কারণে সমকালের পত্রপত্রিকাগুলোর সঙ্গে তর্ক-বিতর্কে মেতে উঠতে হত এবং তাতে ছিনিয়ে আনতে হত বিজয়। সঙ্গত কারণেই কালগত পশ্চাৎপরতা, অনাধুনিকতা, কুসংস্কার এবং মননগত অনগ্রসরতার বিরুদ্ধে সবুজপত্র জন্মলগ্ন থেকেই ছিল দ্রোহী একক ও অনন্য বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট। ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে/তবে একলা চলরে।’ রবীন্দ্রসঙ্গীতের এই কলির মত সড়ঃঃড় ছিল তার।

যে কোন গ্রন্থ বুঝতে হলে যেমন গ্রন্থাকারকে উপলব্ধি করা জরুরি, তেমনি পত্রপত্রিকার গুরুত্ব, তাৎপর্য মর্মার্থ ও সাহিহত্যজগতে তার অবদান অনুধাবন করার ক্ষেত্রে সম্পাদকের মেধা, মনন, রুচি, বৈদগ্ধ্য, পরিচর্যা, পরিশীলন, শিক্ষা-দীক্ষা, পঠন-পাঠন ও অধীত জ্ঞানের পরিমাপ করা অত্যাবর্শক।

সবুজপত্রের সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী ছিলেন আধুনিকমনষ্ক বহুভাষাবিদ, শ্রমঘন কর্মমগ্ন ও বিচিত্র অনুষঙ্গে নিবিড় অধ্যয়নশীল, বহুমুখী প্রজ্ঞাবান বিদগ্ধ ব্যক্তি। তাঁর বৈদগ্ধ্যের স্পর্শে এবং দাঢ্যব্যক্তিত্বের গুণে সবুজপত্র সেকালের সাময়িক পত্রিকাসমূহের পংক্তিতে একটি পরিশ্র“ত, পরিশুদ্ধ ও পরিশীলিত রুচিময় ধারা সৃষ্টির এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। সবুজপত্র ও প্রমথ চৌধুরী এক ও অভিন্ন সত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন এবং তাঁর সৈন্যপত্যে সবুজপত্র বাংলা ভাষা-সাহিত্য পরিচর্চার ক্ষেত্রে প্রভূত সমুন্নতি লাভ করেছিল।

সবুজপত্রের সবচেয়ে বড় অবদান সাধুভাষারীতির নিগড় থেকে মুক্ত করে চলিত ভাষারীতির কালজয়ী যাত্রা শুরু এবং সাহিত্য-সাধনায় নবনবীনের অভিষেক, আধুনিকতার জয়ধ্বনি; জড়তার বন্ধনমুক্তি এবং প্রাঞ্জল সাবলীল বর্ণনায় রচনাসমূহ সাহিত্যগুণান্বিত, রসময় বাগবৈদগ্ধ্যে প্রসাদগুণ সম্পন্ন হয়ে ওঠার সফলতা। তাঁর নিজের ভাষায়, ‘বাণীর বসতি রসনায়’।

সবুজপত্রের প্রথম সংখ্যার প্রকাশকাল ২৫ বৈশাখ, ১৩২১; ৭মে ১৯১৪। এ সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের ‘সবুজের অভিযান’ কবিতা, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘সবুজ পাতার গান’ কবিতা, সম্পাদকের মুখবন্ধ ও বীরবলের সবুজপত্র, রবীন্দ্রনাথের ‘বিবেচনা ও অবিবেচনা’ প্রবন্ধ এবং ‘হালদার গোষ্ঠী’-গল্প প্রকাশিত হয়।

উনিশ শতকে পাশ্চাত্য রেনেসাঁসের প্রভাবে ভারতবর্ষে বাঙালির মানসিক ও ব্যবহারিক জীবন থেকে জড়তা মুক্ত হওয়ার যে আনন্দময় চাঞ্চল্য শুরু হয়; শুরু হয় মুক্তির আনন্দসে আনন্দে যে ‘নবসাহিত্যে ফুল ফুটবে তাকে চাষ করাই সবুজপত্রের উদ্দেশ্য।’ এ সম্পর্কে সম্পাদকের স্পষ্ট ঘোষণা, ‘যে লেখায় নবজীবনের আদর্শ প্রতিফলিত হবে তাকেই সযতেœ সবুজপত্রাধারে রক্ষিত করা হবে।’ ঘটানো হবে ‘দেশের অতীত ও বিদেশের বর্তমান এই দুইটি প্রাণশক্তির বিরোধ নয়’, মিলন। উদ্দেশ্য ঐ এক, ‘বাংলা সাহিত্য ও সমাজের ভবিষ্যৎ’ সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করা। এ জন্যেই উদ্যোগী ও অকুতোভয় নবীন লেখকদের ‘আমাদের বাঙলা ঘরের খিড়কি দরজার ভিতর প্রাচীন ভারতবর্ষের হাতি গলাবার চেষ্টা করতে হবে। আমাদের গৌড় ভাষার মৃৎকুম্ভের মধ্যে সাতসমুদ্রকে পার করতে হবে।’

আর তা করতে হলে, রবীন্দ্রপ্রতিভা বিচারের জন্য নয়, সবুজপত্রের চারিত্র্য নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে; ১ম সংখ্যায় প্রকাশিত উপর্যুক্ত ‘সবুজের অভিযান’ কবিতার কাক্সিক্ষত অভিযাত্রীদের, যে যাই বলুক, ‘রক্ত আলোর মদে মাতাল ভোরে’, ‘সকল তর্ক হেলায় ত্চ্ছু করে’ বেরিয়ে আসতে হবে। বেরিয়ে আসতে হবে ‘দুরন্ত’, ‘কাঁচা’, ‘সবুজ-নবীনদের’। ‘আধ মরাদের ‘ঘা মেরে’ তুলতে হবে বাঁচিয়ে। নবজীবনের বানডাকা বিশ্বপানে যারা তাকায় না, সেই প্রবীণ, সেই পরম পাকাদের নিরাপদ আস্তানা ‘অন্ধকারে বন্ধ করা খাঁচায়’ দস্যুর মত হানা দিয়ে তছনছ করে দিতে হবে এবং আনতে হবে তাদের আলোর ভুবনে বের করে। একই কারণে উপর্যুক্ত কবিতার অন্য একটি চরণ স্মরণ যোগ্য, ‘ঝড়ের মাতন, বিজয় কেতন নেড়ে/অট্টহাস্যে আকাশ খানা ফেড়ে,/ ভোলানাথের ঝোলা ঝুলি ঝেড়ে/ ভুলগুলো সব আনরে বাছা বাছা/ আয় প্রমত্ত আয়রে আমার কাঁচা।’

উল্লেখ্য যে, ‘সবুজের অভিযান’, সবুজপত্র সম্পাদক প্রমথ চৌধুরীর উপরিউক্ত প্রত্যাশার সমার্থক। অর্থাৎ সবুজপত্র শৃঙ্খল ভেঙে ‘পান থেকে সংস্কারের চুন’ খসানোর দৃঢ় প্রতীতিতে স্থিতধী। স্থিতধী যে, তার প্রমাণ পাওয়া যায়, রবীন্দ্রনাথ ‘বাংলাভাষা ও ব্যাকরণ’ শীর্ষক প্রবন্ধে ‘বাংলাভাষার স্বাধীন সত্তার বিকাশে সংস্কৃতভাষার প্রভাবকে অস্বীকার’ করার চেষ্টা করলে সংস্কৃত পণ্ডিত শরচ্চশাস্ত্রী তার তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং শাস্ত্রী মশায়ের পক্ষাবলম্বন করে বলাই চাঁদ গোস্বামী, রায় যতীন্দ্রনাথ চৌধুরী, রাজেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ, প্রথমনাথ তর্কভূষণ বলেন যে, ‘সংস্কৃতের বন্ধন মোচন করলে বাংলার কুফল হবে।’ এতৎপ্রেক্ষিতে সবুজপত্রের সারথী তাঁদের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে প্রত্যয়দীপ্ত দৃঢ় ভাষায় বলেন, ‘বাংলা ভাষার যে প্রকৃতি, তাতে সংস্কৃত শব্দ যত বেশি প্রবেশ করবে, ততই দোষের হবে।’ শুধু তাই নয়, ‘বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি সংস্কৃত শব্দের অধিক প্রয়োগ’শরচ্চশাস্ত্রীর এ দাবীর অযথার্থতা প্রতিপন্ন করতে প্রমথ চৌধুরী সবুজপত্রে প্রকাশ করেন তাঁর যুক্তি ও বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধ ‘কথার কথা’। তাতে তিনি শাস্ত্রী মশায়ের যুক্তি খণ্ডন করেন এ ভাষায়, ‘ভাষা মানুষের মুখ হতে কলমের মুখে আসে, কলমের মুখ হতে মানুষের মুখে নয়। উল্টো চেষ্টা করতে গেলে মুখে শুধু কালি পড়ে’। প্রমথ চৌধুরীর সবুজপত্র বাঙালির মুখকে কালিমালিপ্ত হতে দিতে চায় নি। তাই সংস্কৃত শব্দের বাহুল্য ত্যাগ করে বাংলা ভাষাকে ভারমুক্ত, কলুষমুক্ত করার প্রাণপণ চেষ্টা করেছে এবং তাতে সবুজপত্র অভাবিত পূর্ব সাফল্য লাভ করেছে। সবুজপত্রের এটিও একটি অমর কীর্তি। এর সাথে অনিবার্য সম্পক্ততা স্বীকার করতে হবে সাহিত্যচর্চায় সুনিপুণ বাগবৈদগ্ধ্য এবং উইট, স্যাটায়ার, হিউমার; পারাডক্স-এর বহুল ব্যবহার।

প্রকৃত সত্য এই যে, সবুজপত্রে প্রকাশিত ‘বীরবলের হালখাতা’য় প্রাবন্ধিকের ‘প্রথমেই চোখে পড়ে যে, এই নব সাহিত্য রাজধর্ম ত্যাগ করে গণধর্ম অবলম্বন করেছে।’ অতএব সবুজপত্র থেকেই বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের যাত্রা শুরুএ কথা অস্বীকার করার জো নেই। বরং সবুজপত্রের সারথ্যে সংস্কৃতবহুল সাধুভাষারীতি ত্যাগ করে চলিত ভাষা রীতিতে যে সাহিত্যচর্চা শুরু হয় ক্রমাগত অনুশীলনের ফলে আজ তা সর্বত্রগামী; সর্বজন স্বীকৃত। অন্যদিকে সাধুভাষারীতি ব্যবহার বিলুপ্ত প্রায়। সবুজপত্রের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের বেলায়ও সদর্থক ক্রমোৎকর্ষ লক্ষণীয়।

 

সবুজপত্রর শতবর্ষ

গাজী আজিজুর রহমান

[অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ॥ বাংলা বিভাগ ॥ কালিগঞ্জ কলেজ ॥ সাতক্ষীরা]

ভাষার জঙ্গমতা ছাড়া কোনো ভাষাই সুদীর্ঘকাল বেঁচে থাকে নাহিব্র“, লাতিন, সংস্কৃত, প্রকৃত, পালি, সাধু ভাষা তার উদাহরণ। যে ভাষা লোকপরম্পরা প্রসিদ্ধ, জীবনঘনিষ্ট, সৃতি এবং প্রসাদগুণমণ্ডিত সে ভাষার অপমৃত্যু ঘটে না। আজকের বাংলা ভাষার যে গতি, সংহতি, অনাড়ষ্টতা, স্বচ্ছন্দতা, সাবলীলতা এবং সর্বজনীনতা তার পনের আনা কৃতিত্ব প্রমথ চৌধুরীর। তিনিই বাংলা ভাষাকে প্রথম রঙের ব্যাভিচার থেকে, জবরজঙের দুর্ভর থেকে, হেয়ালি-কূটাভাষ-জটিলতার জাল থেকে উদ্ধার করে একটা আদর্শবাদি, অসংশয়িত, বুদ্ধিদীপ্ত, সৃজনধর্মী ভাষার প্রবর্তন করেন¬¬যে ভাষা রবীন্দ্রনাথও ব্যবহারে হলেন অকুণ্ঠিত, অন্যরা তো সে ভাষাতেই চিড়ে ভেজালেন। প্রমথ চৌধুরীই প্রথম দেখালেন জলরঙ বা তেলরঙ নয়, স্কেচধর্মী ছবিতেই অন্তরের প্রকাশ ঘটে সবচেয়ে বেশি, রেখাচিত্রিক ভাষাই হওয়া উচিত ভাষার অভিজ্ঞান। এসব লক্ষণ ও বৈশিষ্ট্য বক্ষে ধারণ করে আজ হতে শতবর্ষ পূর্বে সবুজপত্র (১৯১৪) বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পালাবদলে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করেছিলে, যে ইতিহাস অতিগুরুত্বপূর্ণ।

যে কোনো ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক সাময়িকী প্রকাশের পশ্চাতে একটা উদ্দেশ্য থাকেঅবশ্যই সে উদ্দেশ্য হওয়া চাই সৎ, শুদ্ধ ও পরিবর্তনমুখি। সাময়িক পত্রই পারে সমাজকে পাল্টাতে, বহু যুগের সাহিত্যধারাকে পাল্টাতে, ভাষাকে নব নব রূপে বিকশিত করতে, মানুষকে জ্ঞান ও বিজ্ঞানমনস্ক করে গড়ে তুলতে, প্রগতিশীলতাকে মননে-চৈতণ্যে ছড়িয়ে দিতে। নবচেতনা, নতুন পথ, নতুন দিনের সকালে জেগে ওঠার জন্য সাময়িক পত্র চিরকাল অবিকল্প। প্যারিচাঁদ মিত্র ও রাধানাথ শিকদার সম্পাদিত ‘মাসিক পত্রিকা’ (১৮৫৪) প্রকাশের উদ্দেশ্য ছিল মূলত স্ত্রী লোকদের মন-প্রাণ বিকাশের জন্য এবং আলালী ভাষারীতি অনুসৃত হওয়ার জন্য। আর বঙ্কিমের ‘বঙ্গদর্শন’ (১৮৭২) প্রকাশের উদ্দেশ্য ছিল ‘যতদিন না সুশিক্ষিত জ্ঞানবন্ত বা বাঙালিরা বাঙ্গালা ভাষায় আপন উক্তি সকল বিন্যস্ত করিবেন, তত দিন বাঙালির উন্নতির কোন সম্ভাবনা নাই।’ ‘ভারতী’ (১৮৭৭) ছিল ঠাকুরবাড়ির প্রতিভা বিকাশের অন্যতম বাহন। এবং নবীন লেখক সৃষ্টিসহ বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করায় ‘ভারতী’র ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। সাধনা (১৯৯১) ছিল ঠাকুরবাড়ির প্রতিভা বিকাশের অন্যতম পরিবাহী। সবুজপত্র প্রকাশের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্পাদকের মন্তব্য ছিল ‘আমাদের বাংলা সাহিত্যের ভোরের পাখিরা যদি আমাদের প্রতিষ্ঠিত সবুজপত্রমণ্ডিত সাহিত্যের নব শাখার উপর এসে অবতীর্ণ হন তাহলে আমরা বাঙালি জাতির সবচেয়ে যে বড় অভাব, তা কতকটা দূর করতে পারব। সে অভাব হচ্ছে আমাদের মনের ও চরিত্রের অভাব কতটা, তারই জ্ঞান।’

প্রমথ চৌধুরী ছিলেন চিরসবুজের পূজারি, যৌবনে দাও রাজটিকা’র আর্চক, চির বসন্তের বন্দনাকারি। এমন মানুষের পত্রিকার নাম তো সবুজপত্র হবেই। সবুজপত্রর নাম মাহাত্ম্য নিয়ে তিনি দুটি প্রবন্ধই লিখে ফেলেছিলেন : ১. সবুজপত্রের মুখপত্র ২. সবুজপত্র। প্রবন্ধদ্বয়ে যেন সবুজের সমারোহ, বসন্তের হিল্লোল, যৌবনের জয়গান বহু বর্ণে বর্ণিল। এই ব্যক্ত সত্যকে আমরা বুঝতে পারি না, ব্যক্তকে গুপ্তধন হিসাবে আবিষ্কার করতে যেয়ে। ‘যে বর্ণ বাংলার ঔষধিতে ও বনস্পিতিতে নিত্য বিকশিত হয়ে উঠেছে, নিশ্চয় সেই একই বর্ণ আমার হৃদয়-মনকেও রাঙিয়ে রেখেছে। আমাদের বাহিরের প্রকৃতির যে রঙ, আমাদের অন্তর পুরুষেরও সেই রঙ। (সবুজপত্র)। সবুজপত্র প্রকাশের প্রথম সংখ্যায় (বৈশাখ ১৩২১) তিনি যে মুখপত্র রচনা করেন তাতে লিখেছিলেন, ‘দেশের মন যাতে আর বেশি ঘুমিয়ে না পড়ে তার চেষ্টা করা এবং বাঙালীর জীবনে যে নূতনত্ব এসে পড়েছে তাই পরিষ্কার করে প্রকাশ করা সবুজপত্রের লক্ষ হবে।’ বোঝা যায় সবুজপত্র প্রকাশের সময় দেশে নব-নবীনের হাওয়া বইছিল, রবীন্দ্রনাথের হাতে সম্পন্ন হচ্ছিল রেনেসাঁর পুষ্পিত পরিণাম। কিন্তু দেশে অরাজকতাও কম ছিল না। বঙ্গভঙ্গ-উত্তর ঝড়ো বাংলা, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডঙ্কা, স্বদেশি আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলনের বাতাবরণে দেশে সুস্থ চিন্তা, সুখ চিন্তার দিন যে ফুরিয়ে যাচ্ছে অনতিকাল পর ‘কল্লোল’ (১৩৩০) যুগের পদধ্বনিতে তার আভাস স্পষ্ট। যা কিছু পুরাতন, অতীত তা থেকে বেরিয়ে এসে এক নব যুগের মধ্যে অবগাহন করাই ছিল কল্লোলের অভীপ্সা। এই নব আন্দোলনকেও স্বাগত জানিয়ে ছিলেন প্রমথ চৌধুরী। এ তাঁর সাহস ও দ্রোহের পরিচায়ক।

সবুজপত্র চেয়েছিল দেশের ও মানুষের যৌবনকে রক্ষা করবে ‘ওঁ প্রাণায় স্বাহা’র মাধ্যমে। কমল হীরে বিদ্যা আর তার দ্যুতি হবে কালচার। সমস্ত সবুজ ও সজীবের উৎসাহস্থল হিসাবে প্রমথ চৌধুরীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল একটা নবীন বিদ্রোহী লেখক গোষ্ঠী। চিরনূতন রবীন্দ্রনাথসহ ইন্দিরা দেবী, অতুলচন্দ্র গুপ্ত, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সবুজপত্রের তরুণ তুর্কি লেখক। আর ‘কল্লোল’ যৌবন ও নতুনের পূজারি ছিল বলে প্রমথ চৌধুরী সেখানে নিয়মিত লিখতেন। অর্থাৎ যেখানে যৌবন, যেখানে সজীবতা, যেখানে নবীনতা সেখানে তিনি ছিলেন তার মধ্যমণি। যার উজ্জ্বল উত্তরাধিকার লাভ করেছিলেন নজরুল।

প্রমথ চৌধুরী ছিলেন জীবনরসিক মানুষ, মজলিসী মানুষ, অভিজাত মানুষ, উইট ও হিউমারনিষ্ঠ মানুষ, সর্বোপরি একজন স্টাইলিস্ট মানুষ। কাউকে অনুকরণ বা অনুসরণ করা ছিল তাঁর স্বভাব বিরুদ্ধ। তিনি যে সর্বাংশে স্বতন্ত্র ছিলেন সে তাঁর গল্প, গদ্য, সনেট যাই হোক-না কেন সর্বত্র তার পরিচয় মেলে। তাঁর স্বাতন্ত্র্যের মূল স্পিরিট ছিল চলতি বাংলা ভাষাযেখানে থাকবে ভাষার শৃঙ্খলা, অশৈথল্য, অজড়তা, গতি ও দীপ্তি। সবুজপত্র ছিল তাঁর এই ভাষিক সংগ্রামের হাতিয়ার। এলিয়ট যেমন বসেছিলেন কবিতায় অপ্রয়োজনীয় একটিও বাক্য, শব্দ ও বর্ণ থাকবে না, তেমনি প্রমথ চৌধুরী তাঁর লেখা থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করেছিলেন পুনরুক্তি, অত্যুক্তি, অস্পষ্টতা, অকারণ বিশ্লেষণ প্রয়োগের বাতুলতাসহ ভাষার সকল দুর্লক্ষণকে। এসব প্রকরণ মেনে তিনি ভাষা ও সাহিত্যচর্চা করে লাভ করেছিলেন অনন্য গদ্যশিল্পীর মর্যাদা। ভাষার নবরীতির ক্ষেত্রে বঙ্কিমী বা রবীন্দ্র ভাষার পর বীরবলী বা প্রমথীয় ভাষারীতি তাঁর অসামান্য কীর্তি। ভাষা ও সাহিত্যে নবরীতি নির্মাণে তিনি এতটাই পারঙ্গমতা অর্জন করেছিলেন যে বুদ্ধদেব বসু তাঁকে ‘লেখকদের লেখক’ এবং ভবিষ্যতের বাঙালি লেখকদের তিনি হবে অন্যতম শিক্ষক’এমন মন্তব্য করেছিলেন ‘কালের পুতুল’-এ। আমরা সাহিত্যের স্রষ্টা ও দ্রষ্টাদের নিয়ে সরব, কিন্তু যারা নির্মাতা তাদের সম্পর্কে তিনি নীরব প্রমথ চৌধুরী সে কারণে আজও এক অনালোচ্য প্রতিভা, তাঁর উজ্জ্বলতা আজও আলোকিত হল না, তাঁর আলো থেকে আলো জ্বাললো না প্রায় কেউ। কেবল ব্যতিক্রম অন্নদাশঙ্কর রায়, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কিংবা সাগরময় ঘোষ।

প্রমথ চৌধুরীর অনন্য প্রসিদ্ধি চলতি ভাষা। তৎপূর্বে রবীন্দ্রনাথের হাতে এই ভাষার উন্মেষ ঘটেছিল তাঁর ‘য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র’, ‘ছিন্নপত্র’ ইত্যাদিতে। কিন্তু সে ভাষা যে যথেষ্ট কুলমান সম্পন্ন নয়, অনুসরণযোগ্য ও আদর্শ সাহিত্য ভাষা নয় বুঝতে পেরে সাধু ভাষায় প্রত্যাবর্তন করে লিখলেন ‘চতুরঙ্গ’, ‘জীবনস্মৃতি’ ইত্যাদি। পরে প্রমথ চৌধুরীর প্রভাবে ‘ঘরে-বাইরে’ (১৯১৬)-তে তিনি আবার চলতি ভাষায় ফিরে এলেন, আর ফিরলেন না সাধু ভাষার সমীপে।

প্রমথবাবু যথার্থই উপলব্ধি করেছিলেন বাংলা ভাষার প্রকৃত পরিচয় হওয়া উচিত চলতি ভাষা। যে ভাষা আমাদের প্রাণের ভাষা, মায়ের ভাষা, প্রিয়ার ভাষা সেই ভাষাতেই রচিত হবে আমাদের সাহিত্যসবুজপত্র ছিল সেই ভাষা ও সাহিত্যের অকুস্থল। তিনি যখন এই চলতি ভাষার প্রতিষ্ঠা নিয়ে সংগ্রাম করছেন তখন তার বিরুদ্ধবাদীরা গড়ে তুলতে চাইলো প্রবল প্রতিরোধ। কিন্তু প্রমথ চৌধুরীর বুদ্ধি, জ্ঞান ও যুক্তির কাছে তারা যে শেষাবধি পরাজিত হয়েছিলেন বিভূতিভূষণ-তারাশঙ্কর-মানিক-বুদ্ধদেব বসু, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, অন্নদাশঙ্কর রায়ের অধিকাংশ রচনাবলী তার প্রমাণ। অর্থাৎ আধুনিক সাহিত্য মানেই চলতি ভাষাপন্থী।

যে যুগে সবই ছিল রবীন্দ্রানুসারি, রবীন্দ্রবৃত্তে বৃত্তাবদ্ধ, সে যুগে কেবল প্রমথ চৌধুরীই রবীন্দ্রসূর্যকে তাঁর শিশির কণার মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেছিলেন চলতি ভাষার নিগড়ে। এই যে যুক্তি-তর্কে তাঁকে বাধ্য করা, তাঁর পাশে টেনে নিয়ে আসা এবং আপন বৈশিষ্ট্যে উদ্ভাসিত হওয়া, এটাই প্রমথ চৌধুরীর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। অতঃপর নজরুল হলেন আপন স্বাতন্ত্র্যে ভাস্বর। প্রমথ চৌধুরীর কী কবিতা কী গদ্য সবটাই ছিল ভাবলতাহীন, আবেগহীন চিন্তাপ্রসুত নকশাধর্মী ভাস্করধর্মী রচনা। উদাহরণ তাঁর একটি সনেটের কিছু অংশ :

প্রবাসে চলিয়ে গিয়েছে রবি।

এই ফাঁকে হও            নতুন করি ॥

নূতনের আজ             জরুর বড়।

এই বুঝে           নবসাহিত্য গড় ॥

তাঁর এই রচনাশৈলীর ভিন্নতা, অভিনবত্ব এবং নুড়ি-পাথরে কাব্যরীতি রবীন্দ্র পথ থেকে বহু দূরে অবস্থিত। এ যেন গদ্যের সুরে পদ্য লেখা, পদ্যের সুরে গদ্য। এমন কাব্যরূপ আমরা লক্ষ করি গিত্তম আপোলিনের, স্তেফান মালার্মে বা সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখায়। রবীন্দ্রনাথের ‘লেখন’ যেন এমন ছন্দ ও সুরে বাঁধা। সুতরাং নতুন ও প্রমথ চৌধুরী যেন একই সত্যের দুই রকম উৎসারণ। বাংলা সাধু ভাষা ও চলতি ভাষার একটা চারু-সংগ্রাম চলেছিল শতবর্ষব্যাপী। মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার থেকে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিচন্দ্রের তৎসম শব্দের ওস্তাদিতে, সমস্তপদ ও সন্ধিপ্রবণ দূরান্বয় সিদ্ধিতে, আলঙ্কারিক ও ধ্র“পদধর্মী সাধুরীতি একদিকে; অন্যদিকে লোকচালিত কথ্যভাষার স্বপক্ষে উইলিয়াম কেরী থেকে রামরাম বসু, প্যারীচাঁদ মিত্র, রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরী ঘোষিত আন্দোলন যার মুখপত্র ছিল সবুজপত্র এবং প্রথম চৌধুরী ছিলেন তার সারথি। এই বহমান দুই ধারার শ্রেষ্ঠ শিল্পী রবীন্দ্রনাথ। একদিকে ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ অন্যদিকে ‘শেষের কবিতা’ যেন খঞ্জরের শানিত দুই ধারের চকমকি শোভা। কিন্তু প্রমথ চৌধুরীর একাস্নীবান স্বরূপ ছিল চলতি ভাষা, এই বাণেই তিনি বধে সফল হয়েছিলেন সাধু ভাষাকে। তাই এই ভাষাতেই আমৃত্যু অনড় রইলেন ‘অটল অচল যথা’। প্রমথ চৌধুরী বার বার বলেছেন মুখের ভাষাই হওয়া উচিত সাহিত্যের ভাষা। কিন্তু তিনি যে ভাষায় লেখালেখি করেছেন তা কি সত্যি মুখের ভাষা, জনগণের ভাষা? কিছুটা কলকাতাজনের ভাষা। শুধু ক্রিয়াপদ ও সর্বনাম পরিবর্তন করে সাধু ভাষার পোশাক পরিবর্তন করা যায় না। সে কারণে তাঁর ভাষাকে বলা যায় সাধুগন্ধী চলতি ভাষা। শুধু তাই না কোনো কোনো ক্ষেত্রে সে ভাষা সাধু ভাষা অপেক্ষা হয়ে উঠেছে দুরূহ ও কঠিন, জটিল ও জাড্য। সে কারণে অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন ‘বীরবলের ভাষার তুলনায় হতোম বা বিবেকানন্দের বাংলা চলতি রীতি অনেক বেশি জীবনের নিকটবর্তী।’ স্বপক্ষে দুটি উদ্ধৃতি১. সংস্কৃতি সাহিত্যে যুবকযুবতী ব্যতীত আর কারো স্থান নাই। আমাদের কাব্যরাজ্য হচ্ছে সূর্যবংশের শেষ নৃপতি অগ্নিবর্ণের রাজ্য, এবং সে দেশ হচ্ছে অষ্টাদশবর্ষদেশীয়দের স্বদেশ। যৌবনের যে ছবি সংস্কৃত দৃশ্যকাব্যে ফুটে উঠেছে, সে হচ্ছে ভোগবিলাসের চিত্র। সংস্কৃত কাব্যজগৎ মাল্যচন্দনবনিতা দিয়ে গঠিত এবং সে জগতের বনিতাই হচ্ছে স্বর্গ, ও মাল্যচন্দন তার উপসর্গ। (যৌবনে দাও রাজটিকা)। ২. হীরেনবাবু দর্শন শব্দের এবং যোগেশবাবু বিজ্ঞান শব্দের নিরুক্তের আলোচনা করেছেন, কিন্তু যদুবাবু ইতিহাসের নিরুক্ত সম্বন্ধে নীরব।… আমার সময়ে সময়ে মনে হয় যে শাস্ত্রীমহাশয় পুরাতত্ত্বের ছলে আত্মশ্লাঘাপরায়ণ বাঙালি জাতির সঙ্গে একটা মস্ত রসিকতা করেছেন। (চুটকি)। উদ্ধৃতি দুটিতে প্রমথ চৌধুরীর ধীশক্তি, জ্ঞান-আলো-চিন্তার পরিচয় মেলে, উইট ও হিউমারও আছে, আলঙ্কারিক আয়োজনও আছে, কিন্তু ভাষা হয়ে উঠেছে সাধুগন্ধী, দ্রুপদগন্ধী, জলাবর্তগন্ধীএমন ভাষা আর যাই হোক চলতি ভাষার স্বাদ গ্রহণে অক্ষম। তাঁর প্রবন্ধ পড়তে পড়তে আমরা ভুলে যাই এটি চলতি ভাষায় লেখা। অথচ বিবেকানন্দ, রাজশেখর বসুর চলতি বাংলা পড়তে আমাদের তেমনটি মনে হয় না। এমন কি হরপ্রসাদশাস্ত্রীর সাধু বাংলা প্রমথ বাবুর চলতি বাংলা অপেক্ষা সহজ এবং বোধগম্য। সারকথা যে ভাষা রীতিতেই আমরা লিখি-না কেন সে ভাষা যদি প্রাকৃত না হয়ে কৃত্রিম হয়, কাটখোট্টা ও জবরজং হয়, তাহলে তা নন্দিত না হয়ে নিন্দিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

প্রমথ চৌধুরীর ভাষা ইনটেলেকচুয়াল হওয়ায় এবং বাঙালি স্বভাবত ভাববেদ্য ও হৃদয়বেদ্য হওয়ার কারণে তাঁর মূলত অনুসরণযোগ্য হয়নি। তবে চলতি ভাষা প্রতিষ্ঠা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা সবার উপরে। আর সবুজপত্র নয় বছরের সংগ্রামে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পালাবদলে যে নবদিগন্তের উন্মেষ ঘটিয়েছিল সেই সরণি ধরেই আমাদের আধুনিক সাহিত্যের গৃহপ্রবেশ। সবুজপত্র ও প্রমথ চৌধুরীর সংগ্রামী ইতিহাস বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে শতবর্ষ অতিক্রান্ত এক স্মরণীয় ইতিহাস।

সবুজপত্র বাংলাসাহিত্যে ও উত্তরকালের জিজ্ঞাসা

আহমেদ মাওলা

[অধ্যাপক ॥ বাংলা বিভাগ ॥ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়]

সাহিত্যের ঋতুবদলের ঘটনা প্রতি মাসে বা বছরে ঘটে না, ঘটা সম্ভবও নয়, কারণ, বিশ্বসংসার তন্ন তন্ন করে না খুঁজলে এখন আর শিল্পেরকল্পতরু জন্মায় না। সমকালীন দৈনিক পত্রিকায় বুড়োদের লিটল ম্যাগাজিন মার্কা কবিতা পড়লে মনে হয়, বাংলাভাষা বুঝি কবিতা লেখার অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে। চিৎকার আর চুম্বনের মধ্যে যেনো কোনো পার্থক্য নেই। অভিনবত্ব কোথায়? সবই প্রথাগত আর ফ্যাকাশে মনে হয়। এর পেছনে হয়ত সামাজিক রাজনৈতিক অনেক কারণ রয়েছে, তার চেয়ে বেশি অভাব রয়েছে ভালো রুচিশীল সাহিত্যপত্রিকা এবং একজন গুণি সম্পাদকের অনুপস্থিতি। অথচ এমন সময় ছিলো, যখন সাহিত্যপত্রিকা মানদণ্ডের মতো কাজ করতো।

বাংলা সাহিত্যপত্রিকার ইতিহাসে প্রমথ চৌধুরী এবং সবুজপত্র (১৯১৪) প্রায় সমার্থক। চলতিভাষার প্রতিষ্ঠা প্রমথ চৌধুরীর মহৎ কীর্তি হলেও একমাত্র কিংবা প্রধান কীর্তি নয়। বিশশতকের প্রথম দিকে, তিনি ছিলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের স্মরণীয় বিদ্রোহী। বাঙালির চিন্তার দীনতা ও দুর্বলতা এবং বাংলাগদ্যের লেখ্য ও মৌখিক ভাষার পার্থক্য; ভাবালুতা, অস্পষ্টতা, অনুরূপ ক্রিয়াপদের একঘেয়ামিযা ছিল বাংলাগদ্যের দুর্লঙ্ঘ অভিশাপ, তার বিরুদ্ধে প্রমথ চৌধুরীর ছিলো উজ্জ্বল বিদ্রোহ। সবুজপত্র কেবল বাংলা গদ্যের বাঁকবদল ঘটায়নি, একই সঙ্গে বাঙালির বোধ ও বুদ্ধিকে আলোড়িত করে সাহিত্যের ঋতুবদল ঘটিয়েছিলো। এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে একটি নতুন সাহিত্য গোষ্ঠী এবং সাহিত্যাদর্শ গড়ে ওঠে। সেই সাহিত্যগোষ্ঠীর প্রভাব ও সাহিত্যাদর্শের স্বরূপও অস্পষ্ট নয়। প্রমথ চৌধুরীর ব্রাইট স্ট্রিটের বাড়িতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কালে যারা আড্ডায় যোগ দিতেনমণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, অতুলচন্দ্র গুপ্ত, কিরণশঙ্কর রায়, সতীশচন্দ্র ঘটক, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বিশ্বপতি চৌধুরী, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুরেশ চক্রবর্তী প্রমুখ। সবুজপত্র গোষ্ঠীর এই অভিজাত, বিদগ্ধ আড্ডা বিশশতকের বাঙালির মানসে স্থায়ী একটা প্রভাব রেখে গেছে। ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘আমরা ও তাঁহারা’ গ্রন্থের ভূমিকায় সবুজ আড্ডা সম্পর্কে লিখেছেন : আমি যে দলে মানুষ হয়েছি তাকে ঢ়ৎধসধঃযবধহ কিংবা সবুজপত্রের দল বললেই বর্ণনা সম্পূর্ণ হয় না। কারণ আমাদের বই পড়ার অভ্যাস ও বড় বড় ব্যাপার নিয়ে তর্কপ্রবৃত্তির জন্যই প্রমথবাবু নিজের কাছে আমাদের টেনে নেন ও শিক্ষা দিয়ে সবুজপত্রের দল তৈরি করেন। সেখানে অভিব্যক্তিবাদ, নতুন ফিজিক্স, নতুন অর্থনীতি, আর নব্যদর্শন নিয়ে আলোচনা অসামাজিক বিবেচিত হত না। …কেবল বের্গসঁ, প্ল্যাঙ্ক ও রাসেল নয়, এইসঙ্গে শ’ ক্রোচে, ফ্রয়েড, য়ুং, অ্যাডলার, অয়কেন প্রমুখ ইউরোপীয় মনীষীবৃন্দের বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস বিষয়ক মননশীল আলোচনায় সবুজপত্রীরা মনোযোগ নিবদ্ধ করেছিলেন।’ (ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়: ১৯৫৬, ভূমিকা; আমরা ও তাঁহারা)

সবুজপত্র প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাংলাসাহিত্যে একটি নতুন যুগের সূচনা হলো। যে সাহিত্যাদর্শের জন্ম দিয়েছিলো সবুজপত্র স্বরূপটা আসলে কি? তা কেবল বাংলা চলতি গদ্যরীতির অনুশীলন নয়, মননশীল একটি প্রবন্ধের ধারা। যে চিন্তা কেবল সমাজকল্যাণে নিয়োজিত নয়, তার ভিত্তি হচ্ছে যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির, তার লক্ষ হচ্ছে বুদ্ধির মুক্তিসবুজপত্রের প্রতিটি লেখায় তার প্রমাণ পাওয়া যায়। রবীন্দ্র যুগের মধ্য পর্যায়ে সাহিত্যে বিদ্রোহের ঝড়ো হাওয়া নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল সবুজপত্র। সাহিত্যে কথ্যভাষার ব্যবহার, দুরূহ বিষয়কে সহজ-সরল করে উপস্থিত করার প্রয়াস, বুদ্ধিপ্রবণ মননশীলতা, বিশুদ্ধ প্রজ্ঞার চর্চা, যুক্তিধর্মিতা এসবই ছিল সবুজপত্রর প্রধান বৈশিষ্ট্য। তৎকালীন সাহিত্যের দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দিয়ে ছিলেন সবুজপত্রগোষ্ঠী। প্রমথ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি শক্তিমান, বিদগ্ধ নাগরিক রুচিবান, পরিপাটি মনের প্রাবন্ধিক গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। সবুজপত্র প্রকাশের পূর্বের প্রবন্ধকার যেমন, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, সুরেশ সমাজপতি, পাঁচকড়ি বন্ধ্যোপাধ্যায় গিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরী, বিপিনচন্দ্র পাল, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রমুখের লক্ষ ছিলো দেশ-কাল-সমাজ। সবুজপত্র লেখকগোষ্ঠীর লক্ষ বিশ্বনাগরিকতা, বৈদগ্ধমার্জিত বুদ্ধির উদ্বোধন। রবীন্দ্রনাথ সবুজপত্রের প্রভাবের কথা স্মরণ করতে গিয়ে লিখেছেন :

আমি যখন সাময়িকপত্র চালনায় ক্লান্ত এবং বীতরাগ, তখন প্রমথ’র আহ্বানমাত্র সবুজপত্র বাহকতায় আমি তার পার্শ্বে এসে দাঁড়িয়েছিলুম। প্রমথনাথ এই পত্রকে যে একটি বিশিষ্টতা দিয়েছিলেন তাতে আমার তখনকার রচনাগুলি সাহিত্য-সাধনার একটি নূতন পথে প্রবেশ করতে পেরেছিল। …আমি তাঁর কাছে ঋণ স্বীকার করতে কখনও কুণ্ঠিত হইনি। (প্রমথ চৌধুরীর গল্পসংগ্রহ ভূমিকা : ১৯৪১)।

সবুজপত্র রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ও ভাষারীতির আধুনিকতা বিকাশে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ নিজেও সেই ঋণের কথা বার বার স্বীকার করেছেন। ‘একটা নতুন কিছু করো’ ডি. এল. রায়ের এই পরামর্শ অনুসারে প্রমথ চৌধুরী একটা নতুন মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, এমন বলা যায় না। মূল উদ্দেশ্য ছিলো পরিবর্তন। সমাজে আমূল পরিবর্তন। শ্রেণিভেদ, উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থা, রাষ্ট্রশক্তির মূল উৎসের পরিবর্তন। সাহিত্যের কাজ হচ্ছে এই পরিবর্তনের কাজকে সুগম করা। ‘ওঁ প্রাণায় স্বাহা‘সবুজপত্রের মুখপত্রে’ তিনি সাহিত্যের মূল প্রকৃতির কথাটি পরিষ্কার করে বলেছেনএকথা সত্য যে, মানবজীবনের সঙ্গে যার ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ নাই, তা সাহিত্য নয়, তা শুধু বাক্ছল। জীবন অবলম্বন করেই সাহিত্য জন্ম ও পুষ্টি লাভ করে কিন্তু সে জীবন মানুষের দৈনিক জীবন নয়। সাহিত্য হাতে হাতে মানুষের অন্নবস্ত্রের সংস্থান করে দিতে পারে না। কোনো কথায় চিঁড়ে ভেজে না, কিন্তু কোনো কোনো কথায় মন ভেজে; এবং সেই জাতির কথারই সাধারণ সংজ্ঞা হচ্ছে সাহিত্য।

সবুজপত্র সূচনা থেকে উত্তেজনার যুগ অতিক্রম করে তার প্রভাবের ফসল ফলিয়েছে। বাংলা সাহিত্যে সবুজপত্রের প্রভাবের রোদ আর প্রতাপের জোছনা কেবল যুগের বুদ্বুদ মাত্র নয়। ১৯১৪, বৈশাখ ১৩২১ বঙ্গাব্দ থেকে ১৯২৮, ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত মোট তের বছর সবুজপত্র প্রকাশিত হয়। এই সময় পরিসরে সাহিত্যপত্রিকার যে চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য উন্নত রুচি, বিদগ্ধ মননশীলতা ও যুক্তিধর্মিতা প্রদর্শন করে সবুজপত্র একটি মানদণ্ড তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সবুজপত্রর এই মানদণ্ড ও প্রভাব উত্তরকালে বাংলাসাহিত্যে স্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী হয়নি।

সবুজপত্রর প্রভাব উত্তরকালে কেন সুদূরপ্রসারী হলো না? তার কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪) কাল থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯) পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যে সাহিত্যপত্রিকাগুলো প্রকাশিত হয়েছিল, তার মধ্যে তিনটি ধারা লক্ষ করা যায়। এক. সুরেশচন্দ্র সমাজপতির ‘সাহিত্য’ (১৮৯০) জলধর সেনের ‘ভারত বর্ষ’ (১৯১৩) চিত্তরঞ্জন দাসের ‘নারায়’ (১৯১৫) বিজয়চন্দ্র মজুমদার ও আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গবাণী’ (১৯২১) হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষের ‘মাসিক বসুমতী’ (১৯২২)। এগুলো ছিলো রক্ষণশীল এবং রবীন্দ্র বিরোধী সাহিত্যপত্র। দুই. মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ভারতী’ (১৯১৫) জগদিন্দ্রনাথ রায়ের ‘মানসী ও মর্মবাণী’ (১৯১৬) রামানন্দ চট্রোপাধ্যায়ের ‘প্রবাসী’ (১৯০১) উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘বিচিত্রা’ (১৯২৭) এগুলো ছিলো রবীন্দ্র গুণমুগ্ধ সাহিত্য পত্রিকা। তিন. আধুনিকতার পতাকাবাহী প্রগতিশীল সাহিত্যপত্র কাজী নজরুল ইসলামের ‘ধূমকেতু’ (১৯২২) দীনেশরঞ্জন দাসের ‘কল্লোল’ (১৯২৩) প্রেমেন্দ্র মিত্র ও শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘কালিকলম’ (১৯২৬) সজনীকান্ত দাসের ‘শনিবারের চিঠি’ (১৯২৭) সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘পরিচয়’ (১৯৩১)। এগুলো স্বভাবে রবীন্দ্র-বিরোধী হলেও তাদের রবীন্দ্র-বিরোধীতা আসলে রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রমের চেষ্টার নামান্তর মাত্র।

রবীন্দ্র-বিরোধী এবং রবীন্দ্র-অনুরাগী, কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে সবুজপত্রর ঐক্য ছিল না। কারণ, প্রমথ চৌধুরী রবীন্দ্র-গুণগ্রাহী কিন্তু অন্ধ রবীন্দ্র-স্তাবক ছিলেন না। ফলে সবুজপত্রে পথ ছিল বৈশ্বিক নাগরিকতা, বিদগ্ধ মননশীলতা এবং ভাষার ক্ষেত্রে চলিত গদ্যরীতির অনুসরণ। সাধু-চলিত ভাষার তর্কে সবুজপত্রর জয়ের চিহ্ন আজ বাংলাগদ্যের সারা শরীরে বিদ্যমান হলেও সবুজপত্রর সাহিত্যাদর্শ উত্তরকালে অনুসৃত হয়নি। ভারত বিভাগোত্তরকালে ঢাকা বাংলাসাহিত্যে দ্বিতীয় রাজধানী হয়ে উঠলেও সবুজপত্রর মতো একটি মাননিক সাহিত্য পত্র এবং প্রমথ চৌধুরীর মতো একজন সম্পাদক দেখা যায় নি। উদ্যোগ অনেক নেয়া হয়েছে কিন্তু সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার উদাহরণ সত্যি হৃদয় বিদারক।

সবুজপত্র : বাংলাগদ্যে বাঁক বদলের ভেলা

মাহবুব বোরহান

[অধ্যাপক ও সভাপতি ॥ বাংলা বিভাগ ॥ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ॥ ত্রিশাল ॥ ময়মনসিংহ]

মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ভাষা। ভাষা মানুষের চিন্তার বাহন, ভাবপ্রকাশের মাধ্যম। আদিম মানুষের যুথবদ্ধ জীবনে ইশারা, ইঙ্গিত আর নানা রকম সাংকেতিকতার মধ্যে ভাষার পরিসর ছিল নিতান্ত সীমিত। জীবনে টিকে থাকবার অনিবার্য সংগ্রামে শ্রমকে সহজ করার প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় সহজাত অন্তঃপ্রেরণায় আদিম মানুষ যে ধ্বনি বা ধ্বনিসমূহ উচ্চারণ করেছে সেই ধ্বনি বা ধ্বনিসমূহই আজকের আধুনিক মানুষের ব্যবহৃত সকল ভাষার উৎস। মানুষ যে দিন তার মুখের ভাষাকে কাগজ আর কালির শৃঙ্খলে আটক করে রাখবার কৌশল আবিষ্কার করলো অর্থাৎ লিখতে শিখলো সে দিন থেকেই প্রতিষ্ঠিত হলো মানব সভ্যতার উপর ভাষার সার্বভৌমত্ব। তারপর থেকে মানব ইতিহাসে ভাষা ও সভ্যতা প্রায় সমার্থক এবং ভাষা ও সভ্যতার বিকাশ সমান্তরাল। কোন জাতির ভাষার বিকাশকে ব্যতিরেকে সভ্যতার বিকাশ যেমন অসম্ভব, তেমনি কোন জাতির সামাজিক সাংস্কৃতিক জীবনের মানসম্মত উন্নয়ন তথা সভ্যতার বিকাশ ছাড়া সে জাতির ভাষা-সাহিত্যের বিকাশ অকল্পনীয়।

সভ্যতার নিয়ামক লিখিত ভাষার দুইটি রূপ। গদ্য এবং পদ্য। বাংলা ভাষা সহ পৃথিবীর প্রায় সকল ভাষার সাহিত্যের ইতিহাসে দেখা যায় গদ্য অপেক্ষা পদ্যের নিদর্শনই প্রাচীনতর। কিন্তু মানুষ তার জীবনাচরণের প্রয়োজনে যে ভাষা প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে, যে ভাষায় কথা বলে তা পদ্য নয় গদ্য। তা সে গদ্যের রূপ যেমনই হোক। প্রাত্যহিক আটপৌরে জীবনে যে গদ্য সে প্রতিদিন ব্যবহার করেছে সে-ই গদ্য সে মনে রাখবার, লিখে রাখবার বা সংরক্ষণ করবার প্রয়োজন বোধ করে নি। কিন্তু ছন্দবদ্ধ যে সকল পদ্য সে রচনা করেছে বিষয়বস্তুর গাম্ভীর্য এবং রূপের অভিনবত্বের জন্য সে তা মনে রাখবার চেষ্টা করেছে, লিখে রেখেছে অর্থাৎ সংরক্ষণ করেছে। যেমন বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসেবে আমরা যে চর্যাপদের সাক্ষাৎ পাই তা পদ্যে রচিত। চর্যাপদের কবিরা নিশ্চয়ই পদ্যে কথা বলতেন না, বলতেন গদ্যেই। কিন্তু ব্যবহৃত সে গদ্য তারা লিখে রাখেন নি। একান্ত গার্হস্থ্য জরুরি প্রয়োজনে দৈবাৎ হয়তো কিছুটা লিখতে বাধ্য হলেও তা সংরক্ষিত হয় নি। কালের প্রবাহে হারিয়ে গেছে। তাই একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় ভাষার ইতিহাসে পদ্য নয় গদ্যই প্রাচীনতর। এ প্রসঙ্গে শিশিরকুমার দাশের মন্তব্য স্মরণ যোগ্য :

…এটা সত্যিই আমরা গদ্যই বলি। আর যখন লিখি তখন গদ্য বা পদ্য একটিকেই অবলম্বন করে থাকি। পদ্যের জন্ম হয়েছে গদ্যের পরে, অথচ সাহিত্যের ইতিহাস খুললে দেখি, ইতিহাসের আদি স্তরে গদ্যের নিদর্শন নেই। আমাদের ভাষার ইতিহাসেই দেখি, তার প্রথম লিখিত নিদর্শন পদ্য। আমাদের গদ্য সাহিত্যের ইতিহাস যাঁরা লিখেছেন তাঁরা সবাই দেখিয়েছেন যে গত শতাব্দীর আগে গদ্যের সামান্য কিছু নমুনা আছে। সেইসব নমুনার গুরুত্ব মেনে নিয়েও স্বচ্ছন্দে বলা চলে যে আমাদের পুরোনো সাহিত্য মোটামুটি পদ্যে লেখা। অথচ গদ্য ছিল না এমন নয়। গদ্যের নমুনাগুলি না পেলেও বলতে পারি যে গদ্য ছিলই। চর্যাপদ রচয়িতারাই হোন, চণ্ডীদাস-কৃত্তিবাসই হোন, তাঁরা সবাই গদ্যই বলতেন। যেদিন থেকে বাংলা ভাষা সেদিন থেকেই বাংলা গদ্য। যেদিন থেকে ভাষা সেদিন থেকেই গদ্য।

মৌখিক গদ্য যত প্রাচীনই হোক লিখিত আকারে বাংলা গদ্য উনিশ শতকের শুরুর দিক থেকেই সাহিত্যে তার আপন আসন অধিকার করতে থাকে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের (১৮০০-১৮৫৪) পণ্ডিতদের হাত হয়ে রামমোহন (১৭৭৪-১৮৩৩), প্যারীচাঁদ (১৮১৪-১৮৮৩), বিদ্যাসাগর (১৮২৯-১৮৯০), বঙ্কিমচন্দ্র (১৮৩৮-১৮৯৪) যার শক্ত ভিত্তি স্থাপন করেন। ভাষা ব্যবহারে অত্যন্ত রক্ষণশীল সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতদের আধিপত্যে ‘সাধুভাষা’ নামে যে গদ্যের প্রচলন সে সময় ঘটে তা ছিল একান্তই গতিহীন, নিরস এবং আড়ষ্ট। সংস্কৃতবহুল এই আড়ষ্ট গদ্যের দ্বারা প্রথম অর্গলমুক্ত করেন প্যারীচাঁদ মিত্র তাঁর ‘আলালের ঘরের দুলাল’ গ্রন্থে প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহৃত ভাষাকে লিখিত তথা বইয়ের ভাষায় স্থান করে দেওয়ার মাধ্যমে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায় :

…সংস্কৃতপ্রিয়তা এবং সংস্কৃতানুকারিতা হেতু বাঙ্গালা সাহিত্য অত্যন্ত নীরস, শ্রীহীন, দুর্ব্বল এবং বাঙ্গালা সমাজে অপরিচিত হইয়া রহিল। টেকচাঁদ ঠাকুর প্রথমে এই বিষবৃক্ষের মূলে     কুঠারাঘাত করিলেন। তিনি ইংরেজিতে সুশিক্ষিত। ইংরেজিতে প্রচলিত ভাষার মহিমা দেখিয়াছিলেন এবং বুঝিয়াছিলেন। তিনি ভাবিলেন, বাঙ্গালার প্রচলিত ভাষাতেই বা কেন গদ্যগ্রন্থ রচিত হইবে না? যে ভাষায় সকলে কথোপকথন করে, তিনি সেই ভাষায় “আলালের ঘরের দুলাল” প্রণয়ন করিলেন। সেই দিন হইতে বাঙ্গালা ভাষার শ্রীবৃদ্ধি। সেই দিন হইতে শুষ্ক তরুর মূলে জীবনবারি নিষিক্ত হইল।

সেই দিন থেকেই ‘সাধুভাষা এবং অপরভাষা’ দুই প্রকার ভাষায়ই গ্রন্থ ‘প্রণয়ন হইতে লাগিল’। দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত ভাষাকে লিখিত ভাষায় প্রয়োগকে ‘সংস্কৃত ব্যবসায়ী’রা প্রচণ্ড ঘৃণার চোখে দেখতে থাকেন এবং বাংলা গদ্য পুরোপুরি দুটি বিপরীতমুখী ধারায় প্রবাহিত হতে থাকে। এক ধারায় খাঁটি সংস্কৃতবাদীরা অন্যধারায় ‘অধিকাংশ সুশিক্ষিত ব্যক্তিরা’। বাংলা গদ্যের এই দ্বিমুখীবিবাদ মেটাতে এগিয়ে আসেন স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র। বাংলা গদ্যে ভাষা ব্যবহার বা শব্দ প্রয়োগে দ্বিধাবিভক্তির সমাধানে তিনি যে সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা দিলেন, তা কাল নিরপেক্ষভাবেই ভাষা ব্যবহারের এক ধ্র“পদী সূত্র হিসেবে সর্বজন মান্য হয়ে রইলো। তিনি লিখলেন :

অতএব ইহাই সিদ্ধান্ত করিতে হইতেছে যে, বিষয় অনুসারেই রচনার ভাষার উচ্চতা বা সামান্যতা নির্দ্ধারিত হওয়া উচিত। রচনার প্রধান গুণ এবং প্রথম প্রয়োজন, সরলতা এবং স্পষ্টতা। যে রচনা সকলেই বুঝিতে পারে এবং পড়িবামাত্র যাহার অর্থ বুঝা যায়, অর্থগৌরব থাকিলে তাহাই সর্বোৎকৃষ্ট রচনা। তাহার পর ভাষার সৌন্দর্য্য, সরলতা এবং স্পষ্টতার সহিত সৌন্দর্য্য মিশাইতে হইবে। অনেক রচনার মুখ্য উদ্দেশ্য সৌন্দর্য সে স্থলে সৌন্দর্য্যরে অনুরোধে শব্দের একটু অসাধারণতা সহ্য করিতে হয়। প্রথমে দেখিবে, তুমি যাহা বলিতে  চাও, কোন্ ভাষায় তাহা সর্বাপেক্ষা পরিষ্কারভাবে ব্যক্ত হয়। যদি সরল প্রচলিত কথাবার্ত্তার ভাষায় তাহা সর্ব্বাপেক্ষা সুস্পষ্ট এবং সুন্দর হয়, তবে কেন উচ্চভাষার আশ্রয় লইবে? যদি সে পক্ষে টেকচাঁদি বা হুতোমি ভাষায় সকলের অপেক্ষা কার্য্য সুসিদ্ধ হয়, তবে তাহাই ব্যবহার করিবে। যদি তদপেক্ষা বিদ্যাসাগর বা ভূদেববাবু প্রদর্শিত সংস্কৃতবহুল ভাষায় ভাবের অধিক স্পষ্টতা এবং সৌন্দর্য্য হয়, তবে সামান্য ভাষা ছাড়িয়া সেই ভাষার আশ্রয় লইবে। যদি তাহাতেও কার্য্য সিদ্ধ না হয়, আরও উপরে উঠিবে; প্রয়োজন হইলে তাহাতেও আপত্তি নাইনিষ্প্রয়োজনেই আপত্তি। বলিবার কথাগুলি পরিস্ফুট করিয়া বলিতে হইবেযতটুকু বলিবার আছে, সবটুকু বলিবেতজ্জন্য ইংরেজি, ফার্সি, আরবি, সংস্কৃত, গ্রাম্য, বন্য যে ভাষার শব্দ প্রয়োজন, তাহা গ্রহণ করিবে, অশ্লীল ভিন্ন কাহাকেও ছাড়িবে না। তার পর সেই রচনাকে সৌন্দর্য্যবিশিষ্ট করিবেকেন না, যাহা অসুন্দর, মনুষ্যচিত্তের উপরে তাহার শক্তি অল্প।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রবর্তিত উল্লিখিত বাংলা গদ্যেরই একচ্ছত্র আধিপত্য লক্ষ করা যায় রবীন্দ্রনাথের লেখক জীবনের একটা পর্যায় পর্যন্ত, সুনির্দিষ্ট করে বললে বলা যায় ১৯১৪ সাল পর্যন্ত, অন্যভাবে বলা যায় প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত সবুজপত্র পত্রিকা প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত। শব্দ ব্যবহারে বঙ্কিমচন্দ্র কোন রক্ষণশীলতাকে প্রশ্রয় না দিলেও দীর্ঘ সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ ব্যবহৃত ভাবগম্ভীর সাধুরীতির গদ্যই সবুজপত্র পত্রিকা প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথসহ তাবৎ লেখক সমাজের বলতে গেলে একমাত্র অবলম্বন হিসেবে দেখা যায়। স্বল্পদৈর্ঘ্যরে সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ যুক্ত চটুল গতির ‘চলিতরীতি’র গদ্যও যে সাহিত্যের বাহন হতে পারে এই চিন্তা তৎকালীন লেখককুল মেনে নিতে দ্বিধান্বিত ছিলেন। বাংলা গদ্যের এই অচলায়তনের উপর প্রথম আঘাত হানলেন প্রমথ চৌধুরী তাঁর সবুজপত্র পত্রিকার মাধ্যমে। সুকুমার রায়ের ভাষায়, ‘…প্রমথবাবুর সম্পাদিত সবুজপত্র প্রকাশিত হইয়া শিক্ষিত বাঙ্গালীর সাহিত্য ও সমাজ চিন্তায় মর্মান্তিক ও গতানুগতিকতার উপর প্রাণান্তিক আঘাত হানিল’। (সুকুমার সেন, ১৯৭৬: ২৪৮) সে আঘাতে তিনি অর্জন করলেন ঈর্ষণীয় সাফল্য। কোলকাতাকেন্দ্রিক নাগরিক জনের ব্যবহৃত মুখের ভাষাকে তিনি সাহিত্যে স্থান দিয়ে বিপ্লব ঘটালেন বাংলা গদ্যে। প্রচলিত হলো সাহিত্যের সকল শাখায় ব্যবহার উপযোগী আধুনিক বাংলা গদ্য। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ প্রভাবিত হলেন এই রীতির দ্বারা। সবুজপত্র প্রকাশের পরে রচিত রবীন্দ্রগদ্যের প্রায় পুরোটাই বলা যায় চলিতরীতির। কবি জীবনের শেষ পর্বে রবীন্দ্রনাথ যে গদ্যকবিতা রচনা করেন একটু চিন্তা করলে বোঝা যায়, এই সময়ে রচিত গদ্যরচনাসমূহে মধ্য দিয়েই তার ভাষা তৈরি হতে থাকে ।

প্রশ্ন জাগে প্রমথ চৌধুরী এই অসাধ্য সাধনের সাহস এবং শক্তি কোথা থেকে অর্জন করলেন? প্রমথ চৌধুরীর বেড়ে ওঠার ইতিবৃত্ত ও জ্ঞান-সাধনার সামগ্রিক পারিবারিক-আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের মধ্যে নিহিত আছে তাঁর এই দুর্দান্ত সাহস এবং অসাধ্য সাধনের গূঢ় রহস্য। প্রমথ চৌধুরী এই ভাষারীতি প্রবর্তনে কথ্য বাংলাকে বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দেন যা তাঁর ছদ্মনাম ‘বীরবল’ অনুসারে বীরবলী ভাষা হিসেবে খ্যাতিলাভ করে। প্রথম পর্যায়ে সবুজপত্র তেমন সফলতা অর্জন না করলেও দ্বিতীয় পর্যায়ে তা ব্যাপকভাবে খ্যাতি লাভ করে। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের সবুজপত্র যুগের এবং পরবর্তীকালের গদ্য নিশ্চিতভাবেই প্রমথ চৌধুরী প্রবর্তিত সাহিত্যরীতি বা সবুজপত্রের সফলতাকেই প্রমাণ করে।

আলোচনার এক পর্যায়ে আমরা প্রমথ চৌধুরীর শক্তি ও সাহসের উৎস সন্ধানে যে প্রশ্ন তুলে ছিলাম, এই পর্যায়ে তার উত্তরে এ কথা বলা বোধ হয় অমূলক হবে না যে ব্যক্তি প্রতিভা প্রমথ চৌধুরীর এই যুগান্তকারী শক্তি ও উদ্যমের প্রধান উৎস ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। পত্রিকাটি প্রকাশের অনুপ্রেরণা থেকে শুরু করে সার্বক্ষণিক লেখক হিসেবেও সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী রবীন্দ্রনাথকে পেয়েছিলেন। সুকুমার সেন যথার্থই বলেছেন, ‘সবুজপত্রের সারথি রবীন্দ্রনাথ, গাণ্ডীবী সব্যসাচী প্রমথনাথ’। পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর ব্যবহৃত নতুন গদ্যরীতি থেকে সরে আসেন নি। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রগদ্যের পর্যায় বিভাজনে অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়ের মন্তব্য স্মরণযোগ্য। তিনি লিখেছেন, ‘রবীন্দ্র-গদ্যরীতির প্রথম পর্ব জ্ঞানাঙ্কুর-ভারতীর যুগ (১৮৭৬-১৮৮৩), দ্বিতীয় পর্ব হিতবাদী-সাধনা-ভারতী-বঙ্গদর্শন-প্রবাসীর যুগ (১৮৮৪-১৯১৩), তৃতীয় পর্ব সবুজপত্রের যুগ (১৯১৪-১৯৪১)।’ আর আসেন নি বলেই সবুজপত্র প্রবর্তিত গদ্যরীতি বাংলা সাহিত্যে এমন স্থায়ী আসন লাভ করতে পেরেছিলো। সবুজপত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ যদি তাঁর ব্যবহৃত নতুন গদ্যরীতি থেকে সরে যেতেন তা হলে হয়তো প্রমথ চৌধুরী তথা সবুজপত্র প্রবর্তিত গদ্যরীতি বাংলা সাহিত্যে এমন স্থান অধিকার করতে পারতো না। কথাটিকে অন্যভাবে বলা যায় ভাষার মহাকারিগর রবীন্দ্রনাথ বাংলা গদ্যের ভবিষ্যৎ গতিপথের অনিবার্য বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি পুরোনো পথকে পরিহার করে নতুন পথের অভিযাত্রী হয়েছিলেন। প্রমথ চৌধুরী এবং সবুজপত্র সেই অভিযাত্রার উপলক্ষ মাত্র। আমরা জানি উপলক্ষকে অবলম্বন করেই প্রতিভার বিস্তার ঘটে। তাই রবীন্দ্রনাথ হয়তো বাংলা গদ্যরীতির খোলস পরিবর্তনের উপলক্ষ সন্ধানের অন্তর্গত প্রেরণা হিসেবেই ‘প্রমথ চৌধুরীকে উৎসাহিত করেছিলেন এ রকম একটি পত্রিকা প্রকাশে’।

রবীন্দ্রনাথকে প্রমথ চৌধুরীর প্রধান সহায়ক শক্তি হিসেবে মেনে নিয়েই একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে সবুজপত্র পত্রিকাই বঙ্কিম-পরবর্তী বাংলা গদ্যের বাঁক পরিবর্তনের প্রধান ভেলা। বাংলা কবিতার বাঁক পরিবর্তনে পঞ্চপাণ্ডবসহ তিরিশোত্তরদের যে ভূমিকা বাংলা গদ্যের বাঁক পরিবর্তনে সবুজপত্রের সেই ভূমিকা। পার্থক্য এই, তিরিশোত্তর কবিরা কবিতার নতুন বাঁক বিন্যাসে রবীন্দ্রনাথকে সচেতনভাবে পরিহার করেছিলেন আর বাংলা গদ্যের সবুজপত্রীয় বাঁক পরিবর্তনের প্রধান পুরুষ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। (অবশ্য বাংলা কবিতার আধুনিক কাব্যভাষা নির্মাণের অর্থাৎ কবিতায় গদ্যরীতি প্রচলনের শক্ত ভিত্তি রবীন্দ্রনাথের হাতেই তৈরি হয়েছিলো, আর এর প্রস্তুতির কাজটি তিনি সেরেছিলেন সবুজপত্র যুগে রচিত গদ্যের মাধ্যমেবিষয়টি পৃথক গবেষণার দাবি রাখে।)

সবুজপত্রকে কেন্দ্র করে বাংলা গদ্যরীতির যে ধারা প্রচলিত হয়, কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তারও পরিবর্তন ঘটতে থাকে। বিশেষ করে ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির পর থেকে ঢাকাকেন্দ্রিক বাংলাদেশের সাহিত্যে এই পরিবর্তনের রূপ আস্তে আস্তে দৃশ্যমান হতে থাকে। বর্তমানে যা অত্যন্ত স্পষ্ট আকার ধারণ করেছে। সাম্প্রতিককালের কোলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা গদ্য এবং ঢাকাকেন্দ্রিক বাংলা গদ্যের স্বাতন্ত্র্য বাংলা গদ্য সাহিত্যের নতুন বাঁক পরিবর্তনেরই স্মারক। ঢাকা কোলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা গদ্যের স্বাতন্ত্র্য মূলত দুইটি অঞ্চলের পৃথক আর্থসামাজিক পারিপার্শ্বিকতায় পৃথক জীবন বাস্তবতারই অনিবার্য ফল। সমাজ ও জীবনবাস্তবতার পরিবর্তনের পথ ধরেই পরিবর্তিত হয় ভাষা। এই পরিবর্তন লেখার অনেক আগেই আসে মানুষের মুখের ভাষায়যে টি ভাষার লিখিত রূপ গদ্য ও পদ্যের বাইরে আরেক রূপ। যাকে শিশিরকুমার দাশ বলেছেন ‘বচন’। মানুষের লিখিত গদ্য যখন তার সামগ্রিক সমাজ বাস্তবতাকে ধারণ করতে ব্যর্থ হয় তখনই সে দ্বারস্থ হয় বচনের। বচন আর গদ্যের পারস্পরিক ঘাতপ্রতিঘতেই এগিয়ে চলে ভাষা। ভাষা সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় উপাদান। শিশিরকুমার দাশ যথার্থই বলেছেন :

বচন থেকে গদ্যের সৃষ্টি; কিন্তু সেই সৃষ্ট গদ্য যখন বচন থেকে ক্রমশই দূরে চলে যেতে চায়, ক্রমশই তাদের মধ্যে দেখা দেয় বিরাট ব্যবধান, তখন আবার মানুষ প্রতিবাদ করে, গদ্যকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায় বচনের দিকে। বচনও গ্রহণ করছে গদ্যের কাছ থেকে, যাতে করে যেসব কাজ মানুষকে বচনের মাধ্যমে করতে হয়, তার ক্ষমতা বাড়ে। এইভাবে দেখা যাবে মানুষের সংস্কৃতির ইতিহাসের একটি অংশ হল বচন ও গদ্যের টানাপোড়েনের ইতিহাস।

বাংলা ভাষার সকল বাঁক পরিবর্তন বচন ও গদ্যের এই ঘাতপ্রতিঘাতেরই যৌক্তিক পরিণতি।

 

সবুজপত্র ও প্রাথমিক গদ্যভাষা

বিলু কবীর

[গবেষক ও প্রাবন্ধিক]

মানুষটা পাবনার। জন্মেছিলেন যশোরে। ডেপুটিমেজিস্ট্রেট বাবা দুর্গাদাস চৌধুরীর সেখানে তখন পোস্টিং। জমিদার, অভিজাত। গড় মন্তব্য না হলেও এ কথা অনেক ক্ষেত্রে খাটে যে, জমিদার পুত্রদের খুব একটা প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া হয় না। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। তাঁরা অনেক ক্ষেত্রে প্রাচুর্যের অকল্যাণে বখে যাওয়া, অকর্মা, ভোঁতা কিছিমের হন। কিন্তু প্রমথ চৌধুরীর বেলায় অন্য কথা। তিনি একেবারে ‘বাপ কা বেটা’। কোলকাতা হেয়ার স্কুলে এন্ট্রাস আর সেন্ট জেভিয়ার্স-এর এফএ। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে দর্শন শাস্ত্রে বিএ অনার্স প্রথম শ্রেণিতে প্রথম। এমএ-র বেলায় ইংরেজি, এতেও যথারীতি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান! এন্ট্রাস আর এফএ-তো রেজাল্ট মনে হয় অনার্স আর এমএ-র মতো অতো ভালো নয়। কারণ তাঁর বেলায় পাশের উল্লেখই পাওয়া যায় না। বাঙালির ক্ষেত্রে এইটেই অভ্যেস। দেখবেন যে অনেকের বেলায় বলা হয় ‘সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম’ মানে স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে না, এক্ষেত্রে সন্দেহ করা চলে যে, উক্ত ‘সম্ভ্রান্ত’ নিয়ে প্রশ্ন আছে। পাঠক হয়তো ভাবছেন, এমন তীর্যক বিরূপাক্ষিক হেঁয়ালি কেনো করছি! করছি মান হয়ে যাচ্ছে। এই লেখার প্রধান প্রতিপাদ্য প্রমথ চৌধুরীর (বীরবল) এখানে প্রভাবক হিসাবে কাজ করছেন। কারণ বাংলা সাহিত্যে তিনিই প্রথম বিদ্রুপাত্মক প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। শানানো মেধাভিত্তিক তীর্যক কটাক্ষে বাংলা গদ্য লেখার তিনিই পথিকৃৎ। যাই হোক, ইংরেজিতে স্নাতোকোত্তর করে তিনি বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি (ব্যারিস্টারি কথাটা ভুল) পাশ করে আসেন। ব্যাবহারজীবী হিসাবে তিনি কাজ শুরু করেন কলকাতা হাইকোর্টে। কিন্তু এই কাজে তাঁর মন বসবে কেনো? মাত্র কিছুদিন। তারপর আর আদালতের বারান্দায় তাঁকে দেখা যায় নি। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনি কলেজে অধ্যাপনা। সেও মাত্র কিছুদিন। বহরমপুর ও কোচবিহার কলেজে যে অধ্যক্ষের চাকুরি, তাকে তো তিনি প্রত্যাখানই করে বসলেন। শেষে ঠাকুর এস্টেটের ম্যানেজার। সেও তাঁর খুব একটা ভালো লেগেছিলো কী? শেষ পর্যন্ত সাহিত্যচর্চায় মননিবেশ এবং পুরোপুরি আত্মনিবেদন বলতে যা বোঝায়, তাই করলেন তিনি। ইতোমধ্যে বাংলা, ফরাসি এবং ইংরেজি সাহিত্যে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিদগ্ধ। পড়াপাগল গ্রন্থকীট প্রমথ চৌধুরী এই যে বলা যায়, এখানে-ওখানে কিছুদিন করে করে কাজে ইস্তফা দিয়ে লেখালিখিতে যোগ দিলেন, এখানটায় তিনি স্থির হতে পেরেছিলেন। এটাই স্বাভাবিক। এখানেই পুঞ্জীভূত ছিল তাঁর মানসক্ষুণিœবৃত্তির ও জ্ঞানতৃষ্ণার যাবতীয় উপাচার।

প্রমথ চৌধুরী রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় অগ্রজ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৪২-১৯২৩) কন্যা ইন্দিরা দেবীকে (১৮৭৩-১৯৬০) বিয়ে করেছিলেন। তিনি ছিলেন কাকা-শ্বশুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ে সাত বছরের ছোট, অর্থাৎ একেবারে সমবয়সী। প্রমথ যে সবুজপত্র সাহিত্যপত্রিকাটি বের করতেন, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তার একেবারে নিয়মিত লেখক। মোট একশো ছয়টি সংখ্যা বের হয়েছিলো সবুজপত্রর (১৩৩৩ সালে ভাদ্র সংখ্যাটি বোধ হয় বেরোই নি।) তো এই একশো ছয়টি সংখ্যার মধ্যে তেষট্টিটি সংখ্যাতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ছিলো। এর মধ্যে কোনো কোনো সংখ্যায় তাঁর একাধিক লেখা রয়েছে (৪-৫টি পর্যন্ত)। তেষট্টিটি সংখ্যায় প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখার পরিমাণ একশো পঁচিশটি। মানে গড়ে তিনি প্রতিটি সংখ্যায় লিখেছেন ১.১৮টি লেখা। এই হিসাব কষার পর মনে হলো তাহলে তো রবীন্দ্রনাথ সবুজপত্রের কেবল নিয়মিত লেখকই নন, প্রধান লেখকও বটে। তখন, আবার একটা সাহিত্য-অডিট করে দেখা গেলো, এতে তারপরে সব চেয়ে বেশি লিখেছেন তার সম্পাদক এবং ভ্রাতৃজামাতা প্রমথ চৌধুরী। সম্পাদকীয় ধরনের লেখাগুলো বাদ দিলে এতে প্রমথ চৌধুরীর স্বনামে লিখেছেন আটানব্বইটি এবং ‘বীরবল’ ছদ্মনামে লিখেছেন বায়ান্নটি, মোট মিলিয়ে একশো পঞ্চাশটি লেখা। তবুও সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারে রবীন্দ্রনাথই প্রধান, যেহেতু প্রমথ চৌধুরী পৃথক পৃথক নামে লিখেছেন, সেহেতু তাঁকে আলাদা আলাদা দুটি সত্তা বিবেচনা করাই সঠিক গ্রহণযোগ্য হবে। আর একটি হিসাব হলো, সম্পাদকীয় বাদ দিয়ে সমুদয় সবুজপত্রয় প্রকাশিত মোট লেখার সংখ্যা ছয়শো ছিয়াশিটি। তার মধ্যে কাকা-শ্বশুর আর ভাইপো-জামাই-ঠাকুর ও চৌধুরীই লিখেছেন দুইশো পঁচাত্তরটি লেখা। মানে তাঁরা দুইজন মিলে লিখেছেন চল্লিশ শতাংশ রচনা। অতএব, এই জামাতাটি যে ঠাকুরের মনের মতো ছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ তো থাকার কথা নয়।

অবাক হবার বিষয় হলো স্বভাবতই রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আপন আলোয় উজ্জ্বল। সেই সময়ে এমন সাহিত্যিক পাওয়া এই আমলের মতোই ভার ছিলো যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর উপর কমবেশি প্রভাবক হিসেবে কাজ করেন নি। কিন্তু ব্যক্তিত্ব এবং সাহিত্য প্রতিভার বিচার করলে অবাক বলতে হয় যে, প্রমথ চৌধুরী এক অণুও রবিঠাকুরের দ্বারা প্রভাবিত নন। যদিও তাঁরা বয়সের দিক দিয়ে খুব কাছাকাছি, একে অপরের সাথে সাহিত্যিক ও পারিবারিক পর্যায়ে লাগোয়া-একাকার। মানে রবিঠাকুরের থেকে দূরে থেকেও যেখানে রবিসংক্রমণে বাধ্য, সেখানে প্রমথ চৌধুরী তাঁর সাথে একেবারে মিলেমিশে থেকেও আলাদা। শুধু রবীন্দ্রপ্রভাবমুক্ত থাকাই নয়, সেভাবে যুক্ত থেকে আলাদা একটা ‘সাহিত্যভাষা’ বা ‘গদ্যভাষা’র প্রবন্ধজগত এবং সবুজপত্রর সুবাদে সাহিত্য-আন্দোলন গড়ে তুলতে তিনি উল্লেখযোগ্য সফল ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর এই স্বতন্ত্র সাহিত্য-সাধনার বদৌলতে তিনি যে একটি লেখক গোষ্ঠী তৈরি করে নিতে পেরেছিলেন, সেই আমলে রবীন্দ্রবলয়ের বাইরে এইরকম আর একটি পৃথিবী নির্মাণ করা অবশ্যই খুব কঠিন কাজ ছিলো। হিম্মতের অনুশীলন ছিলো।

সবুজপত্র প্রমথ চৌধুরীর অনবদ্য সাহিত্যসৃষ্টি এবং এমনই সৃষ্টি যে এর মাহত্ম্য তাকেও বহুলাংশে নির্মাণ করেছে। মানে সবুজপত্র যেমন তার ¯্রষ্টার সৃষ্টি তেমনই ঐ সৃষ্টিও তার ¯্রষ্টার সৃজক। রবীন্দ্ররৌদ্রমুক্ত এবং প্রথম-আলোর উচ্ছ্বাসে উদ্ভাসিত এই সবুজপত্র। রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িককালে রবীন্দ্রপ্রভাবমুক্ত একটি পত্রিকা দাঁড় করানো অবশ্যই কঠিন কর্মযজ্ঞ এবং বিশেষ প্রতিভা-যোগ্যতার ব্যাপার ছিল। সবুজপত্রের সুবাদে প্রমথ চৌধুরী একটি সাহিত্য-আবহ, লেখক গোষ্ঠী, রচনার ধরণ, এমনকি চলিতজবানির গদ্যের ভাবরীতি পর্যন্ত গড়ে তুলতে সক্ষম হন। তাঁর লেখকদের মধ্যে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও ছিলেন। এতে প্রমথ চৌধুরী সম্পাদকীতো লিখতেনই, লিখতেন স্বনামে এবং বেনামে (বীরবল ছদ্মনামে)। এতোদিন বাংলা গদ্য সাধুভাষায় রচিত হচ্ছিল। যার মধ্যে ছিল বইয়ের-বুলির জীবনদূরত্বের দৌরাত্ম্য। সাধারণ মুখচলিত যে আটপৌরে ভাষা, আঞ্চলিক ভাষা, আঞ্চলিক জবান, অভিজাত্যের মুখোশমুক্ত শব্দমালা, এদিয়েও যে গদ্য রচিত হতে পারে এবং তার পাঠগতি যে তুলনায় সাবলীল-দ্রুত, ঊনবিংশ শতাব্দী জুড়ে সেটা প্রায় ভাবাই হয়নি। কিন্তু বিষয়টি যে সম্ভব এবং তুলনায় সুন্দর, তা-ই প্রমাণ করে সবুজপত্র বা সবুজপত্রের লেখকগোষ্ঠী বা তার ¯্রষ্টা সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী। গদ্যনির্মিতিতে মৌখিক প্রকৃত ভাষা যে কতটাই লাগসই এবং গতিশীল, সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন প্রমথ চেীধুরী। বলা প্রয়োজন যে, এর আগে এক্ষেত্রে সামান্য চেষ্টা চলছিল, কিন্তু তা যেনো ঠিক হালে জল পায় নি। সেইসব ব্যর্থতার গ্লানি এবং বিমুখ হওয়া সাহিত্যসুন্দরকে মৌলিকত্ব দিতে সবুজপত্র প্রভাবক হয়ে ওঠে। এর আগেও রবিঠাকুর কিছু কিছু কথা চলতিজবাবে লিখতে প্রয়াস পেয়েছিলেন। তবে তাঁর গদ্যের মূল আশ্রয় ছিল সাধুভাষা। কিন্তু সবুজপত্রের প্রভাবে যখন যখন তিনি চলিত ভাষার গদ্য লেখার গতিসারল্য অনুধাবন করেন, তখন থেকে পুরোদস্তর তাঁর গদ্যের বাহন হয়ে দাঁড়ায় চলিত বা আঞ্চলিক কথ্যভাষা। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথসহ সমকালীন গদ্যকারদের চোখের সামনে থেকে সবুজপত্র বা প্রমথ চৌধুরীই সেই অবগুণ্ঠনটি সরিয়ে দেন, যার জন্য তাঁরা চলিতভাষার সরল সবল উৎসগুলোকে ঠাওর ব্যর্থ হয়েছিলেন। অতএব, আজকে এই বিপুল সম্পদশালী বাংলা গদ্যজগৎ, এই যে বিবিধ গণমাধ্যমের সাধারণ মানুষের আটপ্রহরের সহজগ্রাহ্য ভাষা, এর পটভূমি যে পত্রিকাটির ভূমিকা, সেটি হলো সবুজপত্র, যে লেখকগোষ্ঠীর অবদান সেটি হলো ‘বীরবল’।

 

সবুজপত্র : একশ বছর আগে

মাসুদ পারভেজ

[শিক্ষক ॥ বাংলা বিভাগ ॥ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ॥ সিলেট]

সবুজপত্র প্রকাশের তারিখ দেখলে সহজে বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনে এর জন্ম হচ্ছে। অর্থাৎ প্রকাশক কিংবা সম্পাদক এই তারিখকে বেছে নিচ্ছেন পয়মন্ত মনে করে যেহেতু বাংলা সাহিত্যের সমকালীন এক প্রভাবশালী লেখক এইদিনে জন্মগ্রহণ করেছেন। আবার লেখকের প্রতি বিনয় প্রদর্শনের জন্যেও এটা করতে পারেন। এই বিনয়টা লেখকের কৃপা পাওয়ার আশায়ও হতে পারে। এ সবই অনুমান কারণ সম্পাদক প্রথম সংখ্যার যে সম্পাদকীয় লেখেন তাতে তিনি পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্য কিংবা সবুজপত্র নিয়ে তাদের স্বপ্নাকাক্সক্ষা তুলে ধরেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের বিখ্যাত উক্তি‘একটা নতুন কিছু করো’ এর মধ্য দিয়ে সবুজপত্র পত্রিকার মুখবন্ধ শুরু হলেও সম্পাদক জানান দিচ্ছেন এটাই তাদের সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য নয়। আরও উদ্দেশ্য আছে এবং সেটাই মুখ্য। সম্পাদক খোলাসা করে বলেছেন, সমকালীন যে সাহিত্যপত্রিকাগুলো নিজেদের ‘গুণক্রম’ করছেন তা থেকে সবুজপত্র আলাদা হবে। আরও বলা হচ্ছে‘দলবদ্ধ হয়ে আমরা সাহিত্য গড়তে পারি নে, গড়তে পারি শুধু সাহিত্য-সম্মিলন।’ বুঝা যাচ্ছে সবুজপত্র সাহিত্য গড়তে আগ্রহী সাহিত্য-সম্মিলন নয়। আর এই সাহিত্য গড়তে নতুন লেখক তৈরি করতে চেয়েছেন। তবে নতুন লেখকদের সন্ধান পেতে তাকে কিছুটা অপেক্ষা করতে হয়েছে বৈ কি। তারও আগে তিনি বাংলা সাহিত্যের ‘ভোরের পাখি’ লেখকদের সবুজপত্রের ডালে বসার জন্যে আহ্বান করেছেন এবং আরও বলেছেন, আর এটা যদি সম্ভব হয় তাহলে আমাদের মন ও চরিত্রের অভাব দূর করা যাবে। সেক্ষেত্রে সম্পাদক বলেছেন‘আমরা নিত্য লেখায় ও বক্তৃতায় ‘দৈন্যকে ঐশ্বর্য্যকে বলে’, ‘জড়তাকে সাত্ত্বিকতা বলে’, ‘আলস্যকে ঔদাস্য বলে’, ‘শ্মশান-বৈরাগ্যকে ভুমানন্দ বলে’, ‘উপবাসকে উৎসব বলে’, ‘নিষ্কর্মকাকে নিষ্ক্রিয় বলে’, প্রমাণ করতে চাই।’ আমরা এসব কেন করি সেটাও তিনি বলেছেন‘ছল দুর্বলের বল। যে দুর্বল সে অপরকে প্রতারিত করে আত্মপ্রসাদের জন্ আত্মপ্রবঞ্চনার মত আত্মঘাতী জিনিস আর নেই।’

এইসব অজুহাত ঠেলে সবুজপত্র কী ধরনের সাহিত্যপত্র প্রকাশ করবে তা সম্পাদক উল্লেখ করেছেন। এই সাহিত্যের বহির্ভূত লেখা আমাদের কাগজ থেকে বহির্ভূত করবার একটি সহজ উপায় আবিষ্কার করেছি বলে, আমরা এই নতুনপত্র প্রকাশ করতে উদ্যত হয়েছি। একটা নতুন কিছু করবার জন্য নয়, বাঙ্গালীর জীবনে যে নূতনত্ব এসে পড়েছে তাই পরিষ্কার করে প্রকাশ করবার জন্য।

প্রশ্ন জাগে বাঙালী জীবনে এই নূতনত্ব বলতে সম্পাদক কী বুঝাচ্ছেন? এই নূতনত্ব বলতে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বন্ধনকে ইঙ্গিত করেছেন।

সম্পাদকীয়তে আরও জানা যায় যে, আমাদের দেশে সাহিত্য ব্যবসা-বাণিজ্যের অঙ্গ হয়ে না ওঠাতে আমরা সবাই সাহিত্য সমাজের সখের কবির দল। আর এই সখের কবির দলের কাছে সাহিত্য কাজও নয় খেলাও নয়, শুধু অকাজ, কারণ খেলার ভিতর যে স্বাস্থ্য ও স্বচ্ছন্দতা আছে, সে লেখায় তা নেইঅপরদিকে কাজের ভিতর যে যতœ ও মন আছে, তাও তাতে নেই। আর এ কারণে ‘বঙ্গসাহিত্য পুষ্পিত না হয়ে পল্লবিত হয়ে হয়ে উঠেছে।’ তার মানে দাঁড়ায় বঙ্গসাহিত্য সেই সময়েও মানের চেয়ে সংখ্যার আধিক্যর মধ্যে ছিল :

ফুলের চাষ করতে হয়, জঙ্গল আপনি হয়। অতিকায় মাসিক পত্রগুলি সংখ্যাপূরণের জন্য এই আগাছার অঙ্গীকার করতে বাধ্য, সেই কারণে আগাছার বৃদ্ধি ও প্রশ্রয় দিতেও বাধ্য। এইসব দেখে শুনে, ভয়ে সঙ্কুচিত হয়ে আমাদের কাগজ ক্ষুদ্র আকার ধারণ করেছে।

আর সবুজপত্রে কী ধরনের লেখা থাকবে তা নিয়ে বলেন :

স্ত্রী পাঠ্য, শিশু পাঠ্য, স্কুল পাঠ্য এবং অপাঠ্য প্রবন্ধ সকল, অনাহূত কিংবা রবাহূত হয়ে আমাদের দারস্থ হলেও আমরা তাদের স্বস্থানে প্রস্থান করতে বলতে পারব, কারণ আমাদের ঘরে স্থানাভাব। এককথায় শিক্ষাপদ প্রবন্ধ আমাদের প্রকাশ করতে হবে না। এর লাভ যে কি তিনিই বুঝতে পারবেন। তিনি জানেন যে, যে কথা একশবার বলা হয়েছে তারি পুনরাবৃত্তি করাই শিক্ষকের ধর্ম্ম ও কর্ম্ম। যে লেখায় লেখকের মনের ছাপ নেই, তা ছাপালে সাহিত্য হয় না।

তিনি লেখার জন্যে নির্দিষ্ট সীমানার কথা বলেছেন :

এই সীমানা দেশ কালের সীমানা নয় এটা আকার নির্ধারণে। সাহিত্য গড়তে কোন বাইরের নিয়ম চাইনে, চাই শুধু আত্মসংযম। লেখায় সংযত হবার একমাত্র উপায় হচ্ছে সীমার ভিতর আবদ্ধ হওয়া, আমাদের কাগজে আমরা তাই সেই সীমা নির্দিষ্ট করে দেবার চেষ্টা করব।

তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিলন ঘটাতে চেয়েছেন, আরও চেয়েছেন বড়কে ছোটর ভিতরে ধরে রাখতে। আমাদের বাঙ্গাল ঘরের খিড়কি দরজার ভিতর প্রাচীন ভারতবর্ষের হাতী গলাবার চেষ্টা করতে হবে, আমাদের গৌড়-ভাষার মৃৎ-কুম্ভের মধ্যে সাত সমুদ্রকে পাত্রস্থ করতে হবে। এ সাধনা অবশ্য কঠিন। কিন্তু স্বজাতির মুক্তির জন্য অপর কোনও সহজ সাধন পদ্ধতি আমাদের জানা নেই।

এসব গেল সবুজপত্র নিয়ে প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়।

লিটল ম্যাগাজিন যারা বের করেন তাদের সবার মনে এক ধরনের আশা এবং স্বপ্ন থাকে। আর এই আশায় বসত করে তাঁরা সাহিত্য ধারণ করতে চান, সাহিত্য লালন করতে চান, স্বজাতির মুক্তির আকক্সক্ষা করেন। সবুজপত্র পত্রিকার সম্পাদকের কাছ থেকে আমরা এই কথাগুলোই পাচ্ছি।

সবুজপত্র পত্রিকা প্রথম পর্যায়ে ১৩২১ বঙ্গাব্দ থেকে ১৩২৯ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়। তারপর দ্বিতীয় পর্যায়ে আবার ১৩৩২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয় এবং দুই বছর পর ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে তা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

আমাদের লেখার জন্যে যে চলিত গদ্যরীতি তা সবুজপত্রের দান। নতুন লেখক তৈরিতেও সবুজপত্রের ভূমিকা রয়েছে। সবুজপত্র বন্ধ হওয়ার আগে বাংলা সাহিত্যের জন্যে কিছু কাজ করে। সাহিত্য পত্র পত্রিকায় বুদ্ধদেব বসু সবুজপত্র নিয়ে বলেন :

… এর প্রথম দান প্রমথ চৌধুরী বা বীরবল। দ্বিতীয় দান চলিত ভাষার প্রতিষ্ঠা। তৃতীয় এবং হয়তোবা মহত্তম দান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রমথ চৌধুরী এবং রবীন্দ্রনাথ, এ দুজনের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল সবুজপত্রের, প্রথমজনের আত্মপ্রকাশের জন্য, দ্বিতীয় জনের নতুন হবার জন্য।…

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নতুন হওয়ার যে প্রসঙ্গ বুদ্ধদেব বসু তুলেছেন তা প্রথম পাঁচটি সংখ্যার দিকে চোখ রাখলে কিছুটা বুঝা যাবে। প্রথম পাঁচটি সংখ্যায় মোট লেখা ছাপানো হয় তেত্রিশটি। তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ছিল ষোলটি। এইসব লেখার ভাষা ভাব কিংবা ভঙ্গি কী ছিল তা পাঠক নিজেই পড়ুন তাহলে চিরসবুজ থাকবে সবুজপত্র।

 

শতবর্ষে সবুজপত্র : বিবিধ ভাবনা

মোহাম্মদ শেখ সাদী

[শিক্ষক ॥ বাংলা বিভাগ ॥ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়]

ভাষা বহতা নদীর মতো। এর নিজস্ব স্বতঃস্ফূর্ত একটি গতিপথ রয়েছে। জোর করে কেউ সেই গতিমুখ ফেরাতে চাইলেও, এটি স্বধর্ম অনুযায়ী আপন বৈশিষ্ট্য নিয়ে কালের ভেলায় অনায়াসে ভেসে বেড়ায়। পরিবর্তন, পরিমার্জনের মধ্যে দিয়ে কালের নৌকা বেয়ে তা যেমনই হোক; টিকে থাকে আপন মহিমায়। ভাষা বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে চলে। এটিই নিয়ম। এটিই তার প্রকৃতি। খটকা লাগতে পারে, সবুজপত্র নিয়ে লিখতে বসেকী প্রলাপ বকছি! অনেকেই মনে করেন প্রমথ চৌধুরীই কথ্যভাষারীতির প্রবর্তক। পাঠ্যসূচিভুক্ত বইপত্রেও এর সমর্থন মেলে। প্রমথ চৌধুরীর পূর্বেও যে কথ্যরীতি সাহিত্যে কথ্যরীতি প্রচলনের প্রচেষ্টা হয়েছেসে বিষয়ে খানিকটা অস্পষ্টতা রয়েই গেছে। তবে প্রমথ চৌধুরীই যে এ রীতির সফল প্রণেতাসে বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। যা-ই হোক, সবুজপত্র প্রমথ চৌধুরীর সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা বা সাময়িক পত্র। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধন ও বিকাশের ক্ষেত্রে ‘সাময়িক পত্র’ কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছে। উনিশ শতকে সাময়িক পত্রের হাত ধরেই বাংলা গদ্যরীতি বলিষ্ঠতা অর্জন করে। ‘বঙ্গদর্শন’, ‘সাধনা’, ‘ভারতী’, ‘কল্লোল’ ও সবুজপত্র এক্ষেত্রে সবচেয়ে জ্যোতির্ময় দীপ্তি ছড়িয়েছে। এগুলোর মধ্যে সবুজপত্রর ভূমিকা বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতেই অগ্রগণ্য। কিন্তু প্রমথ চৌধুরী যে কথ্য ভাষা-রীতিকে সাহিত্যের সুযোগ্য বাহন মনে করলেনতা কিন্তু তাঁর অভিনবত্ব নয়। তাঁর কৃতিত্ব অন্য জায়গায়। প্রমথ চৌধুরীর পূর্বেও কথ্য বা মৌখিক ভাষা-রীতিকে সাহিত্যে ব্যবহার ও প্রয়োগের প্রচেষ্টা হয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ভবানীচরণের ‘কলিকাতা কমলালয়’, ‘নববাবুবিলাস’ ও ‘নববিবিবিলাস’ প্রভৃতি গ্রন্থে এ রীতির সূচনা পরিলক্ষিত হয়। প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলালে’ও তার প্রয়াস রয়েছে। তবে প্যারীচাঁদের চেয়ে কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’য় খানিকটা উৎকর্ষ পরিলক্ষিত হয়। তবে যাই হোক, এদের কোন প্রচেষ্টাই সফলভাবে পথ চলতে সক্ষম হলো না। কাল-পরিক্রমায় এসব পদক্ষেপ একেবারে হারিয়ে না গেলেও, ভবিষ্যৎ পথ-নির্দেশে তা সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। প্রমথ চৌধুরীর হাতেই বাংলা ভাষার কথ্যরীতি পেল যোগ্য মর্র্যাদা ও অন্তহীন পথ চলার প্রেরণা। মৌখিক বা কথ্য-রীতির ভাষাকে কিছুটা মার্জিততর করে, তিনিই সাহিত্যে এ রীতির সফল প্রণেতা হিশেবে আজও জয়মুকুট পরিধান করে আছেন। সুদীর্ঘকালের সংস্কারাচ্ছন্ন বাঙালিমানসে সবুজপত্র যেনো এক জীয়নকাঠি। প্রমথ চৌধুরী শুধু কথ্য ভাষারীতিকেই চালু করে ক্ষান্ত হননি। তাঁর দৃষ্টি ছিল সুদূরপ্রসারী। এই ভাষারীতি তাঁর সাহিত্যাদর্শের অবলম্বন হলো মাত্র; তিনি চমক দেখালেন অন্যত্র। তাঁর বাকভঙ্গিই সবুজপত্রের বিশেষ দিক। যেখানে তিনি চিরায়ত ভাবাবেগ ও ঐতিহ্যের বদলে বেছে নিয়েছেন বুদ্ধিবাদ ও যুক্তিবাদকে। বাঙলির ঘুমন্ত মনকে জাগ্রত করা, আর সাহিত্যে জীর্ণতা ও প্রথাবদ্ধতা দূরীকরণেই তাঁর এই সাধনা। তিনি সফলও হয়েছিলেন। তাই তাঁর এ ভাষাদর্শ ও সাহিত্যাদর্শ উপযোগিতাগুণে আজ প্রায় সকলের কাছেই আন্তরপ্রেরণারূপে কাজ করছে। ১৯১৪ সালে প্রথম প্রকাশিত সবুজপত্রে কথ্য-গদ্যরীতির পূর্ণপ্রাণ প্রতিষ্ঠা ও এতে সজীবতা দান করতে পেরেছিলেন বলেই, আজ ২০১৪ সালেও তা বিস্ময়ে ভাবছি। বাঙালি মন ও সমাজে, ভাষা ও সাহিত্যে প্রমথ চৌধুরী যে শৈলিগত নতুনত্বের সূচনা করলেন, তা বংলা ভাষা ও সাহিত্যে পূর্বে ছিলো না। সবুজপত্র তাই এই গৌরবের পথিকৃৎ। বাক্-চাতুর্য, মননশীলতা, যুক্তিবাদ, মুক্ত-চিন্তা-নির্ভর অসাধারণ গদ্যরীতিতে সৃষ্ট সবুজপত্র বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে তাই এক ব্যতিক্রমী, কিন্তু সবচেয়ে কার্যকরী সাহিত্য পত্রিকা। সবুজপত্রর মাধ্যমে ‘বীরবলীচক্রই গড়ে ওঠেছিলো। রবীন্দ্রনাথও তাঁর গদ্যকে অধিক শাণিত করার প্রেরণা লাভ করলেন এই সময়ে। প্রমথ চৌধুরী সেই সফল ব্যক্তিত্ব, যিনি রবীন্দ্রযুগেও একটি স্বতন্ত্র যুগের প্রবর্তক। তাঁর চলিত ভাষারীতির সৌকর্য রবীন্দ্রনাথের ওপর যে কার্যকরী প্রভাব বিস্তার করেছিলতাও এক বিস্ময়কর ঘটনা। বাংলা সাহিত্যচর্চা আজও তাঁর প্রদর্শিত ভাষারীতি অনুসরণ করে চলেছে। এটি এক অবিস্মরণীয় ও যুগান্তকারী ঘটনা। তবে কেউ কেউ আশঙ্কা করেন যে, বিশ্বায়ন ও অবাধ আকাশ-সংস্কৃতির বদৌলতে পাওয়া মিশ্র প্রবণতা ও সংস্কৃতি, আমাদের ভাষার স্বকীয়তাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করতে পারে। কারণ গ্রহণ-বর্জনের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন ভাষার শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে বাংলা ভাষায়এ কথা সত্যি। তবে বিভাষী কোনো শব্দ জোর করে কোনো ভাষায় যুক্ত হতে পারে বলে মনে হয় না। জীবনাচার ও সংস্কৃতিগত কারণে কোনও শব্দ আপনা-আপনি আত্তীকৃত হতে পারে। আমাদের দেশে ইলেকট্রনিক কিংবা প্রিন্টমিডিয়ায় ভাষার স্বেচ্ছাকৃত বিকৃতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। নাটক, সিনেমাতেও এ ধরনের বিকৃতি কম বেশি লক্ষণীয়। এবং অনেক ভাষাপ্রেমিকই তাতে শঙ্কাগ্রস্ত। তবে বাংলা ভাষার যে অন্তর্নিহিত শক্তি রয়েছে, এর জোরেই তা টিকে থাকবে বলে অনেক ভাষাতাত্ত্বিক মনে করেন। সবুজপত্র প্রদর্শিত মার্জিত কথ্যরীতি আরেকটি চমৎকার কাজ করেছে সেটি হলোআঞ্চলিক মানভাষার প্রচলন হলো। যে মানভাষাটিকে যে-কোন অঞ্চলের মানুষই চাইলে রপ্ত করতে পারে। ব্যক্তির বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও মনোজাগতিক মুক্তি, সাহিত্যে সৃষ্টিশীলতা, আনন্দতত্ত্ব, মননশীলতা, উদারতা, যুক্তিবাদ প্রভৃতি সবুজপত্রকে যে অভিনবত্ব ও আধুনিকতা দান করেছিলো, তা আজও বাংলাভাষী ও সাহিত্যপ্রেমী মাত্রেই শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। সবুজপত্র আজ নেই কিন্তু এটির প্রেরণা ফল্গুধারার মতো বহমান। আজও সমাজ ও সাহিত্যে যত আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনই সাধিত হোক না কেন; সবুজপত্র ও তার সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী; আপন মহিমায় অনায়াসে কালের খেয়া পার হতে হতে দীপ্তি ছড়াবেন; সন্দেহ নেই।

 

দুই বাংলার ৪ প্রবন্ধকারের আলোচনা

বাংলাদেশের মিথুন ব্যানার্জী ও রঘুনাথ ভট্টাচার্য

পশ্চিমবঙ্গের কানাই সেন ও জ্যোতির্ময় ঘোষ

সবুজপত্রের সবুজ সংকেত

মিথুন ব্যানার্জী

বাংলা গদ্যের বিকাশের সঙ্গে সবুজপত্র পত্রিকার সম্পর্ক ঐতিহাসিক ঐতিহ্যিক এবং অবিচ্ছেদ্য। উনিশ শতকে সাধু-কাঠামোর যে গদ্যচর্চার সূচনা হয়েছিল তা শতকান্তরের ভিন্ন বাস্তবতায় এক তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়। আর এই পরিবর্তনের পেছনে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন প্রমথ চৌধুরী ও তাঁর প্রকাশিত সবুজপত্র পত্রিকা। বিশেষত সবুজপত্রকে ঘিরে চলতি রীতির গদ্য রচনার একটি ফরম্যাট দাঁড়িয়ে যায়, যা এখন পর্যন্ত বহুল ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রমথ চৌধুরী সবুজপত্রের সূত্র ধরে নানা লেখার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন যে, সাধু রীতির পরিবর্তে চলতি রীতির ব্যবহার অনেক বেশি প্রাঞ্জল, জীবন-ঘনিষ্ঠ এবং সাবলীল। বাংলা গদ্যের চলার পথে সবুজ বাতি জ্বালিয়ে প্রমথ চৌধুরী এই পথকে নির্বিঘœ করেছেন এমন মন্তব্য এই বিষয়ে সাধারণ্যে প্রচলিত ভাবনার সঙ্গে বৈপরীত্যসূচক নয়। বাঙালি চিন্তা-মননের ঐশ্বর্যকে যে চলতি রীতি ধারণ করতে পারে এই বিশ্বাস প্রমথ চৌধুরী দৃঢ়ভাবে লালন করতেন আর একেই তিনি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন তাঁর সবুজপত্রে। বর্তমান আলোচনায় সবুজপত্রের এই সবুজ সংকেতের তাৎপর্য সমকালে বা উত্তরকালে কতটা অনুধাবন করা সম্ভব হয়েছিল এবং এই সংকেত বঙ্গদেশের জনভাষার প্রেক্ষাপটে কতটা সবুজ ছিল সেই বিষয়ে আলোকপাত করা হবে।

বাংলা গদ্যচর্চার প্রথম পর্বে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের গদ্যলেখকগণ, রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান ছিল। তবে প্রথমদিকের সংস্কৃত-অনুগত্য সাধুরীতির গদ্য রচনাকে প্রাঞ্জল করে তোলার তাগিদ বিদ্যাসাগর নিজেই অনুভব করেছিলেন। তাঁর গদ্যরচনায় এর প্রমাণও মেলে। তা সত্ত্বেও তাঁর গদ্যে সংস্কৃত-কাঠামোর ছাঁচটিই মুখ্যত পাওয়া যায়। একই শতকে কথ্যরীতিকে প্রাধান্য দিয়ে গদ্য রচনা করেন প্যারীচাঁদ মিত্র ও কালীপ্রসন্ন সিংহ। আলালের ঘরে দুলাল ও হুতোম প্যাঁচার নক্্সাএই দুয়ের মধ্যে গবেষকগণের বিবেচনায় আলালি ভাষায় ঘটেছে সাধুরীতির ছাঁদের সঙ্গে কথ্যরীতির সংমিশ্রণ, অপরদিকে হুতোমি ভাষায় রয়েছে অবিমিশ্র কথ্যরীতির ঢং। এই দুই রীতি সম্পর্কে প্রমথ চৌধুরীর মন্তব্যটিও প্রাসঙ্গিক: তাঁর বিবেচনায় এই দুই রীতি হলো ‘বাঙালির ওড়ানো বিদ্রোহের দুই লাল পতাকা’ (আমাদের ভাষা সংকট; ১৩২৯)। তবে, প্রমথ চৌধুরীর আবির্ভাবের বেশকিছু কাল আগেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল আলালি রীতি, ছিল এই রীতির প্রতি তাঁর পক্ষপাতও। বঙ্কিমচন্দ্র এ ধরনের রীতিকে স্বাগত জানালেও গদ্য রচনার ক্ষেত্রে তিনি বিদ্যাসাগরীয় রীতিকে কখনোই পরিহার করেননি। তৎসম শব্দবহুল সাধুরীতিতে তিনি গদ্য রচনা করলেও প্রাধান্য দিয়েছিলেন রচনার শিল্পগুণ তথা প্রাঞ্জলতা ও অর্থব্যপ্তিকে। বঙ্কিমচন্দ্র ভাব প্রকাশের সহজতার কথাই বারবার বলতে চেয়েছেন এবং বেশিরভাগ লোকের কাছে যে ভাষা বোধগম্য তাকেই সাহিত্য রচনার উপযোগী ভাষা বলে মন্তব্য করেছেন‘না বুঝিয়া, বহি বন্ধ করিয়া, পাঠক ত্রাহি ত্রাহি করিয়া ডাকিবে, বোধ হয় এই উদ্দেশ্যে কেহ গ্রন্থ লিখে না।’ গদ্যভাষা নিয়ে বঙ্কিচন্দ্রের এই তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সর্বোচ্চ মাত্রায় সফলভাবে প্রয়োগের মধ্য দিয়ে উনিশ শতকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাধুরীতিপ্রধান বাংলা গদ্যের একটি প্রাণবন্ত রূপ সৃষ্টিতে সক্ষম হন। কিন্তু তা সত্ত্বেও সাধুরীতি যেহেতু মানুষের মুখের ভাষার কাছাকাছি নয় তাই চলতি রীতি প্রচলনের ক্ষেত্রে গৃহীত উদ্যোগসমূহে গোড়া থেকেই ছিল তাঁর পূর্ণ সমর্থন। বলা যেতে পারে প্রমথ চৌধুরীর চলিত রীতি প্রচলনের বা সবুজপত্র প্রকাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় আয়ুধ ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই সমর্থন। বিশ শতক ও সবুজপত্ররবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গদ্যশৈলীর চূড়ান্ত উৎকর্ষের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। সময়ের দাবিকে সাদরে গ্রহণ করে তিনি মানুষের মুখের ভাষায় সাহিত্য রচনায় অগ্রসর হলেন। কিন্তু এরপরও একটা বিষয় অমীমাংসিত রয়ে যায়; যে মুখের ভাষায় সাহিত্য রচনায় রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ এতো জোর দিয়েছিলেন, সেই মুখের ভাষার আদর্শরূপ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিচিত্র ভূপ্রকৃতি আর সংস্কৃতির মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা সমগ্র বাঙালি নৃগোষ্ঠীর প্রতিদিনের কথ্যভঙ্গি কতটা বিবেচনায় এসেছিল। অর্থাৎ চলতি রীতি বলতে প্রমথ চৌধুরী যে কথ্যরূপের প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হলেন তা বঙ্গভঙ্গ রদের সূত্র ধরে পুনর্যুক্ত বঙ্গের সকল অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষার সঙ্গে কতটা সাযুজ্য রক্ষা করেছিল। এই বিষয়টির মীমাংসা হওয়া প্রয়োজন।

পূর্বেই বলা হয়েছে, প্রমথ চৌধুরী চেয়েছিলেন সাধু রীতির স্থলে চলতি রীতি ব্যবহারের সম্ভাবনাকে প্রতিষ্ঠিত করা। সাধু ও চলতি রীতি মূলত বাংলা ভাষার দুটি বাচন স্তর। এ প্রসঙ্গে সবুজপত্রে প্রমথ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাভাষা কথাটির মধ্যে দ্ব্যর্থ আছে, কেননা বাঙলাদেশে একটি নয়, দুটি ভাষার চলন রয়েছে (“বাঙালা ভাষার কুলের খবর”; ৪র্থ বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা, শ্রাবণ; ১৩২৪)।’ যদিও বাস্তবতা এই যে, ভাষাবৈজ্ঞানিক বিবেচনায় এ-দুটো আলাদা ভাষা নয়, বরং অভিন্ন ভাষার দুটি রূপ; যা ব্যাপকভাবে সাধু রীতি ও চলতি রীতি হিসেবে পরিচিত। সাধু রীতি একটি সংস্কৃত শব্দবহুল, সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ ব্যবহারের বিশেষত্বমণ্ডিত কৃত্রিম লেখ্যরূপ আর চলতি রীতি হলো নগরবাসী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণির মানুষের মুখের বুলি। একটি ভাষার পৃথক রূপসমূহের মধ্যে এক ধরনের সম্পর্ক থাকে; যাকে ভাষাবিজ্ঞানের অভিধায় দ্বিবাচনিকতা বলা হয়। ভাষায় এরকম দুটি রূপ প্রচলিত থাকলে তাদের একটিকে বলা হয় উচ্চ বুলি আর আরেকটিকে বলা হয় নিম্নবুলি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গ্রিক ভাষায় এরকম দুটি রূপ প্রচলিত রয়েছে। গ্রিক ভাষার উচ্চ বুলির নাম ‘কাথারেভুসা’ আর নিম্নবুলির নাম ‘ডোমেতিকি’। এই দুটো রীতিরই সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে; রয়েছে সমাজের মধ্যে এই দুই রীতি ব্যবহারের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে সাধু আর চলতি রীতির মধ্যে যে সম্পর্ক বিদ্যমান তা দ্বিবাচনিকতা কি-না, তা নিয়েও ভাষাবিজ্ঞানীদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। দ্বিবাচনিকতা তত্ত্বের প্রবক্তক চালর্স ফার্গুসন বাংলা ভাষা নিয়ে গবেষণা করলেও এ বিষয়ে তাঁর অভিমত সুলভ নয়। তবে অনেক গবেষক (উদয়নারায়ণ সিংহ; ১৯৭৬, সুহাস চট্টোপাধ্যায়; ১৯৮৬, রাজীব হুমায়ুন; ১৯৮০) মনে করেন সাধু ও চলিত রীতির যে সম্পর্ক তা দ্বিবাচনিক। কিন্তু মৃণাল নাথ (১৯৯৯) এ মতের ঘোরতর বিরোধী। মৃণাল নাথ তাঁর মতের পক্ষে অনেক রকম যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে সাধু ও চলিত রীতির মধ্যে যে সম্পর্ক তা দ্বিবাচনিক নয়; কেননা, দ্বিবাচনিকতা হলো একটি সুস্থিত ভাষা-পরিস্থিতি যা টিকে থাকে শতবর্ষ, সহ¯্রবর্ষ ধরে, এতে থাকে সামাজিক স্তরবিন্যাসের নানাবিধ প্রভাব। দ্বিবাচনিকতার আরেকটি উলেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো সংশ্লিষ্ট দুটো রীতির পৃথক প্রয়োগক্ষেত্র নির্ধারিত থাকবে। কিন্তু বাংলা ভাষার সাধুরীতি ও চলতিরীতির বৈশেষিক লক্ষণ হিসেবে উলিখিত বিষয়গুলোকে সমন্বিত করা বেশ মুশকিল। আবার দ্বিবাচনিকতার ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্যগুলোর অনুপুঙ্খ উপস্থিতি যদি অপরিহার্য বিবেচনা করা না হয়, সেক্ষেত্রে দেখা যাবে যে, অধিকাংশ মানবভাষাই দ্বিবাচনিক এমনকি বহুবাচনিক বললেও ভুল বলা হবে না। যদি সাধুরীতি আর চলতি রীতির মধ্যকার সম্পর্ক দ্বিবাচনিক না হয় তবে, প্রশ্ন জাগে সম্পর্কটি কি বিবর্তনমূলক। অর্থাৎ, সাধুরীতিকে কালের ধারায় প্রতিস্থাপিত করেছে চলতি রীতি। এরূপ চিন্তার সমর্থন পাওয়া যাবে প্রমথ চৌধুরীর বিভিন্ন রচনাতেই। কেননা, তিনি সাধু রীতির নানা কমতির দিক দেখিয়ে একরকম একে বাতিল করেই চলতি রীতির প্রস্তাব করেছিলেন। শুধু তাই নয়, যেসব পরিবেশে সাধুরীতি ব্যবহৃত হতো তার সবগুলোতেই যে চলতি রীতি যোগ্যতর বিবেচনায় ব্যবহৃত হতে পারে এমন প্রমাণ করাই ছিল তাঁর লক্ষ। যেহেতু কলকাতা কেন্দ্রিক শিক্ষিত সমাজের কাছে প্রমথ চৌধুরীর প্রস্তাবই ধীরে ধীরে গৃহীত হয়েছিল সেহেতু দুটি রীতির একত্র টিকে থাকা কাল-পরম্পরায় আর সম্ভব ছিল না। চলতি রীতির সর্বত্র ব্যবহার (আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক পরিবেশে) ক্রমান্বয়ে অনিবার্য হয়ে উঠেছে; অপরপক্ষে সাধুরীতি ব্যবহারের দিক থেকে অনেকটাই বাক্সবন্দি অবস্থায় রয়েছে। এ কারণেই সবুজপত্র পত্রিকার আর্বিভাবকাল হিসেবে ১৯১৪ বাংলা গদ্যভাষার বিকাশেও অমোচনীয় দিকচিহ্ন হয়ে রইল।

চলতি রীতির প্রবর্তন করতে গিয়ে প্রমথ চৌধুরী মূলত বাংলা ভাষার একটি ঔপভাষিক রূপকে বেছে নিয়ে তাকেই চলতি রীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। তবে, এই নির্বাচনের পেছনে কোনো সুসমন্বিত বিজ্ঞানভিত্তিক যুক্তিশৃঙ্খলা সক্রিয় ছিল কি-না তা স্পষ্ট নয়। তিনি এমন একটি অঞ্চলের উপভাষাকে বেছে নিলেন যা জনতাত্ত্বিক জরিপে কিংবা ভূতাত্ত্বিক বিচারে বঙ্গদেশের একটি প্রান্তবর্তী ও ক্ষুদ্র অঞ্চলের অধিবাসীদের ভাষা। এ কারণে প্রমথ চৌধুরী সাধুরীতির কৃত্রিমতা পরিহার করার লক্ষ নিয়ে, মুখের ভাষা প্রচলনের জোর চেষ্টা করা সত্ত্বেও, এই ভাষাটি বঙ্গদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষা না হওয়ায় একরকম কৃত্রিম হয়েই রয়ে গেল। এর প্রমাণ মেলে যখন দেখা যায় পূর্ববাংলা তথা বর্তমান বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে অনেকটা দ্বিতীয় ভাষা শেখার মতো করেই প্রমিত চলতি বাংলা শিখতে হয়; কেননা, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশে বাঙালি পরিবারে জন্মগ্রহণেরসূত্রে যে ভাষা তারা আয়ত্ত করে তা থেকে প্রমিত বাংলা ধ্বনিতাত্ত্বিক ও রূপতাত্ত্বিকভাবে তো বটেই কখনও কখনও বাক্যতাত্ত্বিক এমনকি বাগর্থতাত্ত্বিকভাবেও পৃথক। এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে, বাংলাভাষী বিস্তীর্ণ এই অঞ্চলে চলতি বাংলা তাহলে আদিতে কোথায় কোথায় ব্যবহৃত হতো। প্রমথ চৌধুরীর উদ্যোগে গৃহীত এই চলতি বাংলার ঔপভাষিক রূপটি বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া, শান্তিপুর তথা ভাগীরথী নদীর উভয়তীরে বর্ধমান ও বীরভূম জেলার পূর্বে ও দক্ষিণে প্রচলিত, প্রমথ চৌধুরী এই অঞ্চলের ভাষাটিকে ‘দক্ষিণদেশী’ ভাষা হিসেবে অভিহিত করেছে। বিশেষত এই ভাষায় কৃষ্ণনগরের উপভাষার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। প্রমথ চৌধুরী বিভিন্ন সময় নিজেকে কৃষ্ণনাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ব অনুভব করতেন, যার ছাপ তাঁর ভাষাচিন্তায়ও পরিলক্ষিত হয়। ‘দক্ষিণদেশী’ উপভাষা ব্যতীত তিনি বাংলা ভাষার বিভিন্ন উপভাষার ধ্বনিতাত্ত্বিক, রূপতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যকে ওই উপভাষাসমূহের দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। ‘পূর্ববঙ্গের লোকের মুখে স্বরবর্ণ ছড়িয়ে যায়, আর কলকাতার লোকের মুখে স্বরবর্ণ জড়িয়ে যায়। এমন কোন প্রাদেশিক ভাষা নেই যাতে অন্তত কতকগুলি কথাতেও কিছু না কিছু উচ্চারণ দোষ নেই। কম-বেশি নিয়েই আসল কথা।’ এই কম-বেশির হিসাব করতে গিয়ে তিনি নানাবিধ দিক বিচার করে ‘দক্ষিণদেশী’ উপভাষাকে বঙ্গদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ উপভাষা হিসেবে শনাক্ত করেছিলেন এবং এই উপভাষাকে চলতি রীতি ও মান্যভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন সবুজপত্রে। অন্যান্য উপভাষা কেন গৃহীত হবে না তার কিছু যুক্তিও প্রমথ চৌধুরী উপস্থাপন করেছেন এভাবে: ‘যাদের মুখে ঘোড়া ও গোড়া একাকার হয়ে যায়, তাদের চেয়ে যাদের মুখে ঐ শব্দ নিজ নিজ আকারে বের হয় তাদের ভাষা যে শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য হবে, এ আর কিছু আশ্চর্যের বিষয় নয়’ (“বঙ্গভাষা বনাম বাবু-বাংলা ওরফে সাধুভাষা” ; ১৩১৯)। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়: স্বরধ্বনির জড়িয়ে যাওয়া ছড়িয়ে পড়া আর ঠিক থাকাএর মাপকাঠি প্রমথ চৌধুরী কীভাবে নিরূপণ করলেন? কেননা, অভিন্ন উচ্চারণের ভিন্নার্থক শব্দ প্রমিত চলতি বাংলাও প্রচুর আছে। তাই এই মানদণ্ডে অন্যান্য বাংলা উপভাষা থেকে কৃষ্ণনগরের ভাষাকে শ্রেষ্ঠতররূপে চিহ্নিত করার কোনো সুযোগ ছিল না। তাছাড়া, আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে মৌলিক স্বরধ্বনি মূলত একটি মানসিক পরিমাপক; যা ভাষা থেকে ভাষায় পার্থক্য সূচিত হয়। মৌলিক স্বরধ্বনির সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে যা ভাষী তার নিজের ভাষায় যেটুকু মানানসই সেটা গ্রহণ করে। তাই একটি ভাষার ধ্বনিসমূহ নির্দিষ্ট করে তারপর বৈশিষ্ট্য আরোপ করা হয়, বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করে ধ্বনি নির্দিষ্ট করা হয় না। আবার প্রতিটি উপভাষায় বিশেষ কিছু ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য থাকে, যেমন অল্পপ্রাণ, মহাপ্রাণ-এর তারতম্য, উচ্চারণ স্থান ও উচ্চারণ রীতি পরিবর্তিত হওয়া, ভিন্ন কোনো সুর যুক্ত হওয়া ইত্যাদি। এই ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য উপভাষাকে স্বতন্ত্রতা দান করে। এসব কারণে ভাষা উচ্চারণেও আলাদা কিছু বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। এই ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য এক এক উপভাষায় এক এক রকম হতেই পারে। তাই বলে এই বৈশিষ্ট্যসমূহের কারণে কোনো ভাষারূপ নিকৃষ্ট হয়ে যায় না। অন্তত ভাষাবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকাণ থেকে কোনো উপভাষাকে এভাবে বিচার করা সম্ভব নয়।

উপভাষাভেদে শুধু ধ্বনির নয় শব্দেরও বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যবহার লক্ষ করা যায়। প্রায় প্রতিটি উপভাষায় বৈচিত্র্যপূর্ণ শব্দভাণ্ডার থাকে। প্রমথ চৌধুরী দক্ষিণবঙ্গের ভাষার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের ভাষার তুলনা করতে গিয়ে কিছু শব্দের উদাহরণ দিয়েছিলেন এবং পার্থক্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। যেমন রাজশাহী বা পাবনা অঞ্চলের লোকজন পৈতা, চুপ করা, সকাল, শখ, কুল, পেয়ারা, তরকারি প্রভৃতি নিয়মিতভাবে ব্যবহার না করলেও তাদের কাছে এই শব্দগুলো দুর্বোধ্য নয়; কিন্তু নগুন, নন্করা, বিয়ান, হাউস, বোর, আম-সব্রি, আনাজ প্রভৃতি শব্দের অর্থ দক্ষিণদেশের অধিবাসীদের কাছে একেবারেই দুর্বোধ্য। তাই প্রমথ চৌধুরী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, দক্ষিণদেশের মুখের কথা লেখ্যভাষার পক্ষে বিশেষ উপযোগী। তাঁর প্রদত্ত উদাহরণগুলো থেকে বেশ কিছু শব্দই বাংলা ভাষীমাত্রেই পরিচিত হওয়ার কথা। তাছাড়া পরিচিতি পেলে বাকিগুলোও আর দুর্বোধ্য থাকত না। উলিখিত কয়েকটি শব্দ বিভিন্ন সময়ে সাহিত্যেও ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষত বিয়ান বা বিহান আর হাউস। আবার সূক্ষ¥তর বিচারে বিহান শব্দের সর্মাথক শব্দ হতে পারে ভোর বা ঊষাকাল। এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে তথাকথিত ‘শ্রেষ্ঠ’ ও ‘নিকৃষ্ট’ বিচারে সাধুরীতির সমর্থকদের সঙ্গে প্রমথ চৌধুরীর একপ্রকার সাদৃশ্য বর্তমান। তিনি যা জানেন বা যে ভাষাতে কথা বলেন তাকেই তিনি র্নিদ্বিধায় শ্রেষ্ঠ বলে অভিহিত করছেন কিন্তু মাতৃভাষায় সাহিত্য রচনাকে প্রাধান্য দিতে হলে জনগোষ্ঠীর সংখ্যা গরিষ্ঠতার কথাও ভাবা প্রয়োজন। অথচ তিনি মনে করেন: ‘স্ত্রীর ম-কারাদি প্রয়োগ করা, যাদের জঙ্গল কেটে কলকাতায় বাস সেই সকল ভদ্রলোকের মুখেই সাজে, বাঙালি ভদ্রলোকের মুখে সাজে না। এর কারণে বাংলা ভাষা কিংবা কলকাত্তাই ভাষা, এ উভয়ের কোনোটিই লেখার ভাষা হতে পারে না। আমি যে প্রাদেশিক ভাষাকে দক্ষিণদেশী ভাষা বলি, সে ভাষাই সাহিত্যের পক্ষে সম্পূর্ণরূপ উপযোগী… এবং আমার মতে, খাস-কলকাত্তাই নয়, কিন্তু কলকাতার ভদ্রসমাজের অনুকরণ করে চলাই আমাদের কর্তব্য (বঙ্গভাষা বনাম বাবু-বাংলা ওরফে সাধুভাষা; ১৩১৯)’। এখন প্রশ্ন হলো ভদ্র সমাজের বাইরে যাদের অবস্থান, তাদের ভাষাকে অগ্রাহ্য করে কি আদৌ কোনো বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মানভাষা নির্ধারণ করা সম্ভব! যারা জঙ্গল কেটে তথাকথিত ভদ্রসমাজে ঠাঁই পাওয়ার জন্য কলকাতায় বাস শুরু করলো তারাই কী উপায়ে বা কোন মাপকাঠির ভিত্তিতে অভদ্র সমাজ বলে পরিগণিত হয়? আর তাছাড়া মুখের ভাষায় সাহিত্য রচনার সমস্যা মীমাংসায় সবার মুখের ভাষা বিবেচনা করেই একটি মানরূপ নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন। আর সে-ক্ষেত্রে তারা ব্রাত্য কি কুলীন তা বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। অথচ প্রমথ চৌধুরী প্রণীত চলতি গদ্যে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের ভাষার প্রতিনিধিত্ব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তবে, আজ এই একশ বছর পরে এই অভিযোগের দায় কেবল একা প্রমথ চৌধুরীর ওপর চাপানোর কোনো সুযোগ নেই। কেননা, প্রমথ চৌধুরী সবুজপত্রের প্লাটফর্ম ব্যবহার করে বাংলা গদ্যের চলতি কাঠামো বিষয়ক একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এই প্রস্তাবের ভালো দিক, মন্দ দিক থাকা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি সময়ের সঙ্গে সেই ভাষার বিবর্তন ও বিবর্ধন নিয়ে বহুবিধ প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গৃহীত হবে এমনটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় নানাবিধ পট পরিবর্তিত হয়েছে, ভারত ভেঙেছে, পাকিস্তান হয়েছে, তার থেকে নতুন দেশ বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছে অথচ জনমানুষমুখ্য কোনো ভাষা-পরিকল্পনা আজও গৃহীত হয়নি। তাই প্রমথ চৌধুরী সবুজপত্রের মধ্য দিয়ে যতখানি আশা জাগালেন, বাংলা ভাষার নিজস্ব^ শব্দভাণ্ডার ব্যবহার করার যে সবুজ সংকেত দেখালেন তাকে সর্বাত্মকভাবে জনমানুষের ভাষায় পরিণত করার যথাযথ উদ্যোগ দেখা গেল না।

“বঙ্গভাষা বনাম বাবু-বাংলা ওরফে সাধুভাষা” (১৩১৯) প্রবন্ধে চলতি গদ্যরীতির বেশ কিছু গুণের কথা ব্যক্ত করেছেন প্রমথ চৌধুরী। এগুলো হলো: সরলতা, গতি ও প্রাণ। প্রকৃতপক্ষে এই গুণগুলো যেকোনো ভাষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেই বিষয়ে সন্দেহ নেই। প্রমথ চৌধুরীর কাছে ভাষার মূল সার্থকতা হলো এই যে : ভাষা কখনোই ভাব-প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে না বরং বিশেষভাবে সহায়ক হবে। এক্ষেত্রে তাঁর একটি সাধারণ যুক্তি ছিল, চলতি গদ্য যতখানি সহজ বা বাংলা ভাষীদের নিকট সাবলীল সাধুরীতি তা নয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সাধুরীতির লেখাকে বিবেচনায় নিলে এই মন্তব্যের যথার্থতা স্বীকার করা কষ্টকর। কারণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাধুরীতির রচনা দুরূহ নয় এবং তাতে পাঠকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনেও কষ্ট হয় না। ফলে, সবুজপত্র আমাদের বাংলা গদ্যচর্চার ক্ষেত্রে যে সবুজ সংকেত দেখালো তার মূলকথা যদি ধরে নেওয়া হয় কেবল সাবলীলতা সঞ্চার তা হলে ভুল করা হবে। কারণ ভাবের প্রবাহমানতাই যদি অন্বিষ্ট হয় তবে সাধুরীতিতেও তা প্রকাশ করা সম্ভব। রবীন্দ্রনাথ তো বটেই বিদ্যাসগর কিংবা বঙ্কিমচন্দ্রের গদ্যকেও এই শ্রেণিতে রাখতে হবে। এমনকি, আরও পরে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, কমলকুমার মজুমদারসহ যাঁরা সাধুরীতির প্রতি আবারও আস্থাশীল হয়েছেন তাঁদের গদ্যেও প্রবহমানতা বিদ্যমান। অথচ সেই সবুজপত্রের কাল থেকেই অনেক গদ্যশিল্পী এমন গদ্য রচনা করে আসলেন যাতে চলতি রীতির মোড়কে তৎসম শব্দবহুল সাধু রীতিরই প্রতাপ বজায় রইল। সেখানে ক্রিয়াবাচক শব্দ ও বিশেষণবাচক শব্দ ব্যতীত সমস্তজুড়েই থাকল কেবল সাধুরীতির কাঠামো। ভাষার শরীরে জুজুর ভয়ের মতো ছড়িয়ে থাকা এইসব শব্দের নামকরণ করা হলো ক্লাসিক্যাল বা ধ্রুপদী শব্দ আর এদের কাছে বিশেষ পাত্তা পেল না অনেক বেশি পরিচিত আটপৌরে শব্দসমষ্টি। যদি সংস্কৃত-উৎসজাত শব্দই এতো প্রাধান্য পায় তবে কেবল ক্রিয়া আর সর্বনাম পরিবর্তন করে চলতি বাংলা বলার যৌক্তিকতা কোথায়? এ ধরনের ভাষারীতি দেখে মোহিতলাল (দ্র. শ্যামলকুমার চট্টোপাধ্যায়, বাংলা গদ্যের ক্রমবিকাশ; ১৯৫৯) মন্তব্য করেছিলেন : ‘লিখিব সাধুভাষায়, ভঙ্গিমা করিব বাংলা বুলির এবং তাহারই খাতিরে উচ্চারণ বাঁকাইয়া ক্রিয়াপদের স্থানে টক টক করিব, এ অনাচারে ভাষা পীড়িত হয়, তাহার ধ্বনিধর্ম নষ্ট হয়।’ সন্দেহ নেই, প্রমথ চৌধুরী এমনটি চাননি। ফলে সবুজপত্র যে একরকম ভাষা-বিপ্লবের সূচনা করল, তার সবুজ সংকেত অব্যাখ্যাতই রয়ে গেল ভাষা ব্যবহারকারীদের নিকট।

প্রমথ চৌধুরীর সবুজপত্রের সবুজ সংকেত বঙ্গদেশের জনভাষার পরিপ্রেক্ষিতে সবুজ সংকেত হয়ে থাকল কি-না তা তর্ক সাপেক্ষ বিষয় হলেও বাংলা গদ্যের ক্ষেত্রে প্রমথ চৌধুরীর অবদান অনস্বীকার্য। চলতি বাংলাকে বাঙালির আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক জীবনের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে প্রমথ চৌধুরী যে ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন তা সেই কালে তো বটেই এখন পর্যন্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলা গদ্যচর্চায় যাঁরা সাধুরীতিতে লেখার পক্ষে ছিলেন তাঁরা বারবারই বলার চেষ্টা করেছেন, ভাষায় মৌখিক রূপ লেখ্যরূপ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে না; আর যদি তা হয় তবে ভাষার আভিজাত্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কারণ তাঁদের মতে বাংলা ভাষা ভীষণ আটপৌরে; এ ভাষা দিয়ে সাধারণ যোগাযোগের কাজ চললেও সাহিত্য কীরূপে রচিত হতে পারে। প্রমথ চৌধুরী এই ভাবনার মূলে কুঠারাঘাত করেছিলেন। ভূ-রাজনৈতিক কারণে বাংলা ভাষার সঙ্গে সংস্কৃত ভাষার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যেহেতু প্রাচীনকাল থেকেই সংস্কৃত ভাষা একটি সমৃদ্ধ ভাষা তাই সম্পর্কিত অন্যান্য ভাষার ওপর এই ভাষার প্রভাব থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে বাংলাসহ অন্যান্য সম্পর্কিত ভাষার স্বকীয়তা বিসর্জনের কোনো সুযোগ নেই। প্রমথ চৌধুরীর অনন্যতা এইখানে যে, তিনি বাংলা ভাষাকে আপন শক্তিতে বিকশিত হবার সম্ভাবনাকে সবুজ সংকেতের মধ্য দিয়ে পুর্নব্যক্ত করেছিলেন। তিনি সাধু ও চলতি রীতির মধ্যকার এই ব্যবহারিক দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে চেয়েছিলেন। একাধিক প্রবন্ধে যুক্তিসহ তিনি উপস্থাপন করেছেন কেন চলতিরীতি ব্যহার করা উচিত এবং চলতিরীতি ব্যবহারের সঙ্গে যে সংস্কৃত ভাষার কোনো বিরোধ নেই তা-ও তিনি বিভিন্ন উদাহরণের সাহায্যে দেখিয়েছেন। প্রয়োজনে সংস্কৃত থেকে শব্দ ঋণ করার কথাও তিনি বলছেন। প্রসঙ্গত স্মরণীয়: ‘আমি সংস্কৃত শব্দের ব্যবহারের বিরোধী নই, শুধু ন্যূন অর্থে, অধিক অর্থে কিংবা অনর্থে বাক্যে প্রয়োগে বিরোধী। (বঙ্গভাষা বনাম বাবু-বাংলা ওরফে সাধুভাষা; ১৩১৯)’। আবার চলতি রীতিতে কেন গদ্য রচনা করতে হবে সে-সম্পর্কেও তাঁর সুস্পষ্ট অবস্থান ছিল। এ বিষয়ে তিনি বলেন: ‘ভাষা মানুষের মুখ হতে কলমের মুখে আসে। কলমের মুখ থেকে মানুষের মুখে নয়, উল্টোটা চেষ্টা করতে গেলে মুখে শুধু কালি পড়ে (ভাষার কথা; ১৩০৯)’। যাঁরা এই কালি ছড়িয়েছেন এবং যাঁরা এই কালি থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছেন; দু পক্ষের ভাষা ভাবনার ভিতকেই প্রমথ চৌধুরী নাড়া দিতে পেরেছিলেন। তবে, যে চলতি রীতি তাঁর প্রস্তাবসূত্রে প্রণীত হলো তাতে বৃহত্তর বাঙালির ভাষার প্রতিনিধিত্ব থাকল না। এমনকি দেশভাগের পর পূর্ববাংলায় ভাষাভিত্তিক যে স্বকীয়তা গড়ে উঠেছিল তাতেও এই অঞ্চলের জন্য একটি মান বাংলারূপ নির্ধারণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রমথ চৌধুরীর উদ্যোগ-সূত্রে পাওয়া সেই ‘ভদ্রজনের’ ভাষাই এদেশের কৃষক-শ্রমিক তথা জনসাধারণের ওপর আরোপিত হয়ে রইল। তারপরও প্রমথ চৌধুরীর ভাষা বিষয়ক ভাবনা অনেক ক্ষেত্রেই বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রসঙ্গত, হুমায়ুন আজাদের একটি অভিমত স্মরণ করা যেতে পারে; যার মূলকথা এই যে, বাংলা ভাষার প্রথম সফল ভাষা-পরিকল্পক প্রমথ চৌধুরী। আর এই পরিকল্পনা তিনি কার্যকর করেছেন সবুজপত্রের মাধ্যমে। নিঃসন্দেহে প্রমথ চৌধুরীর এই উদ্যোগ বাংলা ভাষার জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। প্রমথ চৌধুরী ভাষা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের নিরীক্ষায় ভাষাবিজ্ঞানের জ্ঞান প্রয়োগ করেননি; যদিও এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি। প্রমথের প্রস্তাবের সূত্র ধরে বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে এই বস্তুনিষ্ঠ গবেষণার সূত্রপাত হতেই পারতো। আর তা হয়নি বলেই বাংলা ভাষা তার কাক্সিক্ষত মর্যাদা লাভে ব্যর্থ হয়েছে। তাই আবারও বলতে হয়: চলিত গদ্যের বা সবুজপত্রের সবুজ সংকেত পরবর্তী প্রজন্মসমূহের কাছেও যথাযথভাবে সঞ্চালিত হয়নি। চলতি রীতিতে গদ্য রচনা করে প্রমথ চৌধুরী যে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছিলেন তাকে সময়ের সাথে আরও বেশি করে জনভাষানিবিড় করা যদি সম্ভব হতো কেবল তা-হলেই বাংলা ভাষার আবেগ নয় বরং ভাষিক-উপাদানসমূহের অভিন্নতা মানুষে মানুষে অবিচ্ছেদ্য ঐক্য গড়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা পালন করতো। তা হয়নি বলেই এখনও প্রমথ চৌধুরীর ভাষাতে বলতে হয় ‘সব ভাষার নিয়ম আছে, শুধু বাংলা ভাষায় নেই। যার যা খুশি লিখতে পারি, ভাষা বাংলা হতেই বাধ্য। বাংলা ভাষার প্রধান গুণ যে, বাঙালি কথায় লেখায় যথেচ্ছারী হতে পারে’ (আমাদের ভাষা সংকট; ১৯২২)। এই মন্তব্য যে আজও প্রাসঙ্গিক, তার প্রমাণ মিলবে ইদানীং-ব্যবহৃত কারও কারও মুখের ভাষায় এমনকি তাদের লেখার ভাষাতেও। বর্তমানে ব্যবহৃত চলতি ভাষায় জনভাষার যথাযথ প্রতিনিধিত্ব হয়নি বলে ইচ্ছে মতো কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই তা পাল্টে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না; কেননা এটাও এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা। বর্তমানে ভাষার প্রশ্নে একদল মনে করে আমার মাতৃভাষা যেটা অর্থাৎ আমি যে অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেছি সেখানকার যে উপভাষা সেটাই আমি সব ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারি, কারণ মাতৃভাষা ব্যবহার করা আমার জন্মগত অধিকার। সবাই এমনটা ভাবলে যে একটা হট্টগোল অনিবার্য তা বুঝতে কোনো কষ্ট হওয়ার কথা নয়। কেননা, একটি ভাষার অনেকগুলো ঔপভাষিক রূপ যেমন থাকবে, তার পাশাপাশি সর্বজনগৃহীত একটি মান্যভাষাও থাকতে হবে। তবে সেই মান্যভাষা নির্ধারিত ভূগোলসীমার সকল ঔপভাষিক রূপকে বিবেচনায় এনেই নির্ধারণ করতে হবে। এরূপ গণতান্ত্রিক পদক্ষেপ প্রমথ চৌধুরী নেননি, কিন্তু ভাষারীতিকে যে যৌক্তিক কারণে পরিবর্তন করা যায়তা-তো তিনি প্রমাণ করেই দিলেন। তাঁর এই অগ্রণী ভূমিকা বাংলা ভাষার চলতি রীতিকে স্বাবলম্বী করেছে, করেছে কালজয়ী। তাই বলা যায় যে, প্রমথ চৌধুরীর উদ্যোগ ও তাঁর সবুজপত্র বাঙালিকে গদ্যচর্চার যে সবুজ সংকেত প্রদান করেছিল, তাকে আরও বেশি যুগোপযোগী এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো ভাষা-পরিকল্পনা গ্রহণ করার মধ্য দিয়েই সঠিকভাবে অনুধাবন করা সম্ভব; যে কাজটি আজ পর্যন্ত করে ওঠা সম্ভব হয়নি।

 

সবুজপত্রগোষ্ঠীর সাহিত্যাদর্শ

রঘুনাথ ভট্টাচার্য

 আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিকাশে গোড়া থেকেই সাময়িকপত্র তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সাময়িকপত্রের মধ্য দিয়েই বাংলা সাহিত্যিক গদ্যের যথার্থ প্রতিষ্ঠা। দলিল-দস্তাবেজ বা চিঠিপত্রের মধ্যে বাংলা গদ্যের যে চেহারা, তার কোন সাহিত্যিক মহিমা ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) প্রাক্কালে সবুজপত্রের প্রকাশ ঘটে। প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত সবুজপত্র ১৩২১ সনের ২৫ বৈশাখ (১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ) প্রকাশিত হয়; এবং সর্বশেষ সংখ্যাটি বের হয় ১৩৩৪ সালের ভাদ্র মাসে। মাঝে মাঝে বিরতিসহ পত্রিকার ১০৮টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতে জাতীয় জীবনের নানা বিপর্যয় ও আন্দোলনের ফলে বাংলার যুবচিত্ত অশান্ত ও হতাশ হয়ে ওঠেছিল। প্রচলিত মূল্যবোধ সম্পর্কে সংশয় ও জিজ্ঞাসা জেগে ওঠে মনের মধ্যে। সে পটভূমিতে তারুণ্যের স্বপ্ন নিয়ে প্রকাশিত হয় মাসিক সবুজপত্র।

বাংলার সমাজের যে-অংশ সংস্কারবদ্ধ জড়তাধর্মী সুপ্তপ্রায়, সবুজপত্র সেখানে প্রবল প্রাণধর্মের স্রোত প্রবাহিত করতে চেয়েছিল। একটা নতুন কিছু করার জন্য নয়, বাঙালির জীবনে যে নতুনত্ব এসে পড়েছে তাই পরিষ্কার করে প্রকাশ করার জন্য সবুজপত্রের আবির্ভাব। এর মারফৎ সমকালীন সাহিত্যচিন্তায় ইউরোপীয় গতি, মুক্তি ও আনন্দের বাণী ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন প্রমথ চৌধুরী। তাই ছড়িয়ে দিলেন মৃত্যুহীন যৌবনের সবুজ রঙ-জাগ্রত প্রাণের অবাধ দীপ্তি। এভাবেই সবুজপত্র আধুনিক বিশ্বের অন্তর্নিহিত জীবনবোধ ও মানস-প্রবণতাকে আমাদের সমাজ ও ব্যক্তির চেতনায় সঞ্চার করার গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেছিল। সবুজপত্র যথার্থ অভিনব ছিল। পত্রিকা প্রকাশে এবং অব্যাহত রাখায় সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অকুন্ঠ সহযোগিতা পেয়েছেন। সবুজপত্র পত্রিকার লক্ষ ছিল বাঙালির মনকে জাগিয়ে তোলা, পুরাতনের সংস্কার করা, সাহিত্যকে নতুন পথে নিয়ে যাওয়া, এবং মানসিক যৌবন প্রতিষ্ঠা করা।

সবুজপত্রকে কেন্দ্র করে একটি লেখক গোষ্ঠীও তৈরী হয়েছিল। যাঁরা পত্রিকায় মোটামুটি নিয়মিত লিখতেন এবং পত্রিকার অফিসে উপস্থিত হয়ে সাহিত্যের আলোচনায় অংশ গ্রহণ করতেন, তাঁদেরকে সবুজপত্র-গোষ্ঠীর সদস্য বলে গ্রহণ করা হয়েছে। সেই মানদণ্ড অনুসারে প্রমথ চৌধুরী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্যতীতও বার জনকে সবুজপত্র-গোষ্ঠীর লেখক বলা যায়। তাঁরা হচ্ছেনঅতুলচন্দ্র গুপ্ত, ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী, কিরণশঙ্কর রায়, ধূর্জটীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, ননীমাধব চৌধুরী, প্রবোধ চট্টোপাধ্যায়, বরদাচরণ গুপ্ত, সতীশচন্দ্র ঘটক, কান্তিচন্দ্র ঘোষ, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুবোধ চট্টোপাধ্যায় ও হারিতকৃষ্ণ দেব। বাকি ছয়জন অনিয়মিতভাবে লিখতেন বিধায় তাঁদেরকে আমাদের বিবেচনায় সবুজপত্র-গোষ্ঠীর যথার্থ লেখকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায় না।

সবুজপত্র যে বিশিষ্ট জীবনদৃষ্টি ও সাহিত্যাদর্শের ঘোষণা দিয়ে প্রকশিত হয়েছিল, এই লেখকেরা মোটামুটি সে-রঙে রঞ্জিত হয়েছিলেন। সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, সবুজপত্রের বিশিষ্ট লেখকেরা সাহিত্যের ভাষা-ভঙ্গী সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরী করেছিলেন। বিভিন্ন লেখকের রচনার মধ্যে উনিশ-বিশ পার্থক্য অবশ্যই ছিল; কিন্তু সব কিছু মিলিয়ে তাঁরা সৃষ্টি করেছিলেন নতুন সুর ও নতুন দৃষ্টি। তাঁদের বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত করার প্রয়াস রয়েছে এই প্রবন্ধে। প্রমথ চৌধুরীসহ সবুজপত্রের লেখকদের সাহিত্যচিন্তা সম্পর্কে বিভিন্ন সমালোচকের অভিমত নিচে সংকলিত করা হলো :

সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত

তাঁহার মনকে আকৃষ্ট করিয়াছেন দণ্ডী বামন প্রভৃতি যাঁহারা কাব্যের আত্মা রসকে বাদ দিয়া কাব্যের শরীর রীতি ও অলংকারের ব্যাখ্যা করিয়াছেন। প্রমথ চৌধুরী একজন প্রকৃত আলংকারিক।

অধীর দে

‘সাহিত্য-শিল্পাদর্শের ক্ষেত্রে প্রমথ চৌধুরী কলাকৈবল্যবাদের (Art for Art’s Sake) অর্থাৎ আনন্দবাদের শ্রেষ্ঠত্বই স্বীকার করিয়াছেন।’

নীলরতন সেন

Art for Art’s Sakeমতবাদ তিনি সমর্থন করতেন। বস্তুজগতের প্রয়োজনবোধের অতিরিক্ত আনন্দদানই সাহিত্যের আদর্শনীতিগত ভাবে তিনি এ মতকে সমর্থন করেছেন।

জীবেন্দ্র সিংহরায়

হৃদয়গত আনন্দবাদের দিক থেকে তাঁর নিজের সাহিত্যই বিশ্লেষণ করা যায় না।

রথীন্দ্রনাথ রায়

প্রমথ চৌধুরী সাহিত্যসৃষ্টিতে প্রেরণাবাদের চেয়ে যতœকৃত কলা-কৌশলে বিশ্বাসী ছিলেন। কলাবিধির চর্চা, আঙ্গিকের পরীক্ষা নিরীক্ষা, সযতœশিল্পিত ফর্ম-নিষ্ঠা তাঁর গদ্য ও কবিতা, দ্বিবিধ রচনাতেই পরিস্ফুট।

ক্ষেত্র গুপ্ত

তাঁকে এককথায় ‘রূপবাদী’ আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। ভাবের প্রকাশ নয়, ভাবের রূপ নির্মিতিই সাহিত্যিকের কর্তব্য।

অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়

চৌধুরী মহাশয় আর্টকে সব-কিছুর উপরে স্থান দিয়েছেন।

হীরণকুমার সান্যাল

বিলিতি পণ্যকে তিনি জাতীয় সম্পদে পরিণত করতে পেয়েছিলেন বলেই বর্তমান বাংলা গদ্যের উপর তাঁর প্রভাব বঙ্কিম রবীন্দ্রনাথের প্রভাবের ঠিক পরেই।

শুভেন্দু ঘোষ

তাঁর মনের আভিজাত্য এবং অনন্যতা শুধু গল্পে নয়, তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধেও অত্যন্ত পরিস্ফুট।

আহমদ কবির

অর্থাৎ সেই আর্টই প্রমথ চৌধুরীর অন্বিষ্ট, যে-আর্ট কোন উদ্দেশ্য সাধন করবে না, কোন শিক্ষা দেবে না, রাজনীতিতে জড়াবে না, এবং কোন লোকহিত বা পরোপকারবৃত্তি অবলম্বন করবে না।

এর বিপরীত মতও রয়েছে। প্রমথ চৌধুরী নিজেই লিখেছেন :

সুতরাং সাহিত্যচর্চ্চা আমাদের পক্ষে একটা সখ নয়, জাতীয় জীবন গঠনের সবর্ক্ষশ্রেষ্ঠ উপায়। কেননা এ ক্ষেত্রে যা কিছু গড়ে উঠবে, তার মূলে থাকবে জাতীয় আত্মা এবং জাতীয় কৃতিত্ব। …তা ছাড়া সাহিত্যের প্রধান কাজই যখন জাতীয় আত্মাকে প্রবুদ্ধ করা,তখন তার অবসর চিরকালই আছে। আমার শেষ কথা এই যে, বাংলার ভবিষ্যত ও বাঙালীর ভবিষ্যত মূলে একই বস্তু।

সবুজপত্রের তথা প্রমথ চৌধুরীর সাহিত্যচিন্তা সম্পর্কে সমালোচকেরা যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, স্বয়ং প্রমথ চৌধুরীর মত বিপরীতধর্মী বলে মনে হয়। কেউ কেউ এমনও বলেছেন যে, প্রমথ চৌধুরী আদৌ কোন নির্দিষ্ট মতে স্থির ছিলেন না। এবারের গোষ্ঠীর অন্য লেখকদের নিয়ে আলোচনা করা যায়। সংগত কারণেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আলোচনায় আনা হয়নি। ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সাহিত্যচিন্তা প্রসঙ্গে বিভিন্ন সমালোচকের মত নি¤œরূপ :

সুদীপ বসু

সচেতন পাঠককে প্রশ্নের তীক্ষè খোঁচায় অধিকতর সচেতন করা, কি মনে আবেগ এনে নতুন প্রশ্নোদ্রেক করা পর্যন্ত। তবু প্রমথ চৌধুরীর মতো তাঁরও প্রবন্ধের লক্ষণ যেন দাঁড়িয়েছিল বিষয়ের থেকে আঙ্গিকের প্রাধান্য।

অশোককুমার সরকার

প্রাঞ্জলতা তাঁর অন্বিষ্ট ছিল, তাই মূল বক্তব্যকে স্তর বিন্যস্ত করেই প্রকাশ করেছেন, লক্ষচ্যুতিকে প্রশ্রয় দেননি। অতুলচন্দ্র গুপ্তের সাহিত্যচিন্তা প্রসঙ্গে অশোককুমার সরকার বলেন‘তাঁর গদ্য গতিশীল এবং লক্ষভেদে অব্যর্থ। তাঁর আত্মবিশ্বাস, মাত্রাজ্ঞান এবং সংযম গদ্য রচনাকে সুনিয়ন্ত্রিত করতে পেরেছে।’

এই পরিপ্রেক্ষিতে সবুজপত্রের সম্পাদক ও গোষ্ঠীর ধ্যান-ধারণা পুনরায় মূল্যায়ন করার প্রয়াস পেয়েছি এই প্রবন্ধে। সবুজপত্রে গল্প, নাটক ও কবিতা প্রকাশিত হতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাস সবুজপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। সেগুলো থেকেও পত্রিকার সাহিত্যাদর্শ কিছুটা জানা যায়। প্রমথ চৌধুরী আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর সম্পর্কে সাতটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচিত হয়েছে; বিভিন্ন সমালোচনা গ্রন্থে এবং প্রবন্ধসাহিত্যের ইতিহাসেও তার উল্লেখ দেখা যায়। তবে ‘সবুজপত্র-গোষ্ঠী’ নিয়ে আলাদা ভাবে আলোচনা হয়নি। কিন্তু ‘সবুজপত্র-গোষ্ঠীর সাহিত্য-ভাবনা’ গ্রন্থটির মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে (আমার পি-এইচ.ডি অভিসন্দর্ভের পরিমার্জিত রূপ)।

প্রমথ চৌধুরী পাঠকদের ফরাসী সাহিত্য পাঠ করার জন্যে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছেন। জাতীয় জীবনের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্কের বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তিনি উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে কোন দ্ব্যর্থবোধকতা নেই। তাঁর মতে, ‘সাহিত্যের প্রধান কাজই যখন জাতীয় আত্মাকে প্রবুদ্ধ করা, তখন তার অবসর চিরকালই আছে। আমার শেষ কথা এই যে, বাংলার ভবিষ্যৎ ও বাঙ্গালীর ভবিষ্যৎ মূলে একই বস্তু।’ ‘সুতরাং সাহিত্যচর্চ্চা আমাদের পক্ষে একটা সখ নয়, জাতীয় জীবন গঠনের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ উপায়।’ এবং, ‘মানবজীবনের সঙ্গে যার ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ নেই, তা সাহিত্য নয়, তা শুধু বাক্-ছল।’ সবুজপত্র-গোষ্ঠীর লেখকেরাও এ মতের অনুসারী ছিলেন।

সেকালে সাহিত্যের ভাষা নিয়ে দুটি ধারা বর্তমান ছিল। একদল অধিকহারে সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করার পক্ষপাতি ছিলেন। অন্যদল মনে করতেন বেশি বেশি করে ইংরেজি শব্দ প্রয়োগ করলে বাংলা সাহিত্য আধুনিকতার পথে এগিয়ে যাবে। প্রমথ চৌধুরী এবং তাঁর অনুসারীরা দুটি মতই প্রত্যাখ্যান করে মুখের ভাষা তথা চলতি ভাষার প্রয়োগ করার পক্ষপাতি ছিলেন। চলতি রীতির পক্ষে ও সাধু রীতির বিপক্ষে তাঁরা এত বাক্য ব্যয় করেছেন যে, নতুন করে বলার কিছু নেই। সবুজপত্রের সবচেয়ে বড় অবদান সাহিত্যে চলতি রীতির প্রতিষ্ঠা করা। এই অভিমতের বিরুদ্ধে জোরালোভাবে কিছু বলা প্রায় অসম্ভব। এই বিষয়ে সবুজপত্র-গোষ্ঠীর অবস্থান ও অবদান সর্বজনস্বীকৃত। সবুজপত্র-গোষ্ঠীর লেখকরা গদ্য ও প্রবন্ধে সরাসরি যা বলেছেন, আকারে-ইঙ্গিতে তারই অনুরণন বা সমর্থন রয়েছে কবিতায়ও। সবুজপত্র পত্রিকায় রস সম্পর্কে কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। বিচ্ছিন্ন ভাবেও কোন-কোন প্রবন্ধে রসের উল্লেখ ও আলোচনা রয়েছে। কিন্তু কেউ-ই সাহিত্য-বিচার করার জন্যে রস উৎপন্ন হয়েছে কিনা তা দেখার প্রয়োজন অনুভব করেন নি। প্রমথ চৌধুরী একটি বক্তব্যে বলেছেন, ‘কদলী বৃক্ষের অন্তরে সার নেই- আছে কেবল রস; সে কারণে আমরা যদি বঙ্গ সাহিত্যে সেই নিটোল সুগোল মসৃণ চিক্কণ নধর সরস বৃক্ষের চাষের প্রশ্রয় দিই, তাহলে বঙ্গসরস্বতীর কপালে নিশ্চয়ই শুধু কদলী ভক্ষণই লেখা আছে।’ এই উক্তি থেকে স্পষ্ট যে, ‘রস’ সম্পর্কে প্রমথ চৌধুরীর কোন আন্তরিক অনুরাগ ছিল না। আরও স্মরণ করা যেতে পারে যে, সম্ভবত আলংকারিকদের ব্যবহৃত রস শব্দ তিনি সম্যকভাবে ব্যবহার করেন নি। তিনি ইমোশন তথা ভাবকে রসের সমার্থক ধরেছিলেন [‘অপরপক্ষে আমরা যাকে বলি রস, আর ইংরেজরা ইমোশন’] (বাংলায় ভবিষ্যৎ), কিন্তু আলংকারিকেরা ভাবকে রসের সমার্থক ধরেন নি। ভাব একটি কাঁচা মাল যা বিভাব ও অনুভাব সহযোগে রসে পরিণত হয়। অতুলচন্দ্র গুপ্ত ব্যতীত রস ও অলংকারশাস্ত্রের অন্যান্য বিষয় নিয়ে সবুজপত্রে কেউ সরাসরি আলোচনা করেন নি। বিক্ষিপ্তভাবে রসের প্রসঙ্গ ও অলংকারশাস্ত্রের ব্যবহার কোন কোন লেখায় পাওয়া যায়।

সবুজপত্রে প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য রচনাগুলো হচ্ছে :

১. প্রমথ চৌধুরী, অভিভাষণ (১৩২১ ফাল্গুন, ১ম বর্ষ, একাদশ সংখ্যা)।

২. প্রমথ চৌধুরী, অলঙ্কারের সূত্রপাত (১৩২২ অগ্রহায়ণ, ২য় বর্ষ, অষ্টম সংখ্যা)।

৩. প্রমথ চৌধুরী, বাংলার ভবিষ্যৎ (১৩২৪ অগ্রহায়ণ, ৪ র্থ বষর্, অষ্টম সংখ্যা)।

৪. প্রমথ চৌধুরী, রামমোহন রায় (১৩২৭ আশ্বিন, ৭ম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা)।

৫. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাস্তব (১৩২১ শ্রাবণ, ১ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা)।

৬. রাধাকমল মুখোপাধ্যায়, সাহিত্যে বাস্তবতা (১৩২১ মাঘ, ১ম বর্ষ, দশম সংখ্যা)।

৭. সুরেন্দ্রনাথ দাস গুপ্ত, অভিনবের ডায়েরী [ রসের অলৌকিকত্ব] (১৩২২ কার্তিক, ২য় বর্ষ, সপ্তম সংখ্যা)।

৮. ভূপেন্দ্রনাথ মৈত্র, সোদাহরণ অলঙ্কার (১৩২৩ শ্রাবণ, ৩য় বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা)।

৯. জ্ঞানেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য, সাহিত্যে সমদর্শন (১৩২৯ জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ়, ৮ম বর্ষ, একাদশ ও দ্বাদশ সংখ্যা)।

১০. অতুলচন্দ্র গুপ্ত, কাব্য-জিজ্ঞাসা (১৩৩৩ আষাঢ়, শ্রাবণ, কার্তিক-অগ্রহায়ণ, ফাল্গুন, ৯ম বর্ষ, একাদশ, দ্বাদশ সংখ্যা, ১০ম, বর্ষ, দ্বিতীয়-তৃতীয়, ষষ্ঠ সংখ্যা)।

তালিকার দশ নম্বরটি তথা অতুলচন্দ্র গুপ্তের ‘কাব্যজিজ্ঞাসা’ এই ধারার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখা। সংস্কৃত অলংকার শাস্ত্রের বিশাল অরণ্য নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে তিনি যৌক্তিক পারম্পর্যে ও সাবলীলতায় মূলবক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। অলংকার নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা ও মন্তব্য করেছেন পত্রিকা সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী নিজেই। তাঁর চারটি প্রবন্ধের নাম এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। তার বাইরে অন্যান্য প্রবন্ধে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু মন্তব্য পাওয়া যায়। বিভিন্ন লেখা থেকে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্যসমূহ সংকলন করা হয়েছে।

ক. ‘বাক্য রসাত্মক হইতে হইলে, প্রথমত, ভাব রসাত্মক হওয়া আবশ্যক; দ্বিতীয়ত, শব্দ রসাত্মক হওয়া আবশ্যক; তৃতীয়ত, এরূপভাবে প্রকাশ করা কর্তব্য যাহাতে রসাত্মক ভাব রসাত্মক শব্দের সহিত সম্পূর্ণরূপে মিশ্রিত হইতে পারে।’

খ. ‘বাঙ্গালী জাতির হৃদয়ে রস আছে, মস্তিষ্কে বল আছে।’

গ. ‘আদিরসই এ জগতে একমাত্র রস নয়, অনাদি রস বলেও একটি রস আছে; যাঁরা এ রসের রসিক তাঁদের কাছেই উপনিষদ্ হচ্ছে মানবমনের গগনচুম্বী কীর্ত্তি।’

ঘ. ‘যে রস তাঁর কাব্যের একটি বিশেষ রস সে রস এ যুগে অস্পৃশ্য। কেননা তা হচ্ছে আদিরস। উক্ত রসের শারীরিক ভাষ্য এ যুগের কাব্যে আর চলেনা, চলে শুধু দেহতত্ত্ব নামক উপবিজ্ঞানে।’

ঙ. ‘যখন কোনো জাতির অন্তরে কাব্যরস শুকিয়ে আসে তখন প্রায়ই দেখা যায় যে, সাহিত্যিকের পিত্ত সেই সঙ্গে প্রকুপিত হয়ে ওঠে; আর তখন সাহিত্য কি হওয়া উচিত তাই নিয়ে মহা বাগ্বিতণ্ডা উপস্থিত হয়।’

উদ্ধৃতিগুলো থেকে বোঝা যায়, প্রমথ চৌধুরী সব রচনায় রসকে এক অর্থে ব্যবহার করেননি; অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি রসকে ভাবের প্রতিশব্দ হিসেবে গণ্য করেছেন। প্রকৃত অর্থে, রস ভাব নয়, ভাবও রস নয়। মানুষের মনে ভাব থাকে, রস থাকে না। মানব মনের ৯টি স্থায়ী ভাব ও ৩১টি ব্যভিচারী অবলম্বন করে বিভাব ও অনুভাবের সাহায্যে লেখক সাহিত্যরচনা করেন। সেই সাহিত্য সহৃদয় বা বিদগ্ধ পাঠকের মনে রসের উদ্বোধন ঘটায়; পাঠশেষে সে-রস আবার মিলিয়ে যায়। অর্থাৎ ভাব মানব মনে চিরন্তন বা স্থায়ী, কিন্তু রসের স্থায়িত্ব ক্ষণিকের। রসের উদ্ভব ও বিলয় পাঠকের মনে। অতুলচন্দ্র গুপ্ত লিখেছেন‘কাব্যরসের আধার কাব্যও নয়, কবিও নয়, সহৃদয় কাব্যপাঠকের মন।’ অতুলচন্দ্র গুপ্তের অর্থে প্রমথ চৌধুরী রস শব্দটি প্রয়োগ করেননি। রস সম্পর্কে তাঁর ধারণা খুব স্বচ্ছ ও গভীর ছিল তা মনে হয় না।

সবুজপত্র-গোষ্ঠীর আরও দু-একজন লেখক রস নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে সেগুলো কৌতুকের ভঙ্গিতে। তাঁদের মনোভাব পূর্বে উদ্ধৃত প্রমথ চৌধুরীর মনোভাবেরই অনুরূপ। সবুজপত্র-গোষ্ঠীর বিশেষ বিবেচনা ছিল রচনার শৈলী ও আঙ্গিক সম্পর্কে। বক্তব্যের তুলনায় ভঙ্গিকে তাঁরা কোন ক্রমেই গুরুত্বহীন মনে করেন নি। বরং কখনো কখনো, বিশেষ করে প্রমথ চৌধুরীর লেখায় এমন বক্তব্যও পাওয়া যায়, যাতে মনে হতে পারে যে, তিনি শুধু অঙ্গসজ্জার দিকেই অধিকতর মনোযোগী ছিলেন। রচনার আঙ্গিক যাতে সুন্দর, সুষ্ঠু ও সুগঠিত হয় তার প্রতি অত্যন্ত বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন প্রমথ চৌধুরী ও তাঁর অনুসারীরা। শব্দের ধার বৃদ্ধি করা, শব্দের নতুন তাৎপর্য আবিষ্কার করা, ভাষার কৃত্রিমতা পরিহার করা, অর্থালংকারের আতিশয্য এবং অনুপ্রাসের ঝংকার ও ভাবালুতা কমিয়ে আনা তাঁরা উন্নত সাহিত্যের জন্য অপরিহার্য মনে করতেন। সবুজপত্র-গোষ্ঠীর লেখকদের সম্পর্কে প্রচলিত এই মতটি সম্পর্কে দ্বিমতের কোন অবকাশ নেই।

সাহিত্যের দুটি অংশবিষয় ও আঙ্গিক। দুটির যথাযথ মিলনেই একটি উৎকৃষ্ট সাহিত্য রচিত হয়। সাহিত্যরসিকেরা দুটিকে আলাদা করে দেখতে চান না, এবং এ দুয়ের মধ্যে লঘু-গুরু ভেদ করেন না। এই আদর্শ অবস্থা বাংলা সাহিত্যে সব সময় দেখা যায় নি। উনিশ শতকের লেখকেরা বেশি জোর দিয়েছিলেন বিষয়ের ওপর। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, সাহিত্যচর্চায় আঙ্গিকের দিকটি প্রায় অপাঙ্ক্তেয় হয়ে গিয়েছিল। সেই পটভূমিতে সঙ্গত কারণে, প্রমথ চৌধুরী বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন আঙ্গিকের প্রতি। আঙ্গিকের প্রতি প্রমথ চৌধুরী ও তাঁর অনুসারীরা এত বেশি নজর দিয়েছিলেন যে, অপরটি সম্পর্কে তাঁদের চিন্তা সমালোচকদের দৃষ্টি প্রায় এড়িয়ে গেছে। তাই বলে এই গোষ্ঠী শুধু আঙ্গিক নিয়েই ব্যাপৃত ছিলেন না, বিষয়কেও তাঁরা অতীব গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। তাঁদের লেখা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করে আমাদের মনে হয়েছে কোন-কোন সমালোচকেরা যে ভাবে তাঁদের সাহিত্যাদর্শকে নির্দেশ করেছেন, আসলে ব্যাপারটা তেমন নয়। আহমদ কবিরের মতটি তথা, ‘…সেই আর্টই প্রমথ চৌধুরীর অন্বিষ্ট, যে-আর্ট কোন উদ্দেশ্য সাধন করবে না, কোন শিক্ষা দেবে না, রাজনীতিতে জড়াবে না, এবং কোন লোকহিত বা পরোপকারবৃত্তি অবলম্বন করবে না।’ আমাদের প্রাপ্ত তথ্যের ও উক্তির প্রমাণে এমত গ্রহণযোগ্য নয়। তেমনি Art for Art’s Sakeপ্রসঙ্গে ভোলানাথ ঘোষ বলেছেন, একদল মনে করেন ‘শিল্পের জন্য শিল্প’। এঁরা বিশ্বাস করেন ও প্রচার করেন যে, সাহিত্য দেশ-কালের উর্ধ্বে স্থাপিত সৌন্দর্য-প্রতিমা; মানুষের প্রাত্যহিক জীবন, সামাজিক জীবন বা রাষ্ট্রীয় জীবনে সাহিত্যের উপযোগিতা নেই। এঁরা আরো মনে করেন যে, আর্ট কখনো কারো বস্তুগত উপকারে আসে না, শিল্পী কখনও কোনো বিষয়ের ভালো-মন্দ বিচার করতে বসেন না, শিল্পীর লক্ষ থাকে সার্থক সৌন্দর্য সৃষ্টির দিকে। বস্তুজগতের আড়ালে বিরাজিত সৌন্দর্য জগতকে প্রকাশ করা বা তার আলেখ্য নির্মাণই শিল্পীর প্রধান দায়িত্ব।

অন্যদিকে M.H. ABRAMS-এর A Glossary of literary Terms-এ আছে- `French writer’s developed the view that a work of art is the supreme value among human products precisely because it is self-sufficient, and has no use or moral aim outside its own being. The end of a work of art is simply to exist in its formal perfection; that is, be beautiful, and to be contemplated as an end in itself. A rallying cry of aestheticism became the phrase ‘l’ art pour l’art”- art for art’s sake.’ভোলানাথ ঘোষ এবং M.H. ABRAMS -এর বরাত দিয়ে যা বলা হয়েছে সেটাও প্রমথ চৌধুরীর অনুসৃত আদর্শের সঙ্গে মেলে না। আসলে প্রমথ চৌধুরী এবং সবুজপত্র-গোষ্ঠীর লেখকেরা উদ্দেশ্যবিহীন সাহিত্যের তথা ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ তত্ত্বের পক্ষে ছিলেন না। নিছক আনন্দ দেওয়াকেই তাঁরা সাহিত্যের একমাত্র উদ্দেশ্য মনে করেন নি। সাহিত্যচর্চা তাঁদের কাছে সখের ব্যাপার ছিল না। সাহিত্যের কাছ থেকে তাঁরা হাতে-হাতে ফল পাবার আশা করেন নি; সাহিত্য সবার অগোচরে ধীরে-ধীরে অথচ অনিবার্যভাবে জাতি গঠন করে চলে। প্রমথ চৌধুরীর কাছে সাহিত্যচর্চা সাহিত্য সাধনার সমতুল্য ছিল।

 

শতবর্ষে সবুজপত্র : কিছু ভাব

কানাই সেন

 বিগত শতক তথা বিশ শতকের প্রথমে যথার্থ সাহিত্য পত্রমাসিক পত্র প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত সবুজপত্র। রবীন্দ্র স্নেহধন্য প্রথম চৌধুরীর সম্পাদনায় পত্রিকাটি প্রকাশিত হলেও এর প্রাণপুরুষ এবং প্রেরণা উৎস নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রনাথ। তা সত্ত্বেও এর পেছনে ছিল ‘সুকর্ষিত বিদগ্ধ মানসিকতা’র কিছু সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ। তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। ব্রাইট স্ট্রিটের বাড়িতে প্রমথ চৌধুরীর মজলিশ বসত। সে মজলিশে যাঁরা অংশ নিতেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বরা হলেনঅতুলচন্দ্র গুপ্ত, কিরণশংকর রায়, সতীশচন্দ্র ঘটক, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বরদাচরণ গুপ্ত, সুনীতিকুমার চট্ট্যোপাধ্যায় প্রমুখ। এঁদের সঙ্গে উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল ইন্দিরাদেবীরও। সংস্কৃতিচর্চাই ছিল এই সভার অন্যতম উদ্দেশ্য। এঁদের সংস্কৃতিচর্চা-সাহিত্যসাধনার পথ ধরে এবং অবশ্যই প্রমথ চৌধুরীর প্রযত্নে জন্ম হলো সবুজপত্রের। সবুজপত্রের প্রতিষ্ঠা এবং বিকাশের ক্ষেত্রে এই মজলিশ গোষ্ঠীর ভূমিকা কোনভাবেই অস্বীকার করা যায় না। এই আসর সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে এর অন্যতম প্রাণপুরুষ ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলেছেন :

আমি যে দলে মানুষ হয়েছি তাকে Pramathean কিংবা ‘সবুজপত্রের দল’ বললেই বর্ণনা সম্পূর্ণ হয় না। কারণ আমাদের বই পড়ার অভ্যাস ও বড় বড় ব্যাপার নিয়ে তর্ক প্রবৃত্তির জন্যই প্রমথবাবু নিজের কাছে আমাদের টেনে নেন ও শিক্ষা দিয়ে সবুজপত্রের দল তৈরি করেন।

বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে উনিশ শতকের সাতের দশকে একটি পরিশীলিত লেখক গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়েছিল। তারও আগে এই দায়িত্ব নিয়েছিলেন ‘সংবাদ প্রভাকরের’ সম্পাদক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। কিন্তু বিশ শতকের প্রথম পর্বের প্রমথ চৌধুরীর ব্রাইট স্ট্রিটের মসলিশের সঙ্গে এর কিছুটা চরিত্রগত পার্থক্য ছিল। সুশিক্ষিত প্রমথ চৌধুরী একটি সুশিক্ষিত লেখক গোষ্ঠী গড়ে তুলেছিলেন নিজের সাহিত্য আদর্শের ভাবনায়। এবং তিনি এটা করেছিলেন সচেতনভাবে। এই লেখকগোষ্ঠীর মুখপত্র রূপেই সবুজপত্রের আত্মপ্রকাশ। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে পরবর্তী সময়ে ‘কল্লোল’ পত্রিকা প্রকাশের ইতিহাস প্রায় একই রকম। একটি শিল্প-সাহিত্যিক গোষ্ঠীর মুখপত্র রূপেই ‘কল্লোল’ পত্রিকার প্রকাশ ঘটেছিল। এই পত্রিকা প্রকাশের সূত্রপাত ‘ফোর আর্টস্ ক্লাব’ বা ‘চতুষ্কলা সমিতির’ হাত ধরে। আনুষ্ঠানিকভাবে ক্লাবটির যাত্রা শুরু ১৯২১ সালের ৪ঠা জুন। অবশ্য এর আগে এক পূর্ণিমা রাতে জ্যোৎস্নাস্নাত পরিমণ্ডলে একটি সভায় এই ক্লাবের প্রস্তুতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। দীনেশচন্দ্র দাস এবং গোকুলচন্দ্র নাগের ভাবনার ফসল এই ‘ফোর আর্টস্ ক্লাব’। ক্লাবের নামকরণ করেছিলেন গোকুলচন্দ্র। এঁরা ছাড়া সতীন্দ্র প্রসাদ সেন এবং সুনীতি দেবীরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এই ক্লাবের অনুশীলনের বিষয় ছিলসাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রশিল্প ও কারুশিল্প।

প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত সবুজপত্র প্রকাশের পেছনে অনেকগুলো বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এর মধ্যে কিছু বিষয় ঐতিহাসিক, কিছু পারিপার্শ্বিক এবং কিছু ব্যক্তিগত। সুকুমার সেন ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাসে’ এ পত্রিকা প্রকাশের প্রস্তুতি-পর্বের পরিচয় প্রসঙ্গে বলেছেন : ‘প্রমথনাথ চৌধুরীর গাঢ়বদ্ধ ও অগতানুগতিক পদ্য ও গদ্য রচনা পড়িয়া রবীন্দ্রনাথ স্থির করিলেন, ইহাকে অগ্রণী করিয়া বাংলা সাহিত্যকে আধুনিকতার পথে পরিচালিত করিতে হইবে’এবং ‘এই উদ্দেশ্য লইয়া প্রমথ (নাথ) চৌধুরী সবুজপত্র বাহির করিলেন।’ এছাড়া সবুজপত্র প্রকাশনার পেছনে আরও একটা বিষয়ের ইঙ্গিত তিনি দিয়েছেন। সেটা হল, এর কয়েক বছর আগেই রবীন্দ্রনাথ ‘বঙ্গদর্শনে’র সম্পাদনা ছেড়েছেন। বিপিনচন্দ্র পালের নেতৃত্বে ‘বঙ্গদর্শনে’ রবীন্দ্রনাথের রচনা ও চিন্তার বিরুদ্ধতা শুরু হয়েছিল প্রবলভাবে। বিপিনচন্দ্রের আক্রমণের লক্ষ ছিল রবীন্দ্রনাথের লেখার ভাব ও বস্তু সম্পর্কিত। তাঁর রচনা যে সর্বতোভাবেই ‘বস্তুতন্ত্রহীন’ এটা প্রতিপন্ন করার জন্য বিপিনচন্দ্র এবং তাঁর সহযোগীরা অনেকেই কম বেশী আক্রমণাত্মক হয়েছিলেন। এই পরিস্থিতিতে‘রবীন্দ্রনাথ প্রয়োগ করিলেন আধুনিকতম অস্ত্রনির্মল বুদ্ধির, অনাবিল চিন্তার ও শাণিত বচনেরযাহা প্রতিপক্ষের বর্ম ও মর্ম ভেদ করিবে এবং সেই সঙ্গে পাঠক ও লেখক মনের জড়তা হইতে, সাহিত্য-কর্মের ধূলি-আবর্ত ও পুনরাবৃত্তির চক্র আক্রমণ হইতে মুক্ত হইবার দিশা পাইবে’ (সুকুমার সেন, বাঙ্গালী সাহিত্যের ইতিহাস)। সেনের মতে সবুজপত্র প্রকাশের এটাই হলো মুখ্য উদ্দেশ্য। এই উদ্ধৃতিটি বিশ্লেষণ করলে দুটো বিষয় সামনে আসবে। প্রথমত, বিরুদ্ধবাদীদের প্রতিরোধে যে বুদ্ধি, চিন্তা ও ভাষা ব্যবহৃত হবে সেগুলো হবে নির্মল, আবিলতামুক্ত এবং তীক্ষè শাণিত। দ্বিতীয়ত, লেখক ও পাঠকের মন সন্ধান পাবে পরিচ্ছন্ন উজ্জ্বল, মলিনতাহীন মুক্ত সাহিত্য-পৃথিবীর।

সবুজপত্রের প্রথম সংখ্যায় সবুজপত্র নামাঙ্কিত দুটি প্রবন্ধ আছে। একটি সম্পাদকীয় যার শীর্ষনাম ‘সবুজপত্রের মুখপত্র’ এবং দ্বিতীয়টি ‘সবুজপত্র’। প্রথম প্রবন্ধটিকে সম্পাদকীয় তথা পত্রিকা প্রকাশের কারণ নির্দেশক রচনা হিসেবে ধরা যায়। ‘সবুজপত্রের মুখপত্র’ প্রবন্ধের প্রথমে প্রাণের বন্দনা আছে‘ওঁ প্রাণায় স্বাহা’। এই প্রাণ তরুণপ্রাণ, এর সাধনা যৌবনের সাধনা। প্রবন্ধের প্রথমেই তিনি বলেছেন‘স্বর্গীয় দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বাঙালি জাতিকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘একটা নতুন কিছু করো’। সেই পরামর্শ অনুসারেই যে আমরা একখানি নতুন মাসিক পত্র প্রকাশ করতে উদ্যত হয়েছি, একথা বললে সম্পূর্ণ সত্য বলা হবে না। এ পৃথিবীটি যথেষ্ট পুরোনো, সুতরাং তাকে নিয়ে নতুন কিছু করা বড়োই কঠিন, বিশেষত এদেশে যদি বহু চেষ্টায় নতুন কিছু করে তোলা যায়, তা হয় জলবায়ুর গুণে দুদিনেই পুরোনো হয়ে যায়, নয় তো পুরাতন এসে তাকে গ্রাস করে ফেলে। এইসব দেশে শুনে এদেশে কথায় কিংবা কাজে নতুন কিছু করবার জন্য যে পরিমাণ ভরসা ও সাহস চাই তা আমাদের আছে তা বলতে পারি না।’ বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের প্রয়োজনে সবুজপত্র প্রকাশিত হয়েছে এটা প্রমথ চৌধুরী মেনে নেননি। এই প্রবন্ধে তিনি অকুন্ঠভাবে স্বীকার করেছেন‘তাছাড়া স্বদেশের কিংবা স্বজাতির কোনো একটি অভাব পূরণ করা, কোনো একটি বিশেষ উদ্দেশ্য সাধন করা সাহিত্যের কাজও নয় ধর্মও নয়। …কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যকে অবলম্বন করাতে মনের ভিতর যে সংকীর্ণতা এসে পড়ে সাহিত্যের স্ফূর্তির পক্ষে তা অনুকূল নয়।’ তিনি বলেছেন, কাজ হচ্ছে দশে মিলে করার জিনিস, কিন্তু দলবদ্ধ হয়ে সাহিত্য গড়া সম্ভব নয়। তাঁর বিশ্বাস‘মন পদার্থটি মিলনের কোলে ঘুমিয়ে পড়ে, আর বিরোধের স্পর্শে জেগে ওঠে। এবং মনের এই জাগ্রত ভাব থেকেই সকল কাব্য, সকল দর্শন, সকল বিজ্ঞানের উৎপত্তি’। পাশাপাশি নিজের সাহিত্য আদর্শ সম্পর্কেও তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন :

মানব জীবনের সঙ্গে যার ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ নেই, তা সাহিত্য নয়, তা শুধু বাক-ছল। জীবন অবলম্বন করেই সাহিত্য জন্ম ও পুষ্টি লাভ করে, কিন্তু সে জীবন মানুষের দৈনিক জীবন নয়। সাহিত্য হাতে হাতে মানুষের অন্ন বস্ত্রের সংস্থান করে দিতে পারে না।

বিদেশী সাহিত্যে বিদগ্ধ প্রমথ নাথ মনে করতেন ইউরোপীয় সাহিত্যের সংস্পর্শেই বাংলা ভাষায় নতুন সাহিত্য ভাবনায় মুক্তির ঢেউ লেগেছে। তিনি বলেছেন‘সুন্দরের আগমনে হীরা মালিনীর ভাঙা মালঞ্চে যেমন ফুল ফুটে উঠেছিল, ইউরোপের আগমনে আমাদের দেশে তেমনি সাহিত্যের ফুল ফুটে উঠেছে।’ পাশাপাশি অন্য একটি সত্যের প্রতিও তিনি সযতেœ আলোকপাত করেছেন‘ইউরোপের কাছে আমরা একটি অপূর্ব জ্ঞান লাভ করেছি। সে হচ্ছে এই যে, ভাবের বীজ যে দেশ থেকেই আনো-না কেন, দেশের মাটিতে তার চাষ করতে হবে।’ প্রথম সংখ্যার দ্বিতীয় প্রবন্ধ সবুজপত্রের শেষাংশে পত্রিকার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেছেন :

আমাদের নব মন্দিরের চারদিকের অবারিত দ্বার দিয়ে প্রাণবায়ুর সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের যত আলো অবাধে প্রবেশ করতে পারবে। শুধু তাই নয়, এ মন্দিরে সকল বর্ণের প্রবেশের সমান অধিকার থাকবে। ঊষার গোলাপি, আকাশের নীল, সন্ধ্যার লাল, মেঘের নীললোহিত, বিরোধালংকার- স্বরূপে সবুজপত্রের গাত্রে সংলগ্ন হয়ে তার মরকতদ্যুতি কখনো উজ্জ্বল, কখনো কোমল করে তুলবে। সে মন্দিরে স্থান হবে না কেবল শুষ্ক পত্রের’। সবুজপত্র যে সংস্কার-বদ্ধ, গতানুগতিক, মলিন-জীর্ণ সাহিত্য-আবর্ত থেকে বাংলা সাহিত্যকে উদার মুক্ত, যুক্তি বুদ্ধির নতুন উজ্জ্বল দিগন্তে মুক্তি দেবে এই প্রত্যাশা বাণী এখানে বলিষ্ঠভাবে উচ্চারিত হয়েছে।

নতুন পত্রিকার সবুজপত্র নামকরণ সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের মননজাত। ৫ই মার্চ ১৯১৪ সালের প্রমথ চৌধুরীকে লেখা রবীন্দ্রনাথের একটি চিঠিতে এর ইঙ্গিত রয়েছে। যেখানে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন‘সবুজপত্র উদ্গমের সময় হয়েছেবসন্তের হাওয়ায় সেকথা ছাপা রইল নাঅতএব সংবাদটা ছাপিয়ে দিতে দোষ নেই।’ ২৩ শে মার্চ ১৯১৪ তিনি প্রমথ চৌধুরীকে আবার লিখলেন‘আচ্ছা রাজি আছি। ১৫ ই বৈশাখেই বের করো। ইতিমধ্যে দু-একটা লেখা দিতে পারব।’ এর আগে পত্রিকাটির পরিকল্পনা লগ্নে রবীন্দ্রনাথ এর অন্য একটি নামও সম্ভবত ভেবেছিলেন। প্রমথনাথকে লেখা একটি চিঠিতে পাওয়া যায় : ‘সেই কাগজটার কথা চিন্তা কোরো, যদি সেটা বের করাই স্থির হয় তাহলে শুধু চিন্তা করলে হবে না–কিছু লিখতে শুরু করো। কাগজটার নাম যদি ‘কনিষ্ঠ’ হয় ত কি রকম হয়? আকারে ছোটবয়সেও।’

সেই সময় এবং তার আগে প্রকাশিত কোনো বাংলা মাসিক পত্রের সঙ্গে সবুজপত্রের আকৃতিগত এবং প্রকৃতিগত কোনো দিকেই মিল ছিল না। এর আকার ছিল ফুল্সক্যাপ কাগজের অর্ধেক। মলাট ছিল সবুজ রঙের। মলাটের মাঝখানে সবৃন্ত তালপাতার সিলুয়েং (Silhouette—কালো রঙে নকশা)। উদ্ধত, অদম্য, চিরহরিৎ, চিরনবীন, সরল, সবল, উদ্দণ্ড, ঊর্ধ্বাভিমুখিতার চিহ্ন এই অভিনব তালধ্বজ। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী নন্দলাল বসু।

সুকুমার সেন বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাসে (পঞ্চম খণ্ড) সবুজপত্রের প্রকাশ তারিখ সম্পর্কে বলেছেন : ‘এই উদ্দেশ্য লইয়া প্রমথ (নাথ) চৌধুরী সবুজপত্র বাহির করিলেন (১৫ বৈশাখ, ১৩২১)।’ এই তারিখটি নিশ্চিতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এটা সম্ভবত ছাপার ভুল। কারণ সবুজপত্রের প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠায় (Title Page) এর যে-প্রকাশ সময়ের উল্লেখ আছে তা হলো ২৫শে বৈশাখ ১৩২১। প্রকাশক হিসাবে কান্তিক প্রেস, ২০, কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, কলিকাতার উল্লেখ আছে। এই সংখ্যার মূল্য চারি আনা মাত্র এবং পত্রিকার বার্ষিক মূল্যদুই টাকা ছয় আনা। ছাপা হয়েছিল কান্তিক প্রেসে; মুদ্রক শ্রী হরিচরণ মান্না এবং প্রকাশক শ্রীযুক্ত কালাচাঁদ দালাল। এই তথ্য মূল Title Pageথেকে পাওয়া। বিজ্ঞাপন, ছবি সংবাদ-ফিচার এবং চটকদার, আকর্ষক বা তাৎক্ষণিক মনোরঞ্জনের বিষয় কোন কিছুই সবুজপত্রে স্থান পায়নি। সচেতনভাবেই এগুলো বর্জন করা হয়েছিল।

পত্রিকার প্রথম বর্ষের (১৩২১) ১২টি সংখ্যার রচনাগুলির চরিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে গল্প-কবিতা-ধারাবাহিক উপন্যাস-প্রবন্ধ-চিঠি-গান-নাটক-রম্য রচনা-বক্তৃতা-সম্পাদকীয় মিলিয়ে প্রথম বছরে মুদ্রিত রচনার সংখ্যা ৭২। উল্লেখ্য এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি লেখা রবীন্দ্রনাথের। এই সংখ্যা ৪০। প্রায় ৫৬ শতাংশ। প্রতিটি সংখ্যাতেই রবীন্দ্রনাথের একাধিক লেখা ছিল। সবচেয়ে কম সংখ্যক লেখা ছিল ষষ্ঠ সংখ্যায় (আশ্বিন ১৩২১)Ñ মাত্র দুটি। এবং সবচেয়ে বেশি লেখা ছিল নবম (পৌষ) ও একাদশ (ফাল্গুন) সংখ্যায় ৫টি করে। এই দুটি সংখ্যায় প্রমথ চৌধুরীর একটি করে লেখা ছাড়া বাকি সব লেখাই রবীন্দ্রনাথের। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য বছরের শেষ সংখ্যা (চৈত্র, দ্বাদশ) সব লেখাই রবীন্দ্রনাথের। বসন্তের পালার ভূমিকা আছে প্রথমে। এগুলি বসন্তের পালার গান। এরপর আছে ‘ফাল্গুনী’ নাটকের ভূমিকাদুই পৃষ্ঠা এবং শেষে আছে মূল নাটকটি। প্রমথ চৌধুরীর স্বনামে এবং বীরবল নামে লেখার সংখ্যা ১৬টি (স্বনামে ১২ এবং বীরবল নামে ৪টি)। বীরবলের মারফৎ প্রাপ্ত জনৈক বঙ্গনারীএই নামে আছে একটি লেখা (কার্ত্তিক সংখ্যা) এটি যে বীরবলেরই লেখা এতে কোন সন্দেহ নেই। এছাড়া প্রথম বছর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন দুটি কবিতাপ্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যা (বৈশাখ) এবং তৃতীয় সংখ্যায় (আষাঢ়)। এছাড়া একটি করে রচনা আছে ১৩ জনের। এঁরা হলেনসর্বশ্রী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রনারায়ণ বাগচি, কালিপদ রায়, অজিত কুমার চক্রবর্তী, প্রফুল্ল চক্রবর্তী, বীরেন্দ্র কুমার বসু, রমাপ্রসাদ চন্দ, মহীতোষ কুমার রায় চৌধুরী, নরেশ চন্দ্র সেনগুপ্ত, সতীশচন্দ্র ঘটক, ইন্দিরা দেবী, রাধাকমল মুখোপাধ্যায় এবং সরযূবালা দাসগুপ্তা। প্রথম বছর ১২টি সংখ্যার মোট পৃষ্ঠা ৮৬৩। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথের লেখা আছে ৫০৯ পৃষ্ঠা অর্থাৎ মোট পৃষ্ঠা সংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ।

রবীন্দ্রনাথের প্রেরণা ও উৎসাহে এবং প্রমথ চৌধুরীর সযতœ সম্পাদনায় সবুজপত্র পত্রিকার প্রকাশ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক ক্রান্তিলগ্ন। কারণ সবুজপত্রের মাধ্যমেই বাংলা ভাষায় নতুন গদ্যরীতি প্রবর্তিত হলো। এটা ইতিহাস স্বীকৃত। এর ঐতিহাসিক মূল্য নির্দেশ প্রসঙ্গে ‘বাংলা সাহিত্যে প্রমথ চৌধুরী’ গ্রন্থে লেখক মান্য অধ্যাপক রথীন্দ্রনাথ রায় বলেছেন‘সবুজপত্র যুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর যুগের বিদ্রোহী সন্তান। তাই তার আচরণ ও বাগ-বিন্যাসেও এই বিদ্রোহের বক্র তির্যক ভঙ্গিটি স্পষ্ট রেখায় স্বাক্ষরিত।’ যদিও ইতিহাসের নিরিখে বাংলা প্রবন্ধের চর্চা শুরু হয়েছিল উনিশ শতকের প্রথম পর্বে রামমোহনের যুগ থেকেই। সাময়িক পত্রিকার ইতিহাস আরো পুরোনো। রামমোহনের পর বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, ভূদেব মুখোপাধ্যায় এবং বঙ্কিমচন্দ্র ও তাঁর পার্শ্বচর মনীষীরা উনিশ শতকেই প্রবন্ধ যথেষ্ট কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। তাঁদের রচনায় গদ্যের বলিষ্ঠতা, প্রসাদগুণ এবং যুক্তি বুদ্ধির সমন্বয় ঘটেছিল। এর সঙ্গে অবশ্যই যুক্ত হয়েছিল গবেষণাধর্মিতা এবং পাণ্ডিত্য। এই সময়ের প্রবন্ধে উপাদান এ বস্তু গুণের কোন অভাব ছিল না। পাশাপাশি নৈয়ায়িক মেজাজটিও ছিল লক্ষ করার মতো। তবে সে যুগের লেখকরা কি বিষয় লিখবেন তার সাধনাতেই সমস্ত শক্তি ব্যয় করেছেন। কিন্তু কেমন ভাবে লিখবেন অর্থাৎ লেখার রীতি বা স্টাইলের দিকটির চর্চা তাদের কাছে উপেক্ষিত ছিল। এখানেই উনিশ শতকের ভাষারীতি ও উপস্থাপন রীতির সঙ্গে বিশ শতকের প্রথম সাময়িক পত্রিকা সবুজপত্রের মৌল পার্থক্য। বলার বিষয় এবং বলার একেবারে নতুন স্মার্ট স্টাইল নিঃসন্দেহে সবুজপত্রের দান। বাংলা ভাষা আন্দোলনের পথ নির্দেশেই সবুজপত্রের গৌরব দীপ্ত ভূমিকা। এই পত্রিকাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়নি, তবুও এর ভূমিকা যুগান্তকারী। এখান থেকেই শুরু হয়েছিল আধুনিক মনন ও বিশ শতকের নতুন জিজ্ঞাসার প্রস্তুতি আগামী যুগের বার্তাবহ হিসেবেই সবুজপত্রের অম্লান স্বীকৃতি। অধ্যাপক রথীন্দ্রনাথ রায় সবুজপত্রের আদর্শ সম্পর্কে বলেছেননব্যতন্ত্রী সাহিত্যের ঋজু গতিপথ নির্দেশই ছিল এর লক্ষ। নিত্য নতুন অভিঘাতে প্রাণচাঞ্চল্যে উদ্বোধিত আধুনিক জীবন এবং আধুনিক সাহিত্য ধর্মিতার প্রাণময় উজ্জ্বল প্রকাশই ছিল এর আদর্শ।

লোকান্তরের পূর্বে একটা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন : ‘প্রমথনাথ যে এই পত্রকে (সবুজপত্র) একটি বিশিষ্টতা দিয়েছিলেন তাতে আমার তখনকার রচনাগুলি সাহিত্য সাধনার একটি নতুন যুগে প্রবেশ করতে পেরেছিল।’ এই স্বীকারোক্তিতে অতিরঞ্জন নেই। কারণ চির তারুণ্যের উপাসক রবীন্দ্রনাথের ¯্রষ্টা মন এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে নতুন উদ্দীপনায়, প্রবল প্রাণাবেগে উদ্বোধিত হয়েছিল। প্রথম সংখ্যার ‘সবুজের অভিযান’ কবিতা এবং ‘হালদার গোষ্ঠী’ ছোট গল্পের মধ্যে রয়েছে নতুন জগতে পদসঞ্চারের সুস্পষ্ট ঈঙ্গিত। নারী জাগরণ তথা অন্ধ সংস্কারের কারাগার থেকে মুক্ত করে তিনি তাদের আত্ম-স্বাতন্ত্র্যের পৃথিবীতে মুক্তি দিয়ে চেয়েছিলেন। হৈমন্তী, বোষ্টমী, স্ত্রীর পত্র ইত্যাদি ছোট গল্পগুলি এর সার্থক উদাহরণ। পত্রিকার প্রথম বছরে প্রকাশিত বিভিন্ন সংখ্যায় বিচ্ছিন্নভাবে ‘চতুরঙ্গ’র উপন্যাস নতুন যুগের উপন্যাস রীতির সুস্পষ্ট সূচনা করলো। দ্বিতীয় বছর প্রকাশিত ধারাবাহিক ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসের ভাব ভাবনা, রচনা রীতির নতুনত্ব চলিত ভাষার সহজ স্বাচ্ছন্দ্য পাঠক দেখতে পেলেন। ‘বলাকা’র গতিবাদ ভাবনা মূলক কবিতার অনেকগুলোই প্রকাশিত হয়েছিল সবুজপত্রের পৃষ্ঠায়। মহাকবির এই উত্তরণের ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছিল এই পত্রিকা আশ্রয় করে। সচেতনভাবে পুরোনো ভাষা কাঠামো ভেঙে বিশ্ব ভাবনা আত্মস্থ করে নির্মোহ চিন্তার আলোকে জগত ও জীবনকে যুক্তি বুদ্ধিতে বিদ্যুদ্দিপ্ত করে নতুন যুগ এবং নতুন প্রজন্মকে স্পর্শ ও প্রভাবিত করতে পেরেছিল সবুজপত্র। এই সিদ্ধির মূল রসায়ন বিশ্বনন্দিত রবীন্দ্রনাথ এবং বিশ্বনাগরিক প্রমথ চৌধুরীর উজ্জ্বল মেলবন্ধন। এদিক থেকে সবুজপত্র একদিকে যুগের সৃষ্টি অন্যদিকে যুগ¯্রষ্টা এবং যুগান্তকারী।

সবুজপত্রের প্রথম বর্ষের ১২ সংখ্যার বিষয়সূচি ও লেখকের নাম মন্তব্যসহ নিচে দেওয়া হল, এগুলো সংগৃহীত হয়েছে মূল পত্রিকা থেকে।

এক—প্রথম সংখ্যা ২৫শে বৈশাখ ১৩২১ প্রথম বর্ষ

ক) সবুজপত্রের মুখপত্র (সম্পাদকীয়)

খ) সবুজপত্র (প্রবন্ধ) শ্রী প্রমথ চৌধুরী

গ) সবুজের অভিযান (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘ) বিবেচনা ও অবিবেচনা (প্রবন্ধ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঙ) হালদার গোষ্ঠী (ছোটগল্প) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

চ) সবুজ পাতার গান (কবিতা) শ্রী সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

দুইÑদ্বিতীয় সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ ১৩২১প্রথম বর্ষ

ক) সাহিত্য সম্মিলন (প্রবন্ধ) শ্রী প্রমথ চৌধুরী

খ) বাংলা ছন্দ (প্রবন্ধ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ) আমরা চলি সমুখ পানে (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘ) হৈমন্তী (ছোট গল্প) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঙ) গমনাগমন (প্রবন্ধ) শ্রী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

চ) ‘যৌবনে দাও রাজটীকা’ (প্রবন্ধ) বীরবল

‘বাংলা ছন্দ’ প্রবন্ধটি ‘কেমব্রিজের বাংলা-অধ্যাপক জি.ডি এন্ডার্সন, আই.সি.এস মহাশয়কে লিখিত পত্র হইতে অধ্যাপক মহাশয়ের অনুমতিক্রমে মুদ্রিত।’ মূলগ্রন্থে উল্লেখিত সূত্র থেকে তথ্যটি জানা গেছে।

তিন— তৃতীয় সংখ্যাআষাঢ় ১৩২১প্রথম বর্ষ

ক) শঙ্খ (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

খ) আষাঢ় (প্রবন্ধ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ) বোষ্টমী (ছোট গল্প) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘ) খেয়ালের জন্ম (কবিতাTerza Rime) শ্রী প্রমথ চৌধুরী

ঙ) ভারতবর্ষের ঐক্য (প্রবন্ধ) শ্রী প্রমথ চৌধুরী

চ) বর্ষার কথা (প্রবন্ধ) বীরবল

ছ) আষাঢ়ের গান (কবিতা) শ্রী সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

চারÑ চতুর্থ সংখ্যাশ্রাবণ ১৩২১প্রথম বর্ষ

ক) সর্ব্বনেশে (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

খ) বাস্তব (প্রবন্ধ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ) বাংলা ছন্দ (চিঠির আকারে প্রবন্ধ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘ) স্ত্রীর পত্র (ছোট গল্প) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঙ) পত্র (চিঠির আকারে লেখা) বীরবল

চ) উপমা ও অনুপ্রাস (প্রবন্ধ) শ্রী অজিত কুমার চক্রবর্তী

ছ) সহজিয়া (কবিতা) শ্রী দ্বিজেন্দ্রনারায়ণ বাগচি

জ) দেবতা (কবিতা) শ্রী কালিদাস রায়

‘বাংলা ছন্দ’ রচনাটি চিঠির আকারে লেখা একটি প্রবন্ধ। লেখার ফর্ম পুরোপুরি চিঠির। লেখা হয়েছিল কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা-অধ্যাপক শ্রীযুক্ত এন্ডার্সন সাহেবকে। সম্বোধন করা হয়েছিলপ্রিয়বরেষু এবং শেষে আছেÑভবদীয়, শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বীরবলের লেখা ‘পত্র’টির ফর্ম চিঠিরÑসম্পাদক মহাশয় সমীপেষু এভাবে শুরু হয়েছে এবং শেষে আছেÑইতি বীরবল।

পাঁচÑপঞ্চম সংখ্যাভাদ্র ১৩২১প্রথম বর্ষ

ক) লোকহিত (প্রবন্ধ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

খ) ভাইফোঁটা (গল্প) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ) পাড়ি (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘ) সমাজের জীবন (প্রবন্ধ) শ্রী প্রফুল্লচন্দ্র চক্রবর্তী

ঙ) মন্তব্য (প্রবন্ধ) শ্রী প্রমথ চৌধুরী

চ) অনার্য্য বাঙালী (প্রবন্ধ) বীরেন্দ্রকুমার বসু

ছ) ইউরোপে কুরুক্ষেত্র (প্রবন্ধ) শ্রী প্রমথ চৌধুরী

‘মন্তব্য’ রচনাটি শ্রী প্রফুল্লচন্দ্র চক্রবর্তীর লেখা ‘সমাজের জীবন’ রচনার সমালোচনামূলক লেখা কিংবা সম্পাদকের সংযোজন তথা এ বিষয় সম্পর্কে সম্পাদকের ভাবনা তথা মন্তব্য।

ছয়Ñষষ্ঠ সংখ্যা আশ্বিন ১৩২১ প্রথম বর্ষ

ক) আমার জগত (প্রবন্ধ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

খ) শেষের রাত্রি (ছোট গল্প) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ) উত্তরাপথে রাষ্ট্রীয় ঐক্য (প্রবন্ধ) শ্রী রমাপ্রসাদ চন্দ

ঘ) সাহিত্যে আভিজাত্য (প্রবন্ধ) শ্রী মহীতোষ কুমার রায় চৌধুরী

সাতÑসপ্তম সংখ্যাকার্ত্তিক ১৩২১ প্রথম বর্ষ

ক) সন্ধ্যার যাত্রী (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

খ) অপরিচিতা (ছোট) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ) শেষ প্রণাম (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘ) যৌথ পরিবার (প্রবন্ধ) শ্রী নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত

ঙ) হাসি (রম্যরচনা জাতীয় প্রবন্ধ) শ্রী সতীশ চন্দ্র ঘটক

চ) নারীর পত্র (প্রবন্ধ – চিঠির ফর্ম) জনৈক বঙ্গনারী এই নামে লেখা বীরবলের মাধ্যমে প্রাপ্ত।

ছ) নারীর পত্রের উত্তর (প্রবন্ধ জাতীয় রচনা) বীরবল

আটÑঅষ্টম সংখ্যাঅগ্রহায়ণ ১৩২১প্রথম বর্ষ

ক) বর্ত্তমান সভ্যতা বনাম বর্ত্তমান যুদ্ধ (প্রবন্ধ) শ্রী প্রমথ চৌধুরী

খ) ছবি (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ) জ্যাঠামশায় (চতুরঙ্গ উপন্যাসের প্রথম অংশ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘ) তাজমহল (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঙ) ফরাসী গীতাঞ্জলির ভূমিকা (অনুবাদ) শ্রীমতী ইন্দিরা দেবী

চ) তেপাটি (কবিতা) শ্রী প্রমথ চৌধুরী

‘জ্যাঠামশায়’ সবুজপত্রে যখন প্রথম প্রকাশিত হয় তখন এটি স্বতন্ত্র লেখা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। তখন এর আকার ছিল ছোটগল্পের। পরবর্তীকালে চতুরঙ্গ উপন্যাসের প্রারম্ভিক অংশ হিসাবে যুক্ত হয়েছে। ইন্দিরা দেবী কর্তৃক অনূদিত ফরাসি ‘গীতাঞ্জলির ভূমিকা’ মূল ফরাসি লেখক আঁদ্রে গীদের রচনার অনুবাদ। রবীন্দ্রনাথের ‘তাজমহল’ কবিতাটি (১৫ই কার্তিক ১৩২১ এলাহাবাদে থাকাকালীন সময়ে কবি রচনা করেন) পরবর্তীকালে কবিতাটি ‘সাজাহান’ নামাঙ্কিত হয়েছে। এটি বলাকা কাব্যগ্রন্থের অন্যতম কবিতা।

নয়Ñনবম সংখ্যাপৌষ ১৩২১ প্রথম পর্ব

ক) চঞ্চলা (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

খ) লড়াইয়ের মূল (প্রবন্ধ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ) তাজমহল (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘ) খৃষ্টধর্ম (প্রবন্ধ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঙ) নূতন ও পুরাতন (প্রবন্ধ) শ্রী প্রমথ চৌধুরী

চ) শচীশ (চতুরঙ্গ উপন্যাসের দ্বিতীয় অংশ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এই সংখ্যার ‘তাজমহল’ কবিতাটি পরবর্তীকালে এই নামেই সংকলিত হয়েছে। এটি রচিত হয়েছিল এলাহাবাদে অবস্থান কালে ৫ই পৌষ ১৩২১-এ। ‘খৃষ্টধর্ম’ প্রবন্ধটি খৃষ্ট জন্মদিনে শান্তিনিকেতন আশ্রমে কথিত হয়েছিল।

দশÑদশম সংখ্যামাঘ ১৩২১ প্রথম বর্ষ

ক) মা-হারা (নাটকের আকারে রচিত) শ্রী সরযূবালা দাসগুপ্তা

খ) উপহার (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ) দামিনী (চতুরঙ্গ উপন্যাসের তৃতীয় অংশ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘ) বিচার (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঙ) সাহিত্যে বাস্তবতা (প্রবন্ধ) শ্রী রাধাকমল মুখোপাধ্যায়

চ) বস্তুতন্ত্রতা বস্তু কি? (প্রবন্ধ) শ্রী প্রমথ চৌধুরী

‘মা-হারা’ রচনাটির বাইরের কাঠামো নাটকের স্থান। অবস্থানÑগোলকের সীমানা। এর কুশীলবÑআমি, হৃদয়, জ্ঞান, জগৎ মাতা, জগৎ পিতা। সবুজপত্রে শ্রাবণ সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের ‘বাস্তবতা’ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়। এর বিষয় কাব্যে বাস্তবতা সম্পর্কিত। উল্লেখ্য এর আগে ‘প্রবাসী’ পত্রিকার আষাঢ় সংখ্যায় শ্রী রাধাকমল মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘লোক-শিক্ষক ও জননায়ক’, প্রমথ চৌধুরীর ‘বস্তুতন্ত্রতা বস্তু কি?’ রচনাটি শ্রী রাধাকমল মুখোপাধ্যায়ের ‘সাহিত্যে বাস্তবতা’ প্রবন্ধের সমালোচনামূলক রচনা।

এগারোÑএকাদশ সংখ্যাফাল্গুন ১৩২১ প্রথম বর্ষ

ক) শ্রীবিলাস (চতুরঙ্গ উপন্যাসের চতুর্থ অংশ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

খ) দুই নারী (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ) কর্ম্মযজ্ঞ (প্রবন্ধ) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঘ) অভিভাষণ (প্রবন্ধ) শ্রী প্রমথ চৌধুরী

ঙ) এবার (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

চ) আবার (কবিতা) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

‘কর্ম্মযজ্ঞ’ প্রবন্ধটি হিতসাধনমণ্ডলীর প্রথম অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতার সারমর্ম। ‘অভিভাষণ’ রচনাটি প্রমথ চৌধুরী পাঠ করেছিলেন উত্তরবঙ্গ সাহিত্য সম্মিলনে। ‘এবার’ এবং ‘আবার’ কবিতা দুটি ২০শে মাঘ ১৩২১ পদ্মাতীরে অবস্থানকালে লেখা। দুটি কবিতাই বসন্ত সম্পর্কিত।

বারো–দ্বাদশসংখ্যাচৈত্র ১৩২১ প্রথম বর্ষ

ক) বসন্তের পালার ভূমিকা (গান) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

খ) ফাল্গুনী নাটকের ভূমিকাÑশ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ) মূল ফাল্গুনী নাটকÑশ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বসন্তের পালার ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন‘আর কয়েক পৃষ্ঠা পরে পাঠক ‘ফাল্গুনী’ বলিয়া একটা নাটকের ধরনের ব্যাপার দেখিতে পাইবেন। এই বসন্তের পালার গানগুলি তম্বুরার মত তাহারি মূল সুর কয়টি ধরাইয়া দিতেছে। অতএব এগুলি কানে করিয়া লইলে খেয়াল নাটকের চেহারাটি ধরিবার সুবিধা হইতে পারে।’ একদা এপ্রিলের পয়লা তারিখে কবি তার কয়েকজন বন্ধুকে হোটেলে নিমন্ত্রণ করিয়াছিলেন। ভোজটা খুব রীতিমত জমিয়াছিল। তারপরে পরিণামে যখন বিল শোধের জন্য অর্থ বাহির করিবার দরকার হইল তখন কবির আর দেখা পাওয়া গেল না। সেদিনকার এই ছিল কৌতুক। এবারকার এপ্রিলেও কৌতুকটা সেই একই, গোড়াতেই তাহা বলিয়া রাখা ভাল। সবুজ পাতার পাত পাড়িয়া যে বাসন্তিক ভোজের উদ্যোগ হইল কবি তাহাতে শেষ পর্যন্ত যোগ দিলেন, কিন্তু যখন সেই ভয়ঙ্কর পরিণামের সময়টা উপস্থিত হইবে যখন সকলে চীৎকার শব্দে অর্থ দাবী করিতে থাকিবে, ‘হে কবি, অন্যে বাক্য কবে, কিন্তু তুমি রবে নিরুত্তর।’ ভূমিকাটি নিঃসন্দেহে কৌতুককর। এই কৌতুক আবরণের পেছনে রয়েছে অন্য গভীর সত্যের ইঙ্গিত। শব্দ এবং অর্থ এই দুয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষার চেষ্টা স্বাভাবিক। কিন্তু যেখানে শব্দের অর্থ বাচ্যার্থকে অতিক্রম করে গভীরতম কোন তাৎপর্যে ব্যঞ্জনাগর্ভ হয়ে ওঠে সেখানে আপাত বা সাধারণ অর্থ খোঁজা নিরর্থক। সরাসরি অর্থ সন্ধানে তৎপর সমালোচকদের বক্রোক্তির সামনে তখন নিরুত্তর থাকা ছাড়া কবির গত্যন্তর থাকে না। ‘ফাল্গুনী’ বিষয়, আঙ্গিক এবং অন্তর্ভাবনার বিচারে গতানুগতিক নাট্যরীতি থেকে অনেকটাই আলাদা। এখানে কবি-নাট্যকার রবীন্দ্রনাথ সংলাপের মালা সাজিয়েছেন বসন্তের রাশিরাশি বর্ণময় ফুলের সম্ভার থেকে। নাটকের পাত্র-পাত্রীর নাম প্রায়শই নেইচরিত্রের ব্যক্তিত্বের চেয়ে দীপ্ত যৌবনকে ব্যঞ্জিত করাই তাঁর উদ্দেশ্য। যৌবনের মৃত্যু নেই, যৌবনের লীলাতেই মেলে সত্যের সন্ধান। ‘এই তাত্ত্বিক উপলব্ধি একটি কাহিনীহীন এবং ব্যক্তি চরিত্রের সম্পর্কহীন পথ চলার সংলাপের মালায় ধরে রাখা হয়েছে। …এ নাটকের বিষয়বস্তু এই পথ চলা। বিষয় হিসেবে বিস্ময়কর সন্দেহ নেই।’ (বাংলা সাহিত্যের সমগ্র ইতিহাস : ক্ষেত্র গুপ্ত)। যে যৌবনের বন্দনা সবুজপত্রের মূল সুর, তেমনি বিষয় উপস্থাপনের অভিনবত্ব এর আদর্শ। এই দুটি ক্ষেত্রে এ নাটকে নাট্যকার চূড়ান্ত সাফল্য দেখিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, পত্রিকার প্রথমবর্ষের ১২টি সংখ্যার পরিচয় প্রদান অংশে এবং বিভিন্ন উদ্ধৃতির বানানগুলি সবক্ষেত্রেই মূল অনুসারী।

অতিরিক্ত কিছু কথা

একশ বছর আগের সবুজপত্রর মূল সংখ্যাগুলো পাওয়া যতটা সহজ হবে মনে করেছিলাম, বাস্তবে তা হয়নি। ভারতীয় জাতীয় গ্রন্থাগার এবং পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারে বিক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি সংখ্যা দেখার সুযোগ হয়েছে। উত্তরপাড়া জয়কৃষ্ণ পাবলিক লাইব্রেরির দুর্লভ সংগ্রহে প্রথমবর্ষের ১২টি সংখ্যা ছাড়াও পরবর্তী সময়ের বেশ কিছু সংখ্যা রয়েছে। সে কারণে প্রথম বর্ষের ১২টি সংখ্যার বিবরণ, মন্তব্যসহ তুলে ধরা সম্ভব হলো। পরবর্তী সময়ের উৎসাহী গবেষক এবং প্রবন্ধকারদের কথা মনে রেখে একাজ করেছি। প্রচ্ছদটি সাদা-কালো রঙে ছাপা অবস্থায় পাওয়া গেছে। প্রচ্ছদের রঙের ব্যবহার কাল্পনিক, তবে তথ্যানুসারী। Title Page-এর প্রতিলিপি মূল সবুজপত্র প্রথম সংখ্যা থেকে পাওয়া। যাঁরা এ ব্যাপারে আমাকে উপদেশ দিয়েছেন এবং সাহায্য করেছেন, তাঁদের নাম কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করলামশ্রী প্রণবেশ চক্রবর্তী, ভারপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক, উত্তরপাড়া জয়কৃষ্ণ পাবলিক লাইব্রেরি, হুগলী; শ্রী সমীর বর্ধন, গ্রন্থাগারিক, অনন্ত দত্ত মেমোরিয়াল টাউন লাইব্রেরী, কোলকাতা; শ্রী অসীম মুখোপাধ্যায়, সহকারী, গ্রন্থাগার ও তথ্যজ্ঞাপনক আধিকারিক, ন্যাশনাল লাইব্রেরি, কোলকাতা ও শ্রীমতি যূথিকা দামÑপশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, কোলকাতা।

প্রসঙ্গ সবুজপত্র

জ্যোতির্ময় ঘোষ

 ‘সেই কাগজটার কথা চিন্তা করো। যদি সেটা বের করাই স্থির হয়, তাহলে শুধু চিন্তা করলেই হবে নাকিছু লিখতে শুরু করো। কাগজটার নাম যদি ‘কনিষ্ঠ’ হয় তো কী রকম হয়? আকারে ছোট-বয়সেও। শুধু কালের হিসাবে ছোট বয়স নয়, ভাবের হিসাবে।’ প্রমথ চৌধুরীকে লেখা রবীন্দ্রনাথের এই চিঠির সঙ্গে কোনো তারিখ পাচ্ছি না। কিন্তু এই চিঠি লেখার তারিখ অন্তত ‘১৯১৪ সালের ৫ মার্চের আগে। কেননা, ৫ মার্চ তারিখেই প্রমথ চৌধুরীকে আবার লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ‘সবুজপত্র উদ্গমের সময় হয়েছেবসন্তের হাওয়ায় সে ছাপা রইল নাঅতএব সংবাদটা ছাপিয়ে দিতে দোষ নেই। আমি একটু ফাঁক পেলেই কিছু লেখার চেষ্টা করবো। বিবিকে সুরেনকেও তাড়া দিয়ো।’ এই চিঠির বাকি অংশ জুড়েও সবুজপত্র সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের উৎকণ্ঠা ও ভবিষ্যৎ-ভাবনা তাঁর সম্পাদকের ভাবনাকেও ছাড়িয়ে গেছে, দেখা যায়। পাঁচ দিন পরে ১০ মার্চ তারিখে লেখা চিঠিতেও সবুজপত্রের প্রসঙ্গ অনুভব করা যায়। পরের চিঠি ২৩ মার্চ লেখা এবং তাতে‘আচ্ছা, রাজি আছি। ১৫ বৈশাখেই বের করো। ইতিমধ্যে দুই-একটা লেখা দিতে পারবো।’ চিঠিগুলো সব শান্তিনিকেতন থেকে লেখা। ৪ ও ১৬ এপ্রিল তারিখে লেখা চিঠি দুটিতেও সবুজপত্রের কথা। সবুজপত্র নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ধারাবাহিক ভাবনা ছিল কতো গভীর, তার একটা কিছু পরিচয় ৪ এপ্রিলে লেখা এই পত্রাংশে পাব‘তোমরা ১৫ বৈশাখে কাগজ তো বের করছো কিন্তু, হাতে দু’তিন মারে সম্বল তো জমাওনিThink not of tomorrow টা কি সদুপদেশ?’ বুঝতে অসুবিধা হয় না, অভিজ্ঞ সম্পাদক রবীন্দ্রনাথ এ কাজে অনভিজ্ঞ স্নেহভাজন আত্মীয়-বন্ধু প্রমথ চৌধুরীকে হাতে-কলমেই প্রায় সম্পাদনার কাজে তালিম দিয়ে চলেছেন। ১৯১৪ সালেরই ৬ জুলাই লেখা চিঠিরও অংশবিশেষ তুলে দিচ্ছি, যাতে স্পষ্ট হয় সবুজপত্রের রথী প্রমথ চৌধুরী হলেও সারথী ছিলেন সর্বাংশেই রবীন্দ্রনাথ। এই উদ্ধৃতি কিছুটা দীর্ঘ হলেও অত্যাবশ্যক, কেননা, সবুজপত্র ও প্রমথ চৌধুরীর ফ্রেণ্ড ফিলজফার এবং গাইড কে ছিলেন, তা সাম্প্রতিক পাঠকের কাছে প্রথমেই স্পষ্ট থাকা ভালো :

অন্যান্য মাসিকে যে সমস্ত আলোচ্য প্রবন্ধ বেরোয় তার সম্বন্ধে সম্পাদকের বক্তব্য বের হলে উপকার হবে। প্রথমত যারা উৎসাহের যোগ্য সেইসব লেখকেরা পুরস্কৃত হবে, দ্বিতীয়ত, অন্যের লেখা সম্মুখে রেখে, বলবার কথাটাকে পরিষ্কার করে বলবার সুবিধা হয়। তাছাড়া আধুনিক সাহিত্যের মাঝিগিরি করতে হলে সমালোচকের হাল ধরা চাই। প্রতিমাসে সমালোচনার যোগ্য বই পাবে না। কিন্তু মাসিক পত্রের লেখাগুলোর প্রতি লক্ষ করে কিছু-না-কিছু বলবার জিনিস পাবে। বিরুদ্ধ কথাও যথোচিত শিষ্টতা রক্ষা করে কী ভাবে বলা উচিত তার একটা আদর্শ দেখবার সময় এসেছে।

রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন, প্রমথ চৌধুরী ও সবুজপত্রের উপরেই ‘আধুনিক সাহিত্যের মাঝিগিরি’র গুরুতর দায়িত্ব বর্তাক। ১৯১৪ সালেরই ৮ই অক্টোবর লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ :

যে পর্যন্ত না লেখক দুটি-একটি তৈরি হয়ে ওঠে সে পর্যন্ত সবুজপত্র তোমার লেখা দিয়েই ভরতে হবে। …আমার বলবার কথা নানা রকম করে বলা হয়ে গেছে… এখন তুমি…। মানুষের চিত্তকে একজন লোক বরাবর জাগিয়ে রাখতে পারে নাসেই জাগিয়ে রাখাটাই আসল কথা, কোনো কিছু দান করার মূল্য তেমন বেশী নয়। নূতন শক্তির অভিঘাতে মানুষ জাগেপুরাতনের বাণী অতি অভ্যাসে আর মনকে ঠেলা দেয় না। …এখন আমার গাণ্ডীব তোলাবর শক্তি নেই। সেইজন্য তোমাকে আসি একটি নবীন লেখকমণ্ডলীর কেন্দ্র ও অধিনায়কের আসনে অধিষ্ঠিত দেখতে ইচ্ছা করি। এইজন্যই সবুজপত্রের প্রতি আমার যা-কিছু ঔৎসুক্যআর তাই দেহমনের বিমুখতা সত্ত্বেও যতটুকু পারি লিখছি। কিন্তু তোমার জায়গা তুমি সম্পূর্ণ জুড়ে বসোআমার যাবার সময় হলো।

সবুজপত্রএর পাতায় যে নবীন লেখকমণ্ডলী প্রমথ চৌধুরীর নেতৃত্বে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, সেই লেখকগোষ্ঠী ক্রমশ গড়ে উঠেছিলো; এই মন্তব্য অতিশয়োক্তি হবে না। কয়েকটি নাম স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণে এসে যায়অতুলচন্দ্র গুপ্ত, ধূর্জটিপ্রাসাদ মুখোপাধ্যায়, সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী, কিরণশঙ্কর রায়, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, অতীশচন্দ্র ঘটক, বরদাচরন গুপ্ত, বিশ্বপতি চৌধুরী, হারিতকৃষ্ণ দেব এবং অবশ্যই সম্পাদকপতœী ইন্দিরা দেবীচৌধুরানী। কিন্তু উল্লেখ প্রয়োজন, সবুজপত্রের অধিকাংশ সংখ্যাতেই এক রবীন্দ্রনাথেরই তিনটি-চারটি, এমনকি পাঁচটি পর্যন্ত লেখা ছাপা হয়েছে। কোনো কোনো সংখ্যায় প্রায় সবগুলি রচনাই একা রবীন্দ্রনাথেরই। সবুজপত্র বিরোধীরা ব্যঙ্গ করে নানা কথা বলতো।

বস্তুত স্বয়ং প্রমথ চৌধুরীকেই স্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে হয়েছিলো :

সবুজপত্রের বিরুদ্ধে নানা বদনাম থাকা সত্ত্বেও একটি বিশেষ সুনাম আছে। জনরব যে পত্রের সম্পাদক রবীন্দ্রনাথের বেনামদার। এ প্রবাদটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য না হলেও প্রকৃতপক্ষে মিথ্যা নয়। সকলেই জানেন যে, প্রথম দুবৎসর রবীন্দ্রনাথের লেখাই ছিলÑকী ওজন কী পরিমাণে এ-পত্রের প্রধান সম্পদ। সবুজপত্র বাঙলার পাঠকসমাজে যদি কোনোরূপ প্রতিষ্ঠা ও মর্যাদা লাভ করে থাকে তো সে মুখ্যত তাঁর লেখার গুণে। রবীন্দ্রনাথের সাহায্য ব্যতীত আমি যে কাগজ চালাতে পারবো, এ ভরসা আমার আদপেই ছিল না। আমার ক্ষমতার সীমা আমি জানি।…

যাই হোক, ক্রমশ একটি নবীন লেখকগোষ্ঠী গড়ে ওঠায় প্রমথ চৌধুরী পত্রিকা প্রকাশ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে খুবই উপকৃত হন। সেই কৃতজ্ঞতাও তিনি যথোচিত আন্তরিকতার সঙ্গে ব্যক্ত করেছেন। অবশ্য সেই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, নবীন লেখকদের প্রত্যেকটি রচনা খুঁটিয়ে পড়ে রবীন্দ্রনাথই দিনের পর দিন প্রমথ চৌধুরীকে লেখা চিঠিতে তাঁদের রচনার গুনাগুণ বিশ্লেষণ করেছেন। অর্থাৎ সবুজপত্রের লেখকগোষ্ঠী গঠনেও রবীন্দনাথের সক্রিও ভূমিকা ছিল। কোন্ সংখায় কার-কার-কোন্-কোন্ লেখা দেওয়া যেতে পারে, সে বিষয়েও রবীন্দ্রনাথ প্রমথ চৌধুরীকে প্রায় নিয়মিত পরামর্শ দিয়েছেন। সবুজপত্রের প্রকাশনা যাতে নিয়মিত হয়, পত্রিকা যাতে নির্ভুল ছাপা হয়: সবদিকেই ছিল রবীন্দ্রনাথের সস্নেহ সতর্ক তাড়না। ‘যত পারো নতুন লেখক টেনে নাওলিখতে লিখতে তারা তৈরি হয়ে নেবে। কাগজের আদর্শ সম্বন্ধে অত্যন্ত বেশী কড়া হলে নিষ্ফল হতে হবে’এই সতর্কবাণীও রবীন্দ্রনাথের।

সবুজপত্রের লেখকের সংখ্যা তবু খুব উল্লেখ্য হতে পারেনি। প্রায়শ রবীন্দ্রনাথ এবং সম্পাদকের লেখায় সবুজপত্র ভরিয়ে তুলতে হতো। এ সম্পর্কেও রবীন্দ্রনাথ প্রমথ চৌধুরীকে সজাগ করতে চেয়েছিলেন বারবার। লিখেছেন :

সবুজপত্রে কেবলমাত্র সম্পাদক এবং একটিমাত্র লেখক যদি সব কথা লেখে তবে লোকে বলবে কী? এক তো সেটা দেমাকের লক্ষণ মনে করে ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠতে থাকবেতারপরে হয়তো বৈচিত্রের অভাবে দুঃখবোধ করতে পারে।

ফল কথা, রবীন্দ্রনাথ গুরুর হিতৈষণা, অগ্রজের স্নেহ ও বন্ধুর সৌহার্দ্য দিয়ে ঘিরে রেখেছিলেন সম্পাদক প্রমথ চৌধুরীকে। সবুজপত্র নতুন সময়ের প্রয়োজনে, যুগ-পরিবর্তনের বাঁকে দেখা দিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ প্রণোদনায়, ঠিক তেমনি নতুন ভাবধারা ও তার প্রকাশের নবীনতায় রুষ্ট প্রতিক্রিয়ার স্বরূপ স্পষ্ট হতেও সময় লাগেনি। সবুজপত্রের বিরুদ্ধে ‘নারায়ণ’ পত্রিকার ভূমিকাও প্রসঙ্গত প্রণিধানযোগ্য। রবীন্দ্রনাথ তাঁর অভিজ্ঞতা থেকেই জানতেন, সবুজপত্র যে প্রগতি চিন্তার বাহন হয়ে উঠতে চাইছে, তারুণ্য ও যৌবনের জয়গাথা রচনা করতে প্রবৃত্য হয়েছে, তার ফলেই তাকে এবং পত্রিকাগোষ্ঠীকে নানা বিরুদ্ধতার ও কুৎসার সম্মুখীন হতেই হবে। তাই তিনি সবুজপত্রের দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশ হতেই প্রমথ চৌধুরীকে অগ্রিম সতর্ক করে দিয়েছিলেন শুধু নয়, তাঁর মানসিক প্রস্তুতির স্বার্থেই লিখেছিলেন তাকে :

‘যৌবনে দাও রাজটিকা’ লেখাটি খুব ভালো লাগল। খুব উজ্জ্বল ও শাণিত। অবনের ভ্রমণকাহিনীটাও খুব সুন্দর হয়েছে। আমার তো বোধ হচ্ছে তোমার কাগজ এইরকমভাবে যদি বছরখানেক চলে তাহলে বাংলা সাহিত্যকে নতুন শক্তি, গতি এবং রস দিতে পারবে। সবুজপত্রের উচিত হবে খুব একচোট গাল খাওয়া। সেইটেই একটা লক্ষণ যে, ওর কথাগুলো মর্মস্থানে গিয়ে লাগছে।

আগেই বলেছি, সময়ের তাগিদ থেকেই উঠে এসেছিল সবুজপত্র। জীবনে যেমন, সাহিত্যেও তেমনি প্রত্যেকটি কালপর্যায়েই থেকে যায় প্রগতি ও প্রতিক্রিয়ার দ্বন্দ্ব। যাঁরা সময়ের অগ্রবর্তী মানুষ, যেমন অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ, তাঁরই সময়ের এই চাপ, তার মাত্রা, তার তাগিদটাকে অনুধাবন করতে পারেন। রবীন্দ্রনাথও তা পেরেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন। রবীন্দ্রনাথ ‘বলাকা’র গতিশীল কবিতাগুলি লিখতে আরম্ভ করেছেন। বিদেশ ঘুরে এসেছেন সদ্য। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতির চেহারা আর চরিত্রটা তাঁর কাছে স্পষ্ট। তিনি তখন নতুন সময়ের জন্য কবিতায় যেমন ‘নতুন বিষয়’ নতুন কাব্যভাষা ও নতুন ছন্দের টান অনুভব করলেন, ‘বলাকা’র কবিতাগুলি যার প্রকাশ-প্রচেষ্টা, তেমনি অনুভব করেছিলেন : নতুন কাগজ চাই। স্বতন্ত্র চরিত্রের আর মেজাজের কাগজ। সেই প্রস্তাবেরই তাঁর প্রথম প্রস্তাবিত নাম ‘কনিষ্ঠ’, যার সম্বন্ধে লিখেছিলেন, ‘শুধু কালের হিসাবে ছোট বয়স নয়, ভাবের হিসাবেও’।

রবীন্দ্রনাথের ‘বলাকা’র ভাব-ভাষা-ছন্দের সঙ্গে মিলিয়ে বুঝতে হবে, ক্ষয়িষ্ণু প্রচীনতার বিরুদ্ধে চলিষ্ণু উদীয়মান শক্তির, জরার বিরুদ্ধে যৌবনের, নির্বোধ গতানুগতার বিরুদ্ধে সম্মুখবর্তী প্রবহমান ধ্যানধারণার এবং অন্ধপ্রতাপমত্ততার ও স্বার্থান্ধতার বিরুদ্ধে আত্মোৎসর্গে অবিচলিত প্রেমেরই বাহন হয়ে উঠতে পেরেছিল সবুজপত্র। মিথ্যা ও ভণ্ডামীর সঙ্গে আপোষের দিন শেষ হোক, যুক্তির ও বুদ্ধির আলোয় চিনে নেওয়া যাক বন্ধু আর শত্র“র স্বরূপ, শুরু হোক প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই-দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশের পরেই স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই কি এই বক্তব্য খুব সোজাসুজি তুলে ধরেন নি :

মিথ্যার গায়ে হাত বুলিয়ে তাকে বাপুবাছা সম্বোধন করে আর চলে না। আমাদের বর্তমান সাহিত্য মানুষকে গান দেয় কারণ তাতে পৌরুষ নেইবরঞ্চ সেটা কাপুরুষেরই কাজকিন্তু যেখানে যথার্থ বীর্যের দরকারযেখানে শয়তানের সাথে লড়াই, যে শয়তানের হাজার কণ্ঠ এবং বাহু, সেখানে দেখতে পাই বড়ো বড়ো সব সাহিত্যিক গুণ্ডারা কেবল পোষা কুকুরের মতো ল্যাজ নাড়ছে আর সেই বৃদ্ধ পাপের পঙ্কিল পা আদর করে চেটে দিচ্ছে।

ভাবা যায়, রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ১৯১৪ সালেই? একই বছরের ২ আগস্ট ঘোষণা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, প্রতিক্রিয়ার শয়তানের বিরুদ্ধে লড়াই করেই জিতবে উদীয়মান নবীন চলিষ্ণু শক্তি, সবুজপত্রের প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যায় মুদ্রিত রবীন্দ্রনাথের কবিতাটির নামই তো ছিল : ‘সবুজের অভিযান!’ সুতরাং রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন :

তার জানা আছে, কারা ‘সবুজপত্রের মাথা মুড়িয়ে খাবার চেষ্টা করবেন’ এবং ‘তোমার মুশকিল এই যে এ-ক্ষেত্রে আমার পোড়াকপালের আঁচ তোমাকে লেগেছে। সঙ্গদোষেই তুমি বিপদে পড়েছ নইলে তোমাকে এতো দুঃখ পেতে হতো না। যাই হোক, আমি নিশ্চয়ই বলে দিচ্ছি তোমার কাছে এদের হার মানতে হবে। অনেক দিন পর্যন্ত এরা বিনা বাধায় আমাদের দেশের যুবকদের বুদ্ধিকে পঙ্কিল করে তুলেছিলÑ বিধাতা বরাবর তা সইবেন কেন? দেশের যেকোনো জায়গা থেকেই কি এর ধাক্কা খাবে না? সরল মূঢ়তাকে সওয়া যায় কিন্তু বাঁকা বুদ্ধিকে প্রশ্রয় দেওয়া কিছু নয়। রণক্ষেত্রে যখন দাঁড়িয়েছ তখন যদি একা লড়তে হয তা-ও লড়তে হবে, পিছু হটলে চলবে না।

একটি দশকব্যাপী এই লড়াইটাই চালিয়েছিল সবুজপত্র, রবীন্দ্রনাথের প্রেরণা ও স্ট্র্যাটেজি অবলম্বনে। সবুজপত্র জরার বিরুদ্ধে যৌবনের হয়ে যে-লড়াই চালিয়েছিল সাহিত্যে, তা কি স্তব্ধ হয়ে গেল সবুজপত্র বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে? না। এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতান্ত নির্বোধ ও যান্ত্রিক হবে। লড়াইয়ের স্তর ও যাত্রা বদলের সঙ্গে সঙ্গে রথী ও হাতিয়ার বদল অনিবার্য হয়ে উঠেছিল সময়েরই অনিবার্য তাড়নায়। বিষয়টি বুঝে নিতে হলে জাতীয় ও অন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সঙ্গে-সঙ্গে পরিচ্ছন্ন রাখা দরকার হবে বাংলা সাহিত্যের সঠিক ইতিহাসবোধ এবং কালচেতনাও।

বিচিত্র সমাজতত্ত্ব লজ্জার সমাজতত্ত্ব

বিচিত্র সমাজতত্ত্ব লজ্জার সমাজতত্ত্ব

 

 

[মুহাম্মদ হাসান ইমাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। সমাজবিজ্ঞানের ব্যাপক বিষয়ের মধ্যে চমকপ্রদ বিষয়বস্তু আছে যা সাধারণ্যে প্রচুর আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম। তাছাড়া ছাত্রছাত্রীরা এসব বিষয়ে সরলভাষ্যের সাথে পরিচিত হলে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে তাদের ধারণা বৃদ্ধি পাবে এবং বিষয়টির প্রয়োগসাফল্য সৃষ্টি হবে। যদিও লেখক সমাজবিজ্ঞানের পরিব্যাপ্ত বিষয়বস্তুর তাত্ত্বিক বিতর্ক সম্পর্কে অবগত আছেন, তবুও সমাদৃত সমাজবিজ্ঞানের পরিক্ষেপ থেকে অন্যান্য বিষয়াবলী দেখার ব্যাপারে আরো উদ্যোগ লক্ষ করতে চান। এই ধারাবাহিক রচনাটি বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোকপাত করবে এমন প্রত্যাশা নিয়েই আমাদের যাত্রা শুরু হলো।– সম্পাদক]

It highlight she most valuable core of all people who desperately want acceptance, respect and love from other which continually fearing rejection and negative of self. (Scott 2007:5)

Shy people, you might think, can be identified by this visible discomfort in social situations and their inability (or it is unwillingness?) to interact with other people. (Scott 2007:1)

The Oxford English Dictionary (2005) defined shyness as being Easily frightened away; difficult of approach owing to timidity, caution or destruct underlines  the point that this is a society oriented state of mind (cited in Scott 2007:1)
লজ্জাশীলতার সমাজতত্ত্ব লজ্জার মনকেন্দ্রিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী তত্ত্ব ও প্রয়োগের চেয়ে বৃহত্তর সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতের উপর গুরুত্ব দিতে চায়। আমরা লাজুকতাকে ব্যক্তিক সমস্যা হিসেবে দেখে একে সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখতে চাই। ম্যাক্রো পর্যায়ের রুটিন আন্তঃক্রিয়ার বদলে ম্যক্রো পর্যায়ের সামাজিক স্থিতির সাথে মিলাতে চাই।
মনোবিজ্ঞানে যেসব অনুমানের উপর নির্ভর করে লজ্জা নিয়ে গবেষণা করা যায়। সেগুলো হলো লজ্জা নিতান্তই একটি মানসিক ধর্ম যা নিয়ে একজন ব্যক্তির যখন তার মধ্যে কিছু দর্শনযোগ্য প্রলক্ষণ দেখা যায়। মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যক্তির প্রলক্ষণ, আচরণগত দক্ষতার অভাব বা ভ্রান্তিমূলক প্রজ্ঞার বিষয়গুলো জরুরি বিবেচিত হওয়ায় লজ্জাকে একটি ব্যক্তিক আচরণগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার ও সংশোধনের চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। আর এমন দৃষ্টিভঙ্গি আমাদেরকে লজ্জার সামাজিক নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনাকে সামাজিকভাবে দেখার উৎসাহ জোগায় না। আরেকটি ব্যাপার হলো মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণায় এমন অনুমান খুবই স্বাভাবিক যে ‘লাজুক’ এবং ‘লাজুক-নয়’ এ’দুয়ে বিভক্ত করার প্রবণতা। এক্ষেত্রে তাঁরা বস্তুনিষ্ঠ পরিমাপক স্কেল ব্যবহার করে থাকেন। তাছাড়া, অন্যান্য কৌশলসমূহও যথেষ্ট উন্নত।
অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞানীরা সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা বলে মনে করেন। যাকম্যানের নাটকীয়তা তত্ত্বটি প্রয়োগ করে স্কট দেখাতে চেয়েছেন কখন আমরা লাজুক-ভূমিকা গ্রহণে আগ্রহী হই এবং কখন হই না। আমরা বিশ্বাস করি যে লজ্জাশীলতা একটি অপ্রত্যাশিত ও নেতিবাচক দিক যা পরিহার করে চলা উচিত। ব্যক্তির হতাশা, মনোমালিন্য ও অতিমাত্রায় আত্মমুখীনতা থাকতেই পারে। কিন্তু সেগুলোকে সমস্যা হিসেবে বিবেচিত করে এর সামাজিক দায়কে জানার চেষ্টা করা। শুধুমাত্র ব্যক্তি প্রকৃতি (nurture), লালনপালন (nurture) ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে জ্ঞাত হওয়াই তো আমাদের শেষ লক্ষ হতে পারে না।
মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণা ও তত্ত্বে লজ্জাশীলতা একটি অন্তর্গত গুণাগুণ হিসেবে বিবেচিত হলেও এমন কথাও তাঁরা বলেছেন যে, এটি একটি আয়ত্তকৃত বা শিক্ষণকৃত অভ্যেস যার জন্য বিশেষ পরিবেশ দায়ী। হতে পারে বাবা-মার ভূমিকা এর জন্য দায়ী। যেমন, আমাদের দেশে মেয়েদেরকে লজ্জাশীল ও নমনীয় হবার উপদেশ ছোটবেলা থেকে দেয়া হলেও ছেলেদের দেয়া হয় না। বরং ছেলেরা বেশি বেশি মিশুক হোক, বহির্মুখি হোক, কিছুটা ডানপিটে হোক এমনটিও আশা করা হয়। স্বাভাবিকভাবে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেকে স্কুল জীবনে, খেলার মাঠে, পারিবারিক আয়োজন-উৎসবে, এমনকি নিজের জন্মদিনেও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তাদের এই মনোভাব ও আচরণ ক্রমাগতভাবে স্থায়িত্ব লাভ করে।
সামাজিক কগনিশন তত্ত্ব এখন মনোবিজ্ঞানে বেশ শক্তিশালী ধারা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। এ ধরনের অভিগম মনে করে লজ্জা পাওয়ার পেছনে অন্যদের উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
সমাজবিজ্ঞানীরা বিষয়টিকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে দেখতে চায় মুখোমুখি সম্পর্ক ও আন্তঃক্রিয়া কিভাবে আমাদের আত্মপরিচয় নির্মাণে সহায়তা করে বা করে না। ‘আত্মপরিবীক্ষণ’ ও ‘আত্মসচেতন আবেগ’ মনোবিজ্ঞানীদের কগনিটিভ তত্ত্বে দুটি বিশেষ আবিষ্কার যা লজ্জাশীল ব্যক্তিকে সামাজিক আন্তঃক্রিয়ার ক্ষেত্রে দারুণভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। সর্বোপরি মনোবিজ্ঞানের সামাজিক কগনিটিভ তত্ত্ব ব্যক্তিমানসকে লজ্জা উৎপাদনের প্রাথমিক ক্ষেত্র মনে করে। যারা লাজুক তারা স্বাভাবিক কগনিটিভ স্টাইলের একটি ভ্রমাত্মক ধারা যা সামাজিক পরিস্থিতিতে সহায়তা পায়। এতে করে সামাজিক দক্ষতার ঘাটতি দেখা যায়। অন্য গবেষকদের মতে এটি অদ্ভুত এক আত্মকেন্দ্রিক দুষ্টচক্রের জন্ম দেয়। লজ্জাকাতর ব্যক্তিবর্গের ধোয়াশে আচরণ, অপদস্তমন্যতা, সামাজিক প্রস্থান, এবং দক্ষতার দুর্বিসহ নি¤œগামিতাকে প্রতিভাত করে। অনেকে নিজের ও অন্যের যাবতীয় করুণ অভিজ্ঞতা, নেতিবাচক অনুভূতি ও অবাস্তব কম্পনাকে একীভূত করে সামাজিক ভীতির অচলায়তন সৃষ্টি করে। এমনও দেখা যায় এসব লাজুক ব্যক্তিত্ব নিজের অন্তরালে রাখার জন্য অনাকর্ষণীয় পোষাক পরিধান করে, ছদ্মবেশ ধারণ করে অথবা লুক্কায়িত থাকে। আত্ম-উপস্থাপনার কোন সুযোগ গ্রহণ না করে বরং তা থেকে পলায়নপর থাকে। অনেকে নিজের ব্যর্থতার জন্য অপরকে অথবা বাইরের পরিস্থিতিকে কারণ হিসেবে দাঁড় করায়। অথচ যারা লাজুক নয় তাদের মধ্যে এমনটি দেখা যায় না। বরং অনেকে অনেক বেশি সপ্রতিভ ও আত্মপরিবেশ ব্যবস্থাপনায় পরিপক্বতার পরিচয় দেয়।
প্রায় ১০০ বৎসরের বেশি সময় আগে থেকে এ ব্যাপারে গবেষণা শুরু হয়েছে। বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী কুলি, পিয়াগেট ও মিডের নাম এ প্রসঙ্গে করা যায়। মিডের অহম সংক্রান্ত গবেষণা ও লেখার মূল্য এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে তার একটি বড় কারণ হলো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের গোড়ায় সমাজের ভূমিকাকে তুলে ধরা। তাদের আলোচনা মূলত আন্তঃক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। পরবর্তীতে সখ্য সম্পর্কের উপর আলোচনা হয় যা আজও শিশুদের উপর পরিচালিত গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সে সময়ের শিশুদের উপর গবেষণায় তাদের সামাজিক অংশগ্রহণ গুরুত্ব পায় কারণ, দেখা যায় সবাই সমান অংশগ্রহণে পারদর্শী বা ইচ্ছুক নয়। স্বাভাবিকভাবেই ক্রমান্বয়ে বেশ কিছু শব্দের সন্নিবেশ ঘটে যেগুলো যেমন আলাদা অর্থ বহন করে তেমন সমার্থকও বটে। যেমন, নিঃসঙ্গ খেলা, সামাজিক খেলা, সামাজিক ক্ষেত্রে প্রত্যাহারমূলক আচরণ, অনিয়োজিত থাকা, দর্শক-মনোভাবাপন্নতা, লাজুক শিশু, সমস্যাআক্রান্ত শিশু, ভীতু চরিত্র, নেতিবাচক আত্মমূল্যায়ন, নির্জনতা অবসন্নমন্যতা, বন্ধ বিসর্জন প্রভৃতি। তবে লজ্জাশীলতার এই যে মাত্রা ও অর্থের ভার প্রত্যয়গত জটিলতা সৃষ্টি করাটাই স্বাভাবিক। বিশেষত গবেষণায় প্রত্যয়গত পরিচ্ছন্নতাই অপরিহার্য। ব্যক্তির প্রলক্ষণ, প্রেষণাগত প্রক্রিয়া, ও পর্যবেক্ষণমূলক আচরণ নির্দেশ করে এমন শব্দসমূহের সংমিশ্রণ গবেষণার জন্য উপযোগী নয়। রুবিন ও কপলান (২০১০) একাকিত্বের সাথে সম্পর্কিত ও ব্যবহৃত শব্দসমূহ হতে পারে একটি শ্রেণীবিন্যাস করেছেন যা নিঃসন্দেহে আমাদের অভিধার ব্যাপকতা নির্দেশ করে। যেমন, একাকিত্বের কারণ এতে এমন শব্দগুলো হলো: সক্রিয় একাকিত্ব, নিষ্ক্রিয় প্রত্যাহার, সাথীদের পরিত্যাগ, সাথীদের অবহেলা, সাথীদের বর্জন, সামাজিক প্রত্যাহার; আপত্তি, লজ্জা ও উৎকণ্ঠার সাথে জড়িত শব্দসমূহ: (ক) আচরণগত আপত্তি, সামাজিক আপত্তি; (খ) নিচু মাত্রার অভিগম, সংঘাতপূর্ণ লজ্জা, ভীতিপূর্ণ লজ্জা, আত্মসচেতন লজ্জা, সামাজিক ভীতি, শ্লথ-অভিগম; (গ) উৎকণ্ঠিত প্রত্যাহার, উৎকণ্ঠিত নিঃসঙ্গতা, রিটিসেন্স, সামাজিক উৎকণ্ঠা, সামাজিক পরিহার, সামাজিক ভীতি, সমস্যা। নিঃসঙ্গ শব্দাবলী: অন্তর্মুখি, নিঃসঙ্গ নিষ্ক্রিয়, কম সামাজিক, সামাজিকতায় অনাগ্রহ, কম অসামাজিক ভাবনা এখানে দেখা যাচ্ছে যে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই শব্দগুলো ব্যক্তি থেকে সমাজলগ্নতার দিকে তাড়িত হয়েছে। যাহোক মনোবিজ্ঞানী রুবিন ও কপলান এক্ষেত্রে সংখ্যা কমিয়ে পরস্পর সম্পৃক্ততা পরিহারের উপরই গুরুত্ব দিয়েছেন।
আন্তঃক্রিয়াবাদী সমাজতাত্ত্বিক পরিক্ষেপ মনে করে যে লজ্জাশীল মন একটি সামাজিক নির্মাণ। যদিও মনোবিজ্ঞানীরা দাবী করেছেন কিছুটা হলেও লজ্জামনস্কতা অন্তর্গত এবং জন্মগত যা শিশুকাল থেকেই পর্যবেক্ষণযোগ্য। যদিও লজ্জাবোধের প্রজ্ঞাগত, আবেগগত ও আরচণগত উপাদানা রয়েছে এবং সে কারণে এই ব্যক্তিগত বিষয়টি মনোবিজ্ঞানের গবেষণার বিষয়বস্তু। তবে সামাজিক পরিস্থিতি ও তার ফলশ্র“তি অনেক সময় লজ্জাবোধ লালিত ও স্থায়ী করে। বলা হয়েছে Insofar as shyness is a socially oriented state of mind, we can only understand and interpret the meaning of these thoughts and feelings in relation to our perceptions of other and our awareness of the social rules governing interaction (Scott 2007:8).

লজ্জাকে একটি সচেতন আত্মপরিচয়মূলক (আইডেন্টিটি) ক্রিয়া মনে করা যায় যা কল্পিত দর্শক-শ্রোতৃমণ্ডলীর সামনে সম্পাদন করা হয়। এখানে নিজের ভাবমূর্তি সম্পর্কে একটি স্বনির্মিত অবয়ব ধরে নেয়া হয় এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে ভাবমূর্তির অপূর্ণতাকে মেনে নেয়া হয়। একজন লাজুক ব্যক্তি সচেতন থাকে যে তার আচরণের সামাজিক প্রতিক্রিয়া আছে। সে কারণেই সমাজ-সচেতন লাজুক সত্তার অন্তর্নিহিত দিকটি সমাজবিজ্ঞানীরা জানতে চায়। তার দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজ সম্পর্কে যে প্রেষণা ও অর্থ ধারণ করা হয় তা অত্যন্ত মূল্যবান। সামাজিক আন্তঃক্রিয়ার প্রশ্নে তাদের বিশ্বাস ও অনুমান এবং এরকম বিশ্বাস ও অনুমানের বিকাশ কেন হয় তা জানা জরুরি। তারা যেভাবে দায় সম্পন্ন করতে চায় বা তা সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা কিভাবে মূল্যায়িত হয় সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আর আমরা যারা তার আন্তঃক্রিয়ার অসম্পূর্ণতাকে আবিষ্কার করি এবং তার স্বাভাবিক আচরণে বাধার সৃষ্টি করি সেটিও দেখা দরকার। তাছাড়া, লাজুক আইডেন্টিটি যদি দীর্ঘদিনের আন্তঃক্রিয়ার ফসল হয় তবে যে সমস্ত ব্যক্তি এই আন্তঃক্রিয়ায় নিয়োজিত ছিল বা আছে তাদের অধ্যয়ন জরুরি। লাজুক ব্যক্তিরা তাদের সামাজিক দক্ষতার অভাবের দিকটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ সজাগ। তাঁরা প্রত্যক্ষ করতে পারে যে কিভাবে অন্যেরা তাকে প্রত্যক্ষ করছে। সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও সামাজিকভাবে নির্মিত লাজুক আইডেন্টিটির অস্তিত্ব লক্ষণীয়। আমরা কিছু আদর্শ-মূল্যবোধ-প্রথানিষ্ট চরিত্রকে স্বাভাবিক এবং তা থেকে স্বভাবকে লাজুক বলতে আগ্রহী। আমরা তাদের মনের খবর রাখিনা তার নয়; কিন্তু সামাজিক জগতে তারা কিভাবে আচরণ করছে সেটিই মূল পর্যবেক্ষণের ব্যাপার হয়েছে। যেমন, মানসিকভাবে অসুস্থ একজন ব্যক্তি যতটা যতœ ও সহানুভূতি সমাজের কাছে প্রত্যাশা করতে পারে তার চেয়ে অনেক বেশি অপদস্থ করা আমাদের একধরনের মজা করার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ কোন্ সমাজে কোন্ কালে কে লাজুক হিসেবে পরিগণিত হলো তা সংস্কৃতিগতভাবে নির্ধারিত হয়। অপরদিকে লাজুক ব্যক্তিরাও উপলব্ধি করতে পারবেন সমাজ তাকে কিভাবে দেখছে। তারা সহজেই বোঝে যে তাদের সংখ্যা সংখ্যাগরিষ্ঠ অ-লাজুকদের চেয়ে কম। এবং তাদের মূল সমস্যা হলো তারা ভয় পায়, অন্তর্মুখি এবং একাকী।

লজ্জাশীলতার সাথে জেন্ডারের সম্পর্ক সাংস্কৃতিকভাবে সম্পর্কিত। অনেক দেশে একেক সময় নারীদের একেকভাবে প্রত্যক্ষ করা হয়। তবে এক্ষেত্রে ক্ষমতাহীনতা, সম্পদহীনতা, নির্যাতন, হেয় প্রতিপন্নকরণ, অবরুদ্ধকরণ, পর্দা, শারীরিক দুর্বল ভাবা, সন্তান উৎপাদনের নামে ক্ষয়িষ্ণুতার দিকে ধাবমান করা, চিকিৎসাহীনতা, নিরক্ষর রাখা, জনসমক্ষে আসতে না দেয়া, রাজনীতি থেকে দূরে রাখা, অধঃস্তনতা প্রভৃতি বিষয় উল্লেখ করা যায়। ‘আর লজ্জা নারীর ভূষণ’ Ñ এ প্রবাদটিতো আমাদের মতো দেশে আপ্তবাক্যের মতো মনে করা হয়। কি ধর্মীয়, কি সামাজিক, কি পারিবারিক, কি রাষ্ট্রীয়, কি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নারীর অনুপস্থিতি ও লজ্জাশীলতাজনিত কারণে নীরবতা পালন করলে মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। নারীকণ্ঠ বাড়ির বাইরে শোনা না যাওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। সুতরাং পুরুষ ছেলেদের লজ্জা ও সংকোচ কিছুটা গণ্য করা হলেও কন্যা শিশুদের এমন স্বভাব অনেকটা গুণের মধ্যেই পড়ে। পিতার অবর্তমানে কন্যারা সম্পত্তির প্রশ্নে চুপ থাকবে এটিই বাঞ্ছনীয়। বিবাহিত বোনেরা ভাইয়ের কাছে পিতার সম্পত্তির অংশ দাবি করবে এটা আকাক্সিক্ষত নয়। ভাই যেখানে নেই সেখানে বোন পিতাকে জীবিতকালে সম্পত্তি লিখে দিতে বললে পিতা নারাজ হয়ে থাকেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাই ভর্তি হবার অনুপ্রেরণা পেলেও বোন ভালো ছাত্রী হওয়া সত্ত্বেও অনুপ্রাণিত হয় না। এমন হাজারো দৃষ্টান্ত আমরা প্রতি মুহূর্তে পর্যবেক্ষণ করছি। এসব সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনাপত্তি নিঃসন্দেহে মেয়েদের অগ্রসরতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। লজ্জাশীলতা এসব অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তির সহজাত গুণ না হয়ে সামাজিকভাবে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বলে মনে করার যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে।
সুতরাং লাজুক আইডেন্টিটিকে শুধু নিষ্ক্রিয় কার্যসম্পাদনকারী হিসেবে দেখা যুক্তিসংগত নয়। তারা বাস্তব দর্শক-শ্রোতামণ্ডলীর সামনে সচেতনভাবে কৌশলসহ আত্মরক্ষায় নামে বা নামার উদ্যোগ গ্রহণ করে। তখন তার মনে দর্শক-শ্রোতাদের মূল্যায়নের ধরনটি যথেষ্ট মনে থাকে এবং সে কারণে তার উপস্থিতি একটি সার্বিক পরিস্থিতির মধ্যে সম্পন্ন হয়। সে শুধু ভূমিকা গ্রহণ করে না; নিজস্ব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ভূমিকা তৈরি করে। সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের আলোকে বিষয়টি অনুধাবনের অনেক অবকাশ রয়েছে।
[চলবে]

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চা-১১

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প-সাহিত্য
ও সংস্কৃতিচর্চা-১১

কোনো প্রাপ্তিই পূর্ণ প্রাপ্তি নয়
কোনো প্রাপ্তিই দেয় না পূর্ণ তৃপ্তি
সব প্রাপ্তি ও তৃপ্তি লালন করে
গোপনে গহীনে তৃষ্ণা তৃষ্ণা তৃষ্ণা।
-হেলাল হাফিজ
সেপ্টেম্বরের শরতের আকাশে এমনই তৃষ্ণার সন্ধান পেয়েছিলেন মনিরুজ্জামান। শব্দকে কণ্ঠে ধারণ করে আরো তৃষ্ণার্ত হবার আহ্বান জানিয়েছিলেন শহীদুল্লাহ্ কলাভবনের ১৫০ নম্বর কক্ষে; সময়টা ১৯৮১ সাল, ২০ সেপ্টেম্বর। কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক সেই অনুষ্ঠানে সংশয়যুক্ত কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের- ‘স্ফুলিঙ্গ তার পাখায় পেল ছন্দ/ উড়ে গিয়ে মিলিয়ে গেল এই তার আনন্দ’ লাইন দুটো উচ্চারণ করেছিলেন। কিন্তু মনিরুজ্জামান (প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক) ও শেরিফা নার্গিস আখতার রেখা (প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম আহ্বায়ক) কণ্ঠ-শানানোর যে দায়িত্ব নেন, হাসান আজিজুল হকের নাম দেয়া সেই স্বননর বয়স এখন তেত্রিশ। চিহ্নর ধারাবাহিক আয়োজনের এবারে থাকছে শুদ্ধ উচ্চারণ ও আবৃত্তি সংগঠন স্বনন।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আবৃত্তি সংগঠন স্বনন জন্মলগ্ন থেকে উচ্চারণ, ব্যাকরণ ও আবৃত্তি বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে মতিহার সবুজ প্রাঙ্গনে, কলাভবনের বিভিন্ন কক্ষে, নাজিম মাহমুদের কক্ষে, হাসান আজিজুল হকের কক্ষে ও বর্তমানে মমতাজউদ্দিন কলাভবনের ১৪০ নম্বর কক্ষ-খ্যাত ক্লাপসেবল গেটের ফাঁকা জায়গাতেই বিশোর্ধ কর্মীর মহড়া চলে দিন-দিন বিকাল ৫টা থেকে ৭টা পর্যন্ত। তবে স্টেডিয়াম মার্কেটে তাদের নিজস্ব অফিস রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বল্প সময়ের জন্য আসা (পাঁচ বছর, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণে কখনো আরো বেশি) শিক্ষার্থীদের মাঝ থেকে আবেদনপত্র সংগ্রহ ও অডিশনের মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহ করে থাকে স্বনন। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সংগঠনের প্রতি আস্থা ও ভালোবাসার জায়গা থেকে স্বননর গঠনতন্ত্র নির্মিত। ‘যতদূরে যাই/ আমরা সবাই/ স্বনন পরিবার’- এই বিশ্বাস বুকে ধারণ করে বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কনিষ্ঠদের প্রতি স্নেহই স্বননর মূলমন্ত্র। যাঁদের একান্ত ভালোবাসা- অনুপ্রেরণা- পরামর্শে স্বনন শিশু থেকে বলিষ্ঠরূপে উপস্থাপিত হচ্ছে তাঁরা হলেন- নাজিম মাহমুদ, হাসান আজিজুল হক, জুলফিকার মতিন, সনৎকুমার সাহা, আলী আনোয়ার, আবুবকর সিদ্দিক, গোলাম মুরশিদ, আতাউর রহমান, শহীদুল ইসলাম, আসাদুজ্জামান, আব্দুল খালেক, শিশির কুমার ভট্টাচার্য, জাহেদুল হক টুকু, সুব্রত মজুমদার, ওয়াহিদুল হক, অসিত বরণ ঘোষ প্রমুখ। তবে, সার্বিক প্রেরণার মূলে কাজ করেছেন নাজিম মাহমুদ। সুধীজনদের সহযোগিতায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরেও রংপুরে ও ঢাকায় স্বননর দুটি শাখা রয়েছে। চিরসবুজ স্বনন সারা বছর ধরে মতিহার চত্বরকে দিয়ে এসেছে একটি ছন্দ, লয়, নির্দিষ্ট ঘরানায় চলার গতি। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক জটিলতা তাদের কার্যক্রমে বাঁধা সৃষ্টি করতে পারে নি। স্বনন বর্ষাকে সম্ভাষণ জানায় শব্দে, বাসন্তি পরিবেশকে সুললিত করে কণ্ঠে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবর্ষ উদ্যাপন করে হাওয়ার অনুরণনে কিংবা তাঁরই প্রয়াণের দিনে বেদনার গুমোট পরিবেশ জানান দেয় শব্দের গুরুত্ব। এছাড়াও জাতীয় দিবসগুলোতে এবং বাঙালির একান্ত গৌরবের দিনগুলোতে স্বনন কবিতার ঝুড়ি নিয়ে বসে মতিহার চত্বরে। এ কার্যক্রমের ধারা প্রতি বছর অব্যাহত থাকে। ১৯৮২ সালের জানুয়ারি মাসে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়কে প্রধান আবৃত্তিকার করে অনুষ্ঠিত হয় দেশের প্রথম দর্শনীর বিনিময়ে আবৃত্তি অনুষ্ঠান। এরপর হাজার বছরের কবিতা, বিভিন্ন কবিকে কেন্দ্র করে (সমর সেন, আহসান হাবীব-এর প্রয়াণে, জীবনানন্দ, আবুল হাসান স্মরণ ইত্যাদি) অনুষ্ঠান, গুণিজন সংবর্ধনা, ছড়া-নাটক-গদ্য পাঠ, কর্মশালা এমইতর বিভিন্ন উপলক্ষ ও সুনির্দিষ্ট উপলক্ষ ছাড়াও স্বনন আয়োজন করেছে আবৃত্তি অনুষ্ঠানের। এছাড়াও রবীন্দ্রসংগীত মেলা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত আবৃত্তি অনুষ্ঠানে স্বননর উপস্থিতি অত্যন্ত উজ্জ্বল। কবি কামাল, জয়ন্ত রায়, মাসকুর-এ-সাত্তার এবং নিশাত জাহান রানার সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বনন প্রতিনিধি দলও ১৯৮৬ সালে গিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। সেখানে স্বনন উপস্থাপিত হয়েছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। জাতীয় আবৃত্তি উৎসবে স্বননর সরব উপস্থিতি চোখে পড়বার মতো। ‘রক্ত বিচ্ছুরিত সূর্য কবিতার বাংলাদেশ’- এই স্লোগানে ‘৯০-এর গণ-আন্দোলনের সমর্থন জানায় স্বনন। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে নাজিম মাহমুদের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে জাতীয় জাদুঘরে ‘চিত্তে যবে মত্ত আশা’- স্লোগানে আবৃত্তি উপস্থাপন করে স্বনন। স্বননর প্রাণপুরুষ নাজিম মাহমুদ স্বর্গের সাথে মতিহার সবুজ চত্বরকে তুলনা করেছিলেন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত স্বননর সদস্যরা ফি-বছর তাঁর প্রয়াণের দিনে কবিতার মাধ্যমে তাঁকে এভাবেই স্মরণ করেন। ১৯৮৪ সালে বৈশাখ উদ্যাপনের মাধ্যমে প্রথম কর্মশালার আয়োজন করে স্বনন। তাছাড়া দশ বছর পূর্তি, তিন বছর পূর্তি, ছয় বছর পূর্তি, আট বছর পূর্তি, যুগ পূর্তি, ষোল বছর পূর্তি, তেইশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান ও কর্মশালাগুলোতে সৈয়দ শামসুল হক, হায়াৎ সাইফ, কবি কামাল, হাসান আজিজুল হক, আলী আনোয়ার, কামরুল হাসান, জামিল চৌধুরী, কবি পূণেন্দু পাত্রী, নাজিম মাহমুদ প্রমুখ বিভিন্ন সময়ে উপস্থিত থেকেছেন এবং তাঁদের সম্মাননা প্রদান করেছে স্বনন। ঢাকায় বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের আবৃত্তি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়েছিল স্বনন। সেই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ২১মার্চ ‘বিশ্ব কবিতা দিবস’ ও ‘ফাল্গুন’ উপলক্ষে ‘এতো ফুল ফোটে এতো পাখি গায়’- স্লোগানে পুরাতন ফোকলোর চত্বর বিকাল ৫.৩০টায় প্রেম, প্রকৃতি ও দেশ কবিতায় মুখরিত ছিলো। কবিতার গুরুত্ব ও ফাল্গুনের আগমন ধ্বনি উচ্চারিত হয় স্বনন শিশুদের কণ্ঠে। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রধানতম অর্জন স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ২৬ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক জোটের আওতাধীন ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’- স্লোগানে বিকাল ৪.০০ টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার মুক্তমঞ্চে শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, সিকান্দার আবু জাফর, সানাউল হক প্রমুখের কবিতায় আরও একবার স্বাধীনতার গৌরব ও ত্যাগের মহিমা কীর্তনে সিক্ত হয় মঞ্চ। বাংলাদেশ ও বাঙালির উৎসবের ঐতিহ্য পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ‘পর্বত চাহিল হতে বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ’- স্লোগানে বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক জোটের আওতাধীন বিকাল ৩.৪০ টায় আমচত্বরে (কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পেছনে) হরেক রকম কবিতার পশরায় মুখরিত হয় বৈশাখ উদ্যাপন। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবর্ষ উদ্যাপনে ‘নানা রবীন্দ্রনাথের একখানা মালা’- স্লোগানে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার মুক্তমঞ্চে বিকাল ৫.০০ টায় স্মরণ করা হয় রবীন্দ্রনাথকে। স্বননর প্রাণপুরুষ নাজিম মাহমুদের প্রয়াণ দিবস ও আলী আনোয়ার স্মরণে ফি-বছরের ন্যায় ১৭ মে শহীদুল্লাহ্ কলাভবনের ১৫০ নম্বর কক্ষে কবিতা আবৃত্তির আয়োজন করে স্বনন। স্মরণ অনুষ্ঠানটিতে উপস্থিত ছিলেন- হাসান আজিজুল হক, বেগম হোসনে আরা, সনৎকুমার সাহা, কবি আরিফুল হক কুমার, রাশেদা খানম প্রমুখ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানটিকে অলংকৃত করেছিলেন- শিশির কুমার ভট্টাচার্য, সুব্রত মজুমদার, শুভ্রা রাণী, তাপস মজুমদার, রকিবুল হাসান রবিন, কবি কামাল প্রমুখ। যখন স্বননর এই কার্যক্রমের কথাগুলো লিখিত হচ্ছে বাহিরে অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে, হয়তো স্বনন সদস্যরাও প্রস্তুত হচ্ছে তাদের পরবর্তী আয়োজন বৃষ্টির কবিতা নিয়ে। দীর্ঘ সাংস্কৃতিক আন্দোলন পরিক্রমায় সংশয়, নৈরাজ্য ও হতাশা মোকাবিলা করতে প্রত্যেক সময়ে শক্তভাবে হাল ধরেছিলেন স্বননর সদস্যরা। তাছাড়াও যার ডানার তলে স্বনন শিশুরা আগলে রয়েছে তাঁরা হচ্ছেন কবি কামাল ও মাসকুর-এ-সাত্তার কল্লোল। ঝড় কেটে গেছে, স্বনন তরী নির্বিঘেœ ভাসুক সাংস্কৃতিক সমুদ্রে…।

ভারতীয় নারীবাদ ও যৌনতার ডিসকোর্স

ভারতীয় নারীবাদ ও যৌনতার ডিসকোর্স
মূল-সরোজিনী সাহু

অনুবাদ : মাহবুব অনিন্দ্য

সরোজিনী সাহু দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম নারীবাদী লেখিকা। শরহফষব ম্যাগাজিনের দৃষ্টিতে ভারতে ২৫ ব্যতিক্রমী নারীর একজন। জন্ম ১৯৫৬ সালে ভারতের ওডিশা রাজ্যে। লেখেন ওড়িয়া ও ইংরেজিতে। তার গল্প, কবিতা, উপন্যাস ও প্রবন্ধের বিষয়বস্তু মোটা দাগে নারীজ্জনারীর জীবন, যন্ত্রণা ও নানাবিধ জটিলতা। গল্প-উপন্যাস মিলিয়ে ওড়িয়া ভাষায় প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৭। ইংরেজিতে এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে একটি উপন্যাস ও দুটি গল্প-সংকলন। কলেজে অধ্যাপনার পাশাপাশি ফিচারভিত্তিক ইংরেজি জার্নাল ইন্ডিয়ান এজ এর সহযোগী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত। নিয়মিত ব্লগ লেখেন। তার লেখা এরমধ্যে পাঠকসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। অনূদিত হয়েছে ইংরেজি-বাংলা-হিন্দিসহ বেশ কয়েকটি ভাষায়। লেখালেখির জন্য ওডিশা সাহিত্য একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসহ অর্জন করেছেন বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মাননা। এই লেখাটি ওহফরধহ ঋবসরহরংস ধহফ ঝবীঁধষরঃু উরংপড়ঁৎংব প্রবন্ধের বাংলা রূপান্তর।
১৯০১, ফুল ফোটে, ঝরে
১৯০১ সালে বস্তারের (বর্তমানে ছত্তিশগড়) এক খ্রিস্টান পরিবারে তার জন্ম। পরে তিনি কটক মেডিকেল স্কুলে পড়ালেখা করেন এবং সেখান থেকেই অর্জন করেন এলএমপি ডিগ্রি। সেই সময়েই তিনি কটক রেডক্রসের সুপারিনটেনড্যান্ট হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন। এসময় পিতার বয়সী এক লোকের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে তার স্ত্রী কর্তৃক হাতেনাতে ধরা পড়েন। তাদের মধ্যে গভীর শারীরিক সম্পর্ক ছিল, কিন্তু প্রেমিকটি মনেপ্রাণে চাইতেন যোগ্যতম কোনো ব্যক্তির সাথে তার বিয়ে হোক।
১৯২১ থেকে ১৯২৭, এই ছয়-সাত বছরে তিনি বেশ কিছু লেখালেখি করেন। ওড়িয়া ভাষায় অঞ্জলি ও অর্চনা সহ কয়েকটি কবিতার বই এবং ভারতী ও পরশমনি নামে উপন্যাস বের হয় তার। লেখার মাধ্যমে তিনি প্রতিবাদ করেছেন পর্দাপ্রথা, বাল্যবিবাহ, জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা ও নারীর প্রতি সকল বৈষম্যের। পাশাপাশি কথা বলেছেন নারীর অধিকার, ক্ষমতায়ন ও বিধবা বিবাহের পক্ষে। রেডক্রসে তার পরামর্শক-প্রেমিকটির সাথে সম্পর্ক থাকা অবস্থায় তিনি দিল্লিতে বসবাসরত এক অখ্যাত ডাক্তার তথা ভণ্ডলোকের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। অচেনা এই ডাক্তারের সাথে বিয়ের বিরোধিতা করেন প্রেমিকটি। তাতে কাজ হয়নি। চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি আর্যসমাজের সভ্য হন এবং অচেনা সেই ডাক্তার লোকটিকে বিয়ে করেন। তারপর দিল্লির চাঁদনিচক এলাকায় ক্লিনিক খুলে সেখানেই বসবাস করতে থাকেন। ওড়িয়া ভাষায় লেখা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি হিন্দিতেও লিখতে শুরু করেন তিনি। বরমাল্য নামে হিন্দি কবিতার সংকলন বের হয় তার। পাশাপাশি মহাবীর, জীবন ও নারী ভারতীর মতো কয়েকটি হিন্দি সাময়িকপত্রের সম্পাদক হন। পরে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় ও বেনারশ হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেবার আমন্ত্রণ পান। একজন নারীর জন্য সেই সময়ে এটি ছিল দুর্লভ স্বীকৃতি। কিন্তু তার বিবাহিত জীবন সুখের ছিল না মোটেও। স্বামী তাকে ব্যবহার করেছিল উপার্জনের উৎস হিসেবে। প্রতিরোধের চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত পারেননি। রোগে-শোকে, মানসিক আঘাতে জর্জরিত হয়ে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে মারা যান তিনি। তার করুণ জীবন ও সংগ্রামের ওপর ভিত্তি করে প্রখ্যাত হিন্দি সাহিত্যিক জিনেন্দ্রকুমার রচনা করেন কল্যাণী উপন্যাস। তার নাম কুন্তলা কুমারী সাবাত। ওড়িয়া সাহিত্যের বহুদর্শী এক লেখিকা। তার বিবাহপূর্ব ও বিবাহোত্তর জীবন সুখের ছিলো না। প্রেম, যৌনতা, অত্যাচার, প্রতারণা তার জীবনকে বিষিয়ে তুলেছিলো। সামন্ততান্ত্রিক ভারতে পুরুষ-আধিপত্যশীল সমাজের অনেক আঘাত সয়েছেন নীরবে। সাহিত্যে প্রকাশ করেননি তেমন কিছুই। যৌনতা কিংবা জীবন-যন্ত্রণার কোন বয়ান আমরা পাই না তার কবিতায়। বরং যৌন অভিপ্রকাশের ওপরে এক ধরনের সুফি আদর্শ বা আধ্যাত্মিকতার প্রলেপ দিয়ে সবসময় গোপন করতে চেয়েছেন বেদনা-জর্জর জীবন-অভিজ্ঞতার সব করুণ আখ্যান। এই প্রবণতা স্থায়ী হয়েছিল অনেক বছর, এমনকি পোস্ট-কলোনিয়াল যুগ শুরুর পরে কয়েক দশক পর্যন্ত। এই যুগে নারী-কবিতাকাররা তাদের ভালবাসার অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন ভক্তিমূলক কবিতার ফরম্যাটে।
১৯১৪, গোপন দুঃখ
১৯৩০ সালে ১৬ বছর বয়সী ভারতীয় এক বালিকার সাথে রোমানিয়ার এক তরুণের সাক্ষাৎ হয়। দুজনে প্রেমে পড়ে। তরুণটি এসেছিল ভারতীয় দর্শনের ওপর পড়ালেখা করতে, মেয়েটি ছিলো তার শিক্ষকের কন্যা। এই সম্পর্ক তারা গোপন রাখতে পারেননি, অল্পদিনের মধ্যেই অভিভাবকেরা বিষয়টি জেনে যায়। তরুণটিকে শিক্ষকের বাড়ি থেকে চলে যেতে এবং আর কখনোই মেয়েটির সাথে যোগাযোগ না করতে বলা হয়। পরবর্তীতে সেই তরুণ পরিচিতি পান বিশ্বখ্যাত দার্শনিক হিসেবে। লেখেন একটি আধা-আত্মজৈবনিক উপন্যাস। ১৯৩৩ সালে রোমানিয়ায় বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। এটি লেখা হয়েছিল বিশেষ করে একটি সাহিত্য পুরস্কারের জন্য। পরে তা দেদার বিক্রি হয় এবং লেখকের জন্য বিপুল অর্থ ও খ্যাতি বয়ে আনে। উপন্যাসটি তখন ইতালিয়ান, জার্মান, ফরাসি, স্প্যানিশ সহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়। পরে বিশ বছর বয়সে মেয়েটির বিয়ে হয়ে যায়, সন্তানও হয় দুটি। এরপর তিনি লেখালেখিতে আত্মনিয়োগ করেন, প্রকাশ করতে থাকেন কবিতা ও গদ্যের বইপত্র। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর বেশ কয়েকটি বই লেখেন তিনি। তবে ১৯৭৪ সালের আগে তেমন বিখ্যাত হতে পারেননি। ১৯৩৮ কিংবা ১৯৩৯ সালে তার পিতার ইউরোপ ভ্রমণের পরেই কেবল তিনি রোমানিয়ায় প্রকাশিত উপন্যাসটি সম্পর্কে জানতে পারেন। এও জানতে পারেন সেটি তাকেই উৎসর্গ করে লেখা হয়েছে। ১৯৭২ সালের দিকে লেখকের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু কোলকাতায় এলে অবশেষে তিনি বুঝতে পারেন যে বইটিতে তাদের দুজনের যৌন সম্পর্কের বর্ণনা করা হয়েছে। পরে এক বন্ধুকে দিয়ে উপন্যাসটি ফরাসি থেকে অনুবাদ করিয়ে নেন। উপন্যাসের বর্ণনা তাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। ১৯৭৩ সালের তিনি আমেরিকায় যান একটি সেমিনারে রবীন্দ্রনাথের ওপর বক্তৃতা দিতে। ৪৩ বছর পর লেখকের সাথে আবার সাক্ষাৎ হয় তার, ব্যক্তিগতভাবে তার সাথে কথা বলেন তিনি। আর এই বলে সতর্ক করে দেন যে, বইটি কখনও ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়ে থাকলে লেখকের বিরুদ্ধে তিনি মামলা করতে পারেন। লেখক তাকে নিশ্চিত করেন যে, উপন্যাসটি তিনি ইংরেজিতে প্রকাশ করেননি বা করবেন না। সম্ভবত লেখককে তিনি বিশ্বাস করেননি, চেপে রাখতে পারেননি নিজের মর্মবেদনা ও দুঃখের কথা। দুঃখ ছিলো এই যে, তার ভালোবাসাকে অসত্য ও ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এরপর তিনি নিজে একটা উপন্যাস লেখেন। তার মৃত্যুর পরে ১৯৭৪ সালে আমেরিকার শিকাগো ইউনিভার্সিটি প্রেস রোমানিয়ান ও ভারতীয় উপন্যাস দুটির একটি যুক্ত ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশ করে। এতে উঠে আসে দুজনের সম্পর্কের খোলামেলা বর্ণনা। উপন্যাসটিতে তিনি তুলে ধরেছেন এক ভারতীয় মেয়ে কিভাবে পশ্চিমা এক তরুণের প্রেমে পড়ে যায় তার বয়ান। শরীরী সম্পর্কের চেয়ে আবেগের কথাই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে এখানে।
রোমানিয়ার সেই লেখকের নাম মির্চা এলিয়াদ আর ভারতীয় মেয়েটির নাম মৈত্রেয়ী দেবী। রোমানিয়ার উপন্যাসটির ইংরেজি নাম বেঙ্গল নাইটস আর ভারতীয় উপন্যাসটির নাম ইট ভাজ নট ডাই। উপন্যাস দুটি বাংলায় যথাক্রমে লা নুই বেঙ্গলি ও ন হন্যতে নামে অনূদিত হয়েছে, সেকথা আমাদের অনেকেরই অজানা নয়।
১৯১৯, লাভ স্টোরি
মৈত্রেয়ী-কাহিনীর ছয় বছর পরে পাঞ্জাবের অল্পবয়সী এক নারী-কবি বিয়ে করেন এক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদককে। শৈশব থেকে পরিচয় ছিলো দুজনের। বিয়ে করে নাম পাল্টে ফেলেন তিনি। পরবর্তীতে উপন্যাস, ছোটগল্প ও কবিতা মিলিয়ে তিনি ৭০টির মতো বই লেখেন। ভারতীয় সাহিত্য আকাদেমি যে ২১ ব্যক্তিকে ফেলো নির্বাচন করে তাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। এছাড়া পদ্মবিভূষণ, জ্ঞানপীঠ ও পদ্মশ্রী প্রভৃতি পুরস্কারে ভূষিত করা হয় তাকে। দিল্লি, জবলপুর ও বিশ^ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডি-লিট ডিগ্রি প্রদান করে। ১৯১৯ সালে গুজরানওয়ালায় (বর্তমানে এটি পাকিস্তানে পড়েছে) জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার একমাত্র ছেলে একাধারে স্কুল শিক্ষক, কবি ও একটি সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক। ৪০ বছর বয়সে তিনি উর্দু ভাষার এক কবির সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এজন্য ত্যাগ করেন স্বামীকে। কিন্তু সেই কবি তাকে বিয়ে করেননি। তার জীবনে নতুন এক নারীর আগমন ঘটেছিল। পরে তিনি এক চিত্রশিল্পীর সাথে জড়িত হন এবং জীবনের বাকি ৪০ বছর তার সাথেই কাটিয়ে দেন। তার বেশিরভাগ বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকেন এই শিল্পী। বাকি জীবনে দুজন প্রেমিকের সাথেই সমানতালে নির্বিঘেœ সম্পর্ক টিকিয়ে রেখেছিলেন তিনি। এই লেখিকার নাম অমৃতা প্রীতম। ২০০৫ সালের ৩১ অক্টোবর মারা যান তিনি। তার দুই প্রেমিক ছিলেন ইমরোজ ও সাহির লুধিয়ানভি। অমৃতা-ইমরোজের কাহিনী নিয়ে পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া প্রকাশ করে উমা ত্রিলকের লেখা অমৃতা-ইমরোজ: আ লাভ স্টোরি।
১৯৩৪, খোলা হাওয়া
মৈত্রেয়ী-ইলিয়াদ প্রেম-রোমান্সের চার বছর পরে কেরালায় জন্ম নেয় এক মেয়ে। সেই শহরে কাটে তার শৈশব। ১৭ বছর বয়স থেকে সে ইংরেজি ও মালয়ালম ভাষায় লিখতে শুরু করে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তার চেয়ে ১৫ বছর বেশি বয়সী এক লোকের সাথে বিয়ে হয় মেয়েটির। বিয়ের এক বছর পরেই জন্ম নেয় তাদের প্রথম সন্তান। শীঘ্র তার লেখায় এক ধরনের বৈপরীত্য দেখা যায়। তার লেখা হয়ে দাঁড়ায় এক ধরনের স্বীকারোক্তিমূলক আখ্যান। জীবনের দুর্গতি ও টিনেজ বয়স থেকে শুরু হওয়া মানসিক আঘাতের কথা তিনি গোপন রাখতে পারেননি। লেখিকা হিসেবে তিনিই প্রথম নিজের যৌন আকাক্সক্ষার খোলামেলা বর্ণনা তুলে ধরেছেন এবং সেগুলো নিয়ে নির্দ্বিধায় আলোচনা করেছেন। নিজের সমকামী সম্পর্ক, স্বামীর সমকাম-প্রবণতা এমনকি বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের কথাও গোপন রাখেননি। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, সেই স্বামী সবসময় সমর্থন দিয়ে গেছেন তার লেখার।
বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ মাই স্টোরিতে তিনি লিখেছেন, ‘আমার মানসিক বৈকল্যের দিনগুলোতে আমার স্বামী ও আমার মধ্যে এক ধরনের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় যা ছিলো একান্ত শরীরী… সে আমাকে গরম পানিতে গোসল করিয়ে দিতো তারপর ছেলেদের পোশাক পরিয়ে তার কোলে বসাতো, আর আদর করে ‘মাই লিটল ডার্লিং বয়’ বলে ডাকতো… আমি প্রকৃতিগতভাবে লাজুক ছিলাম…। কিন্তু অসুস্থতার সময়ে জীবনে প্রথমবারের মতো সব বিসর্জন দিয়েছি। সেই প্রথম বুঝতে পারি বিছানায় নিজেকে কিভাবে পুরোপুরি সমর্পণ করতে হয়।’ অনেক সাক্ষাৎকারে লেখালেখির ক্ষেত্রে স্বামীর সমর্থনের প্রশংসা করলেও মাই স্টোরিতে তিনি বলেন যে, স্বামী তাকে সমর্থন দিয়েছিলেন এজন্য যে, তার লেখালেখি ছিলো স্বামীর উপার্জনের উৎস। দীর্ঘ অসুখে ভুগে তার স্বামী মারা যান। পরে তিনি রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছিলেন কিন্তু ব্যর্থ হন। এক মুসলমান তরুণকে বিয়ে করতে ৬৫ বছর বয়সে ধর্মান্তরিত হন তিনি। ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হবার পরে তিনি যুক্তি দেখান, বিশ্বে নারীর জন্য সবচেয়ে সুন্দর পোশাক হচ্ছে পর্দা। নিরাপত্তার বোধ থেকে তখন সার্বক্ষণিক তিনি পর্দা পরতেন। ধর্মান্তর প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে, জীবনভর তিনি একাকীত্ব বোধ করতেন। রাতে ঘুমোতেন বালিশ বুকে নিয়ে। কিন্তু এখন আর তিনি একা বোধ করেন না। ইসলাম তাকে সঙ্গ দেয়। তার মতে, পৃথিবীতে ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা নারীকে ভালোবাসা ও সুরক্ষা দিয়েছে। কিন্তু ২০০৬ সালে কোচিতে একটি প্রকাশনা উৎসবে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ধর্মান্তরিত হবার জন্যে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত এবং তিনি তার মুসলিম বন্ধুদের প্রতারণাপূর্ণ আচরণে বিভ্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া দাবি করেন যে, তার কয়েক লাখ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার, বইপত্র ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্রসহ সমস্ত সম্পদ মুসলমানরা লুট করেছে। তার নাম কমলা দাস, মাধবকুট্টি অথবা কমলা সুরাইয়া। ১৯৮৫ সালে মার্গারেট আর্চনার, ডরিস লেসিং ও নাদিন গার্ডিমারের সাথে নোবেল পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় তার নাম ওঠে। শেষ পর্যন্ত নোবেল পুরস্কার পাননি। তবে এশিয়ান পোয়েট্রি প্রাইজ, কেন্ট অ্যাওয়ার্ড, এশিয়ান ওয়ার্ল্ড প্রাইজ, সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা অর্জন করেন তিনি। ৩১ মে ২০০৯ পুনেতে তার জীবনাবসান হয়।
ঔপনিবেশিক চোখে যৌনতার ভূমিকা
গত শতকের এই চার নারীবাদী লেখিকা নিজেদের আলাদা আলাদা চরিত্র সত্ত্বেও নারীর পক্ষে কথা বলার চেষ্টা করেছেন। লেখালেখির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বতন্ত্র মূল্যবোধ। অনেক সময় হয়ত সেগুলোকে মনে হয়েছে বিভ্রান্তিকর, বৈপরীত্যমূলক। এদের লেখা পড়ে কেউ হয়ত বলতে পারেন যে, সামগ্রিক অর্থে নারীত্ব এক ধরনের তত্ত্বগত মিথ যা অতীন্দ্রিয় উপায়ে নারীর বহুমাত্রিক মিথের সাথে সম্পর্কযুক্ত। এই প্রতিযুক্তি খারিজ করে দেবার উপায় নেই। কিন্তু একজন নারী হিসেবে (নারীবাদী হিসেবে নয়) সব ধরনের পরিস্থিতিকে আমি নিজের জন্য সত্য বলে উপলব্ধি করি। কোনোদিন হয়ত আমিও মৈত্রেয়ী, কমলা, অমৃতা বা কমলা হতে পারতাম। মৈত্রেয়ী কেন কমলার মতো হলো না অথবা কমলা কেন কুন্তলার মতো হয়নি, কেন মৈত্রেয়ী ইলিয়াদের সাথে তার সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠা দিতে পারেনি, কমলা যেমনটা পেরেছেÑ এ ধরনের যুক্তিগুলোতে সুশৃঙ্খল চিন্তার ছাপ নেই। আমার মতে, কুন্তুলা থেকে কমলা পর্যন্ত নারীমনের যে রূপান্তর তার কারণ হচ্ছে ভারতে নারীবাদের বিকাশ। ভারতীয় নারীবাদের কারণ ও অভিপ্রকাশের জায়গাটি পশ্চিমা দুনিয়ার নারীবাদী অভিপ্রকাশের চেয়ে আলাদা। পশ্চিমের উপনেবিশপূর্ব সামাজিক কাঠামো এবং নারীর যে ভূমিকা দেখা গিয়েছিলো সেটি তাত্ত্বিকভাবে নারীবাদে রূপলাভ করে এবং তা কোনো অর্থেই ব্যক্তিক ব্যাপার ছিলো না, ছিলো অনেক বেশি সমাজতাত্ত্বিক ব্যাপার। নারী জনগোষ্ঠীকে দেখা হতো পুরুষ জনগোষ্ঠীর সমকক্ষ হিসেবে। কিন্তু নারীর ব্যক্তিসত্তা সামন্তযুগের পিতৃতান্ত্রিক সমাজের মতোই পিউরিটান ছিল। উপনিবেশপূর্ব ভারতীয় সমাজে পুরুষেরা বহুবিবাহ করতে পারত। এমনকি ভারতের অনেক পুরুষ বুদ্ধিজীবী, লেখক ও রাজনীতিবিদ পর্যন্ত প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পরে আরেকটি বিয়ে করেছেন। কিন্তু এমন একটিও উদাহরণ নেই যে, বিধবা হবার পরে কোনো নারী সেই সময়ে আবার বিয়ে করতে পেরেছেন। ব্রিটিশ শাসনের সেই যুগে যদিও বিধবা বিবাহের আইনি বৈধতা ছিলো। নারীদের শিক্ষা দেওয়া হয় বিসর্জনের দেবী হতে, সিমোন দ্য ব্যুভোয়াঁ তার দ্য সেকেন্ড সেক্স বইতে যেমনটা লিখেছেন, নারীদের মা, মাটি, মাতৃভূমি, কুমারি, প্রকৃতি প্রভৃতি মিথ বা কল্পিত আদর্শের ফাঁদে ফেলা হয়। এর মাধ্যমে উধাও হয় তাদের ব্যক্তিসত্তা ও স্বতন্ত্র অবস্থান। উপনিবেশপূর্ব নারীবাদীরা তাই লেখেন ‘সংসারে নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য’ অথবা ‘ভারতীয় পুরাণে কিংবদন্তী নারী’ জাতীয় রচনা। আধিপত্যশীল পিতৃতান্ত্রিক সমাজের মতাদর্শই সেখানে উঠে আসে। ভারতীয় সংস্কৃতিতে ‘নারীত্বে’র ধারণা পুনর্নিমাণের জন্য এক ধরনের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন রূপলাভ করে এবং এতেও ব্যক্তিক নারীবাদকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়। কুন্তলা এবং মৈত্রেয়ী সেই উপনিবেশ-পূর্ব সমাজেরই উপজাত।
বর্তমানে ভারতে সবচেয়ে বৃহৎ ও মূলধারার নারী সংগঠন হচ্ছে অল ইন্ডিয়া উইমেনস কনফারেন্স। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একটি অঙ্গ সংগঠন হিসেবে বহুস্তর বিশিষ্ট এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৭ সালে। আন্দোলনের অঞ্চলগত বৈচিত্র্য ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সংস্থাটি সবসময় সচেষ্ট থেকেছে। কোলকাতায় মৈত্রেয়ী-ইলিয়াদ সাক্ষাতের এক বছর পরে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ১৯৩১ সালে করাচি প্রস্তাব পাস করে। স্বাধীন ভারতের রূপরেখা হিসেবে ‘স্বরাজ’ ঘোষণা করা হয়। এতেও নারী-অধিকারের বিষয়টি খুবই সীমিত আকারে উল্লে¬খ ছিলো। স্বরাজ-এর একটি ধারায় নারী অধিকার সুরক্ষার প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয় শ্রমিক অধিকারের অংশ হিসেবে! উপনিবেশ-পূর্ব ভারতের তুলনায় উপনিবেশ-উত্তর ভারতের পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে অনেক ভিন্ন। এ সময় নারী-শিক্ষার বিপুল বিস্তার ঘটতে থাকে। যে বাইনারিগুলো জেন্ডারভাবনার আধিপত্যশীল দার্শনিক ও রাজনৈতিক ভিত্তিভূমি তৈরি করেছিল, তাকে ভেঙেচুরে নতুন রূপ দেয় বৈষম্যমূলক পিতৃতান্ত্রিক পরিবার-কাঠামো: বয়স, সামাজিক মর্যাদা, পুরুষের সাথে সম্পর্ক, বিয়ে, সন্তান জন্মদান থেকে শুরু করে পিতৃতান্ত্রিক আরও কিছু ব্যবস্থা যেমন যৌতুক, জাতিভেদ, রক্তসম্পর্ক, গোষ্ঠী, গ্রাম, বাজার ও রাষ্ট্র প্রভৃতি। এই পিতৃতান্ত্রিক প্রতিবেশ ‘নারীসত্তা’র অধিকারের প্রশ্নকে ‘বিরোধিতা’ হিসেবে বিবেচনা করে। কমলা দাস ও অমৃতা প্রীতমকে আমি সমর্থন করি আর সেজন্যেই এই লেখা। অনেক তাত্ত্বিক আছেন যারা সবসময় চেষ্টা করেন নারীবাদ থেকে বিচ্ছিন্ন করে যৌনতার একটি স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করতে। আদতে যা কখনো হতে পারে না। তাদের সংজ্ঞায়িত নারীবাদে পুরুষ-আধিপত্যবাদী মতাদর্শ প্রতিরোধের কোনো ধারণা নেই। তারা মনে করে যে, এ ধরনের আধিপত্যবাদ মোকাবেলার ক্ষেত্রে যৌনতার কোন ভূমিকা থাকতে পারে না। বিশ শতকের উপনিবেশিক ভারতে নারীদের লেখালেখি যদি হয় সামাজিক উত্তরাধিকার-পরম্পরা ও স্বতন্ত্র ভারতীয় পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা, উপনিবেশ-উত্তর ভারতে নারীবাদী তর্কবিতর্ক হয়েছে নারী-যৌনতাবাদীদের চর্চিত পথেই।

একবিংশর সাহসী মাঝি খোন্দকার আশরাফ হোসেন

একবিংশর সাহসী মাঝি খোন্দকার আশরাফ হোসেন

কবি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি (খোন্দকার আশরাফ হোসেন) একদিন লিখেছিলেন, সেদিন ট্রামের নিচে থেমে গিয়েছিল বাংলা আধুনিক কবিতার অনিরুদ্ধ গতি। তাঁর যেদিন মৃত্যু হলো সেদিন হয়তো অতোখানি না ভাবলেও এটুকু অন্তত আমার মনে হয়েছিল যে, শুধু কবিতার জন্য এমন করে ভাবার মানুষ খুব কম রয়েছে জগতে। আমার কখনো কখনো মনে হয়েছে, কবি বুদ্ধদেব বসু যদি অন্য কিছু না লিখে শুধুই কবিতা লিখতেন, তাহলে বুদ্ধদেবের কবিতায় অন্য কোনো রূপের দেখা আমরা পেতেও পারতাম। খোন্দকার আশরাফ হোসেন তার নিরন্তর কবিতা-ভাবনার সাথে আরো অনেক কিছুর মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছিলেন। অনন্ত জীবন-অন্বেষার মধ্যে কোনো লেখক নানাভাবেই নিজেকে ব্যক্ত করতে চান আর সেটা করতে গিয়ে অনেক সময়ই তার মৌলিক কাজটির ব্যাঘাত ঘটে থাকে। তবে প্রতিভারও রকমফের রয়েছে। অনেক কিছুর মধ্যে ডুবে থাকলেও নিরন্তর কবিতা-ভাবনা থেকে তিনি দূরে সরে যান নি কখনো, কিংবা বলা যায়, নতুন কবিতা লেখার কিংবা নতুন কবিদের উৎসাহ দেবার বিষয়ে তার আগ্রহে কখনো ভাটা পড়েছে বলে আমার মনে হয়নি।
১৬ জুন ২০১৩, মৃত্যুর গহীন আড়ালে চলে গেছেন কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সম্পাদক খোন্দকার আশরাফ হোসেন। চলে গেছেন না-ফেরার দেশে। তার কথা মনে হলে একজন আপদমস্তক ভদ্র মানুষের প্রতিকৃতিই ভেসে ওঠে চোখের সামনে। একজন শক্তিমান কবি ছিলেন তিনি। তাঁর কবিতা সম্পর্কে বলা হয়েছে :
তার আগমন ছিল একটি নীরব দ্রোহের মতো। ঐতিহ্যসূত্রকে ছিন্ন না করেও আশির দশকে তিনি বাংলা কবিতার মুখ ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন নন্দনের নতুন অভিমুখে; কালের সমূহ কলাপ কণ্ঠে ধারণ করেও উচ্চারণ করেছেন চিরকালীনতার শব্দমালা; দর্শন ও জীবনের নানা মাত্রিকতার সমীকরণ তাঁর কবিতাকে করেছে গভীর ও তীক্ষèধার; নিরন্তর পথ পরিক্রমায় পেরিয়ে এসেছেন অনুভবের নানা উত্তাপ ও হিম; কবিতার শৈলী নির্মাণ হয়েছে তার নিরন্তর অভিনিবেশে। [কবিতা সংগ্রহের ফ্ল্যাপ থেকে]
একজন প্রকৃত কবি কিংবা শিল্পী রাষ্ট্রের কিংবা অন্য কারো অনুকম্পায় বেঁচে থাকেন না। প্রকৃত কবিরা চিরকালই নিঃসঙ্গ থেকেছেন। এরা রাষ্ট্র কিংবা সমাজের ধার ধারে না। বরং এটা রাষ্ট্রেরই দায় কবি ও কবিতার দিকে নেক নজরে তাকানো। কারণ, যে দেশে একজন অন্ধ হোমার থাকে সেই দেশ চিরকালই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। কবিতার সাথে আমার অনেক কালের বসবাস। ঢাকার কোনো পত্রিকা সম্পাদক কিংবা কবির সাথেও আমার সে সময়ে কোনো পরিচয় হয়নি। ফলে কবিতা প্রকাশের ব্যাপারে আমার তেমন আগ্রহ ছিল না। আমি ভেবেছিÑ রাইটিং পোয়েট্রি ইজ আ সর্ট অব পে¬জার অ্যান্ড আই নিড দিস পে¬জার ফর মাই ওন সারভাইভাল। আমার এ সামান্য কবিকৃতির মূলে খোন্দকার আশরাফ হোসেনের অবদান অনস্বীকার্য। আমরা যারা ‘একবিংশে’ লিখতাম, আমরা যেন অবিভাবকশূন্য হয়ে পড়লাম। ‘একবিংশ’ পত্রিকার এতগুলো সংখ্যায় দুইবাংলার যে শত শত লেখকের মণিমুক্তো ছড়িয়ে আছে তার মূল্য অপরিসীম। ‘একবিংশ’ পত্রিকার মাধ্যমে দেশ-বিদেশের শিল্পসাহিত্য কিংবা সাহিত্যতত্ত্বের ওপর যত আলোচনা হয়েছে তা যেমন আমাদের শিল্পচেতনাকে শাণিত করেছে, তেমনি বাংলা কবিতার পরিবর্তনে এই পত্রিকার ভূমিকা অসামান্য। বিশ্বসাহিত্যের সোনালি শস্য তিনি আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। নানা বিষয়ে অনেকগুলো মননশীল প্রবন্ধ লিখে তিনি আমাদের প্রবন্ধসাহিত্যকে উর্বর করেছেন।
লিটল ম্যাগাজিনকে অনেকেই ছোটকাগজ বলে থাকেন। ‘ছোটকাগজ’ লিটল ম্যাগাজিনকে ধারণ করে কিনা জানি না, তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে লিটল ম্যাগাজিনকে ছোট কাগজ বলতে অনাগ্রহী। লিটল ম্যাগাজিন একটি বিশেষ ধাঁচের সাহিত্য পত্রিকা, যার বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। সে সব বিষয়ে আলোচনায় না গিয়ে শুধু এটুকু বলা যায় যে, লিটল ম্যাগাজিন পরিবর্তনের, পালাবদলের, নতুনত্বের অঙ্গীকারে ঋদ্ধ। লিটল ম্যাগাজিন হিসেবে প্রয়াত কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেন সম্পাদিত ‘একবিংশ’ সাতাশ বছর অতিক্রান্ত করেছে। একটি লিটল ম্যাগাজিন-এর সাতাশ বছর পূর্তি একটি বিস্ময়কর ব্যাপারই বটে, যখন কাগজ কিংবা ছাপা খরচের কথা আমাদের ভাবতে হয়। লিটল ম্যাগের সাথে অকালমৃত্যৃর একটি সম্পর্ক রয়েছে। আবার অনেক লিটল ম্যাগ অনেককাল টিকেও থাকে। অনেক পত্রিকাই ঢাক-ঢোল পিটিয়ে যাত্রা শুরু করে অকালেই ঝড়ে পড়ে। এই ঝরে পড়ার মধ্যে কোন গ্ল¬¬ানি আছে বলেও আমার মনে হয় না। একটি/দুটি সংখ্যাও যদি শিল্পসাহিত্যের কোনো এক ক্ষেত্রে একটু ঝাঁকি দিয়ে নিভে যায়, তাহলেও তার সেইটুকু প্রাপ্তিকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশই নেই। একথা বলাই বাহুল্য যে, সব পত্রিকাই প্রকৃত সাহিত্যপত্রিকা হয়ে ওঠে না। শিল্পসাহিত্যের মতোই সাহিত্যপত্রিকা বা লিটলম্যাগকে আমরা দুইভাগে ভাগ করতে পারি। সৃষ্টিশীল সাহিত্যপত্রিকার একটি দায়বদ্ধতা থাকে। কিন্তু বাজারী সাহিত্যপত্রিকার তা থাকে না। এখানে বলে নেওয়া ভালো যে, সব সাহিত্যপত্রিকাকে লিটলম্যাগ বলা যাবে না, সব লিটলম্যাগকে সাহিত্যপত্রিকা বলা যাবে। লিটলম্যাগের চরিত্র সাধারণ সাহিত্যপত্রিকার মতো নয়। এ নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক। প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রতিষ্ঠানবিরোধীতার নানা কথা রয়েছে। সে বিষয়ে না গিয়ে আজকে লিটল ম্যাগ হিসেবে ‘একবিংশ’-র দায় ও কৃতির কিছু চিত্র তুলে ধরতে চাই।
বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকা বাংলা কবিতার পালাবদলে যে ভূমিকা রেখেছিল তাকে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখতে হবে আমাদের। বিস্ময়করভাবেই পত্রিকাটি অনেককাল টিকে ছিল এবং বাংলা কবিতার আধুনিকায়নে এর ভূমিকা ছিল অনন্য, তিরিশের প্রধান কবিরা চিহ্নিত ও বিকশিত হয়েছে এই পত্রিকার মাধ্যমে। তবে কোনো পত্রিকার টিকে থাকার ব্যাপারে পেছনের মানুষটির ভূমিকা ও যোগ্যতা বিশেষভাবে কাজ করে। শুধু কবিতা নিয়ে, আধুনিক কবিতা নিয়ে বুদ্ধদেব বসুর ভাবনা ও শ্রম, তার অভিভাবকত্ব কিংবা শিক্ষকতা আমাদের কাছে তাকে বিশেষ মর্যাদায় উন্নীত করেছে। বাংলা আধুনিক কবিতার বিকাশে ‘কবিতা’ পত্রিকাটি ছিল তার সকল স্বপ্নের উৎস। এ বিষয়ে ‘সাহিত্যপত্র’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন :
সাহিত্যের অন্যান্য অঙ্গ থেকে বিছিন্ন করে শুধুমাত্র কবিতার উপর এই জোর দেবার প্রয়োজন ছিলো। নয়তো সেই উঁচু জায়গাটি পাওয়া যেতো না, সেখান থেকে উপেক্ষিতা কাব্যকলা লোকচক্ষের গোচর হতে পারে। ‘কবিতা’ যখন যাত্রা করেছিল, সেই সময়কার সঙ্গে আজকের দিনের তুলনা করলে, একথা মানতেই হয় যে, কবিতা নামক একটি পদার্থের অস্তিত্বের বিষয়ে পাঠকসমাজ অনেক বেশি সচেতন হয়েছেন, সম্পাদকরাও একটু বেশি অবহিত এমনকি সে এতদূর জাতে উঠেছে যে, কবিতার জন্য অর্থ মূল্যও আজকের দিনে কল্পনার অতীত হয়ে নেই।
‘একবিংশ’-র ২৭ বছর টিকে থাকা এবং কবিতা নিয়ে, কবিতার নতুন দিকবলয়ের অনুসন্ধানে, কবিতাকে কবিতা হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এই পত্রিকার মাধ্যমে যে বিচিত্র সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ড সম্পাদিত হয়েছে, তার মূল্যায়ন যথাযথভাবে হওয়া উচিত।
খুব নির্মোহভাবে আমরা অনেকেই সেই ঔদার্যের জায়গাটায় পৌঁছতে পারি না বলেই হয়তো অনেককিছুর সঠিক মূল্যায়নে কার্পণ্য দেখাই। ‘একবিংশ’-র মূল্যায়নেও সেরকম বিষয় মাঝে মাঝে লক্ষ করা গেছে এবং তা কোনো শুভত্বের লক্ষণ নয়। খোন্দকার আশরাফ হোসেনকে আমার কখনো কখনো মনে হয়েছে এক নিঃসঙ্গ কর্ণধার, যিনি অনেকটা একাকীই তার ‘একবিংশ’ নামের তরণীটি বেয়ে চলেছেন বিষম স্রোতধারায়। সাতাশ বছর ধরেই চলেছেন। মাঝে মাঝে থেমে গেলেও একবারে থেমে যান নি। অনেকেই এসেছে এই তরণীর যাত্রী হয়ে। চলেও গেছেন। অনেক নতুন নতুন যাত্রীর কোলাহলে কখনো কখনো নতুন ও পুরানোর মিশ্রণে তার চলার গতি থেকেছে স্বচ্ছন্দ।
লিটলম্যাগই মূলত সৃষ্টিশীল শিল্প সাহিত্যের জায়গা। ১৯৮৫ সালের নভেম্বরে প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হবার পর যে আলোরেখায় তার সমূহ অবয়ব আচ্ছন্ন ছিল তাতে বুঝতে কোনো অসুবিধা হয়নি যে, এটি বাংলা কবিতার পালাবদলের অঙ্গীকার নিয়ে আবির্ভূত। আমরা আগেই বলেছি কোন লিটলম্যাগ কিংবা সাহিত্যপত্রিকার সৌন্দর্য-সৌকর্য কিংবা সৃষ্টিশীলতার কিংবা বেঁচে থাকার বিষয়টি অনেকখানি নির্ভর করে সেই পত্রিকাটির পেছনের মানুষটির ওপর, যিনি সেই পত্রিকার সম্পাদক। খোন্দকার আশরাফ হোসেন ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক এবং আশির দশকের একজন উল্লে¬¬খযোগ্য কবি হিসেবে যে দায়িত্ব নিয়ে ‘একবিংশ’ বের করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন সেটি ছিল কবিতাকে প্রকৃত কবিতা করে তোলার অঙ্গীকার।
সত্তরের দশকের কবিদের কবিতা যে তরলীকৃত শদ্বাচার, দ্রোহ, অকাব্যিক ন্যারেটিভ কিংবা সস্তা বাকবিন্যাসের স্রোতধারায় আচ্ছন্ন ছিল, সেটি বাংলা কবিতার জন্যে মোটেই শুভকর কোনো বিষয় ছিল না। জনপ্রিয় কবিদের একটা সময় গেছে তখন। তবে একথা মানতেই হয় যে, সেই জনপ্রিয় কবিদের মধ্যে অনেকেই আছেন যাদের কবিতাকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। আশির দশকে বাংলা কবিতার একটি পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। এ সময়ে খোন্দকার আশরাফ হোসেনের উপলব্ধিতে আসে কবিতাচর্চায় শুভত্বের, সৃষ্টিশীলতার বিষয়টি। নিজে একজন সৎ কবি হিসাবে যে দায়িত্ব তিনি ‘একবিংশ’-র মাধ্যমে নিয়েছিলেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চালিয়ে গেছেন নিরলসভাবে কিংবা নির্ভীক ঔদার্যেÑ সে-বিষয়ে যে যা-ই ভাবুক না কেন, তার এই নিরন্তর প্রকাশনা এবং কবিতার নানা দিক নিয়ে, সাহিত্যতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা এবং বিশেষভাবে তরুণ কিংবা উদীয়মান প্রতিশ্র“তিশীল কবিদের তুলে ধরার বিষয়গুলো আলাদাভাবে দেখতে হবে। এটি একটি দুরূহ কাজই বটে।
‘একবিংশ’ অনেক কবির জন্ম দিয়েছে। অনেক কবিই ‘একবিংশে’র মাধ্যমে পরিচিতি পেয়েছেন, তাদের অনেকেই হয়তো আজ আর লিখছেন না, কিংবা দূরে সরে গেছেন, কিন্তু ‘একবিংশ’-র পালে হাওয়া লাগা থেমে যায়নি। নবীন-প্রবীণের সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ডে ‘একবিংশ’ প্রতিটি প্রকাশনায় আলাদাভাবে আবির্ভূত হয়েছে। আর এসব আলাদা কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ‘একবিংশ’ তৈরি করেছে রুচিশীল পাঠক। ‘একবিংশ’-র প্রথম সংখ্যায় সম্পাদক লিখেছিলেন ‘… ভবিষ্যবাদী নামকরণের মধ্যে উপর্যুক্ত বোধটি কাজ করলেও স্বীকার করতে হবে, দৈশিক কবিতার হতাশাপূর্ণ বর্তমানই পত্রিকা প্রকাশের পেছনে মূল নিয়ামক ছিল। মনকে চোখ ঠেরে লাভ নেই; বাংলা কবিতার এখন প্রখর দুঃসময়। প্রতিভাদীপ্ত ঘোরসওয়ারগণ বহু আগে নিস্ক্রান্ত; সুখী-জীবন-বুদ্ধের তিরিশি ত্র্যহস্পর্শ থেকে জেগে উঠলো না আর বাংলা কবিতা। কেউ কেউ বলেন, বাংলা কবিতার অনৈসর্গিক মৃত্যু ঘটেছিল কলকাতার ট্রামলাইনের উপর। অন্যরা, তুলনায় আশাবাদী, ঐ মৃত্যুর দিনক্ষণ সামনে ঠেলে কোনোক্রমে পঞ্চাশ দশক পার করে দেন। সে যাই হোক, বাংলার কাব্য ক্ষেত্রটি বহুদিন প্রতিভারিক্ত আধিয়াদের দ্বারা অপকর্ষিত হচ্ছে। অন্তর্গত শ্রীহীনতাকে ঢেকে রাখছে রাজনীতির শিল্পবোধহীন চিৎকার। আমরা একটি হট্টোগোলের হাটে আছি। আত্মকণ্ডূয়নের অসম্ভব যোগাভ্যাস, বামনাবতারদের কলহ, দলবাজি এবং স্বৈরাচারে অবরুদ্ধ প্রাণের স্ফূর্তি আবেগের আন্দোলন। …‘একবিংশ’র প্রকাশ অপক্ষমতা ও স্বৈরাচারের শালীন জবাব; দেয়াল দ্বারা পথ বন্ধ দেখে তা ডিঙিয়ে যাবার স্পর্ধিত উল্লম্ফন বলুন আর প্রতিক্রমণ বলুন, ‘একবিংশ’র অভীপ্সা তা-ই। ‘একবিংশ’ কেবল নতুন প্রজন্মের কবি-লেখকদের জন্য নির্দিষ্ট। যারা অপ্রতিষ্ঠিত, যৌবনাবেগ টলমল, প্রতিভাবান, উদার, অভিনিবিষ্ট, শ্রমী এবং নির্ভয়, আমরা তাদের জন্য পাটাতন নির্মাণ করতে চাই…।’
তরুণদের জন্য একটি মুখপত্রের অনুভব থেকে তিনি ‘একবিংশ’ বের করেছিলেন এবং সুস্থ্যধারার কবিতাচর্চার একটি পথ তৈরিতে নিজেকে অন্বিষ্ট রেখেছিলেন এই পত্রিকার প্রকাশনার সাথে বলতে গেলে দীর্ঘকালই। বাংলা কবিতার একটি বিশেষ সময়ের ব্যূহ থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে ‘একবিংশ’-র ভূমিকাকে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখতে হবে।
‘একবিংশ’ শুধু বাংলাদেশের লেখকদের নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেনি, ওপার বাংলার অনেক লেখকদেরও লেখা ছেপেছে। আমরা অনেকেই আগে আসাম কিংবা ত্রিপুরার বাংলা ভাষাভাষীদের লেখার সাথে পরিচিত ছিলাম না। ঐ অঞ্চলের লেখকরা এমনকি পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের কাছেও অবহেলিত, উপেক্ষিত ছিল। ‘একবিংশ’ই প্রথম আসাম-ত্রিপুরার কবিদের কবিতা ছাপিয়ে এবং ঐ অঞ্চলের পণ্ডিতদের তথ্যসমৃদ্ধ লেখা প্রকাশ করে তাদের বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে এসেছে। বরাক উপত্যকার বাংলা ভাষাভাষীদের সাহিত্যচর্চার বিষয়টি আমাদের নতুন ভাবনার ক্ষেত্রকে আরো বিস্তৃত করেছে বলে আমার বিশ্বাস। ঐ অঞ্চলে একদা যে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল এবং এগারটি তাজা প্রাণ যে আত্মাহুতি দিয়েছিল, সে খবর আমরা একবিংশ-র মাধ্যমে আরো ব্যাপকভাবে জানতে পারি। আসামের কাছাড় জেলায় ১৯৬১ সালের ১৯ মে সংঘটিত ঘটনাটি তাই বাঙালির দ্বিতীয় ভাষা আন্দোলন হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। ‘একবিংশ’ এক্ষেত্রে যে দায়িত্বটি পালন করেছে, বাংলাদেশে প্রকাশিত আর কোনো লিটল ম্যাগাজিন সেটা করেছে বলে আমার জানা নেই। ‘বরাক উপত্যকার কবিতা : অতন্দ্র গোষ্ঠী’ নামক প্রবন্ধের গোড়াতেই তপোধীর ভট্টাচার্য বরাক উপত্যকাবাসী বাঙালির দুর্নিবার নিয়তিকে তুলে ধরেছেন :
বাঙালির উত্তাপবলয় থেকে সুদূরতম প্রান্তে বরাক উপত্যকার বঙ্গভাষীজনেরা যতটা তিনদিক ঘেরা পাহাড়ের পাহারায় বন্দী, তার চেয়ে ঢের বেশি নিমজ্জিত তারা স্বখাত সলিলে। মমতাবিহীন কালস্রোতে নির্বাসিত শ্রীভূমির কথা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, ঐ ভূমি থেকে উৎখাত হওয়ার পরে ছিন্নমূল মানুষের স্বাভাবিক নিরাপত্তাহীনতা ও তজ্জনিত হীনন্মন্যতা হয়ে উঠলো বরাক উপত্যকাবাসী বাঙালির দুর্নিবার নিয়তি। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য এগারটি প্রাণ আহুতি দিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারলেন না। এরা আরম্ভ জানেন কিন্তু সমাপ্তিটা জানেন না। উনিশ-এ মে তাই চৌত্রিশ বছর পরে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অজ্ঞাতপরিচয়, আর তেতাল্লি¬¬শ বছর আগের একুশে ফেব্র“য়ারি প্রতিবেশী সমভাষীদের মধ্যে আজো জ্বলন্ত অগ্নিবলয়। (একবিংশ, দশবছরপূর্তিসংখ্যা, নভেম্বর ১৯৯৬)।
বাংলা সাহিত্যের রথি-মহারথিদের নিয়ে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে ‘একবিংশ’ একদিকে তাদের যেমন সম্মানিত করেছে, তেমনি তাদেরকে নতুনভাবে মূল্যায়নেরও ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে। তত্ত্ববিশ্বের নানা দিক ঠাঁই পেয়েছে ‘একবিংশ’-র বহুতল বুকে এবং এক্ষেত্রে এদেশের পণ্ডিতদের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ কিংবা আসাম ত্রিপুরার প্রাজ্ঞজনরোও লিখেছেন ব্যাপক পরিসরে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, তপোধীর ভট্টাচার্য, অঞ্জন সেন, খোন্দকার আশরাফ হোসেন, আফজালুল বাসার, মঈন চৌধুরী প্রমুখের লেখার মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে তত্ত্ববিশ্বের নানা কথা। রোমান্টিক কবিতা ও রোমান্টিক আন্দোলন, উত্তর আধুনিকতা কিংবা আধুনিকবাদ নিয়ে সম্পাদক নিজে লিখেছেন বিস্তৃত তথ্যসমৃদ্ধ দীর্ঘ প্রবন্ধ। এছাড়াও ইউরোপ-আমেরিকা-ল্যাটিন আমেরিক আফ্রিকার কবিদের কবিতার অনুবাদ ও আলোচনা পাঠককে দিয়েছে আলাদা তৃপ্তি। সব মিলিয়ে ‘একবিংশ’ তার রন্ধনশালার ঔদার্যে রসনাতৃপ্তির নব নব আয়োজন পাঠককুলকে যে পুষ্টিতে সমৃদ্ধ করেছে, সেই বিষয়টি আমাদের অনুভবের জগতে একধরনের আনন্দের সঞ্চার করে। এই আনন্দই শিল্পের নিভৃত সত্যকে জীবনের চারপাশে দাঁড়াতে সাহায্য করে। ‘একবিংশ’র সফলতা এইখানে, এই আলোকিত অবগুন্ঠনে, এই বিভাসিত বিনম্র গুঞ্জনে, সমূহ সূর্যালোকে স্নাত এই শ্রেয়োবোধে।
১৯৯০ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে প্রকাশিত ‘একবিংশ’-র ক্রোড়পত্র ধারণ করে আশির দশকের কবিদের কবিতা। ঐ ক্রোড়পত্রটি সম্পাদনা করেছিলেন সৈয়দ তারিক। ক্রোড়পত্রের শিরোনাম ছিল ‘অনিরুদ্ধ আশি : এক দশকের কবিতা’। ঐ ক্রোড়পত্রে ২৪ জন কবির প্রায় সকলেরই একাধিক কবিতা স্থান পেয়েছিল। এই কবিদের মধ্যে খোন্দকার আশরাফ হোসেন, রেজাউদ্দিন স্টালিন, মোহাম্মদ সাদিক, সরকার মাসুদ, শান্তনু চৌধুরী, মারুফ রায়হান, সুহিতা সুলতানা, মাসুদ খান সক্রিয় থাকলেও বাকিরা বেশ ম্রিয়মান এবং কেউ কেউ একেবারেই নিঃশব্দ। আশির দশকের কিছু সংখ্যক কবির কবিতায় পালাবদলের ঈঙ্গিত ছিল এবং পরবর্তীতে আশি ও নব্বইয়ের দশকের বেশ কিছু কবির কবিতায় জীবনানন্দ-উত্তর নতুন কবিতাচর্চার যে প্রণোদনা দেখা গেল তা আজকে নানাভাবে বিস্তৃত ও বিকশিত হয়েছে। আমরা আবারো বলতে চাই, বাংলা কবিতার পালাবদলে কিংবা সুস্থ ধারার কবিতাচর্চার ক্ষেত্রে ‘একবিংশ’-র ভূমিকাকে আলাদাভাবে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
১৯৮৫ সালের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত ‘একবিংশ’-র প্রথম সংখ্যাটি শুরু হয়েছিল সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রবন্ধ দিয়ে। ঐ সংখ্যায় সাজ্জাদ শরীফ এবং সৈয়দ তারিকেরও প্রবন্ধ ছিল। খোন্দকার আশরাফ হোসেন, ইকবাল আজিজ এবং রেজাউদ্দিন স্টালিনের ছিল দীর্ঘকবিতা। শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন যথাক্রমে সৈয়দ তারিক, আহমদ মাযহার এবং আব্দুল্লাহ সাদী। ‘একবিংশ’-র ২৪তম সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে ২০০৯-এর ফেব্র“য়ারীতে। এই সংখ্যাটি নানা দিক থেকেই গুরুত্বের দাবিদার। সম্পাদকের ভাষায় ‘একবিংশ’-র বর্তমান সংখ্যাটির মূল প্রক্ষেপণ আধুনিকবাদ ও বুদ্ধদেব বসুর ওপর। আধুনিকবাদ নিয়ে দীর্ঘ প্রবন্ধে খোন্দকার আশরাফ হোসেন স্পষ্ট করেছেন আধুনিকবাদী নানা আন্দোলন ও সেই কালখণ্ডের সামূহিক বিষয়কে। আলোচনার সাথে বেশ কিছু আধুনিক ফরাসি কবির কবিতার অনুবাদ পাঠকের কাছে বাড়তি পাওনা হিসেবে মনে হয়েছে। বুদ্ধদেব বসুর জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে তাকে নিয়ে রয়েছে ১১টি সুখপাঠ্য প্রবন্ধ। এই সংখ্যার সম্পাদকীয়-র বেশির অংশ জুড়েই রয়েছে আসামের কবি, প্রাবন্ধিক, সাহিত্যতত্ত্ববিদ তপোধীর ভট্টাচার্যকে নিয়ে আলোচনা, যাঁকে তিনি বলেছেন ‘তপস্যায় ধীর এক আচার্য’। এছাড়াও এ সংখ্যায় শূন্যের দশকের উল্লে¬খযোগ্য কয়েকজন কবির কবিতা মুদ্রিত হয়েছে। ২০১৩ সালের ফেব্র“য়ারিতে প্রকাশিত হয় ‘একবিংশ’-র ২৭ তম সংখ্যা। এই সংখ্যার পরে ‘একবিংশ’ হয়তো আর কবিতা ও নন্দনভাবনার কাগজ হিসেবে বেরুবে না, সেটি ধরেই নেওয়া যায়। এই শেষ সংখ্যাটি শুরু হয়েছে হাসান আজিজুল হকের ‘ভাষা, দর্শন, মানবজীবন’ নামক প্রবন্ধ দিয়ে। এই সংখ্যায় খোন্দকার আশরাফ হোসেনের যে প্রবন্ধটি রয়েছে তার নাম ‘কবিতার রাহসিকতা এবং আকবর আলি খানের বনলতা সেন’। তাঁর ব্যবহৃত এই ‘রাহসিকতা’ শব্দটি তাঁর আগে কেউ লিখেছেন বলে আমার জানা নেই। তাঁর অনেক প্রবন্ধ এবং কবিতার মধ্যে এমন সব শব্দের খোঁজ পাওয়া যায় যা তাঁর আগে কেউ ব্যবহার করে নি।
‘একবিংশ’-র কৃতি তার অসংখ্য সাহিত্যপ্রেমী পাঠক, যারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকে পত্রিকাটির পরবর্তী সংখ্যার জন্য। ২০১৩ সালের ১৬ জুন সেই অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। তথাপি প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সম্পাদক কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেন কালের দুয়ারে একটি সম্মানের আসন নিয়েই বেঁচে থাকবেন বলে আমার বিশ্বাস। পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং অবহেলা-অবমূল্যায়নের এক অনিদ্র দ্রোহ তার ভেতরে সদা জাগ্রত ছিল। স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি আরো নিঃসঙ্গ হয়ে যান। কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে যোগদানের পর তিনি ফেসবুকে লিখেছিলেনÑআপটার জইনিং আই কেম ব্যাক ফ্রম ত্রিশাল। মৃত্যুর দুই সপ্তাহ আগে জুনের ১ তারিখ রাতে তার সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয় এবং আমি হঠাৎ করে বলে ফেলি- ভাবীর মৃত্যুর বিষয়টি আমার জানা ছিল না। তিনি মৃত্যুর তারিখটি বললেন এবং কেঁদে ফেললেন, আমি কিছুটা বিব্র্রত হয়ে ‘ভালো থাকবেন স্যার’ বলে বিদায় নিলাম। রাষ্ট্রও তার বৈরি আচরণে কখনো কখনো মানুষকে নিঃসঙ্গ, একা করে দেয়। সম্মিলিত নৈঃসঙ্গ্যের মধ্যে বেঁচে থাকা বড়ই দুরূহ। তখন ছুটে যেতে ইচ্ছে করে জন্মভিটায়, মায়ের আঁচলের নিচে। তিনি ঝিনাই নদীর জল হাঁটুতে কাপড় তুলে পার হয়ে বাড়ি ফিরতে চানÑ তিনি বাড়ি ফিরেছেন, ফিরেছেন স্নেহময়ীী মায়ের কাছে :
ঝিনাই নদীর জল হাঁটুতে কাপড় তুলে পার হবো,
মধ্যরাতে ডাক দেবো
মা মাগো এসেছি আমি! সেই কবে গভীর নিশিথে
তোমার নিমাইপুত্র ঘর ছেড়েছিল,আজ কাশী বৃন্দাবন
তুলোধুনো করে ফের তোর দীর্ণ চৌকাঠে এসেছি।
Ñবাড়ি যাবো: খোন্দকার আশরাফ হোসেন

ফারুক সিদ্দিকীর সঙ্গে

ফারুক সিদ্দিকীর সঙ্গে

একদিন, অনেকদিন আগে আমরা গিয়েছিলাম পুণ্ড্রনগরে, ফারুক সিদ্দিকীর বাসায়। ‘বিপ্রতীক’ সম্পাদক ফারুক সিদ্দিকী লিটল ম্যাগাজিনের অন্যতম প্রবাদপুরুষ। তখন ‘বিপ্রতীক’ তাঁর ৩৭ বছরের লালিত সন্তান। কথা বলেছিলাম সাহিত্য ও সমকালের বিভিন্ন বিষয়-আশয় নিয়ে। আড্ডামুখর এ কথোপকথনে হয়তো আরো অনেক বিষয় আমরা তাঁর কাছে জানতে পারতাম। যেটুকু সম্ভব হয় নিÑতার সব অক্ষমতা, ব্যর্থতা আমাদের। তারপরও যা কিছু জানতে পেরেছিলাম–তা-ই পত্রস্থ হয়েছিল ‘চিহ্ন’র ১৮-তম প্রকাশে। গত ২৩ এপ্রিল ২০১৪তে এই সাহিত্যশিল্পী-সম্পাদক আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সেই সাক্ষাৎকারটির উল্লেখযোগ্য অংশ এখানে পুনঃপত্রস্থ হল।

কবিতা কী কেন কীভাবে
মুখোমুখি ফারুক সিদ্দিকী ও চিহ্ন
চিহ্ন : আপনি বললেন আধুনিকতা গল্প ও উপন্যাসে একরকম হচ্ছে, কিন্তু কবিতায় সেরকম হচ্ছে না, আলাদা একটা কাঠামোয় তৈরি হচ্ছে। তাহলে কবিতার কাঠামোটা কেমন হওয়া উচিত?
ফারুক সিদ্দিকী : অবশ্যই আলাদা কাঠামো হতে হবে। তার মানে কবিতার একটা আঙ্গিক আছে, একটা ছন্দ আছে, একটা বৈশিষ্ট্য আছে, কিন্তু গল্পের তো এরকম নেই। যতদূর মনে হয় ‘ছাদ’ থেকে ‘ছন্দ’ শব্দটা এসেছে; অর্থাৎ আপনি ঘর করলেন, ছাদ নাই, বৃষ্টিতো পড়বেই। গল্প সচরাচর এক ধরনের উপকথা, কবিতা সেক্ষেত্রে মননক্রিয়া।
চিহ্ন : আপনি বলতে চাচ্ছেন কবিতারও একটা সীমা আছে…
ফারুক সিদ্দিকী : অবশ্যই, তার একটা সীমা আছে, অর্থাৎ শব্দের ভেতরেই তার একটা ব্যাপার আছে। মালার্মে সেই কথাই তো বলেছেনজ্জ‘কবিতা শব্দ দিয়েই লেখা হয়’। এবং দেরিদার প্রিয় কবি মালার্মে। খুব বেশি কবিতা বোধ হয় লেখেন নি মালার্মে। ৬০টির(!) মতো হতে পারে। poetry is written with words, not idea  একথা মালার্মে বলেন। থেমে যাওয়া গুণটি কবির থাকতে হবে; গদ্য কবিতায় বেশি প্রয়োজন।
চিহ্ন : কবিতা যদি শব্দের কারুকাজ হয়, তো অনেক সময় কি মনে হয় না এটা artificial হয়ে গেল? কারণ শব্দ বসিয়ে বসিয়ে আমরা যদি কবিতা লিখি, তাহলে নির্মাণের মতো একটা ব্যাপার হয়ে যায় না! অর্থাৎ শব্দই যদি হয় মূল, তাহলে আরোপিত ব্যাপারটা চলে আসে না; মনে হয় একটা structure-এর মধ্যে ফেলে সেখানে কিছু কিছু শব্দ বসিয়ে দেয়ালের মতো একটা কাঠামো তৈরি করা?
ফারুক সিদ্দিকী : ধৎঃরভরপরধষ হবে কেন, আরোপিত আপনি করতে যাবেন কেন! এখন যেন সহজলভ্য একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে যে আমরা সবাই কবিতা লিখতে পারি। শব্দ নিয়ে যে আমি কথা বললাম, সেটা লৌকিক। কবিতায় শব্দতো ব্রহ্ম, ড়িৎফ রং ষড়মড়ং; কিন্তু কেবল শব্দেরও কোনো ব্যাপার নয় এটা। আমরাও কবিতা লিখতে পারিজ্জ প্রতিভার কোনো দরকার নেই জীবন-উপলব্ধির কোনো ব্যাপার নেই, লিখে গেলাম; কিন্তু স্বভাবকবি না হলে জীবন-উপলব্ধি না থাকলে সে-কবিতা বেশি দিন টেকে না, সে-কবি বেশিদিন লিখেতেও পারে না। কবিতা স্বসমুখ কোনো বিষয় নয়।
চিহ্ন : অর্থাৎ নেমে আসার ব্যাপারটা কবির মধ্যে থাকে এবং থাকা উচিত।
ফারুক চৌধুরী : নেমে আসার ব্যাপার বলে আমি মনে করি না। এখন কবিতার ভেতরে অকবিতার ভিড়টা খুব বেশি, এত বেশি যে যাচাই করা খুব মুশকিল। আমি যে কবিতার আহ্বান করি বিপ্রতীকর জন্যে, আমাকে এ পর্যন্ত দুএকজন ব্যতীত কেউ ছন্দে কবিতা দেয় নি।
চিহ্ন : আচ্ছা ছন্দে কবিতা না লেখার ব্যাপারে তারা কি কিছু বলে বা ব্যাখ্যা দিয়েছে?
ফারুক সিদ্দিকী : কোনো কথাই বলে না, এবং কবিতা পাঠানোর সময় সঙ্গে কোনো চিঠি দেয় না। ফরমায়েশি ক্ষেত্রে এ ধরনের কাজ হয়ে থাকে, সধফব ঃড় ড়ৎফবৎ, ফলে সাধারণ কবিতায় যে গুণটি থাকা উচিত সেই সম্মোহনী শক্তিটুকু হারায়।
চিহ্ন : তারা কি ছন্দ জানেন না নাকি ছন্দ ধাড়রফ করেন?
ফারুক সিদ্দিকী : এখন এ-সম্পর্কে আমিতো কিছু বলতে পারবো না তারা জানে কী-না। তবে আমি একটা কথা মনে করি: পরিশ্রম আছে, ছন্দ অলস কবিকে পরিশ্রান্ত করে, অসম্ভব পরিশ্রান্ত করে। স্মর্তব্য একটি ভাব সব ছন্দে আসবে না, বিশেষ ছন্দেই আসে।
চিহ্ন : কিন্তু ছন্দে কি সীমাবদ্ধতা নেই, যেমন কবিতা লিখতে গিয়ে একটা জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছি, অথচ ছন্দের খাতিরে শব্দগুলিকে পাল্টিয়ে ফেলতে হচ্ছে?
ফারুক সিদ্দিকী : সীমাবদ্ধতা এখানে বলা যাবে না, বলা যায় আমার বাঞ্ছিত ব্যাপারটা এখানে পাচ্ছি না। এখন সীমাবদ্ধতা যদি আপনি বলেন, তাহলে আমি বলব আপনার চিন্তাধারার মধ্যেও সীমাবদ্ধতা আছে বলেই আপনি জিনিসটা প্রকাশ করতে পারছেন না। অবশ্য ছন্দে অনেক সময় বক্তব্য বাদ যায়, এক্ষেত্রে জয়ী হওয়াই কবির প্রধান কাজ। কেননা কবিতা সবচেয়ে দুরূহ শিল্পকর্ম।
চিহ্ন : তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন ছন্দটাই সধরহ, কিন্তু দেখা যাচ্ছে আমি একটা কথা যেভাবে বলতে চাচ্ছি ছন্দের জন্য ঠিক সেভাবে বলতে পারছি না, অর্থাৎ ছন্দের জন্য একটা শব্দ আমি একভাবে বসাতে গিয়ে সেভাবে বসাতে পারছি না, বিকল্প-শব্দ খুঁজতে হচ্ছে, বলার মধ্যে সেই ংঢ়রৎরঃ-টা আর থাকছে না।
ফারুক সিদ্দিকী : শব্দ কখনোই আপনাকে ঢ়বৎসরংংরড়হ দেবে না যে এই শব্দই এখানে থাকল আর তুমি কোনো শব্দ নিও না; শব্দ আপনার মনের ভিতর গিয়ে ভরমযঃ করে, তার মানে এক-শব্দ বলে তুমি এ-শব্দ সরাও আমাকে নাওজ্জএগুলি শব্দেরই গুণগত ব্যাপার। তবে কিছু কিছু কবিতায় ছন্দ করতে গিয়ে শুধু ছন্দই হয়েছে কবিতা হয় নি, সেটা কবির ব্যর্থতা। নজরুল ইসলামের একটা গান আছে, ‘ভুলি কেমনে’, প্রেমের খ্যাত গান, আমি অন্য কেনো জায়গায় এমন চমৎকার কবিতা পড়ি নি, আশ্চর্য রকমেরজ্জদুই লাইন পরে মাত্রাবৃত্ত, তারপরের লাইন স্বরবৃত্ত, তারপরের লাইন মাত্রাবৃত্ত, তারপরের লাইন স্বরবৃত্ত, তারপরের লাইন মাত্রাবৃত্ত, তারপরের লাইন স্বরবৃত্ত। তো কেমন করে এটা হলো? আপনারা এখন কিন্তু বলবেন এটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে হয়েছে, অথচ আমিতো কোথাও এমন কবিতা পড়ি নি; আসলে এটা পৎবধঃরারঃু-এর ব্যাপার, লোকটি সৃষ্টিশীল ছিলেন বলেই এরকম কাজ করতে পেরেছেন। সম্ভবত নজরুল ইসলাম এরকম কবিতা একটিই লিখেছিলেন। শুধু ছন্দ দিয়েই সার্থক কবিতা হয় না; কিন্তু একটি সার্থক কবিতার অবশেষ দেহাবরণটুকু ছন্দ। ছন্দ বাদ যাবে না তখন।
চিহ্ন : এবার এ-প্রসঙ্গে আরেকটা কথা বলি : আচ্ছা, শব্দতো চেতনার আক্ষরিক রূপ।
ফারুক সিদ্দিকী : চেতনার আক্ষরিক রূপ নয় শুধু। চেতনার অনুসন্ধেয় উপক্রম, দহন ও ক্ষরণ থেকে উৎসারিত সেটিই হবে প্রার্থিত কবিতার শব্দ, কেবল শব্দ নয়, মালার্মের শব্দবোধ করি দহন ও ক্ষরণজাত এক ধরনের উজ্জ্বলতা, একাধারে সঙ্গীতাশ্রয়ীও। সঙ্গীতাশ্রয়ী বলেই যথাশব্দ হয় নি রবি ঠাকুরের ‘দ্বিরেফ’ শব্দটি এবং নবগোপালবাবুও সম্মতি দেন নি কিন্তু কবিগুরুও শব্দটি প্রত্যাখ্যান করেন নি। দ্বিরেফ অর্থ ভ্রমর, ছন্দে কথায় দুটির মিল আছে।
চিহ্ন : তা যদি না হয় তবে শব্দে এত কারুকাজ কেন, কারুকাজের প্রয়োজন কীসের জন্য? আমাদের চেতনার যে-নিঃসরণ সেটাইতো কবিতা; তাহলে শব্দ ছাড়া আমরা কবিতাকে কীভাবে বুঝব? আপনি যে স্বীকার করলেন কবিতার জন্য শব্দই মুখ্য, তাহলে কি চেতনার অক্ষরিক বা সাঙ্কেতিক রূপ/চিহ্নই কবিতা নয়? তবে এর সঙ্গে ধ্বনির একটা যোগসূত্র থাকবে। কারণ চেতনাটা হচ্ছে নদীর ¯্রােতের মতো; যে-নদীতে বাতাস লাগে না সে-নদীর ¯্রােত অন্তঃশীল, যখনই বাতাস লাগে তখনই ঢেউ জাগে, আর ঢেউই কিন্তু ¯্রােতের
অস্তিত্বকে প্রকাশ করে প্রমাণ করে। তো ঢেউটা হচ্ছে ধ্বনি, আর বাতাসটা হচ্ছে পরিবেশগত ও সময়গত বাস্তবতা, এবং এই বাস্তবতা অনুসারে ঢেউটা সৃষ্টি হয়, তার মানে বাতাস যেমন হবে ঢেউও তে¤িœ হবে। কিন্তু ঢেউ কখনোই ¯্রােতের অস্তিত্বকে বিলুপ্ত করতে পারে না, বাতাস নিজের প্রয়োজনে ¯্রােতের কাছে যায়, কিন্তু বাতাসের ছোঁয়ায় অন্তর্গত-অস্তিত্বকে প্রকাশ করবার জন্য ¯্রােত মুখিয়ে থাকে ব্যাকুল হয়ে। তো বলতে চাচ্ছি, চেতনার ভাবগত রূপ হচ্ছে ধ্বনি, আর ধ্বনির আঙ্গিক রূপ হচ্ছে শব্দ; অর্থাৎ যে-অর্থকে কেন্দ্র করে ধ্বনির সৃষ্টি সেই অর্থই জানিয়ে দেবে কোন শব্দটা বসানো সঠিক হবে এবং কোন শব্দটা কোথায় বসবেজ্জযতক্ষণ পর্যন্ত এরকম ব্যাপার না-ঘটবে ততক্ষণ পর্যন্ত কবিতা সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব। তবে প্রথম/সকল কবিতাতেই যে সকলের এরূপ স্বতঃসত সামঞ্জস্য ঘটে থাকে তা নয়, যাদের ঘটে তারাতো জীবন্ত-ঈশ্বর; ধীরে ধীরে সময় নিয়ে পরমের দিকে এগুনোই স্বাভাবিক, তাতে করে কবি যে অপার্থিব নন মানুষ তা যুক্তিগ্রাহ্য বা প্রমাণিত হয়। পরমের দেখা পাওয়া যাবে কী-না বা অতদূর যাওয়া যাবে কী-না, সে-প্রশ্নতো বৈষ্ণবকবি সুফিসাধক বাউল কবিদের, চণ্ডীদাস লালন রবীন্দ্রনাথ শ্রী অরবিন্দর, বিশেষত এখনকার কবিদের নয়; তবে যাত্রা করতে হবে বৈকি, কিন্তু সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে নয়, শুধু পথের কর্তব্য পালন করলেই পথের শেষের কর্তব্যও পালিত হবে। তার পূর্বে অভিজ্ঞতাটা প্রয়োজন; বাহ্যবস্তু সম্পর্কে তার আকার সম্পর্কে অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে, কেননা এগুলির আনুপাতিকহারে চেতনা থেকে ধ্বনির সৃষ্টি হয় এবং ধ্বনি থেকে শব্দ চলে আসে। অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য দরকার অনুশীলন, সেটা পুঁথিগত বা বস্তুগত বা দৃশ্যগত যেভাবেই হোক-না কেন, তবে সামন্বিয়ক হলে পড়ে দ্রুত পূর্ণাঙ্গতার দিকে এগুনো যায়; এবং এই অনুশীলনই রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডারকে শব্দপুঁজিতে ভরে তুলতে পারে, যেখান থেকে পৃথক পৃথক ব্যক্তি/উপলব্ধি/চাহিদা ও গভীরতা অনুপাতে শব্দ বণ্টিত হবে ধঁঃড়সধঃরপধষষু; আর যদি শব্দপুঁজি না থাকে তাহলে প্রথমত সাধারণ/তরল শব্দ ব্যবহার করতে হয় অথবা শব্দ খুঁজে খুঁজে বসাতে হয়, তখন আর চেতনার অনিবার্য প্রকাশ বা অদম্য তাড়নাপীড়নের গাম্ভীর্য থাকে না। আরেকটা কথা, যেহেতু পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যে-কোনো বস্তুর গুণ-ভাব-অর্থ-বৈশিষ্ট্য মস্তিষ্কে প্রেরিত হয়, এবং খুব দ্রুত প্রেরিত-বস্তুর প্রতিক্রিয়া মস্তিষ্ক কোষের উর্বরতা অনুপাতে সম্পন্ন হয়, আমরা তখন অনুভব করতে পারি; আর অনুভবের সামষ্টিক ক্ষেত্রটাই হচ্ছে মন/সরহফ. যদিও পঞ্চেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে বস্তুর চরিত্রগুণ মস্তিষ্কে পৌঁছায় কিন্তু মস্তিষ্কের ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কোষের উর্বরতার সংখ্যানুপাতে প্রত্যেক ইন্দ্রিয় কার্যকরী থাকে, গণিতের ভাষায় ঢ়ৎড়ঢ়ড়ৎঃরড়হধষষ, এবং কার্যক্ষম অবস্থান থেকে প্রত্যেক ইন্দ্রিয় আলাদা আলাদাভাবে সধংংধমব পাঠায় মস্তিষ্ক-নিঃসরিত হরমোনের চরিত্রের উপর, হরমোনের চরিত্র ও মস্তিষ্ককোষের বৈশিষ্ট্য পরিচালিত হয় মনের র‌্যাঙ্ক ও সে-স্তরের কাঠামো অনুযায়ী; কিন্তু মস্তিষ্ক-কোষের সংখ্যা নির্ভরশীল জিনগত প্রকৃতিগত পরিবেশগত বাস্তবতার উপর। পূর্বেই বলেছি মন হচ্ছে সামষ্টিক ক্ষেত্র, অর্থাৎ চেতনার বসতবাড়ি।
ফারুক সিদ্দিকী : তাহলে আপনি বলছেন শব্দকে হতে হবে ধ্বনিময়? কিন্তু পুরোনো শব্দের নতুন ব্যবহারওতো হতে পারে, সেটাও কিন্তু একটা কারুকাজ। যেমন একটা উদাহরণ দিই, অত্যাধিক পুরোনো শব্দ, কিন্তু তার নতুন ব্যবহারজ্জ‘নৃত্যরতা রমণীর দেহের চিৎকার’জ্জখুব সুন্দরভাবে নৃত্যরতা রমণীর দেহের সঙ্গে ‘চিৎকার’ শব্দটা সম্পর্কিত হয়েছে, বোঝা যায় মেয়েটি কীভাবে নাচে; তাই এই শব্দ পুরোনো কিন্তু নতুন ব্যবহার। অনেক পুরোনো শব্দেরই ব্যবহার আপনাকে করতে হবে, সেটা প্রথমত জানতে হবে এবং বুঝতে হবে। অর্থাৎ মন বা চেতনার বসতবাড়ি হলে কবিতা সমুদ্ভাসিত হবে, তা নয়, সেক্ষেত্রে কাব্যদৃষ্টিও প্রয়োজন। শুধু শব্দ নয়, পুরোনো শব্দের নতুনরূপে ব্যবহার, সেখানে কবির নৈপুণ্য, তা না হলে দ্বিরেফ’র মতোই হবে।
চিহ্ন : এই যে একটার পর একটা শব্দগুলি আসছে; দেখা যাবে আগের পঙ্ক্তিতে এক ধরনের শব্দ পরের পঙ্ক্তিতে ঐ ধরনের শব্দ আসছে না, অন্যরকম শব্দ আসছে, এটা কি ধ্বনির প্রয়োজনে নয়? যেমন, নৃত্যের তাল-নাচার সময় একবার একরকম করে পা পড়ছে, পরেরবার কিন্তু ওই-পা ওই-স্থানে ওই-রকম করে আর পড়ে না, প্রয়োজনের তাগিদে পা অন্যরকম করে পড়ে বা নটী পা ফেলেন। প্রশ্ন হতে পারে পা কি নিজে থেকে ধঁঃড়সধঃরপধষষু পড়ে নাকি নটীর ইচ্ছায় পড়ে? দুটোই ঠিক; কেননা নাচের সময় নটীর চেতনা তার ভিতরে ইচ্ছে তৈরি করে, এবং ইচ্ছে/আকাক্সক্ষার পূর্ণ-প্রকাশ ঘটলে তার শরীরের ড়ৎমধহ-গুলি স্বতঃস্ফূর্তভাবে সড়াব করে; তবে এখানে অভ্যাস/চর্চা/অনুশীলনের প্রয়োজন আছে, এর ফলে পা/হাত/শরীর যে-অভিজ্ঞতা অর্জন করে তা চেতনাগত আকাক্সক্ষার সঙ্গে অভিন্ন হয়ে যায়, তখন মনে হয় ড়ৎমধহ-গুলি যেন ধঁঃড়সধঃরপধষষু সড়াব করছে। তাহলে শব্দ কি তাই নয়? কারণ আমি যে-চেতনাগত অনুভূতিটা আমার লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করব সেটা কিন্তু আমি রহফরৎবপঃষু বলছি, মনে-মনে, একটা ংড়ঁহফ হচ্ছে আমার ভিতরে-ভিতরে কিন্তু একটা ংড়ঁহফ হবে, সেই ংড়ঁহফ টা আমরা/পাঠকরা বুঝব না; অর্থাৎ কবি যা-লেখেন ৎযুঃযস সহকারে লেখেন, ৎবমঁষধৎ ৎবপঁৎৎবহপব ড়ভ ংঃৎবংং ড়ৎ ধপপবহঃ সহকারে লেখেন।
ফারুক সিদ্দিকী : তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন যে লেখে সে পড়ে? সর্বোপরি শব্দগুলো আসছে অর্থাৎ করোৎপন্ন চেতনায় ক্রমান্বয়ে শুদ্ধি আসেছে কি? অ্যারিস্টটল যাকে ‘ক্যাথারসিস’ বলেছিলেন।
চিহ্ন : তা হতে পারে। আমি বলতে চাচ্ছি, এই যে কবিতা আসছে, এটা হরমোনেরই খেলা, হরমোনটা কিন্তু ফরৎবপঃষু আসে না; অর্থাৎ কৃত্রিম ঝর্ণার মতো সুইচ অন করলে ঝপাৎ করে পড়ে আবার অফ করলে ফুৎ করে নিভে যায়, সে-রকম নয়। এই হরমোনের খেলা কথাটা ংপরবহপব বলে, কিন্তু আমি বলছি না যে কবিতাকে বিজ্ঞান হতে হবে। তো প্রাচীন মুনিদের মতে, বিশ্বামিত্রের ধ্যান ভাঙাতে মেনকার যে-বিচিত্রভঙ্গির অঙ্গ-সঞ্চালন সেটাই প্রথম নৃত্য, সেখান থেকেই শিল্পকলার ধারণা সৃষ্টি। এই নাচটা কিন্তু এখন বাজারে যেসব সুইচটেপা ইলেকট্রিক পুতুলগুলি পাওয়া যায়, যেগুলি বারবার ঘুরে-ঘুরে একই নাচ দেখায়, সেরকম নয়; এই নাচের মধ্যে একটা চেতনাগত রহপষরহধঃরড়হ থাকে যাকে বলা যায় নবহঃ ড়ভ সরহফ, যার ফলে সঁংরপধষ সবধংঁৎব সৃষ্টি হয়; অর্থাৎ প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সড়াব করে আলাদা আলাদা প্রয়োজনে আলাদা আলাদা ভঙ্গিতে, কিন্তু প্রতিটি ভঙ্গিতে একটা সময়ের ঐক্য থাকবে, এক ভঙ্গি নির্দিষ্ট সময়ের ভিতরে আরেক ভঙ্গিতে প্রবেশ করতে নাজ্জপারলে তাল কেটে যাবে, বলা যায় প্রতিটি ভঙ্গি একটা করে ংঁন-ফরসবহঃরড়হ. কবিতায় এটাকে বলা হয় ৎযুঃযসরপ ংবহংব; এই ৎযুঃযসরপ ংবহংব-টা যে শুধু ৎযুঃযস সৃষ্টি করবে তা নয়, সৃষ্টি হবে যধসড়হরড়ঁং ভষড়ি ড়ভ াড়পধষ ংড়ঁহফং. ফলে এই নবধঃরহম ড়ভ ঃরসব বা তালজ্ঞান আসে চেতনা থেকেই। এখানে আরেকটা কথা বলি : ওই যে চঁঢ়ঢ়বঃ-ংযড়ি গুলিতে যে চঁঢ়ঢ়বঃ ফধহপব হয়, যেমন মুস্তাফা মনোয়ারের উৎধসধঃরং চবৎংড়হধপগুলি; এগুলিতে কিন্তু সুইচটে পা পুতুলের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না, যদিও পুতুলগুলি নিজেরা নাচতে পারে না কিন্তু এদের ফরৎবপঃড়ৎ আছে, আর ফরৎবপঃড়ৎ কিন্তু মঞ্চে নেই, মঞ্চে অনুপস্থিত হলেও তিনি ক্রিয়াশীল, কেননা যিনি নাচান তিনি নাচেন। ফরৎবপঃড়ৎ-এর চেতনার ভেতরে যে-নৃত্য ক্রিয়াশীল তারই প্রকাশ ঘটে দম-দেওয়া পুতুলের নাচে। তবে পুতুল এবং ফরৎবপঃড়ৎ-এর মধ্যে সত্তাগত প্রভেদ থাকায় চঁঢ়ঢ়বঃ ফধহপব কে অনেকটা যান্ত্রিক বলে মনে হয়। ফলে নটীর নাচ আর পুতুলের নাচের মধ্যে মৌল পার্থক্য আছেজ্জনটীর নিজের চেতনা তার নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার নাচ অভিন্ন, পার্থক্য এখানেই। তবে যাকে আমরা ফরৎবপঃড়ৎ বলছি তিনি কিন্তু শুধু পরিচালক নন, মূলত শিল্পী, চঁঢ়ঢ়বঃ ফধহপব-এ সমস্ত কৃতিত্ব তার, তিনিই মূল্যায়িত হন, পুতুলগুলির কুশলতা দেখে সবাই মুগ্ধ হলেও সবার ভিতরের চোখ থাকে মুস্তাফা মনোয়ারের দিকে। এই বঃবৎহধ বীরংঃবহপব-এর জন্যই তিনি শিল্পী। বস্তুত নটী নিজেই ¯্রষ্টা নিজেই সৃষ্টি, অর্থাৎ সৃষ্টি এবং ¯্রষ্টা এখানে অভিন্ন একদেহমনপ্রাণ, ফলে শিল্পী এখানে পূর্ণতা পায়, এখানে নটীই প্রধান ও একমাত্র, লীলা স্যামসনই শিল্পী; কিন্তু চঁঢ়ঢ়বঃ ফধহপব-এ শিল্পী হচ্ছেন মুস্তাফা মনোয়ার।
ফারুক সিদ্দিকী : তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন শব্দের ধারাবাহিকতা থাকতে হবে।
চিহ্ন : না, ধারাবাহিকতা না, আমরা বলতে চাচ্ছি কবি ভরৎংঃ পঙ্ক্তি শুরু করলেন ষধংঃ পঙ্ক্তিতে এসে শেষ করলেন, একটি কবিতা লেখা হলো; কিন্তু কবিতাটির প্রত্যেক পঙ্ক্তির ৎযুঃযস তো এক হবে না, এবং এই ৎযুঃযস-এর প্রয়োজনে শব্দের কারুকাজ, অর্থাৎ কোথায় শব্দ বসবে ‘নবংঃ ড়িৎফং রহ ঃযব নবংঃ ড়ৎফবৎ’-এর প্রয়োজন কিন্তু এ-কারণেই অর্থাৎ কবিতাটি যখন পাঠকের কাছে পৌঁছবে তখন কবি সামনে না-থাকলেও শব্দের কারুকাজ বা ধ্বনিব্যঞ্জনের দ্বারা কবির বক্তব্য পাঠকের বোধে কড়া নাড়বে, এভাবে কবি ৎযুঃযস-এর মাধ্যমে কবিতার গূঢ়ার্থসহ পাঠকের উপর ভর করেন, শব্দের কারুকাজ একারণেই প্রয়োজনীয়।
ফারুক সিদ্দিকী : না, কবিতো তখন ফবধফ, যখন কবিতা লেখা হয়ে গেল তখন সে ফবধফ, পাঠক তখন পুনরায় তাকে উদ্ধার করবে। কারণ কবি/লেখক কোনো সত্য উদ্ঘাটন করে নি যে তাকে জীবিত থাকতে হবে; সে এমন একটা সত্য উদ্ঘাটন করল আমরা সত্যে উপনীত হলাম, কিন্তু সেটা বাস্তবিক কোনো সত্য নয়Ñমনোগত, তাই নয় কি?
চিহ্ন : আচ্ছা প্রতীক প্রসঙ্গে বলি, প্রতীক যদি না থাকে তাহলে তো কবিতা সরল স্বীকারোক্তি হয়ে যায় বা দিনযাপনের রুটিন বা জবানবন্দির মতো হয়ে যায়। এটা যদি হয়ে থাকে তাহলে তার ফবসধহফ বাংলা সাহিত্যে কতটুকু? অর্থাৎ বাংলা কবিতায় যদি প্রতীকতা না থাকে তবে দেখা যায় কবিতাটা পুরো ংঃধঃবসবহঃ হয়ে যায়।
ফারুক সিদ্দিকী : কবিতাতো একরকমভাবে হয় না, আপনি যখন যে-রকম লিখবেন, কবিতা হয়ে ওঠাটা বড় কথা, এটাই শেষ কথা। আমার মতের সঙ্গে হয়তো অনেকেই একমত হবেন যে কিছুটা স্বভাবকবিত্ব বা জন্মগতভাবে যদি কোনো অর্জন না থাকে তাহলে আমার মনে হয় কিছুটা কৃত্রিমতা সৃষ্টি হয় আবিলতার সৃষ্টি হয়; জন্মগতভাবে প্রাপ্ত যে স্বভাবকবিত্ব, আমার মনে হয় এটার কিছুটা আবশ্যকতা আছে, একে একদম উড়ে দেওয়া যায় না বানচাল করে দেওয়া যায় না।
চিহ্ন : এবার প্রসঙ্গটা বদলে নিই। অনূদিত কবিতা সম্পর্কে বলুন : বিদেশী কবিতাকে স্বদেশীকরণ করা কি যুক্তিসঙ্গত? যেমন বিষ্ণু দে এলিয়টের কবিতায় মে মাসকে ভাদ্র মাস, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত শেকসপীয়রের সনেটগুলিতে বাংলা মাস ব্যবহার করেন। ভাষান্তরে অন্তঃশীল বিচ্যুতি/বিভ্রাট ঘটে না? সরংঃৎধহংঃধঃরড়হ হয় না? যেমনজ্জসুব্রত অগাস্টিন গোমেজের ‘নির্বাচিত ইয়েটস’ রাজু আলাউদ্দীনের ‘নির্বাচিত টেড হিউজ’ কবীর চৌধুরীর ‘কাহলীল জিব্রানের কবিতা’ শামসুর রাহমানের ‘রবার্ট ফ্রস্টের নির্বাচিত কবিতা’: সৈয়দ আলী আহসানের ‘ওয়াল্ট হুইটম্যানের কবিতা’, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের ‘এমিলি ডিকিনসনের কবিতা’ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘পাবলো নেরুদার কবিতা’জ্জএগুলিকে কি রবীন্দ্রনাথের ভাষায় পুনঃসৃষ্টি বলা যায়? আর পুনঃসৃষ্টিতে সার্থকতা আসে? অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি, অন্বিষ্ট কবির আর সব কবিতা কবিমানস সমাজ সম্পর্কে পাঠগ্রহণের পর অনুবাদককে অনুবাদকর্মে অংশগ্রহণ করাটাকে জরুরি মনে করেন? অর্থাৎ একজন কবির একটি কবিতা বা একটি কাব্যগ্রন্থ যখন আমি অনুবাদ করব তখন তার কবিমানস তার অন্যান্য কবিতা বা কোন সমাজ থেকে কোন পরিবার-পরিবেশ থেকে কোন সময়ে বেড়ে উঠেছেন কবি এসবকিছু জানা কি প্রয়োজন নয়, নাকি তার একটি কবিতা বা কাব্যগ্রন্থ পেলেই হলো, শুধু ওটা পেলেই আমি অনুবাদ করতে পারি? যেমন ধরুন আপনার এই একমাত্র কাব্যগ্রন্থটি ‘স্বরচিহ্নে ফুলের শব’ এটাকে যদি আমি অনুবাদ করতে চাই তাহলে শুধুমাত্র এই বইয়ের কবিতা কটা পড়লেই কি আমি আপনার চেতনা-নিঃসরিত অনুভূতিকে ধরতে পারব? আপনার কবিমানসের সঙ্গে কিন্তু আপনার শব্দচয়ন বিষয় চিন্তনর সম্পর্ক আছে মিল আছে ধারাবাহিকতা বা নিরবচ্ছিন্নতা আছে পড়হঃরহঁরঃু বা ংঁপপবংংরড়হ আছে, যদিও সব অনুবাদকের পক্ষে কবির ফবষরপধপু ড়ভ ভববষরহম বা অনুভূতির সূক্ষ্মতা ধরা সম্ভব না কিন্তু কবির ঢ়ড়বিৎ ড়ভ ভববষরহম বা বোধশক্তিটুকুতো ধরতে পারা চাই, কেননা আমার মতে অনুবাদককে অবশ্যই কবি অথবা কবিমনের হতে হবে, সে-কারণে কবি ছাড়া কবি সম্পর্কে কবিতা সম্পর্কে গ্রহণযোগ্য ফরংপড়ঁৎংব করা খুব কঠিন।
ফারুক সিদ্দিকী : শব্দ জায়গাবিশেষে একটা অর্থ বহন করে। ক্যারোলিন ব্রাউন ‘ংনড়ৎহব খবৎৎধপব’ শব্দ সম্পর্কে আবু হাসান শাহরিয়ারকে বলেছেনজ্জএটা জায়গার নাম, কোনো অশ্লীল শব্দ নয়। কবিতার অনুবাদ ব্যাপারটা প্রথমত কডওয়েলের কথাই বলতে হয়, ‘কবিতা সম্পূর্ণ অনুবাদ হয় না’। আপনি যে-কথাগুলো বললেন, এটা একটা ঈঁংঃড়স ঐড়ঁংব-এর মতো, ঈঁংঃড়স ঐড়ঁংব পার হতে গেলে যে-রকম কাজ করতে হয় অনুবাদের ক্ষেত্রেও ওরকম কাজ করতে হয়। সব কবিতার অনুবাদ যে হবে এ-প্রত্যয় আপনার না-থাকাই ভালো; কারণ যে-কবিতা আপনি অনুবাদ করতে পারছেন গ্যেটে বলেছেন সে-কবির বা মূল-কবির আবেগটা কৃত্রিম নয় স্বতঃপ্রকাশিত, সে-কারণেই অনুবাদটি কবিতা হয়ে ওঠে, যদি আবেগ কৃত্রিম হয় বা জটিলতা সৃষ্টি করে তাহলে সেখানে বাধাগ্রস্ততা সৃষ্টি হয়, সে-কারণে সব কবিতা অনুবাদ হয় না, যে-কবিতার অনুবাদ সার্থক হয় বুঝতে হবে সে-কবিতা অর্থাৎ সে-কবির স্পন্দন তার আবেগ তার অনুভূতি জটিলতাহীন কৃত্রিমতাহীন স্বতোঃপ্রকাশিত।
চিহ্ন : ‘একটি কবিতা পৃথিবীতে একটি ভাষায় লিখিত হতে পারে’, কথাটা আমি বিশ্বাসও করি, কিন্তু ভাবের চেতনার যেহেতু প্রবহমানতা আছে অতএব কবিতা অনুবাদ সম্ভব, সব কবিতা নয় কিছু কবিতা অনেক কবিতা, যে-কবিতাগুলি অনুবাদ হয় না সেগুলি ‘মন্ত্র’ অথবা ‘অকবিতা’। প্রশ্ন হতে পারে ‘মন্ত্র’ কি তবে অনুবাদ হয় না; হ্যাঁ হয়, ত্রিপিটক উপনিষদ বাইবেল কোরআন লালনের গান রবীন্দ্রনাথের গান এগুলিরতো অনুবাদ হয়েছে, সেগুলির আক্ষরিক অনুবাদ ব্যর্থ অনুবাদ; মন্ত্রের একেকটি শ্লোক বা আয়াত বা ংঃধহুধ এর গভীরে অনেক অদৃশ্য/পরোক্ষ ব্যঞ্জিত অথবা ধষষঁফবফ/ংঁমমবংঃবফ বন্ধনী/নৎধশবঃ/ধষষঁঃরড়হ থাকে, আক্ষরিক অনুবাদে সেগুলি বোঝা যায় না, অধিকাংশ প্রকাশক/প্রচারকগণের নিকট থেকে আমরা অক্ষর-অনূদিত উদ্ধৃতি পাই শুধু, কিন্তু বিস্ময় এবং সত্যটা হচ্ছে: মন্ত্রের পূর্ণময়তা বা ষোলকলা বা ফরমরঃভঁষষহবংং খুব সহজেই আমাদের ারঃধষ ঢ়ৎরহপরঢ়ধষ গুলিকে অর্থাৎ শারীরিকভাবে ধঃড়সরপ নড়ফু পবষষ ও সরপৎড়ংপড়ঢ়রপ নড়ফু পবষষ এবং মানসিকভাবে অপরিমেয়রূপে ক্ষুদ্র অননুভবনীয় সত্তা বা রসঢ়ধষঢ়ধনষব ংড়ঁষ বা রহভরহরঃবংরসধষ করে, ংড়ঁষ বা বঃযবৎবধষ ংড়ঁষ গুলিকে ছুয়ে যায় অথবা সঞ্জীবিত করে ারারফষু ধহরসধঃবফ করে, আমরা বুঝতে পারি কী বলা হচ্ছে অথবা আমরা তন্ময় হয়ে যাই যাতে অর্ধেক বোঝা হয়ে যায়; একথাগুলি ংঢ়রৎরঃঁধষ/ সুংঃরপ বংংবহপব থেকে বলছি না, এগুলির মনস্তত্ত্বগত দর্শনগত বিজ্ঞানগত ব্যাখ্যা আছে। তবে আমার ভাল লাগছে আপনি বললেন ‘কবিতা স্বতঃপ্রকাশিত’, যে কথাটা আমি অনেক কথা বলেও এতক্ষণ আপনাকে বোঝাতে পারছিলাম না। এবং আমার মনে হয় ঊীরংঃবহপব ধহফ ঞযড়ঁমযঃ ধহফ ঔড়ু-ই কবিতা বলে ংঢ়ড়হঃরধয়হপড়ঁং ভষড়ি হয়, একারণে প্রাচীন মুনিরা কবিতাকে বলেছেন ‘সচ্চিদানন্দ’।
ফারুক সিদ্দিকী : ঠিকই বলেছেন আপনি। তবু কাব্যিক সম্মতি কোন বিজ্ঞান বা দার্শনিক বিশ্বাস নয়, তারতম্য আছে।
চিহ্ন : আমাদের অগ্রজ কবি/সাহিত্যিকগণ দেখা হলেই উপদেশ দিয়ে থাকেন, ভালো কথা বলেন, পড়ো; বেশিবেশি পড়ো; তো খুব ভালো কথা, পড়লে জানা যায় নিঃসন্দেহে। আরো বলেন, শুধু বাংলা বই পড়লেই চলবে না, বাইরের বইপত্র পড়তে হবে, বাইরের সাহিত্যের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে; কিন্তু সবার পক্ষে তো আর ইংরেজি মাধ্যমে পড়া সম্ভব হয় না, তারা কী করবেন; অনুবাদের ভূমি এদেশে অনুর্বর, উপযুক্ত পরিমাণে অনুবাদ না হলে বাইরের শিল্পজগৎ কীভাবে জানা সম্ভব? বিভূতিভূষণের আনুষঙ্গিক পড়ালেখা কী-ই বা ছিল, বাইরের বই-পত্র খুব একটা পড়তেন না বলাই ভালো। হয়তো সেকারণে তিনি আঙ্গিকটা কী তাই জানতেন না, শুধু এটুকু জেনেই তিনি উপন্যাস লিখতে শুরু করেছিলেন যে উপন্যাস বোধহয় এমনটাই হয়ে থাকে। তার গল্পগুলিও তাই, প্রচলিত ছোটগল্পের ধারণা সেগুলিতে নেই। তথাপি অসাধারণ সব সৃষ্টি। তবু এখন আমাদের দরকার হলো অনুবাদ, যেহেতু অনুবাদ ছাড়া বাইরের শিল্পসাহিত্য আমাদের পক্ষে জানা অসম্ভব, তো অনুবাদগুলি করবেন কারা? আর আমি হাইব্রিড-টাইমের কথা বলছি, এক্কেবারে আজকের দিনটার কথা, এর প্রতিক্রিয়া কোথায় গিয়ে শেষ হবে বলুন!
ফারুক সিদ্দিকী : হ্যারল্ড নার্সের কবিতাটা যে আমি অনুবাদ করেছি, অনুপ্রাণিত হয়েছি এই কারণে তার আবেগটা ছিল ঘনবদ্ধ শুদ্ধ আবেগ। এই জন্য আমি অনেক চেষ্টা করে অনুবাদ করেছি, এবং খুব দ্রুত অনুবাদ হয়েছে। অনেক বড় কবিতা, কিন্তু সহজ ভাষা, দ্রুত চলমান।
চিহ্ন : হ্যাঁ কবিতাটি বেশ বড় ঝড়হম ড়ভ সুংবষভ-এর মতো। আচ্ছা আমার ভুল হলে আমাকে ধরিয়ে দিন, ধরিয়ে না-দিলে ভুলটাই আমার কাছে শুদ্ধ বলে মনে হবে, কবিতাটি নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মতো একদিকে আক্রমণাত্মক আরেকদিকে নিজেকে প্রকাশ।
ফারুক সিদ্দিকী : হ্যা ঠিক ধরেছেন, হ্যারল্ড নর্সের কবিতাটা ওই-ধরনেরই; হ্যারল্ড নর্স আমাদেরকে বেশি তাড়িত করত, কিন্তু তার বই পাওয়া খুব দুর্লভ।
চিহ্ন : ‘খোয়াবনামা’-অনুবাদ জটিলতা সম্পর্কে বলুন। ‘খোয়াবনামা’তে আঞ্চলিক ভাষায় ব্যবহৃত ফরধষড়মঁব কীভাবে অনুবাদে উঠিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব? ইংরেজি/অন্যভাষায় অনুবাদের সময় কি সেগুলি আঞ্চলিক মাধ্যমে অনূদিত হবে নাকি চিরায়ত/ভদ্রলোকের ভাষায় অনূদিত হবে? গুন্টার গ্রাস কিন্তু এরকম একটা জটিল সমস্যা নিয়ে দীর্ঘদিন কথাবার্তা বলে যাচ্ছেন, তিনি মনে করেন বিশ্বসাহিত্য কোনো কবিতা যদি আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত হয়, আর সেটা যদি অনুবাদ করি, তাহলে প্রয়োজন নতুন নতুন শব্দ/ভাষা তৈরি করে অনুবাদ করা, উনি একটা প্রজেক্টও হাতে নিয়েছেন। জার্মানিতে কিছু সম্প্রদায়ের মুখের ভাষা বা নি¤œবিত্ত শ্রেণির মানুষের ব্যবহৃত ভাষাকে উঠিয়ে নিয়ে আসবেন।
ফারুক সিদ্দিকী : গ্রামের কথাটা ঠিক আছে, কিন্তু আমাদের বাংলা ভাষার কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, তার মানে ওই-রকম ভাষাটা নাই যে-ভাষাটার মাধ্যমে অনুবাদের ভেতর দিয়ে আমরা তুলে নিয়ে আসব দলিত ভাষাটা।
চিহ্ন : এই সীমাবদ্ধতাটা বাংলা ভাষার নাকি ইংরেজি/অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষার? এখানে আবারও বলি, আমি কিন্তু বাংলা ভাষার আঞ্চলিক রূপ বা আঞ্চলিক কথ্য ভাষার অনুবাদের কথা বলছি যে সেটাকে অনুবাদ করলে অনুবাদের ভাষাও কি আঞ্চলিক কথ্য ভাষা হবে নাকি শুদ্ধ ভাষা/শিক্ষিতজনদের ভাষা হবে?
ফারুক সিদ্দিকী : সীমাবদ্ধতাটা দুই ভাষারই। যেমন শেকস্পীয়রীয় ভাষা, তাকে পড়তে গেলে নোট বই দরকার হয়। তবে ইংরেজি ভাষা অনেক সংশোধন হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু বাংলা ভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধতাটা বেশি, কেননা ওই রকম উত্তরাধুনিকতার ব্যাপার এখনো বাংলা ভাষায় আসে নাই, বাংলা ভাষায় ওইসব শব্দ ধরার মতো উপযোগী প্রতিশব্দ নাই। ‘হিফহফ’ নামে একটা শব্দ বেরিয়েছে ইংরেজিতে, এর বাংলা কীভাবে করবেন, এর বাংলা করতে গেলে দুই লাইনে লিখতে হবে অর্থাৎ বুঝিয়ে দিতে হবে ‘হিফহফ’ এক ধরনের উন্মাদনা, মানে ৎড়পশ-হ-ৎড়ষষ-এর মতো এক ধরনের উন্মাদনা। রক-এন-রোল-এর বাংলা করেছেন রাজশেখর বসু ‘চিৎপাত সঙ্গীত’। চড়া গলায় গান ও নাচ। বাংলা একাডেমির অভিধানে শব্দটির বাংলাকরণ করা হয় নি।
চিহ্ন : তাহলে এই-যে এত বড় সৃষ্টি ‘খোয়াবনামা’-এর কি মূলানুগ অনুবাদ হওয়া সম্ভব নয়? সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’ ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ‘লালসালু’র ইংরেজি অনুবাদটি কিন্তু কথাসাহিত্যের শিক্ষিত সমাজের। আভিধানিক ভাষাই ব্যবহৃত, খড়পধষ ষধহমঁধমব ড়ভ ফরধষবপঃ-এর ব্যবহার ঘটে নি। জসীমউদ্দীনের ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’-এর ঊ.গ গরষভড়ৎফ-কৃত অনুবাদ ঞযব ভরবষফ ড়ভ ঃযব ঊসনৎড়রফবৎবফ ছঁরষঃ বা ‘সোজনবাদিয়ার ঘাট’র ঊ. চধরহঃং এবং ঙ. খড়াবষড়পশ-কৃত অনুবাদ ঞযব মুঢ়ংু যিড়ৎঢ় যদি আঞ্চলিক ভাষার টোনে লেখা হত। দীনেশচন্দ্র সেনের ঊধংঃবৎহ ইঁহমধষ ইধষষধফং-এর মূল্য বিশ্বলোকসাহিত্যে ঈর্ষণীয় কিন্তু সেগুলি আভিধানিক ভাষায় লিখিত; ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’র সঙ্গে পাশাপাশি রাখলে এক বস্তু মনে হয় না।
ফারুক সিদ্দিকী : হ্যাঁ, ইংরেজি অনুবাদ হওয়া সম্ভব, তবে অনুবাদে ‘খোয়াবনামা’-এর আঞ্চলিক শব্দ আর থাকবে না। যেমন ‘তুই ক্যাঙকা আচু’ এই বাক্যটি আপনি ইংরেজিতে যড়ি ফড় ুড়ঁ ফড় দিয়ে দিলেন তাহলেই হলো। হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তখন অন্ধ, পনের টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন, ১৮৭৫ সালের ঘটনা, তাকে বলা হলো তুমি কবিতা লেখো, ওই সময় ইংল্যান্ড থেকে পঞ্চম এডওয়ার্ড আসলেন হেমচন্দ্র লিখলেন: রাজকুমারী ও রাণী স¤্রাট পঞ্চম এডওয়ার্টের সঙ্গে দেখা করেছেন এটা খুবই সমাজ গর্হিত নিন্দনীয় কাজ, এবং কবিতার মধ্যে দুটো শব্দ লিখলেন ‘মাগী’ ‘ভাতার’। ওখানে যেÑঅ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন, তিনি ইংরেজ, তিনি বললেন: আমিতো তোমার কবিতা কিছুই বুঝলাম না, তুমি ইংরেজিতে ঃৎধহংষধঃব করে নিয়ে এসো, হেমচন্দ্র ইংরেজি ঃৎধহংষধঃব করলেন ‘মাগী’ হয়ে গেল রিভব, ‘ভাতার’ হয়ে গেল যঁংনধহফ তখন অ্যাটর্নি জেনারেল বলল ংঃৎধহমব ব্যাপার, তোমার এই কবিতা নিয়ে এরা ধ্বংস করতে যাচ্ছিল, এটাতো ভালো কবিতা হয়েছে! তাহলে বলেন কীভাবে বোঝাবেন আপনি; আঞ্চলিক ভাষার একটা দূরত্ব সব সময়ই থাকে। বাচনিক অভিব্যক্তি অনুবাদে আঞ্চলিকতায় স্তরভেদে ভিন্নরূপ নেয়, কখনও সমস্তরীয় নয়।

একদিন রক্তের দিন

ঘরের সিঁড়িতে বসে রক্তের একটা ধারাকে গুড়ি মেরে এগিয়ে আসতে দেখে মতি। অস্পষ্ট আঁচড়ের মতো সরু ধারাটা আস্তে আস্তে আরো সৈন্য সামন্ত নিয়ে গাঢ় হয়ে এগিয়ে আসে। ঢোয়ার মাঝামঝি এসে পুরো সেনাদল খানিকটা থমকে দাঁড়ায়, যেন গন্তব্যের দিক ঠিক করতে পারছে না। এক সেকেন্ডের বিরতি, তারপর লাল নিশান দুলিয়ে তারা মতির উল্টো দিকেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সময়টুকু মতি তাদের চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে ছিল। ওর মনে হচ্ছিল, কোন রক্তচোষা গিরগিটির সামনে ও অনন্তকাল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। গিরগিটির সম্মোহনে ওর চোখের পলক পড়ছে না। রক্তখেকোটি আস্তে আস্তে ওর সমস্ত রক্ত শুষে নিচ্ছে। রক্তের এই থেমে থাকায় মতি ভেতরে ভেতরে ছটফট করে ওঠে। ছটফট করতে করতে ওর মনে হয়, রক্তের থমকে থাকা গিরগিটিটা শেষ পর্যন্ত ওর দিকেই হা করে আসবে, ওকে গিলে খাবে। কিন্তু ওকে তুমুল স্বস্তি দিয়ে, গড়িয়ে গড়িয়ে পুরো ফৌজটি একটা মুখের আকৃতি নিয়ে নরেন সাহার ছড়িয়ে দেয়া পায়ে মাথা নুইয়ে আত্মসমর্পণ করলো।
এতোক্ষণ ধরে ঝিম মেরে পড়ে থাকা নরেন সাহা, লাল তাজা রক্তের স্পর্শে কী খানিকটা কেঁপে উঠলো! মতি তার মুখের দিকে তাকায়। রক্তের মুখ ঘষাঘষিতে নরেন সাহার চেহারায় কোন বিকার নেই। পুজোর ক্লান্তির শেষে সবাই ঘুমিয়ে গেলে, টিকটিকির পায়ে পায়ে যেমন অন্ধকার মুখে বুকে ছড়িয়ে পড়ার পরও সরস্বতীর কোন বোধ হয় না, তেমনই নরেন সাহা একটা মূর্তি হয়ে ঘুণে ধরা বাঁশের খুটিতে হেলান দিয়ে বসে আছে। তার কাঁচাপাকা চুল আলুথালু, গায়ের জামাটা এখানে সেখানে ছেঁড়া, মুখে ঠোঁটে কিল ঘুষির দাগ, চোখ জোড়া খোলা জানালার মতো হাট হয়ে খুলে আছে। সেখানে উঁকি দিয়ে মতি দেখে, বাঁশের ঝাড়ে দুলে ওঠা বাঁশফুল, তার পেছনে বাদুড়ের আধখাওয়া তাল নিয়ে বিষণœ পর্বতের মতো নিশ্চুপ তাল গাছ, তার উপরে বৃষ্টি জমানো গম্ভীর কালো মেঘ, মেঘের ফাঁকে ফাঁকে আকাশের ফালি ফালি নীল চোখ, সেই চোখের দৃষ্টি ছাড়িয়ে আরো দূরে কোথায় তাকিয়ে আছে নরেন সাহা! মতি ঠাওর করতে পারে না।
উঠোনের তুলসী গাছের গোড়ায় সাপের আড়ামোড়া ভাঙার সরসর শব্দ তুলে প্রস্রাব শেষে সেন্টু উঠে আসে। ডালিম গাছের চিকন একটা ডাল ভেঙে সে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে বলেজ্জকী জ্যাডা ওমন খাম্বা হইয়া গ্যালা ক্যান? যহন কইছিলাম অতো ফালাইও না, তহনতো শুনো নাই! বড় বাড় বাড়ছিল তুমার, থু দিয়ে নিজের মুখ বুক লেপ্টে একদলা থুতু মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে সে হাসে, অহন বুঝো! সেন্টুর কথায় নরেন সাহার কোন ভাবান্তর হয় না। ভেঙে টুকরো হয়ে পড়ে থাকা গণেশের শুঁড়ের মতোই সে নিষ্প্রাণ, আকাশমুখী। তার সাড়া না পেয়ে সেন্টু হাঁক ছাড়ে, ও জ্যাডা ঘুমাইলা না কি! এতো তাড়াতাড়ি ঘুমাইলে চলবো? খ্যাকখ্যাক করে হেসে সে নরেন সাহার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে, কাম কলাম শেষ হয় নাই। মতি অহনো বাকি আছে। মতির দিকে তাকিয়ে সে অশ্লীল ভঙ্গিতে চোখ টেপে, ভাইডি তুমি সবার ছোট, তাই তুমার সিরিয়াল লাস্টে, কিছু মনে কইরো না কলাম। তার কথার মাঝখানে ঘরের ভেজানো দরজা ক্যাচক্যাচ করে খুলে রহমান বেরিয়ে আসে। লুঙ্গির গিঁটটা টাইট করতে করতে সে সাবধানে রক্তের পাশ কাটিয়ে মতির কাছে এসে পিঠে চাপড় দেয়, ভাইডি এইবার তুমি। তাড়াতাড়ি করবা কলাম, সূর্যের দিকে একঝলক উঁকি মেরে সে বলে, আছরের সুময় হয়া গ্যাছে মনে হয়।
মতি অলসভাবে উঠে দাঁড়ায়। যে উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে সে এখানে এসেছিল, রক্তের সা¤্রাজ্য দেখার পর তার ছিঁটেফোটাও আর সে নিজের ভেতর টের পায় না। লুঙ্গির নিচে বাপমায়ের শক্ত ভিটে হয়ে থাকা যায়গাটা, ওর কাছে নদীর ভাঙ্গনে তলিয়ে যাওয়া কাদাপানির মতো মনে হয়। অথচ সাহা বাড়ির দুধসাদা পরীগুলোর জামা কাপড়ের নিচে কেমন গুপ্তধন লুকানো আছে, বিড়ির ধোঁয়ায় উড়িয়ে এই চিন্তা কতোবার ওকে গভীর রাতে ডেকে তুলে ঘন নিঃশ্বাসের সাথে স্বপ্ন বিনিময়ের কারুকাজ শিখিয়ে গেছে! এমন কী নরেন সাহার স্কুল পড়–য়া মেয়েটাকে না পেয়ে সেন্টুর বড় ভাই মিন্টু যখন আজ সাহার বৌটাকেই টেনে হিঁচড়ে উন্মুক্ত করছিলো, দরজার ফাঁক দিয়ে তার উদোম শরীরের ফর্সা ঝলক ওকে শহরে গিয়ে এক টিকিটে দুই ছবি দেখার শিহরণে টালমাটাল করে তুলেছিল। খানিক আগেও মহিলার ‘তোর পায়ে পড়ি সেন্টু বাপ আমার’ চিৎকারকে তার স্কুল পড়–য়া মেয়ের ‘ছেড়ে দে শয়তান, দেহ পাবি মন পাবি না’ ডায়লগ কল্পনা করে নিষিদ্ধ উত্তেজনায় ওর পায়ের রক্ত মাথায় উঠে দাপাদাপি করছিল। কিন্তু মিন্টু সেন্টু আর রহমানের বিরামহীন আসা যাওয়ায় সেই চিৎকারটুকু ক্ষীণ হতে হতে রক্ত হয়ে পাঁচ আঙুলে নরেন সাহারা সাদা ধুতি আঁকড়ে ধরার পর, ওর কেমন ছুটে পালাবার ইচ্ছা জাগে। কিন্তু পা দুটো যেন জগদ্দল পাথরের মতো ভারি, নড়ে না।
কীরে ভাইডি খাড়ায় রইলা ক্যা? শত চেষ্টার পরও পায়ে লেপ্টে যাওয়া রক্ত মাটিতে ঘষে উঠাতে উঠাতে রহমান বলে, মালাউন শালিডারে ভইরা দিয়া আয়। সাহা ব্যাটা দেহুক ইন্ডিয়ার দালালগেরে ভুট দিলি কী হয়!
ইন্ডিয়ার দালাল কথাটি শুনতেই মতির চোখের সামনে কালা আজাহারের মুখ ভেসে ওঠে। ভোটে জেতার পর সে আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা গত পাঁচ বছর ধরে এলাকার মানুষকে কম জ্বালিয়েছে! ‘আজহার ভাইকে দিলে ভোট, শান্তি পাবে দেশের লোক’জ্জকীসের শান্তি! তার দাপটে মতিন মাওলানার সাপোর্টাররা কেউ শান্তিতে ঘরে থাকতে পেরেছে? মাওলানার মতো পরহেজগার মানুষকে ভোটে হারিয়ে আজহারেরা ক্ষমতায় আসে কেমনে? এই মালাউনরাই ভোট দেয়। মুখে কতো ইতং বিতং আর ভোটের বেলায় ইন্ডিয়ার দালালগোর মার্কাতেই তাদের সিল দেয়া চাই। মতি মনে মনে রেগে ওঠে, শালারা ভাবছে কী এইটা মগের মুল্লুক, এইটা ইন্ডিয়া? এইটা বাংলাদেশ, মুসলমানের দেশ। মেয়ে দুইটারেতো আগেভাগেই বর্ডার পার করছস, কিন্তু তোরে বাঁচাইবো কেডা? মালাউনের মারে বাপ, বিড়বিড় করে গাল দিয়ে সে এক লাফে ঘরে ঢোকে। মাটিতে হাত পা ছড়িয়ে এলো চুলে রক্তমাংসের একটা প্রতিমা চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। নরেন জেঠির বড় বড় চোখ দুটো খোলা। কাজল টানা চোখে সে সরাসরি মতির দিকে তাকিয়ে আছে, যেন সে মতির অপেক্ষাতেই ছিল, যেন সে এখুনি বলে উঠবে, কীরে মতি নাড়– খাবি? মতির কেমন অস্বস্তি লাগে। অস্বস্তি কাটাতে ও অন্যদিকে চোখ ফেরায়। দেখে, মাটি কামড়ে এগিয়ে যাচ্ছে রক্তের ¯্রােত। তাই দেখে মতির আবারও মাথা ঝিম ঝিম করে। ওর গর্জে ওঠা মুসলমান জজবা নিমেষেই চৈত্র মাসের পুকুর হয়ে যায়। আবারও এক ছুটে পালিয়ে যেতে ওর ভীষণ ইচ্ছা হয়। নিজের অজান্তেই ও ঘুরে দাঁড়ায়। কিন্তু ওর হাতটা কি জেঠি আঁকড়ে ধরেছে! শাখা, সোনার বালা আর কাচের চুড়ির সম্মিলিত ডাকে ও ফিরে তাকায়।
মতি না? জেঠি বলে ।
হ, জেডি।
এতো দেরি করলি যে বাপ, আইজ না তোর জন্মদিন?
আইজ?
হ, আমি সেই কহন থেইকা তোর জন্য অপেক্ষা করতেছি! তোরে একটু দেখমু। কাছে আয়, জেঠি ওর হাত ধরে টান দিলে মতি ঝুঁকে সামনে আসে।
তোর চেহারা এমন লাগতিছে ক্যারে মতি?
কেমুন লাগতেছে, মতি অস্বস্তিতে বলে।
মনে হতিছে রক্ত নাই। সাদা কাগজ হইয়া গেছস! রক্ত নিবি? এই নে, জেঠি এক হাতে খানিকটা রক্ত উঠিয়ে ওর দিকে বাড়িয়ে ধরে।
গায়ে রক্ত লেগে যাবার ভয়ে মতি পিছিয়ে আসে, করো কী জেডি!
জেঠি হাসে, ভয় পাইলি?
মতি ঢোক গেলে,নিজের হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করে ও ফ্যাসফ্যাসে স্বরে বলে, না।
ভয় কীসের বাপ। আমিতো তোর মা। মায়ের কাছে আইছস, আর ভয় নাই।
মা! আমার মা নাই, তুমি জানো না জেডি?
কেডা কইছে তোর মা নাই। ভালো কইরা দেখ। আমারে চিনবার পারতসছ না?
মতি মাথা নাড়ে, তুমিতো নরেন জেডি!
ধুর বোকা। নরেন জেডি তো মইরা গেছে। আমি তোর মা। মহিলা ওর হাত ধরে টেনে কাছে নিয়ে আসে, দেখ বাপ, চিনোস না?
মতি ভয়ে ভয়ে মহিলার তাকায়। খানিকটা নিচু হয়ে ও চেহারাটা খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করে, খানিকটা চেনা চেনা লাগে। আসলেই মা না কি!
হরে বাপ, ওর মনের প্রশ্নের উত্তরে মহিলা মাথা দোলায়।
তুমি কখন আইলা মা? মতির কেমন ঘোর ঘোর লাগে।
অনেকক্ষণ বাপ। তুই এতো দেরি করলি ক্যান?
আমিতো আগে আসপার চাইছিলাম। মিন্টু সেন্টুরা দেরি করাইয়া দিল…কিন্তু তুমার চাইরপাশে এতো রক্ত ক্যান?
কইলাম না আইজ তোর জন্মদিন। বাড়িতে কেউ নাই। তোর বাপ হাটে। ঘরে আমি একা পইড়া আছি। তুই আসায় পরানডা জুড়াইলো বাপ।
এইভাবে থাকলে তুমিতো মইরা যাবা!
মরার কি আর বাকি আছেরে বাপ! মরার আগে তোরে ধরলাম, দেখলাম, অহন শান্তি, মহিলা চোখ বোঁজে।
মা, ও মা! মতি মহিলাকে ঝাঁকি দেয়।
ঘরের বাইরে থেকে সেন্টুর হাসি শোনা যায়, কীরে মতি সারা শব্দ নাই ক্যা! মজায় জবান বন্দ হয়া গেছে না কি! দুনিয়াছে মজা লে লো, দুনিয়াছে…সে জোরে জোরে শিস্ দিয়ে গান গায়।
গানটা মতির অসহ্য লাগে। দৌড়ে গিয়ে ওর সেন্টুর গলা চেপে ধরতে ইচ্ছা হয়। কোনরকমে ইচ্ছাটাকে চেপে মহিলাকে ও জড়িয়ে ধরে ওঠানোর চেষ্টা করে, আমি তোমারে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যামু মা।
মহিলা চোখ খোলে। মতি, বাপ আমার, থাম।
না, আমি তোমারে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যামু, মতি তাকে টেনে হেঁচড়ে ওঠাতে চায়।
মতি থাম, ব্যথা পাই।
মতি থামে না।
থাম কইলাম মতি, মহিলার কণ্ঠ হঠাৎ তীক্ষè হয়ে ওঠে।
মতি সভয়ে তাকে ছেড়ে দেয়।
বাপরে, এমন করিস না। আমার খুব কষ্ট হইতেছে।
মতি তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। এতোদিন পর মাকে পেয়ে ওর দুই চোখ বেয়ে অঝোরে জল গড়ায়। মায়ের মাথাটা কোলের ওপর নিয়ে অভিমান জড়ানো গলায় ও ডুকরে ওঠে, মা! জানো আমারে কেউ দেখপার পারে না। তুমি নাই, সবাই আমারে দূর দূর করে। আব্বায় কয়, তুই আমার রক্তের কেউ না। সৎ মায় কইছে, কুত্তারে ভাত দিমু তয় তোরে না। ওমা, মা, তুমি ছাড়া আমার কেউ নাই মা, বলতে বলতে মতি কান্নায় গুঙিয়ে ওঠে।
কান্দিস না বাপ কান্দিস না, মহিলা ওর দু হাত ধরে। তুই কানলে আমি কই যামু! থাম বাপ থাম, মহিলা ওর হাতে চাপড় দেয়, যেন এক মৃত্যুপথযাত্রী মা মৃদু ছোঁয়ায় তার সদ্যোজাত শিশুর কান্না থামাতে চায়।
হাতের মমতার স্পর্শে মতি কেঁপে ওঠে। কান্না থামিয়ে সে বলে, তুমি আমারে থুইয়া আর যাবানাতো মা?
যামু না বাপ, যামু না। মহিলা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
সত্যি! মতির চোখমুখ উজ্জ¦ল হয়ে ওঠে।
হ সত্যিরে সোনা। তয় আমার একটা কাম করবি বাপ?
কী করমু মা?
এইখানে একটু চাপ দিবি, মহিলা ওর দুই হাত নিয়ে নিজের গলায় রাখে, খুব কষ্ট লাগতাছে।
এইখানে চাপ দিলে কষ্ট কমবো?
হ, কষ্ট একবারে যাইবো গা।
সত্যি! মার কষ্ট লাঘব হবে ভেবে মতির মন খুশি হয়ে ওঠে। সে আস্তে করে চাপ দেয়।
জোরে বাপ জোরে, মহিলা ওর হাত শক্ত করে টেনে ধরে।
মতি জোর বাড়ায়..
আরো জোরে বাপ, আরো জোরে…
মতির হাতে অসুর ভর করে
আহ!
আরাম পাইতাছো মা?
হু, মহিলার গলা দিয়ে অস্ফুট শব্দ বের হয়।
ও মতি, হইলো? সেন্টু হাঁক ছাড়ে।
থইথই রক্তের উপর ছেদরিয়ে বসে মতি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে, আরাম হইতেছে মা? ও মা আরাম হইছে?

জানুয়ারি-মে, ২০১৪
সিডনি ॥ অস্ট্রেলিয়া

দলিত চাঁদ

কুরবানি ঈদের গোল চাঁদটা তোরাব আলীর সামনের টেবিলে শোভা পাওয়া শত শত সোনা রুপোর মেডেল, ক্রেস্টের মত ঝলমল করছে। হাবু ঠোঁটের উপর চাঁদ বিছিয়ে দিয়ে এক দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে। চাঁদ দেখে খক্ খক্ কাশির মত হাসতে থাকে অথবা হাসে নাজ্জএটাই তার কান্না। কাশির মত, হাসির মত হয়ত তার কান্না। ‘চাঁদটা কী গোল!’ ওর হাসির জল ঠোঁট বেয়ে শিশিরের মত ঝরতে থাকে বেগুনি ঘাসের উপর। রাত পেরুলেই ঈদ। সবার সাথে ত্যাগের মহিমা ভাগ করে নিতে গ্রামে এসেছে এম.পি. তোরাব আলী। মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আতিকুল্লাহ হাইস্কুলের মাঠে আজ সারাটাদিন এম.পির মেডেল, ক্রেস্ট আর সোনার প্রতীক গ্রহণের অনুষ্ঠান চলেছে। অনুষ্ঠান শেষে কর্মীদের সাথে মতবিনিময়ে বসেছে তোরাব আলী। হাবু সারা দিন এ মাঠে বসে আছে। যেখানে মানুষের সমাগম হবে সে জায়গা ছেড়ে এক চুলও নড়বে না হাবু। এই স্কুল মাঠে কাল সাত সাতটা গরু কুরবানি দিবে তোরাব আলী। স্কুলটির প্রধান শিক্ষক এরতাজ মিয়া এম.পি.কে উদ্দেশ্য করে বলে, স্যার আপনাকে প্রতিদিন রাতে দেখি।
কে যেন বলে ওঠে, স্বপ্নে?
Ñহা হা হা… হেসে ওঠে মজলিসের ভেতর থেকে কয়েকজন।
Ñটিভির টক শোতে। আপনি কত সুন্দর করে কথা বলেন! এরতাজ মিয়া আবার বলে।
Ñতাই না কি? আপনারা শোনেন? তোরাব আলী বলে। প্রসঙ্গ পাল্টে আবার সে এরতাজ মাস্টারকে বলে, মাস্টার সাহেব ওসব বাদ দেন। এখন বলেন স্কুলের খবর কী? এখন সব ঠিকঠাক মত চলছে তো?
Ñজি। এম.পি সাহেব। আর কোনো সমস্যা নাই।
এরতাজ মিয়া ছ’সাত মাস হয় প্রধানশিক্ষক পদে যোগ দিয়েছে। এর আগে হালিম মাস্টার প্রধান শিক্ষক ছিলেন। সে তোরাব আলীরও সরাসরি শিক্ষক। বছরের পর বছর সেই তো তোরাবের স্কুলের বেতন, পরীক্ষার ফিস মওকুফ করিয়েছে। সে অনেক আগের কথা। তার কাছে কৃতজ্ঞ সে। কিন্তু তাকে প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে বাধ্য হয়েই হটিয়েছে তোরাব আলী। আসলে চেইন আব কমান্ড বলে একটি কথা আছে। অধীনস্থকে যদি কমান্ড করতে বিব্রত হতে হয় তবে ল-অব-অর্ডার বলে কিছু থাকে না। এলাকার স্কুল কলেজগুলোর আয় দিয়েই তো তোরাবের হা করে থাকা পাতিনেতাদের মুখ বন্ধ করতে হয়। ওরাই তো দলের শক্তিজ্জওদের বঞ্চিত করা যায় না।
Ñসামনে বার যদি নির্বাচনে জিততে পারি এলাকার চেহারায় পাল্টে দিব। তোরাব আলী তার মুখস্থ বুলিটা আরেকবার ছাড়ে।
Ñএম.পি সাহেব আমার একটা আরজ ছিল। দলের এক বয়স্ক কর্মী হাত তুলে দাঁড়ায়।
Ñএই তোমার আবার কী আরজ। এম.পির পি.এস চিৎকার করে ওঠে।
Ñআরে চিৎকার কর কেন? বলেন চাচা বলেন। তোরাব লোকটিকে অভয় দেয়।
Ñঈদের দিন তোমার বাড়িতে দাওয়াত খাব।
Ñএই কথা। স্কুলমাঠেই খানা হবে নামাজ পড়ে সোজা চলে আসেন।
Ñআরে তোমার আলিশান বাড়িটা দেখতে চাই। তোমার তিলোত্তমার দরজায় তো বিদেশি কুত্তা বসা। সারা বছর ঢুকতে পারি না। ঈদের দিন তো একটু ঢুকতে দিবা। তোমার হয়ে কাম করি এটুকু তো আবদার শুনবা। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীও তো ঈদের দিন সাধারণ জনগণকে বাসভবনে দাওয়াত করে। এলাকার এই মুরব্বিয়ানা লোকটা এভাবেই সবাইকে জ্ঞান দিয়ে কথা বলতে পছন্দ করে। তাছাড়া যে নেতার হয়ে নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছে তার কাছে তো দাবি নিয়েই কথা বলবে। এমনই ধারণা তার। দলের নিবেদিত প্রাণ নিঃস্বার্থ কর্মী সে। দল করে চুল পাকিয়েছে কিন্তু দল থেকে তেমন কোনো সুযোগ সুবিধা আজো নেয় নি। অবশ্য সুবিধা নেয়ার জন্য যোগ্যতা থাকা চাই। অন্যান্যদের এমনই ধারণা। এধরনের কর্মীদের দলের অন্যরা ভাঁড় বলে থাকে।
এ তো মুসিবতের কথা। গ্রামের অশিক্ষিত লোকজনের মুখে কিছু বলতে বাধে না। ভরা মজলিসে এমন আরজি করে বসল বুড়া। তোরাব আলী না করে কেমনে? মনটা বিষিয়ে ওঠে তার। এমনিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে বেকাদায় আছে সে। হবে না তো কিছুই শুধু লোকজনের সামনে বেইজ্জত করে ছাড়বে।
Ñতোমার বাড়ির ভেতরখানা নাকি এক্কেবারে বেহেস্তখানা। নামটাও জব্বর, তিলোত্তমা। আমাদের দেখাইবা না? সবাই জিজ্ঞাসা করে এম.পি.র বাড়ির ভেতরে গেছস? বলি, দেখি নাই। তখন সবাই হাসাহাসি করে। বলে, এম.পি.র কাছের লোক হয়েও তার বাড়িতে একবার ঢুকার সুযোগ পাওনাই। কী বলি বলো এম.পি. সাহেব? কথাটা তো সত্য।
Ñচাচা তোমার জন্য আমার বাড়ির দোয়ার সবসময় খোলা।
হাবু তার ভাঙা পা লাঠির সাথে জড়িয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়, ‘হারাও যাবো, হারাও যাবো। হামাদের কি হক নাই? কাল তোমার বাড়িতে হামাদের সবার দাওয়াত। খিঁচ্চালাব। তালি তালি।’ এই বলে আরো জোরে জোরে হাততালি দিতে শুরু করে সে। তার পাগলামি দেখে মজলিশের অনেকেই হো হো করে হেসে ওঠে।
Ñচুপ কর বুড়া পাগলা। একজন দলীয় কর্মী বলে ওঠে।
তোরাব আলী বিব্রত হয়। ‘ঠিক আছে। বেনু, এদিকে আয়।’ তোরাবের সেরা চামচা বেনু দৌড়ে আসে।
Ñজি ভাই।
Ñমসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে দে। এবার ঈদে এলাকাবাসী আমার বাড়ি দেখার সুযোগ পাবে।
Ñঠিক আছে ভাইজান।
চারদিক থেকে করতালি শুরু হয়।

তোরাব আলীর বাবা মহসীন আলী নিতান্ত গরীব মানুষ ছিলেন। টিনের ছাদ আর ইঁটের গাঁথুনি দেয়া ছোট্ট একটা বাড়ি ছিল তার। তোরাব আলীর রাজনীতি শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায়। হলে সিট দখলের রাজনীতি দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত। ঢাকা শহরে ছেলের পড়াশোনার খরচ চালানোর মত অবস্থা বাবা মহসীন আলীর কোনো দিনই ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে সিট না পেলে ঢাকায় টিকে থাকা তোরাব আলীর পক্ষে কোনো দিনই সম্ভব হবে না। এই বাস্তবতা থেকে হলে সিটের দখল পাওয়ার জন্য রাজনীতির খাতায় নাম লেখায় সে। এরপর টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি কত কী যে করেছে ঢাকায়জ্জশুধুই টিকে থাকার জন্য। দশ বছর আগে এলাকায় ফিরে এলে তার দল তাকে পৌরসভা নির্বাচনের জন্য সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু তা গ্রহণ না করে নিজ দলের স্থানীয় এক প্রভাবশালী নেতার হয়ে কাজ করে সে। এভাবে এলাকার রাজনীতির সাথে যুক্ত হয় তোরাব আলী। আসলে রাজনীতির চালগুলো খুব ভাল বোঝে সে। এর দুবছর পরে এম.পি. নির্বাচনে দলের নোমিনেশনের জন্য অনেক দৌড়ঝাপ করে। অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর অবশেষে তা পেয়েও যায়। নির্বাচনী প্রচারণা ও জামানতের টাকা জমা দেয়ার মত আর্থিক অবস্থা তার ছিল না। সে এলাকার লোকজনের কাছে নির্বাচনের জন্য অর্থ সাহায্য চায় আর এই বলে ওয়াদ করে যে, ‘আমি জয়ী হলে আপনাদের জন্য কাজ করব। আর যেদিন দেখবেন আমার বাবার টিনের চালে সিমেন্টের ঢালাই হয়েছে সেদিন বুঝবেন আমি দুর্নীতি করেছি।’ এলাকাবাসী তার আবেগপূর্ণ ভাষণ শুনে অভিভূত হয়। তারা তাকে কতভাবে যে সাহায্য করেছে! কৃষক তার বীজের জন্য জমানো টাকা থেকে সাহায্য করেছে, গৃহস্থ ঘরের মেয়েরা তাদের হাতের বালা পর্যন্ত খুলে দিয়েছে। যা হোক সে তো ছয় বছর আগের গল্প। আজ শুনলে অনেকের এসব অলীক গল্প মনে হবে। সেই টিনের চালার বাড়ি কোথায় হারিয়ে গেছে। সেখানে এখন বিশাল ডুপ্লেক্স। বাড়ির মেঝেতে ইটালিয়ান সিরামিক, বৈঠকখানায় ইরানি কার্পেট, ডাইনিং-এ ঝুলছে বেলজিয়ামের ঝাড়বাতি, টয়লেটে সব আমেরিকান ফিটিংস। বাড়ির চারদিকে ফুলের বাগান। নাম না জানা দেশি বিদেশী ফুলের সমাহার রয়েছে সেখানে। বাড়ির পেছনে একটি ছোট্ট খাঁচায় দুটি চিত্রা হরিণও রয়েছে। তবে গ্রামের লোকজন এসব দেখে নি। শুধুই শুনেছে। এ বাড়িতে এখন আর কেউ সেভাবে বসবাস করে না। ঢাকা থেকে তোরব আলী ও তার পরিবারের লোকজন অথবা কেন্দ্রীয় কোনো নেতা এলে এখানে থাকে। বাড়িটি দেখাশোনার জন্য রয়েছে বিশ্বস্ত কেয়ারটেকার, বাবুর্চি, দারোয়ান, মালি। এরই মধ্যে গ্রামবাসির মধ্যে বাড়িটি নিয়ে অনেক গল্প চালু হয়েছে। অনেকে নাকি হুরসদৃশ নারীদেরও এ বাড়ির ছাদে, বাগানে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে। তারা এদেশের নয়জ্জদূর কোনো দেশের, ইরান তুরানের হয়ত। অনেকে বলে বাদশাহ সাদ্দাদের প্রেতাত্মা তোরাব আলীরর উপর ভর করেছে। সেও সাদ্দাদের মত বেহেস্তখানা তৈরি করেছে। সঠিক পথ দেখাতে সাদ্দাদের কাছে তো আল্লাহ হুদ(আ.)কে পাঠিয়েছিলেন। তোরাব আলীর হেদায়েত করতে আল্লাহ কি কাউকে পাঠাবে না? গ্রামবাসী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, এ কলি যুগে কেউ আসবে না। পাপদিন দিন বাড়তে থাকবে? এসব গল্প অলস রাতে গ্রামবাসীর বিনোদনের খোরাক যোগাচ্ছে বেশ ক’বছর ধরে।

ঈদের দিন আজ। গাঁয়ের লোকের মনে আনন্দ ধরে না। মাঠে নামাজ পড়ে ছেলে বুড়ো সবাই মিলে যাবে তোরাব আলীর বাড়ি। ভাল-মন্দ খাবে অতঃপর খিলান করতে করতে বাড়ি ফিরবে। হাবু সক্কালে উঠে পাগলা নদীর ঠাণ্ডা জলে গোসল সেরেছে। তার পুরান লুঙ্গিটা ভাতিজা শুক্করের বউ কেচে মাড় দিয়ে কড়কড়ে করে দিয়েছিল। গায়ে দিয়েছে হাওয়াই শার্ট। মাথায় একটা শত ছিন্ন নেটের টুপি। তোরাব আলীর পাশে বসে নামাজ পড়বে বলে সকাল সকাল প্রস্তুত হয়ে ঈদগাহে এলো। তখন কেউ সেভাবে আসে নি। মাদ্রাসার ছোট হুজুরেরা মাঠে কাফনের মত ধবধবে সাদা সারি সারি কাপড় বিছিয়ে বসার ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত। ইমাম সাহেবের মেহরাবটা মখমলের জায়নামাজ দিয়ে ঢাকা। পাশে আতরদানিতে আতর, তুলো রাখা আছে। জ্বলন্ত আগরবাতি ভুর ভুর করে একটা পবিত্রগন্ধ ছড়াচ্ছে। মিষ্টি পবিত্র গন্ধটা ছাপিয়ে হাবুর নাকে এসে সুড়সুড়ি দিচ্ছে আজ সকালে নদীর ধারে স্নান করতে আসা দুষ্টু ছেলেদের প্রাকৃতিক অপকর্মের বিশ্রী গন্ধ। ‘উহ! কী গন্ধ।’ আতরদানি থেকে তুলোয় করে একটু আতর নিল সে।
-আরে আরে! তুমি এখানে কী করছ গো। ঈদগাহের খাদেম এগিয়ে আসে।
Ñএকটু আতরই তো লিয়েছি গো। হাবু বলে। আজকে এম.পির বাড়িতে হার দাওয়াত। কাল এম.পির সাথে হার পেপারে ছবি ছাপা হোবে। বেশি বকলে খিঁচ্চালাব।
Ñবাব্বা! খাদেম মুচকি হেসে বলে। আমাকে খিঁচে ফেলবা?
Ñখিঁচ্চালাব। হাবু আবার তার আধো অর্থের নিজস্ব শব্দটা উচ্চারণ করে।
খাদেম ভাল করে জানে লোকটা আধপাগল। কিছু করতে, কিছু বলতে তার বাধে না। তাই সে খুব একটা কথা বাড়ায় না, ঠিক আছে আতর নিয়েছ ভাল কথা। এবার সরো। যাও, এখন পেছনে গিয়ে বসো।
হাবু প্রথম কাতারে ঠিক মাঝামাঝি গিয়ে বসে। আকাশের দিকে একনাগাড়ে তাকিয়ে খিল খিল করে হাসতে থাকে সে। কোনো পুরনো স্মৃতি অথবা জীবনের কোনো পরিহাস, কিংবা প্রচলিত সমাজের সমীকরণ আবার হয়ত কোনো কিছুই না তাকে হাসতে বাধ্য করছে। এভাবেই চলতে থাকে তার হাসি। নামাজে আসা মুসল্লিরা তাকে দেখে দূরে গিয়ে বসছে। তার পাশে বসতে সাহস পাচ্ছে না কেউ। লোকটা আধপাগলা। মানুষের মুখের উপর হুট করে এমন কথা বলে বসে যে সামনের মানুষটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে যায়। তবে হাবু আজ পর্যন্ত কারো কোনো ক্ষতি করে নি। হয়ত খুব বেশি হলে দুটো অবান্তর প্রশ্ন করবে অথবা দুটো পয়সা চাইবে, চা-বিড়ি খাওয়ার জন্য। খুব বেশি হলে কারো বাড়ির দরজা খোলা পেলে হুট করে বাড়ির অন্দর মহলে ঢুকে পড়বে, বাড়ির গৃহিণীকে দুতিনটা উপদেশ দিবে তারপর নিজের পেটে হাত বুলিয়ে বলবে, ‘খিদা লাগছে ভাত দে তো।’ খাওয়া হলে আর এক মুহূর্ত সেখানে থাকবে না। গ্রামবাসীর উপর এটুকুই তার উপদ্রব, জ্বালা-যন্ত্রণা। আসলে সে এমন ছিল না। একাত্তরে সে টগবগে যুবক। স্কুলে পড়ছে আর অবসরে বাবার সাথে মহানন্দার বুকে নৌকার দাঁড় টানে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বাবার অনুমতি নিয়ে সে যুদ্ধে গেল। একদিন নাকালবাড়ি প্রাইমারি স্কুলে গেরিলা আক্রমণের সময় একজন পাক সেনা তার হাতে ধরা পড়ে। পাকসেনাটিকে মাটিতে আছড়ে ফেলে হাবু তার নাঙ্গা ডান পা শত্র“র গলার উপর চড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘অতদূর দেশ পাড়ি দিয়ে তুই এখানে এসেছিস আমাদের বাপ-ভাইদের মারতেÑমা-বোনদের বেইজ্জত করতে? তোর সাহস তো কম না, আমার মাটিতে এসে আমাদেরই মারবি? তোরে আজ এই পা দিয়ে পিশে ফেলব। ঘাড় মটকে দেবরে বদমাশ!’
পাকসেনাটা অনুনয় বিনয় করে কাঁদতে কাঁদকে বলে, ‘মুঝে ছোড় দো। হামি আভি চলে যাব। হামারা বুড়ি মা মরে যাবে… উসকি কয়ি নাহি, হামি ছাড়া।’
তার কথা শুনে হাবুর নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। তার মাও তো তার জন্য অপেক্ষা করছে। সে কবে বাড়ি ফিরবে এই অপেক্ষায় চোখের জল ঝরাচ্ছে। পাকসেনাটিকে সে কিরা-তওবা করিয়ে নেয়, সে আর যুদ্ধ করবে নাÑসোজা পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যাবে। পরে হাবুদের গেরিলা দলের নেতা আতিকুল্লাহ বিষয়টা জানতে পেরে হাবুর উপর ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়। হাবুকে রাইফেলের বাট দিয়ে পিঠে কয়েকটা আঘাত করে আতিকুল্লাহ। মার খেতে খেতে হাবু এক সময় জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। গেরিলাদের কাছে ‘ক্ষমা’ বলে কোনো শব্দ থাকতে নেই। শত্র“কে নাগালে পেলেই তাকে যেকোনো মূল্যে নিধন করতে হবে। তার এই ক্ষমার কারণে গেরিলা দলটির যে ক্ষতি হয় তার জন্য হাবুকে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি দিলেও অনেক কম দেয়া হত। পরের দিন সেই পাকসেনাটি বিশাল এক বাহিনীকে পথ দেখিয়ে তাদের অবস্থানে নিয়ে আসে। একটা গেরিলা হামলার পর অত অল্প সময়ের মধ্যে শূন্য প্রান্তরময় ঐ এলাকায় গা ঢাকা দেয়ার মত নতুন আশ্রয় খুঁজে পাওয়াটা ভীষণ কঠিন ছিল। কারণ এর সাথে নিরীহ গ্রামবাসীর জীবনও জড়িয়ে পড়ে। পাকসেনারা চারদিক থেকে তাদের ঘিরে ফেলে অতর্কিত হামলা করে। গেরিলা নেতা আতিকুল্লাহ সহ দলের আরো সাতজন সদস্য ঐ দিন শহীদ হয়। সেই পাকসেনাটির বিশেষ অনুরোধে প্রাণে না মারলেও হাবুর ডান পায়ে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি করে ফেলে রেখে যায়। জীবন-মৃত্যুর এক অনিশ্চয়তার মধ্যে সে জঙ্গলে পুরো একটা দিন পড়ে থাকে । প্রচুর রক্ত ক্ষরণ হলেও গ্রামবাসীর সহায়তায় শেষপর্যন্ত বেঁচে যায়। এ ঘটনাটি তাকে ভেতর থেকে দমড়েমুচড়ে ফেলে। তার এ জীবনকে সে বন্ধুদের প্রাণের বিনিময়ে শত্র“র ভিক্ষায় পাওয়া অভিশপ্ত জীবন বলে ভাবতে শুরু করে। তার উপর গ্রামে ফিরে দেখে, তার যুদ্ধে যাবার অপরাধে রাজাকাররা তার পরিবারের সবাইকে ঘরে বন্দি করে আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে। কেউ বাঁচেনিÑবাবা, মা, ছোটবোন এমনকি বাড়ির প্রিয় গরুটাওÑকেউ না। নিঃসঙ্গ একাকি জীবনে হাবু ধীরে ধীরে বৃন্তচ্যুত শীতের শুকনো পাতার মত রঙ বদলাতে থাকে। হাবু মুক্তিযোদ্ধা কখন যে হোব্বাপাগলায় রূপান্তরিত হল গ্রামবাসী এখন ঠিক করে মনে করতে পারবে না।
তোরাব আলী তার লোকজন সমেত ঈদগাহে ঢুকলে চারিদিকে গুনগুন, বুনবুন রব উঠলজ্জ‘এম.পি সাহেব এসেছে। এম.পি সাহেব এসেছে।’ একজন দলীয়কর্মী হাবুর কাছে এসে বলল, ‘এই উঠ। এখানে তুই কী করছিস পেছনে গিয়ে বস। যাহ।’
হাবু ভয় পেয়ে দ্বিতীয় কাতারে গিয়ে বসল। আবার দ্বিতীয় কাতার থেকে চোখ রাঙানি দিয়ে একজন তাকে পেছনে যেতে বলল। সে এভাবে পেছাতে পেছাতে পেছনের শেষ সারিতে গিয়ে পড়ল। হাবু দাঁড়িয়ে তোরাব আলীকে দেখার চেষ্টা করে। তোরাব আলী প্রথম কাতারে ঠিক তার স্থানটাই বসেছে। হাবু বিড়বিড় করে কীযেন বলছে আর খিল খিল করে হাসছে। পাশের এক বালক ইশারায় তাকে চুপ করতে বলে। ভয় পেয়ে এবার সে সত্যি চুপ হয়ে যায়।
নামাজ শেষে হাবু পাগলা তোরাব আলীর গাড়ির পাশে গিয়ে দাঁড়ায় আর আকাশের দিকে তাকিয়ে মন্ত্রের মত বিড়বিড় করে কী যেন বলেজ্জহয়ত কিছুই বলে না। রসের ভারে ঝরে পড়া মৌচাকের টুকরোর সাথে দলাপাকানো মৌমাছির মত মানুষগুলো তোরাব আলীকে ঘিরে গাড়ির দিকে এগিয়ে আসে। হাবু তোরাবকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার দেয়, ‘হামাকে তোমার সঙ্গে লিয়ে তোর বাড়ি চল। দেখতে তো পাছিস হামি ল্যাংড়া হাটতে পারি না।’ কিন্তু মৌমাছির ভনভন কোরাসে হাবুর কথাগুলো গিলে খেয়ে ফেলে অথবা তোরাব আলী শুনতে পেলেই বা কী এমন হত।
হঠাৎ এম.পির গাড়ির চারপাশে মানুষের এমন ঢল নামলে সেখানে খোঁড়া পা নিয়ে হাবুর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হয় না। সরতে সরতে তাকে অনেক দূরে গিয়ে দাঁড়াতে হল। একবার তো সে পড়েই যাচ্ছিল। হাবুর মেজাজ বিগড়ে গেলে সে চিৎকার করে ওঠে,‘ পাজির দল! হামাকে ধাক্কা মারিস! এক্কেরে খিঁচ্চালাব।’ তার গালি শুনে আশেপাশের বাচ্চা ছেলেরা হাসাহাসি শুরু করল। কেউ কেউ আবার গান ধরলজ্জ
‘হোব্বা পাগলা, হোব্বা পাগলা, হোব্বা পাগলা কই?
হোব্বার বউ পোলাও রেধেছে, সঙ্গে আছে দই।’
Ñ‘সারাক সারাক, এখান থেকে। খিঁচ্চালাব।’ হাবু লাঠি তুলে মারতে উদ্যত হল। ছেলেগুলো যে যেদিকে পারল দিল ছুট। হাবু খোঁড়াতে খেঁাঁড়াতে রওনা দিল তোরাবের বেহেস্তখানায় একটা দিন কাটাতে। এভাবে খুঁড়িয়ে এগুতে গিয়ে ঈদই শেষ হয়ে যায় কী না এই আশঙ্কার মধ্যে আছে হাবু। হঠাৎ রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে তার ছায়ার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলল সে, ‘তুই কেনে হামার সাথে আসছিস যাহ বাড়ি যাহ।’ সামান্য হাঁটতে গিয়ে আবার দাঁড়িয়ে পড়ে তার ছায়ার দিকে রাগের দৃষ্টিতে তাকায়, ‘আবার হামার পিছা লিছে! এক্কেরে খিঁচ্চালাব।’এগুতে এগুতে বিড় বিড় করে পোংঠা সব পোলাপানদের চৌদ্দোগুষ্ঠি উদ্ধার করে চলল সে, ‘সব বেঈমান। হামার সাথে বেঈমানি। হামার পিছে ক্যালা ছায়া ল্যালিয়ে দিয়েছে? কাহুকে হামি ছাড়ব না। খিঁচ্চালাব।’ রাগে হাতের চেটো দিয়ে নাক ঘষতে থাকে সে। তোরাবের তিলোত্তমায় যখন পৌঁছাল হাবু ঘেমে নেয়ে একাকার। তৃষ্ণায় গলা ফেটে যাচ্ছে ওর। চৈত্রের কুকুরের মত হাঁপাতে হাঁপাতে হেঁটে চলা পথচারীদের বলে, ‘এই বলত ঈদ আছে না শেষ?’ হাতের লাঠিটা ঠক ঠক করে কাঁপছে। তিলোত্তমার সামনে অসংখ্য মানুষের ভিড়। এই ভিড় ঠেলে ভেতরে যাওয়া হাবুর সাধ্যি নেই। তবু সে ভিড়ের চাপাচাপির মধ্যে নিজেকে নিয়ে ফেলল, ‘এই সর কহোছি এম.পি হাকে দাওয়াত করেছে। এক্কেরে খিঁচ্চালাব।’ ভিড়ের চাপে দম বের হবার যোগাড় সবার। বাড়ির প্রধান দ্বারে দাঁড়িয়ে কয়েকজন দলীয় ক্যাডার মোটা লাঠি ঘুরাচ্ছে আর বলছে, ‘আস্তে আস্তে।’ ‘একজন করে।’ ‘লাইনে।’ ‘সিরিয়াল, সিরিয়াল।’ ক্রমশ মানুষের ঢল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। শত কণ্ঠের মধ্যে হাবুর আতঙ্কিত চাপা স্বর স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে, ‘সর, সর, এক্কেবারে খিঁচ্চালাব।’
এত দিন তোরাব আলী বেশি মানুষ দেখলে খুশি হতজ্জদলের সমাবেশে অথবা নির্বাচনী জনসভায় মানুষ যত বেশি, ততই তার মন আনন্দে নেচে উঠত। আজ হয়েছে তার উল্টো। অতিরিক্ত মানুষের ঢল দেখে প্রথমে সে বিরক্ত হয়েছিল কিন্তু ধীরে ধীরে সে বিরক্ত আতঙ্কে পরিণত হয়। আজ কী তার প্রসাদদুর্গ ভেঙে ফেলবে নাখাক্কা মানুষের দল? মানুষের ¯স্রোত শেষই হয় না। মানুষ আসছে তো আসতেই আছে। সে ভয় পেয়ে থানায় ফোন করে। হঠাৎ পুলিশ কোথা হতে বাঁশিতে শীৎকার দিতে দিতে দৌড়ে এসে তোরাব আলীর মেহমানদের উপর লাঠিচার্জ শুরু করে। দলের ক্যাডাররা বড় বড় বাঁশ নিয়ে মারমুখী হয়ে মানুষের উপর চড়াও হল। শুরু হয়ে গেল দৌড়াদৌড়ি, ছোটাছুটি, ধাক্কাধাক্কি… ব্রাত্যজনের হাজার বছরের পুরনো বহুচেনা পদোবিউগলের সুরের মাঝে তাদেরই অতি চেনা একটি মানুষের আর্তনাদ হারিয়ে যেতে থাকে রক্ত-জলের সোদাগন্ধ মাখা ধুলোর স্তরে স্তরে। বাঙালির অজ¯্র পায়ের বঞ্চনার গল্প লেখা হতে থাকে একটি মানুষের বুকের জমিনে।

পরের দিন দৈনিকগুলোতে সংবাদ হলজ্জএম. পি তোরাব আলীর বাড়িতে ঈদের দিনে প্রীতি সাক্ষাতে গিয়ে মানুষের ভিড়ে পায়ে পিষ্ট হয়ে মারা গেছেন একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। তাকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে।

শর্ষে ফুল ও কর্পোরেট ভালবাসা

কুয়াশার তুলোয় মোড়া হলুদ বল যেন, ঝুলে আছে ম্লান আলো নিয়ে ল্যাম্পপোস্টে। তীব্র শীত-রাতের শেষার্ধ। ট্রেন থেকে নেমে পিছন ফিরে একবার দেখে নিল সদ্য স্টেশন-ত্যাগী ’ধূমকেতু’। ধূমকেতু এক্সপ্রেসেই সাপ্তাহিক বাড়ি ফেরা মুহিতের।
পাশা মুহিতুর রহমান ওরফে মুহিত পাশা বেসরকারি অফিসের মাঝারি গোছের কর্মকর্তা। কদাচিৎ লেখালেখি করলেও এ পরিচয়টা গোপন রাখতেই পছন্দ করে। উপজেলা শহরে বেড়ে ওঠা মুহিত বিগত পাঁচ বছর ধরে রাজধানি থেকে বার বার ফিরে আসে এই উপজেলাতেই প্রাণের টানে, মনের ঘ্রাণে। অবরোধ-হরতাল ছাড়া আর কোনো কিছু পরোয়া করে না সে। করবেই বা কেন, এখানেই তার সংসার, প্রিয়তমা স্ত্রী-শাহানার আস্তানা, পরম ঠিকানা। শাহানা সরকারি স্কুলে পড়ায়। সরকারি বলে কথা! স্থায়িত্ব,নিশ্চয়তা, দীর্ঘদিন ছুটি পাওয়া পেনসন, মুহিতের বেসরকারি ‘এই আছে এই নেই’ গোছের চাকরির বিপরীতে বড় হয়ে দেখা দেয়। এসব যুক্তির কাছে নত হয়ে মুহিতের ঢাকায় চ্যাপ্টা হয়ে পড়ে থাকা, মনে মনে মরে যায় স্ত্রীকে নিয়ে একসাথে ঢাকায় থাকার তুমুল বাসনা।
কিছু আগেই হয়ত রাত-প্রহরী শেষ সাঁজাল জ্বালিয়ে উত্তাপের উপমা নিয়ে জবুথবু শুয়ে থাকে পোস্টাফিসের বারান্দায়। ধোঁয়ার কুণ্ডলি কুঁজো হয়ে নুয়ে পড়ে কুয়াশায় ভিজে ভিজে, দাঁড়াতে পারে না মাথা উঁচু কোরে। দাঁড়াতে পারে না কুকুরটিও, শুয়ে থাকে সাঁজালের পাশে।
মুহিত পায়ে পায়ে পৌঁছে যায় বাড়ির বারান্দায়।এখন আর কলিং বেল লাগে না, সেলফোনেই সেরে নেয়া যায়। হলোও তাই। ’আসছো..? খুলি… এত শীতে…’। সেলফোনের জটিল অজানা তরঙ্গ পেরিয়ে কোনো এক অতল গভীর ঘুমের দেশ থেকে যেন ভেসে এল আদ্রতায় মেশানো এক কুসুম কণ্ঠস্বর, ছড়িয়ে যায় মুহিতের মুগ্ধ-মৌন চৈতন্যে। সূর্যহীন ভেজা-ভোরের বার্তা পাওয়া গেল পাখির কলতানে। ভালবাসার ওমে টুপটাপ শিশিরের শব্দ টিনের চালে গলে গলে পড়ে। মুহিত শুয়ে থাকে দীর্ঘসময় লেপের ভেতর।
‘চা খাও, আমি হেঁটে আসি’ বলে সিথানের পাশে কাপ রেখে বেরিেেয় গেল শাহানা। রক্তের শর্করা বেড়ে গেলে এমনটাই বিধান। সন্তান প্রত্যাশায় নিয়মিত চেক-আপে সম্প্রতি ধরা পড়েছে। তাই নিয়ম মেনে রুটিন বেঁধে জীবনযাপন। দরজা টেনে দেয়ার শব্দ, কোমল কেড্স-এ মোড়ানো নরোম পা ক্রমশ দূরে সরে যায়, ঘাসের ডগায় লেগে থাকা শিশিরে ভিজে ওঠে শাহানার পা। মুহিত দেখতে পায়। অনুভূতির প্রসারিত চোখ চোখে-চোখে রাখে। আহা! এমন হয় না কেন প্রতিটি সকাল, প্রতিদিন পায় না কেন সাহানার সান্নিধ্য-সোহাগ, পায়ের আওয়াজ!
‘এভাবে কতদিন আর আসা যাবে জানি না। অবরোধ-হরতালে প্রতিদিন যেভাবে মানুষ পুড়ছে-মরছে, খুব ভয়ে ভয়ে গাড়িতে বসে থাকি। মনে হয় এই বুঝি জানালা ভেদ করে ঢুকে পড়লো পেট্রল বোমা। প্রতিটি মুহূর্ত আতংকে থাকতে হয়’জ্জনাস্তার টেবিলে এসব বলাবলির ফাঁকে শাহানার হাতে ধরিয়ে দিল সদ্য প্রকাশিত একটি কবিতার বই। একাত্তরের এলিজি- মামুন মুস্তাফা।
‘তোমার কবি-কলিগ?’
‘হ্যাঁ, তুমি এর লেখা আগেও পড়েছ। এটা কিন্তু অন্যরকম লেখা। তুমি তো একাত্তরের চিঠি পড়েছ, সেখান থেকে কয়েকটি চিঠির গভীরতম অনুভূতির অতল থেকে তুলে আনা শব্দাবলিÑপড়ে দেখ ভাল লাগবে।’ চা খেতেখেতে কটি কবিতা পড়েও ফেলে শাহানা।
‘তোমার কলিগ লেখে, সেও তো ব্যস্ত। তুমি লেখ না কেন? সেই কবে লিখেছ! তোমার লেখা পড়ে পড়েই তোমার প্রেমে পড়লাম, আর তুমি লেখাই ছেড়ে দিলে।’
‘বিয়ে করেইতো এসব হলো। এইতো এখন বলবেজ্জগ্যাস আনো, বিদ্যুৎ বিল দাও, পেপার বিল দাও, বাজার করে আসো, ওসুধ নাই, দোকানের বাকিÑকত কি!’
‘আবার চেষ্টা করো না প্লিজ। এখনই তো সময়। দেখ না সময়টা আশির দশকের মত টালমাটাল হয়ে উঠছে। সময়কে ধরে ধরে কবিতায় পুরে দাও। আবার কবি হয়ে যাও।’
‘যথার্থ লিখতে হলে, কবি হতে হলে মানুষের কাতারে থাকতে হয়, জানো তো?’
শাহানার প্রেরণা মুহিতের ভালই লাগে। আরও একবার প্রবল-প্রতাপে ছুঁয়ে দেখতে চায় শাহানাময় রা.বি’র তাপসি রাবেয়ার করিডোর, মতিহারের সবুজ চত্বরে খোলা গলায় শব্দের বিচ্ছুরণজ্জ‘আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই’। সেই শাহানা, শাহানা কতকিছু বোঝে, বোঝে না শুধু এনজিও অফিসের ঘুপচি টেবিলে কি-বোর্ডের শব্দতলায় তলিয়ে যায় কত স্বপ্ন, কবিতার কত লাইন! যাপিত কর্পোরেট জীবনের ইঁদুর দৌড়ে ময়লা-ধুলোয় শুধু বয়স বাড়ে, বাড়ে না অন্যকিছু। এ এক কাঁচুমাঁচু জীবনের রোজনামচা। কেন্নোর মত গুটিসুটি বেঁচে থাকা। ‘বেঁচে-থাকা’জ্জসত্যবোধ করে না মুহিত, বরং বলা যায় এখনও বাতাসের নামে কী সব আসা যাওয়া করে নাকের ভেতর দিয়ে। সমুদয় কাজ শেষে বিকেল আসে।
মুহিতের ইচ্ছে করে শাহানার সাথে হাঁটতে। গ্রামের রাস্তায়, হলুদ শর্ষে ক্ষেতের আল ধরে, পাশাপাশি অনেকদূরজ্জযতদুর চোখ যায় চাপচাপ হলুদ ছুঁয়ে। বেরিয়েও পড়ে দুজন। সন্ধ্যা সমাগত হলে সিএন্ডবি রাস্তার শেষে বিস্তীর্ণ মাঠ সংলগ্ন পুরোনো বটগাছ। কত গাছই কাটা পড়ে চলে গেছে ইঁটের ভাটায়। মাত্র ক’টি এখনও খাড়া হয়ে আছে, হয়তো দোকানিদের দরদামের আশায়। রজবের টি-স্টল। আজও আছে। রজব চাচা বলেই ডাকা হতো। কত মানুষ এসেছে এ স্টলে একসময়। তখনও রাস্তা হয় নি। মধ্যদুপুরের সুনশান নীরবতায় রেল স্টেশন থেকে মাঠ বরাবর গরুর গাড়ি আর দু’পাই ছিল সম্বল। কেরোসিনের বদলে এখন বিদ্যুত, বাতি, পাখা, রঙিন টিভি, কত কি! শাহানাকে নিয়ে চা খেতে ঢোকে মুহিত। কোণার দিকের টেবিলে বসে চা-এর কথা বলে।
‘ক্যারে বা আইছু, বউমা’ক লিয়ে আইছু, ম্যালাদিন পর আলু।’
রজব চাচার সহজিয়া কথায় প্রাণের ঝলকানি চকচকে বাল্বে প্রতিফলিত হয়। দুএকটি মামুলি কথা, চা খাওয়া, তারপর চলে যাওয়া। খুব সহজেই পারে মুহিতেরা। মুহিতের মনে পড়েজ্জকবে কোন অচেনা অথচ বিশ্বস্ত হাতে পাতার পর পাতা ভরা লেখা, যুগযুগান্তের শৃঙ্খলিত মানুষের মুক্তির কথা, বিশ্বময় সাম্যের স্বপ্ন সঞ্চারণ, কত চিরকুট হস্তান্তরজ্জস¦ভাবজাত ঘাড় বাঁকা করে থাকা রজব চাচার কাছে নিয়েছি-দিয়েছি। আজ সেসব কেবলই স্বপ্ন-স্মৃতি-রোমান্টিক অনুভব কখনো-সখনো। আজ ফিরে আসার কালে মুহিতের মনে হয়, হায় রজব চাচা, তোমার মাথা স্বভাবজাত হেলে থাকে বামে। আর আমার! আমাদের! আমাদের মাথাটা ডানে-বামে দুলতে দুলতে কেমন হেঁট হয়ে হেলে আছে, নুয়ে আছে, তোমার এবং তোমাদের কাছে! তুমি দেখতে পাও না! কেউ দেখতে পায় না! সঙ্গে থাকা শাহানাও।
হাঁটতে হাঁটতে কথা তোলে শাহানা ‘আমার বান্ধবী সুমির কথা মনে আছে? ঐ যে ভার্সিটিতে একসাথে পড়তাম। খুব করে বলেছে ঢাকায় যেতে। নিয়ে যাবা?’
‘যাবা, চলো। দুদিন অবরোধ নাই। গেলে আজকেই। স্কুল ছুটি আছে না?’
‘হু’, একটু থেমে শাহানা আবার বলে, ‘আজকেই? সেইতো মাঝরাতের ট্রেন, তাইতো? জানো, সুমির হাজব্যান্ড ওর ম্যারেজডেতে ওকে একটা ফ্লাট গিফ্ট করেছে। ও খুব খুশি।’
‘সুখী তো?’
‘অবশ্যই সুখী।’
‘ফ্লাট গিফ্ট! বাব্বাজ্জওর হাজব্যান্ডের নিশ্চয় অনেক টাকা।’ মুহিত হলুদের শেষে শুকনো খটখটে রাস্তায় চোখ রাখে।
‘তা আর বলতে! পেট্রোবাংলায় চাকরি করতো, এখন করে না। কী সব ইমপোর্ট-এক্সপোর্টের বিজনেস করে। যাকগে, আমি কিন্তু যাচ্ছি।’
অবশেষে যাবার আয়োজন। অনেকদিন একসাথে দীর্ঘ ভ্রমণ হয় না। আজ হবে। ডেকেও নিয়ে যাওয়া যায় না শাহানাকে, আজ স্বেচ্ছায়। ভাবতে ভালই লাগে। শর্ষে ফুলের গন্ধে ভরে থাকে মুহিতের মন।
দুই
সত্যি এবার শাহানা ঢাকায় এসেছে। অনেকদিন পর। আসি আসি করেও দেরি হয়ে গেছে বেশ। অবরোধ হতে পারে। আটকে যাবার ভয় আছে। স্কুলের ছুটিও প্রায় শেষ। কিছু কেনাকাটা করে শাহানা। সময় নষ্ট করা যাবে না। অফিস শেষে শাহানাকে নিয়ে সুমিদের বাসায় গেল মুহিত। শীতের রাত আটটা-ই অনেক। ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকা। লেকের ধারে। নতুন ভবনের তিনতলা। দখিন দুয়ারী। কলিং বেল। খুলে গেল দরজা, খুলে গেল মনের দরজাও। জড়িয়ে ধরা, লুটোপুটি, খুশিতে ছোটাছুটি। কথারা চলছে কলকল করে। মুহিতের ভালই লাগছে, শাহানার গাম্ভীর্য মেশানো সুশ্রী মুখে যেন ‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে’।
‘আয়, ঘুরে ঘুরে দেখ।’ টেনে তুলে নিয়ে গেল সুমি। মুহিতেরও গত্যন্তর নেই, পিছু নিল।
‘এই ফ্লাটটার কথাই তোকে বলেছিলাম, এবার ম্যারেজডেতে গিফ্ট করেছে। বুঝলি আমিতো অবাক! ঘরে যা দেখছিস সব কিন্তু বাইরের, দেশের একটাও না। প্রায় দুই কোটি লেগেছে।’
‘খুব সুন্দর, তোর ভাগ্য বলে কথা, আনকমন, তোর বরটাও আনকমন নাকি রে। ওকে বলেছিস? আমরা আসব জানে? সেই কবে দেখা, বিয়ের দিন।’
‘বলেছি, সময় পেলে আসবে। প্রতিদিন রাত একটার পর আসে। বছরে আর কয়দিন বা এখানে থাকে, বেশি সময়তো বিদেশেই কাটায়। আসলে ও এত ব্যস্ত! আর ব্যস্ত না থাকতে পারলে পুরুষ হলো কেমন কোরে। এই সময়ে ব্যস্ত থাকতে পারা, ভাল ইনকাম করতে পারা একটা যোগ্যতার ব্যাপার বুঝলি?’
ফ্লাটটা ঘুরেঘুরে দেখতে থাকে শাহানা, দেখাতে থাকে সুমি। শাহানা-মুহিত নির্বিকার পর্যবেক্ষক। ড্রইংরুম, বেডরুম, রিডিংরুম, কিচেন, ব্যালকনি এমনকি ওয়াশরুম পর্যন্ত দেখতে হলো, সুমির দেখানোর দাপটে। মুহিত দেখতে থাকে অর্থের অন্ধকারে অস্বচ্ছ-অসহ্য পোয়াতি রূপটা।
রিডিংরুম ভর্তি বুকসেলফ আর সেলফ ভর্তি দেশী-বিদেশী বইয়ের গাদা। গাধাদের পাঠ উপযোগী বইও কম নাই। মুহিত দেখতে থাকে বইগুলো।
‘এত বই! তোমার হাজব্যান্ড পড়ে কখন, সময় পায়?’
‘না না, এসব একবারে একদিনে মিনি ট্রাকগুলো আছে না? ওইটা ভর্তি কোরে কিনে আনলো। আমি তো ভাবলামজ্জযাক বাসায় বই পড়বে, তার মানে ওকে বেশি বেশি বাসায় পাবো! তা আর হলো কই?’ সুমির শব্দ-স্বরে সুস্পষ্ট কম্পন। ট্রাকভরে বই এনে বললো, ‘এগুলো ধীরে ধীরে সাজিয়ে রাখো সেলফে।’
‘এত বই পড়বে কখন?’ প্রশ্ন করলে বললো, ‘পড়বো কেন? বইতো পড়ে সফল হওয়ার জন্য। আমি তো সফল। সফল না? আমার কীসের অভাব? পড়তে হবে কেন? সাজিয়ে রাখো, এটা স্ট্যাটাসের ব্যাপার বুঝেছো?’
‘আমি তো শুনে হতবাক। কী করবো, সাজিয়ে রেেেখছি। কলেজে হেলাল হাফিজ, রফিক আজাদ, রুদ্র’র কবিতা পড়তাম, আবৃত্তিও করতাম, মনে আছে তোর? এখনও একটু আধটু পড়ি। তুইতো ছিলি যাকে বলে পড়–য়া। মুহিত পাশার কবিতা হলে তো কথাই নাই! কী মুহিত ভাই এখনও লেখেন না?’
‘টুকটাক। এভাবেই টাক পড়ে গেল, নতুন লাইন আর গজালো না!’
শাহানা বললো ‘সুমি তোদের আরেকটা বাসা আছে না, বলেছিলি?’
‘হ্যাঁ, আরও তিনটা। উত্তরায়, বারিধারায় আর ইস্কাটনে। এইটা নিয়ে চারটা।’
‘ভালই আছিস।’
‘হ্যাঁ ভালইতো। টাকা-পয়সা কোনো সমস্যা না বুঝলি?’
বুকসেলফ-এর বইগুলো দেখতে দেখতে, দেখাতে দেখাতে কথা চলছে, কথা বলছে। আশির দশকের দুএকটি কবিতার বই টেনে নিয়ে খুলে খুলে মনে করিয়ে দিলজ্জ‘মনে আছে? এটা যখন প্রথম পড়ি, কি যে মজা, তুইও পড়েছিলি, সে কী কাড়াকাড়ি, মনে আছে?’ সুমি বলে।
মুহিত এখন নির্বোধ পর্যবেক্ষক। দেখছে বইগুলো, নাকি দেখছে সুমির স্বামীর রুচির পরিধি। সুমি আরেকটি বই তুলে নিল।
‘দেখ দেখ এই বইটা।’ তৃষ্ণার কলস। কভার পেজ খুলেই দেখতে পেল লেখা আছে- ‘উৎসর্গ: একান্ত আপন যে জন, বন্ধু তুমি বধূ তুমি…শাহানাকেজ্জমুহিত পাশা’।
নীরবতা। হঠাৎ শৈত্য প্রবাহ যেন ঘরময়। সুমি শাহানার দিকে তাকায়। শাহানা মুখটিপে কী এক পরম আত্মপ্রসাদে চেয়ে থাকে সুমির দিকে। সুমিও তাকায়, না কি হারায় কিছু!
‘তোর অনেক আছে, আবার আমার যা আছে তা তোর নেই। এই প্রাসাদ, কোটি কোটি টাকা তোকে হয়তো সাধারণ আনন্দ যোগাতে পারে, কিন্তু তৃষ্ণা মিটবে না। ভাল করে চেয়ে দেখজ্জতোর সবই শূন্য, ফাঁকা। অথচ ঐ একটি তৃষ্ণার কলস আমাকে দিয়েছে গভীর শান্তি, পৃথিবীতে বেঁচে থাকার, আত্ম-পরিচয়ের প্রতিষ্ঠা। যা তোর নেই, কখনও পাবিও না, কোটি টাকাতেও’জ্জশাহানার উচ্চারণের ঝলকানিতে সুমির রক্তহীন-ফ্যাকাসে মুখটা ধরা পড়ে যায়, যা ঢাকতে পারে নি বিদেশী ঝাড়বাতিও।
শীতের রাত, প্রায় এগারো। যেতে হবে ফিরে মুহিতের ঢাকাস্থ ভাড়া করা ঘুপচি ঘরে। ডিনার সেরে শাহানা মুহিত নেমে আসে নীচে। সুমি ব্যালকনিতে দাঁড়ায়। রিক্সায় চেপে বসে দুজন। কুয়াশার সাদায় সুমির অভিজাত অনুভূতিতে শাহানা কি দিয়ে গেল কাফনের শুভ্র শূন্যতা! রিক্সা ছোট হয়ে আসে ক্রমশ, আর বড় হয় সুমির শূন্যতা। রিক্সা দৃষ্টির আড়াল হলে সুমির কর্নিয়া ক্যামেরার মত স্থির হয় একাকী দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্পপোস্টে। দারুণ নিঃসঙ্গতায় ঝুলে থাকা বিমর্ষ বাল্ব, যেন তুলোয় জড়ানো এক হলুদ টেনিস।

বুদ্ধদেব বসুর কথাসাহিত্য : ভাষার ভেলায় ভাসাই তরী

বুদ্ধদেবের কথাসাহিত্যের বহর দেখে বিস্ময় প্রকাশের অবকাশ আছে। তিনি দুহাতে উপন্যাস লিখেছেন_একথা বললে তাঁর উপন্যাসের সংখ্যাধিক্যের ধারণা স্পষ্ট হয় না। বোধকরি দুর্গাদেবির সুদৃষ্টি ছিল তাঁর প্রতি, তাই দশহাতের শক্তি এসে ভর করেছিল বুদ্ধদেবের এক হাতে। তাঁর কথাসাহিত্যের খোঁজখবর যতটুকু জানি, তা থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব নয় যে, এমন কোন গল্প কিংবা উপন্যাস তিনি লেখেন নি, যা পাঠ করে পাঠকের মনে হতে পারে, বুদ্ধদেব তাঁর নামের প্রতি অবিচার করেছেন। নিজের লেখা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তিনি রবীন্দ্রনাথের যোগ্য উত্তরসূরি। নিজের কবিতার বৈষয়িক পরিমণ্ডল থেকে তিনি উপন্যাসের রসদ সংগ্রহ করেছেন, আবার উপন্যাসের ফ্রেম থেকে আলোকপ্রাপ্ত হয়ে নাটকের জন্ম দিয়েছেন। নাটক ও উপন্যাসের মনোদৈহিক রসায়ন থেকে কবিতায় ফিরেছেন_এমন দৃষ্টান্তও উল্লেখ করার মতো। কোন্ শক্তি বুদ্ধদেবকে এই বিপুলায়তন সৃজনবিশ্বের প্রতিভূ হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে, তার উত্তর অনুসন্ধানে অবতীর্ণ হওয়ার আগে সঙ্গ : নিঃসঙ্গতা রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থের ‘রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ ও গদ্য’ শীর্ষক রচনায় রবীন্দ্র-প্রতিভার স্বরূপ বিষয়ে বুদ্ধদেবের একটি মন্তব্যের উল্লেখ করতে চাই :
রবীন্দ্রনাথ গদ্য লিখেছেন কবির মতো; তাঁর গদ্যের গুণ কবিতারই গুণ; যা কবিতা আমাদের দিতে পারে, তা-ই তাঁর গদ্যের উপঢৌকন। যদি কোনো খণ্ডপ্রলয়ে তাঁর সব কবিতার বই লুপ্ত হয়ে যায়, থাকে শুধু নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ, তাহলে সেই প্রবন্ধ নাটক উপন্যাস থেকেইে ভাবীকালের পাঠক বুঝে নিতে পারবে যে রবীন্দ্রনাথ এক মহাকবির নাম।
ব্যক্তিগত শিল্পবিশ্ব নির্মাণের ক্ষেত্রে তিনিও তাঁর সহযোদ্ধাদের মতো রবিরশ্মির তীক্ষèতায় অস্বস্তি বোধ করেছেন এবং রবীন্দ্রসাহিত্যে কী নেই ও সাহিত্যিক হিসেবে তাঁদের কী দেয়ার আছে সে-বিষয়ে বিস্তর বাক্য ব্যয় করেছেন। বলা যায়, তাঁরই তত্ত্বাবধানে ‘রবীন্দ্রপ্রভাবমুক্ত’ ও ‘যুগোপযোগী’ সাহিত্যসৃজনের সংগ্রাম অব্যাহত থেকেছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নে তাঁর মতো উচ্ছ্বসিত কিংবা আবেগতাড়িত পাঠক ও সমালোচক তাঁর সমকালে আর কেউ ছিলেন না। বুদ্ধদেবের মতো বিনত ভাষ্যে তাঁর স্বকালের আর কেউ বলেন নি, রবীন্দ্রনাথের জন্ম না-হলে সাহিত্যস্রষ্টা বুদ্ধদেবের অস্তিত্ব অসম্ভব ছিল। তাঁর মতো করে রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে আর কেউ বলেন নি- আমার কাছে, প্রত্যেক আধুনিক বাঙালি লেখকের কাছে,- কিন্তু বিশেষ করে আমার কাছে আপনি দেবতার মতো।’ বুদ্ধদেব যে দেবতার পূজারী, তাঁর প্রতি শর্তহীন সমর্পণের নজির বুদ্ধদেবসৃষ্ট সমালোচনাসাহিত্যের নিবিড়পাঠকমাত্রই স্বীকার করবেন। সত্যি কথা বলতে কি, রবীন্দ্রনাথের প্রতি বুদ্ধদেবের ভালোবাসার গভীরতা থেকেই আমার বুদ্ধদেব-প্রেম উৎসারিত। রবীন্দ্রনাথের মতোই বুদ্ধদেব আমার কাছে দেবতা নন, তিনি মানুষজ্জবিশেষ এবং ব্যক্তিত্বচিহ্নিত সৃজনশীল মানুষ। বুদ্ধদেব আমাকে শিখিয়েছেনজ্জসাহিত্যসমালোচক যখন বিচারকের আসনে বসেন, তখনই সাহিত্যরসের প্রতি প্রবল অবিচারের উর্বর ক্ষেত্র প্রস্তুত হতে থাকে। সাহিত্য¯্রষ্টার প্রতি নির্মম হলে তাঁর সৃষ্টিতে নিমজ্জিত হওয়ার আগ্রহ অস্তমিত হতে থাকে এবং সাহিত্যের ফুল থেকে মধুর পরিবর্তে কেবলই বিষের উদ্গীরণ ঘটে। রবীন্দ্রনাথের দ্বারে দীনতার লেশমাত্র নেই এবং সেখান থেকে আমরা যতই গ্রহণ করি, সমৃদ্ধ রবীন্দ্রভাণ্ডার শূন্য হবে নাÑ একথা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু বুদ্ধদেব রবীন্দ্রনাথকে পাঠ কিংবা রবীন্দ্রসাহিত্য আস্বাদনের একটি স্বাতন্ত্র্যখচিত মানদণ্ড নির্মাণ করে নিয়েছিলেন। সেই মানদণ্ডের স্বরূপ অনুধাবনের জন্য আমি উপরিউক্ত প্রবন্ধের আরো একটি অংশের প্রতি পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই। একই প্রবন্ধে বুদ্ধদেব উল্লেখ করেছেন :
‘কবি রবীন্দ্রনাথ’, ‘ঔপন্যাসিক রবীন্দ্রনাথ’, ‘প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রনাথ’Ñ এই বিভাগগুলি তাই স্বীকার্য হলেও শেষ পর্যন্ত উপেক্ষণীয়; অর্থাৎ তারা পরস্পরে প্রবিষ্ট, পরস্পরের উদ্দীপক ও পরিপূরক, এবং এক অখণ্ড সত্তার প্রতিরূপ। যে মৌলিক উপাদানে রবীন্দ্রনাথ গঠিত সেটা কবিত্বশক্তি, সেটাই তাঁর গদ্যরচনাকে সপ্রাণ ও সার্থক করে তুলেছে; আগুন যেমন যে-কোনো ইন্ধনে ভাস্বর, তেমনি তাঁর কবিপ্রতিভাও যে-কোনো রূপকল্পে প্রদীপ্ত।
বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময়ী গুরুদেবের গতরে কত রকমের পোশাক পরিয়েছেন তাঁর গুণমুগ্ধ ভক্তরাজ-ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রতীক, আন্তর্জাতিকতার পুরোহিত, শান্তির দূত, দুর্বলের বন্ধু, শোষকের শত্র“, মানব-প্রেমিক, ঈশ্বরপ্রেমিক, পূর্ব-পশ্চিমে মিলনমন্ত্রের উদ্গাতাÑ আরো কত কি। এর সবকিছুই তিনি ছিলেন, কিন্তু বুদ্ধদেবের বিবেচনা : ‘এ-সব স্মর্তব্য হতো না যদি তিনি কবি না-হতেন, তাঁর কবিতার জন্যই তাঁর অন্য সব চেষ্টা অর্থ পেয়েছে, যেহেতু তিনি কবিতা লিখতেন তাই তিনি স্মরণীয় ও বরণীয়।’ বুদ্ধদেবের সাহিত্যকর্মের পরিধি নিশ্চয়ই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তুলনীয় নয়। রবীন্দ্রনাথকে নিবেদিত উপরিউক্ত অভিধার অনেকগুলোই বুদ্ধদেবের ব্যক্তিগত চরিত্র ও শিল্পপরিধির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়; তবু এই দুই শিল্প¯্রষ্টার মৌলবিন্দু চিহ্নিত করার একটা সাধারণ প্রয়াসকে আমি প্রশ্রয় দিতে চাই।
কথাসাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যবিচারে আমার আগ্রহ নেই। বিচারকের আসনকে আমি বরাবরই ভয়ের দৃষ্টিতে দেখি। কারণ সেখানে নির্দোষ ব্যক্তির সাজাপ্রাপ্তির আশঙ্কা যেমন বিদ্যমান, তেমনি দোষী ব্যক্তিকেও নির্দোষ প্রমাণের বিচিত্র আয়োজন অব্যাহত থাকে। সাহিত্যবিচারের যে-সকল নজির আমাদের সামনে উপস্থিত, তার শরণ নিলে পাঠক নিশ্চয়ই আমার বিবেচনাকে অগ্রাহ্য করবেন না। সাহিত্যিককে দণ্ড প্রদানের দায়িত্ব নিয়ে যারা বহাল তবিয়তে করে-কেটে খাচ্ছেন, তাঁদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, সাহিত্যবিচারের মানদণ্ড নির্বাচনে অনেক সমালোচকেরই কাণ্ডজ্ঞানের বিলুপ্তি ঘটে এবং এর ফলে পরের মুখে ঝাল খেতে অভ্যস্ত পাঠকের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও উপেক্ষণীয় নয়। তবুও বলি : মানদণ্ড কেবল বিচারের ক্ষেত্রেই প্রযুক্ত হয় না, আস্বাদন কিংবা অনুধাবনের ক্ষেত্রেও আমরা বিশেষ কোন মানদণ্ডের ওপরই ভরসা করি এবং এখানেও ভুলভ্রান্তির আশঙ্কা উপস্থিত।
আগেই বলেছি, আমি বুদ্ধদেবের কথসাহিত্যের কাঁধে বন্দুক রেখে শিকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছি এবং নির্লজ্জভাবে বুদ্ধদেবের রবীন্দ্র-পাঠের মানদণ্ডকে বুদ্ধদেব-অনুধাবনে ব্যবহার করতে চাই। এই ধারের যুক্তিসঙ্গত কারণ ব্যাখ্যার জন্য বিস্তৃত পরিসর ব্যয় না-করে কেবল এটুকু বলাই যথেষ্ট মনে করি যে, আমার বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথের মতোই বুদ্ধদেবের প্রকৃত পরিচয়, তিনি কবি। শব্দনির্ভর শিল্প¯্রষ্টাদের প্রতিভার রকমফের বিষয়ে সচেতন ছিলেন তিনি, কিন্তু সকল প্রতিভার প্রাণভোমরাই যে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মহামানবের কবিত্বে নিহিতÑ এ-বিষয়ে বুদ্ধদেব নিঃসন্দেহ ছিলেন। স্তেফান মালার্মের বরাত দিয়ে বুদ্ধদেব আমাদের সেই কথাই জানিয়েছেন :
কবিতা আছে ভাষার সর্বত্রÑ ছন্দ থাকলেই কবিতা থাকবেÑ সর্বত্র আছে, নেই শুধু বিজ্ঞাপন ও সংবাদপত্রে। সাহিত্যের যে বিভাগটিকে আমরা ‘গদ্য’ নাম দিয়েছি তাতেও কবিতা আছেÑমাঝে মাঝে খুব ভালো কবিতাÑ নানা রকম ছন্দে তারা রচিত। আসলে গদ্য বলে কিছু নেই : আছে বর্ণমালা, আর নানা ধরনের কবিতা, কোনোটি শিথিল, কোনোটি সংহত, কোনোটি বা একটু বেশি ছড়িয়ে-যাওয়া। যেখানে স্টাইলের দিকে প্রযতœ, সেখানেই পদবিন্যাস।
বুদ্ধদেবের অনেক গদ্যের কাব্যিক সংহতি আমাকে মুগ্ধ করে; এমন অনেক গদ্যাংশ তাঁর কথসাহিত্যের নানা স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে যা তাঁর অনেক গদ্য-কবিতার চেয়েও উৎকৃষ্ট শিল্পকর্ম বলে মনে হয়। আর যে ছন্দের গুণে শব্দ তার আর্থপরিধি অতিক্রম করে পাঠকের কল্পনপ্রতিভায় ভিন্নতর দ্যোতনা সঞ্চার করে, সেই ছন্দের প্রভাবেই তাঁর অনেক গদ্য বৈষয়িক পুনরাবৃত্তির একঘেয়েমিকে আড়াল করে পাঠককে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। বুদ্ধদেবের কথাসাহিত্যের প্রতি আমার আগ্রহের মৌল কারণ : কবিতার মতোই তাঁর কথাসাহিত্যের পদবিন্যাসেও আমি লক্ষ করি বিপুল যতেœর ছাপ। কথাসাহিত্যের পাত্রপাত্রীদের যেহেতু সম্পূর্ণত ভাষার ওপরই নির্ভর করতে হয়; সেখানে অঙ্গভঙ্গি, কণ্ঠস্বরের উঠানামা, চোখের ব্যঞ্জনা অনুপস্থিত থাকে, তাই বুদ্ধদেবের বিচারে ‘ভাষার সম্পূর্ণতা চাই সেখানে, যার জন্য লেখকের পক্ষে কলাকৌশলে নৈপুণ্য প্রয়োজন।’ বুদ্ধদেবের কলানৈপুণ্যে অনাস্থা প্রকাশের সুযোগ নেই, বরং এই নৈপুণ্য অনেক সময় এমন নিষ্ঠুর পর্যায়ে উন্নীত হয় যে, পাঠক তাঁর শিল্পিত সত্যের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। ‘আমরা আমাদের নিজেদেরই মনের কথা ভালো করে বলতে পারি না, লেখক আমাদের হয়ে তা-ই করেন এবং এইজন্যই তিনি শিল্পী নামের অধিকারী।’Ñ বুদ্ধদেবের এই বিবেচনায় আমার সম্মতি আছে; তবু এই দাবি উপস্থাপন অসঙ্গত নয় যে, আমাদের হয়ে যিনি আমাদের মনের কথাকে আমাদের উদ্দেশ্যে পরিবেশন করবেন, তাঁকে সব সময় কেবল নিজের দিকে তাকালে চলে না, পাঠকের দিকেও দৃষ্টি দিতে হয়।
একজন সাহিত্য¯্রষ্টার শিল্পকর্মের মৌল প্রবণতার অনুসন্ধান কিংবা শিল্পী হিসেবে তাঁর ব্যক্তিত্বের বিশেষত্ব সনাক্ত করার ক্ষেত্রে ংঃুষব রং ঃযব সধহজ্জএই প্রবাদপ্রতিম উচ্চারণের প্রতি আমার পক্ষপাত স্পষ্ট। বর্তমান নিবন্ধে বুদ্ধদেবের কথাসাহিত্যের গতি ও গভীরতা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ নেই, এমনকি এ-কাজের যোগ্য লোকও আমি নই। তাঁর বিপুলায়তন গল্প-উপন্যাসের ভাণ্ডার থেকে শ্রেষ্ঠ রচনা কিংবা সধংঃবৎঢ়রবপব নির্বাচনের মতো অর্বাচীন প্রয়াসেও আমি বাক্য ব্যয় করতে রাজি নই। এ-কাজের উপযুক্ত ব্যক্তি নিশ্চয়ই আছেন, আমার ক্ষেত্রে কেবলই লাঠি বাজবে। লাঠালাঠির যে রাজনৈতিক বাস্তবতায় বসে আমি বুদ্ধদেবকে স্মরণ করছি, সেখানে দেশপ্রেমের বড়ই অভাব অনুভূত হচ্ছে; এমনকি ব্যক্তিগত প্রণয়ের পৃথিবীও ব্যবসায়িক কিংবা বৈষয়িক বোধবুদ্ধির দাপটে রক্তাক্ত হচ্ছে। জন্মভূমি কিংবা স্বদেশ-বিষয়ে বুদ্ধদেব বসু বড়ই নির্বিকার; স্বদেশের বন্দনা করে শিল্পসৃষ্টির প্রয়াসকে তিনি খুবই সন্দেহের চোখে দেখেছেন। কিন্তু তাঁর কথাসাহিত্যে মানব-মানবীর প্রেম নানা মাত্রায় নিরীক্ষিত হয়েছে। তাঁর উপন্যাসে প্রেমের ধরনধারণ কিংবা গতিবিধি বিষয়ে কয়েক হাজার পৃষ্ঠা লেখার পরও মনে হবে, খুব সামান্যই বলা হল; কিংবা মনে হতে পারে : কিছুই তো বলা হল না; অর্থাৎ এ-প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়ে এই বোধ জাগ্রত হওয়া খুবই সম্ভব যে, বুদ্ধদেবের প্রেম-সমুদ্রের কিনারে নুড়ি কুড়াতেই ‘কাগজ গেল দিস্তা দিস্তা, কলম গোটা ছয়’। তাই তাঁর কথাসাহিত্যের প্রেম-সমুদ্রে অবগাহনের প্রলোভনকে প্রত্যাখ্যান করে তাঁর রচনাপুঞ্জের ভাষা অর্থাৎ শৈলি-বিষয়ে দুচারটি কথা উল্লেখ করতে চাই।
বুদ্ধদেবের কথাসাহিত্যের ভাষিক সমৃদ্ধি আলোচনায় তাঁর গল্প ও উপন্যাসের বিষয়কে ছুটি দেয়ার সুযোগ নেই। কারণ কথাসাহিত্যের বিষয়ই এর গঠনশৈলির নিয়ন্তা। যে-কোন শিল্পকর্মেই এর ¯্রষ্টার মুখচ্ছবি মুদ্রিত থাকে। কখনো কখনো মুখের গড়নটি হয়তো-বা অধরা কিংবা অস্পষ্ট মনে হতে পারে, কিন্তু মহৎ শিল্পকর্মের হৃৎপিণ্ডের ওপর নিবিড়ভাবে কান পাতলে ¯্রষ্টার পায়ের শব্দ নিশ্চয়ই শোনা যাবে। শিল্পকর্মভেদে মুখচ্ছবির দৃশ্যায়ন কিংবা অনুধাবনে যেমন ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়, তেমনি পায়ের শব্দেও থাকে নানা বৈচিত্র্য ও বৈপরীত্য। বুদ্ধদেবের কথাসাহিত্যের বৈষয়িক পরিমণ্ডল এবং ব্যক্তি বুদ্ধদেবের উপস্থিতির স্বরূপ সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাসে নৈঃসঙ্গ্যচেতনার রূপায়ণ গ্রন্থের মন্তব্য স্মরণ করা যাকজ্জবুদ্ধদেব বসু তাঁর সাহিত্যে, বিশেষত উপন্যাসে, নাগরিক মধ্যবিত্তশ্রেণীর চিত্তসঙ্কট, হার্দ্য-জটিলতা, কৈশোরক স্মৃতিমুগ্ধতা, মনোজৈবনিক কামনা-বাসনা এবং দাম্পত্য-বিচ্ছিন্নতার শিল্পরূপ নির্মাণ করেছেন। আত্মজৈবনিক উপাদানে গড়ে-ওঠা বুদ্ধদেবের উপন্যাসভুবন, বস্তুত, তাঁর ব্যক্তিচেতনারই শৈল্পিক প্রতিভাস। তাঁর কথাসাহিত্যে যে-সব নায়কের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়, তাদের সকলের অবয়বেই বিম্বিত হয় ব্যক্তি-বুদ্ধদেবের ছবি, তাদের কণ্ঠে শোনা যায় বুদ্ধদেবের আত্ম-অনুভূতির স্বরগ্রাম।
সমালোচক উপরিউক্ত মন্তব্যের সারবত্তা প্রমাণের প্রয়োজনে কেবল বুদ্ধদেবের আত্মজৈবনিক উপন্যাসসমূহের ওপরই নির্ভর করেন নি, বুদ্ধদেব-বিষয়ে বিদগ্ধজনের মন্তব্যের দিকেও আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বাংলা কথাসাহিত্য : প্রকরণ ও প্রবণতা গ্রন্থে উল্লেখ আছে, বুদ্ধদেবের কথাসাহিত্যে যে ব্যক্তিচেতনার উদ্ভাসন ‘তা অনেক পরিমাণে লেখকের আত্মচেতনারই নামান্তর’। তিনি বুদ্ধদেবের সাড়া উপন্যাসের সাগর, যেদিন ফুটল কমলের পার্থপ্রতিম, বাসরঘরের পরাশর, একদা তুমি প্রিয়ের পলাশজ্জএই চরিত্রসমূহের মধ্যে বুদ্ধদেবের প্রবল উপস্থিতি লক্ষ করেছেন। গ্রন্থ মতে, এই চরিত্রসমূহের ‘যে চিন্তা মনন ও অনুভূতি’, তার মধ্য দিয়ে বুদ্ধদেবের আত্মোন্মোচন ও প্রসারণ সাধিত হয়েছে। সুকুমার সেন বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থেও বুদ্ধদেবের গল্প-উপন্যাসে লেখকের আত্মবিস্তারের প্রয়াস লক্ষ করেছেন। তিনি লিখেছেন, বুদ্ধদেবের ‘অধিকাংশ রচনা আত্মস্মৃতিমূলক, অথবা তেমনই মনে হয়।…সুতরাং বুদ্ধদেব বাবুর রচনায় লোকের ভিড় নাই, মানুষের বিবিধ বৈচিত্র্যও নাই। আছে ঘুরিয়া ফিরিয়া একই ধরনের নরনারী যাঁহারা কোন না কোন সময়ে লেখকের সাক্ষাৎ সংস্পর্শে আসিয়াছিল অথবা তাঁহারা কল্পনায় উদিত হইয়াছিল। আর প্রায় সব গল্পের নায়ক লেখক নিজেই, তবে বিভিন্ন বয়সে অবস্থায় মেজাজে।’ বাংলা কথাসাহিত্য প্রসঙ্গ গ্রন্থে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বুদ্ধদেবের আমার বন্ধু উপন্যাসে লেখকের আত্মপ্রতিকৃতির প্রোজ্জ্বল প্রভাব আবিষ্কার করেছেন। মৌলিনাথ ও নিরঞ্জনের খাতা উপন্যাসেও ব্যক্তি-বুদ্ধদেবের ছায়াপাত লক্ষ করা যাবে। বিশেষ করে বুদ্ধদেব কৈশোর ও যৌবনের ঢাকাকে স্মৃতির ভেতর দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে চেয়েছেন। এই উপন্যাস দু’টি সম্পর্কে নিরঞ্জন চক্রবর্তী যথার্থই বলেছেন, বুদ্ধদেবের শৈশব-যৌবনের ‘সেই রমনা-পুরানা পল্টন-টিকাটুলির স্বপ্নময় দিনগুলি তার স্মৃতিতে অমলিনজ্জএবং সেই সকল দিনের ঘটনাপ্রবাহ সুযোগ-সুবিধা পেলেই তাঁর গল্প, উপন্যাস, এমনকি তাঁর কাব্যেও অনুপ্রবেশ করেছে।’ অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের ইঁফফধফবাধ ইড়ংব গ্রন্থেও আত্মজৈবনিক উপন্যাস রচনায় বুদ্ধদেবের আগ্রহ ও সক্ষমতা স্বীকৃত হয়েছে।
এ-কথা প্রমাণ করা আমার উদ্দেশ্য নয় যে, বুদ্ধদেব বসুর সমগ্র কথাসাহিত্যের প্রাণকেন্দ্রেই ব্যক্তি বুদ্ধদেব বিশাল আসন অধিকার করে আছেন। তাঁর উপন্যাসের সংখ্যা মাথায় রেখে আত্মবিস্তারধর্মী কিংবা আত্মপ্রতিকৃতি-আশ্রয়ী উপরিউক্ত উপন্যাসসমূহ বিবেচনা করলে স্বীকার করতেই হবে যে, নৈর্ব্যক্তিক ভঙ্গিতে স্বকালের আঘাত-আশঙ্কা-সংঘাত-সমস্যাকে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় প্রসঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করেছেনজ্জএ-জাতীয় উপন্যাসের সংখ্যাই অধিক। কিন্তু আত্মজৈবনিক উপন্যাসের যে ভাষা-ভঙ্গি তিনি রপ্ত করেছেন, তার প্রভাব তাঁর সমগ্র কথাসাহিত্যেরই সাধারণ কুললক্ষণ বলে আমি মনে করি। কেমন সেই ভাষাভঙ্গি? সেই ভাষার শক্তি কিংবা সম্ভাবনা, ব্যর্থতা কিংবা বিপর্যয়ের ধরনটিই বা কেমন? তাঁর সমগ্র কথাসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণের চেষ্টা অনেকেই করেছেন এবং এই চেষ্টা ভবিষ্যতেও হয়তো অব্যাহত থাকবে। এই নিবন্ধে সেই ভঙ্গির দুএকটি দিক নিয়ে আমার বিবেচনা পাঠকের সামনে উপস্থিত করা যেতে পারে। অধিকাংশ উপন্যাসের বিস্তারিত আলোচনা এড়িয়ে কেবল দুএকটি উপন্যাসের বরাত দিয়ে বুদ্ধদেবের সমগ্র কথাসাহিত্যের ভাষিক-প্রবণতার সাধারণ কুললক্ষণ চিহ্নিত করার এই প্রয়াস হয়তো প্রক্ষিপ্ত মনে হবে। কিন্তু  আমার বিবেচনায়, একজন কথাসাহিত্যিক ভাষিক পরিচর্যার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় পাঠককে এমন এক প্রান্তে পৌঁছে দেন, যেখানে বসে ভাষার দর্পণে ¯্রষ্টার মুখচ্ছবি দেখা কিংবা ভাষিক স্পন্দনে শিল্পীর পায়ের শব্দ শোনার কাজটি অনায়াসে সম্পন্ন হতে পারে। বুদ্ধদেব তাঁর পাঠককে এমন এক ভাষাশৈলি উপহার দিয়েছেন, যার ¯্রষ্টা বুদ্ধদেব ভিন্ন আর কেউ হতে পারেন না। ব্যক্তিত্বচিহ্নিত যে ভাষার মাধ্যমে আমরা একজন প্রতিভাবান শিল্পীকে সনাক্ত করতে পারি, সেই ভাষার সাধারণ রূপ সম্পর্কে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া নিশ্চয়ই অসম্ভব নয়।
ঔপন্যাসিক বুদ্ধদেব বসুর যাত্রারম্ভ ১৯৩০ সালে, সাড়া উপন্যাস প্রকাশের মাধ্যমে। তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত সর্বশেষ উপন্যাস ১৯৭২ সালের জুন মাসে প্রকাশিত রুক্মি। প্রায় চল্লিশটি উপন্যাসের মুখ দেখেছেন তিনি, মৃত্যুর পরে প্রকাশ পেয়েছে আরো দুটি উপন্যাস প্রভাত ও সন্ধ্যা (১৯৭৫) এবং এক বৃদ্ধের ডায়রি (১৯৮০)। তাঁর গল্পগ্রন্থের তালিকাও দীর্ঘ। জীবনের একটা বিশেষ পর্যায়ে তিনি লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনেই তাঁকে কথাসাহিত্যের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। ফলে তাঁর কথাসাহিত্যের কাহিনি-বিন্যাসে বৈচিত্র্যের অভাব লক্ষ করা যাবে। কিন্তু পাঠকের কাছ থেকে তিনি কখনোই প্রত্যাখ্যাত হন নি, কারণ তিনি যা বলেন তাতে পাঠকের সম্মতি না-থাকলেও যেভাবে বলেন তার সম্মোহনকে স্বাগত জানাতে হয়। আমার বিবেচনায়, তাঁর এই সম্মোহনের মূলমন্ত্র তাঁর কবিপ্রতিভার মর্মে নিহিত। গল্প বলার এক অসাধারণ ধরন তিনি রপ্ত করেছিলেন। পাঠকের কল্পনাপ্রতিভাকে তিনি এমনভাবে জাগ্রত করেন যেন লেখকের মতোই তাঁর গল্পের পাঠকও সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। ঘটনার গায়ে তিনি এমন এক কাব্যিক ব্যঞ্জনা সঞ্চার করেন যাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই ঘটনার অনুরণন পাঠকচৈতন্যে অনিঃশেষ আলোড়ন তোলে; জীবনানন্দ দাশের কবিতার ভাষায় বলা যেতে পারে : ‘জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়’। বুদ্ধদেব-গবেষকবৃন্দের অনেকেই বুদ্ধদেবের গদ্যশৈলিকে সূত্রবদ্ধ করার প্রয়াস পেয়েছেন। তরুণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত বুদ্ধদেব বসু : মননে অন্বেষণে গ্রন্থের ‘আকর্ষক গদ্যশৈলী : অব্যর্থ তীরন্দাজ’ শীর্ষক প্রবন্ধে আশিস্কুমার দে বুদ্ধদেবের গদ্যের তাৎপর্যপূর্ণ চারটি প্রবণতা চিহ্নিত করেছেনÑ অসাধারণ প্রবহমানতা, গদ্যে ইংরেজি পদান্বয়ের প্রভাব, বিশেষ যুক্তির প্রভাব, এবং গদ্যভাষায় নবীনতা। নতুন, অনুগ ও অনুবাদ শব্দেরা কীভাবে বুদ্ধদেবের চিন্তার অনুকূলে প্রবাহিত হয়েছে তারও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন তিনি। বিশ্বজিৎ ঘোষ এবং সিরাজ সালেকীন সম্পাদিত বুদ্ধদেব বসু: জন্মশতবার্ষিক স্মরণ গ্রন্থের ‘বুদ্ধদেব বসুর গদ্যরীতি’ শীর্ষক প্রবন্ধে গৌতম কুমার দাসও বুদ্ধদেবের গদ্যের উপরিউক্ত প্রবণতাসমূহ বিপুল দৃষ্টান্তসমেত আলোচনা করেছেন। তিনি বুদ্ধদেবের গদ্যের বিরামচিহ্নের চরিত্র চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন, লেখকের শব্দ-সচেতনতার স্বরূপ নির্দেশের প্রয়াস পেয়েছেন, বিশেষ করে ড্যাশ(জ্জ)ব্যবহারের মাধ্যমে একাধিক সরল বাক্যকে একটি মূল বাক্যে রূপদানের বুদ্ধদেবীয় কারিশমায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। কবিতায় ড্যাশের উপর্যুপরি ব্যবহারে জীবনানন্দের কবিভাষায় যেমন বিশেষ ও ব্যক্তিত্বচিহ্নিত আবহ সঞ্জারিত হয়েছে, আমার বিবেচনায় গদ্যে ড্যাশের ব্যবহারে বুদ্ধদেবের গদ্যেও ভিন্নতর আবহ সঞ্চারিত হয়েছে। বুদ্ধদেবের ড্যাশবহুল বাক্য যতই দীর্ঘ হোক না কেন, তা তাঁর মূল ভাব বা চিন্তার কেন্দ্র থেকে পাঠককে বিচ্যুত করে না। বুদ্ধদেবের ‘সাবলীল, পরিশীলিত, মননশীল ও যুক্তিনির্ভর’ গদ্যরীতিতে মুগ্ধ হয়েই গৌতম কুমার দাস বুদ্ধদেবকে ‘বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গদ্যশিল্পী’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বুদ্ধদেবের গদ্যের গতিময়তা বিষয়ে আরো অনেক সমালোচকের বিবেচনাই আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। যেমনজ্জজলার্ক পত্রিকার বুদ্ধদেব বসুর সংখ্যায় ছন্দম চক্রবর্তী ‘আত্মজীবনীমূলক রচনা : বুদ্ধদেব বসুর গদ্যভাষা’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘গদ্যভাষা নির্মাণে তিনি ধ্র“পদীÑ চারুত্ব, প্রয়াসী, নিখুঁতত্বে বিশ্বাসী। বিশেষণ ব্যবহারে তিনি অকুণ্ঠ; উপমা বিশেষ ব্যবহার করেন না কিন্তু অনুপ্রাস ব্যবহারে অলজ্জ; তাঁর গদ্যে যতিচিহ্নের ব্যবহার অবিরল; খণ্ডবাক্যকে তিনি সাজান বিচিত্রভাবে; অবিচলিতভাবে ব্যবহার করেন একের পর এক তৃপ্তিকর এপিগ্রাম।’ একই পত্রিকায় ‘কবির প্রবন্ধ : কলকব্জার কথা’ শীর্ষক প্রবন্ধে নীলরতন সরকার লিখেছেন, ‘সাহজিকতা ও স্বাভাবিকতাভূষিত তাঁর গদ্যের মূল বৈশিষ্ট্য স্পষ্টতা, স্বচ্ছতা এবং বাক্যবন্ধের ঋজুতা। যত দীর্ঘ বাক্যই তিনি রচনা করুন না কেন, অন্বিষ্ট অর্থ সর্বদা অতীব প্রখর ও পরিস্ফুট, বর্ণিত বিষয়ের সংবদ্ধতা কদাপি শিথিল হয় না।’ সমালোচকবৃন্দের এই বিবেচনারই সমর্থন মিলবে শংকরানন্দ মুখোপাধ্যায়ের বাঙলা গদ্য জিজ্ঞাসা গ্রন্থের ‘গদ্য, কবির গদ্য ও কয়েকজন কবি’ শীর্ষক প্রবন্ধে। শংকরানন্দ লিখেছেন, ‘বুদ্ধদেবের গদ্যে তাঁর কবিতার মতোই এমন এক আশ্চর্য সহজতা আছে যা অল্পপাঠের পরই পাঠকের মন আচ্ছন্ন করে। তাঁর পেলব শব্দের ব্যবহার, ঝরঝরে শিল্পিত ভঙ্গি সহজ আকর্ষণে পাঠককে বিমুগ্ধ করে।’ সুকুমার সেনও বুদ্ধদেবের গদ্যের নিপুণতা ও প্রবীণতায় মুগ্ধ হয়েছেন, আধুনিক সাহিত্যিকবৃন্দের মধ্যে বুদ্ধদেবকেই তিনি সবচেয়ে প্রভাবশালী লেখক’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে লিখেছেন, ‘বুদ্ধদেববাবুর গদ্যরীতি সযতœরচিত, সুমিত, পরিপাটি।’ বুদ্ধদেব বসুর শ্রেষ্ঠগল্পের ভূমিকায় বিশ্বজিৎ ঘোষ লিখেছেন, ‘বুদ্ধদেব তাঁর শব্দে ও ভাষায় অনায়াসেই সঞ্চারিত করে দেন আপন সত্তার সৌরভ।’ তাঁর মতে, ‘ভাষার অন্তরাশ্রয়ী গতিধর্ম ও গীতিময়তা তাঁর কথাসাহিত্যের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ।’ সমালোচকবৃন্দের উপরিউক্ত বিবেচনায় বুদ্ধদেবের গদ্যরীতির প্রবণতাসমূহ যথার্থরূপেই চিহ্নিত হয়েছে বলে আমি মনে করি। এ-সকল প্রবণতার অনুপুঙ্খ উপস্থাপন আমার এই রচনার উদ্দেশ্য নয়। আগ্রহী পাঠকবৃন্দের জন্য আমাদের প্রতিভাবান শিল্পসমালোচকবৃন্দের ভাণ্ডার উন্মুক্ত আছে বলেই আমি মনে করি। আমি কেবল খোঁজ নিতে চাই, কবি বুদ্ধদেব কীভাবে কবিতার শক্তিতে ভর দিয়ে উপন্যাসের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে গেলেন। সেই সঙ্গে বুঝে নেয়া যেতে পারে, তাঁর উপন্যাসের যে বৈষয়িক পরিমণ্ডল, উপন্যাসের পাত্রপাত্রীদের মনোজগতের যে ব্যাকরণ, তাদের সম্পর্ক কিংবা সংঘর্ষের যে গতিবিধি, তাতে ঔপন্যাসিকের কবিত্বশক্তির প্রতি ভক্তি প্রদর্শনের অনুকূল আবহ উপস্থিত ছিল কী না।
কথাসাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর ভাষায় কবিত্বের প্রভাবকে আমাদের অধিকাংশ সমালোচকই প্রশ্রয় দিয়েছেন, যার কিছু নজির ইতোমধ্যে উপস্থাপন করা হয়েছে। আমার কাছে কথাকার বুদ্ধদেব প্রথম যে মূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছেন, সেখানেও কবি বুদ্ধদেবই আমাদের সম্পর্ক নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে। কথাসাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ‘আমরা তিনজন’ শীর্ষক গল্পপাঠের মাধ্যমে। এই গল্পে যে ঘটনার বিবরণ, তা গল্প হয়ে ওঠার খুবই উপযোগীজ্জএমন কথা নিশ্চয়ই বলা যাবে না। আমাদের অনেকের জীবনেই এই রকম ঘটনার বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে।  তিন বন্ধুর একই সঙ্গে একই মেয়ের প্রেমে পড়ার গল্পে এমন কিছু নতুনত্ব নেই। কিন্তু বুদ্ধদেব এই ত্রিমাত্রিক সম্পর্কের গল্পকে অনেক দূর টেনে নিয়ে গেলেন। অনেক ছোটখাটো ঘটনার মধ্য দিয়ে একজন মোনালিসার সঙ্গে তিনজনের সম্পর্ক, কিংবা সম্পর্কের স্বপ্নগুলোকে গেঁথে দিয়েছেন বুদ্ধদেব। কারো সঙ্গেই উল্লেখ করার মতো ঘনিষ্ঠতা নির্মিত হয় নি মেয়েটির। একদিন সে চলে যায় না ফেরার দেশে। মেয়েটির সেই বিদায় দৃশ্যেও লেখকের অংশগ্রহণ পূর্ণতা পায় নি, বেঁটে বলে মৃতদেহ কাঁধে নিতে পারেন নি তিনি, পিছনে পিছনে হেঁটে চলেছেন একা একা। সেই তিন বন্ধুর মধ্যেও আজ বিশাল দূরত্ব এবং সেই দূরত্বের মাত্রায়ও যথেষ্ট বৈচিত্র্য বিদ্যমান। গল্পের শেষাংশ কিংবা শ্রেষ্ঠাংশ বুদ্ধদেবের ভাষায় তুলে ধরতে চাই :
অসিত স্কুল থেকে বেরিয়ে চাকরি নিলো তিনসুকিয়ায়, ছ-মাসের মধ্যে কী একটা অসুখ ক’রে হঠাৎ মরে গেলো। হিতাংশু এম.এস.সি. পাশ ক’রে জার্মানিতে গেলো পড়তে আর ফিরল না, সেখানকারই একটা মেয়েকে বিয়ে ক’রে সংসার পাতল… আর আমিÑ আমি এখনো আছি, ঢাকায় নয়, পুরানা পল্টনে নয়, উনিশ-শো সাতাশে কি আটাশে নয়, সে-সব আজ মনে হয় স্বপ্নের মতো, …সেই বৃষ্টি, সেই রাত্রি, সেইÑ তুমি! মোনালিসা, আমি ছাড়া আর কে তোমাকে মনে রেখেছে!
আমাদের জীবনে এই রকম কত ঘটনাই তো ঘটে। তার কতটুকুই আমরা মনে রাখি। কিন্তু লেখকের মনের গভীরে মোনালিসার যে মূর্তি নির্মিত হয়েছে, সেই মোনালিসা তো কবিতার মতোই সুন্দর, মনোহর এবং মৃত্যুহীন। গল্পের শেষ বাক্যটিই যেন পুরো গল্পটির শরীরে অনিঃশেষ ব্যঞ্জনা ছড়িয়ে দিল। এ কাজ কবির পক্ষেই সম্ভব। এবং কবিতাই এভাবে পাঠকের কল্পনাপ্রতিভায় সৃজনাভাস সঞ্চার করে। কবিতার সমালোচক বুদ্ধদেব বসু যে-কোন কালজয়ী কবিতায় বারবার চৌম্বক পঙ্ক্তি বা সধমরপ ষরহব অন্বেষণ করেন। তাঁর কবিতায়ও আমরা এ-রকম চৌম্বক লাইনের দেখা পাই যা পুরো কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিশেষ অনুরণন ছড়িয়ে দেয়। বুদ্ধদেবের কথাসাহিত্যেরও এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রবণতা বলে আমি মনে করি। স্মৃতিমগ্নতা তাঁর গল্প ও উপন্যাসের পাত্রপাত্রীকে এমনভাবে সম্মোহিত করে যেখানে বাস্তব সত্য অনায়াসে কল্পিত সত্যের কাছে প্রতিহত হয়। এই গল্পে যে ঢাকা, বিশেষ করে পুরানা পল্টনের ছবি মুদ্রিত হতে দেখি, সেই পুরানা পল্টন লেখকের শৈশবের পুরানা পল্টন। এই স্মৃতির শহর যখন তাঁর কথাসাহিত্যে কল্পনার সৌরভ ও সমৃদ্ধি নিয়ে উপস্থিত হয় তখন তা কেবল সুন্দর কিংবা মনোরমই নয়, মায়াবীও বটে। কথাসাহিত্যিক হিসেবে বস্তুনিষ্ঠ থাকার বিন্দুমাত্র প্রয়াস দেখান না তিনি। তাঁর গল্পের যে ঘটনাপ্রবাহ এর কাঠামো নির্মাণের জন্য অপরিহার্য, সেই ঘটনাপ্রবাহকে তার বেশি মূল্য দিতে তিনি নারাজ। মনোজগতের দ্বন্দ্বজটিল বাস্তবতাকেই তিনি বারবার পাঠকের সামনে নিয়ে আসেন। মিলনের গান তাঁর কণ্ঠে আমরা শুনেছি, কিন্তু আমার বিবেচনায় বিরহ, বিচ্ছিন্নতা, নিঃসঙ্গতার শৈল্পিক রূপায়ণেই তাঁর কৃতিত্ব চোখে পড়ার মতো। কবিতার শত্র“ ও মিত্র গ্রন্থে বুদ্ধদেব লিখেছেন, ‘আমরা পরস্পরকে যতই না ভালোবাসি, আমাদের শরীর দুটো তো আলাদা, শরীরের মধ্যে দুই জীবনও আলাদা। অত্যন্ত আপনজনকেও কোনো আসল কথা বলা যায় না, পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষ একলা।’ এই একলা মানুষেরই মুহূর্মুহূ উপস্থিতিতে মুখর কিংবা মৃয়মাণ তাঁর কথাসাহিত্য। তাঁর অধিকাংশ গল্প-উপন্যাসের পাত্রপাত্রিরা এই নিঃসঙ্গতা নামক ভয়ানক ব্যধিতে আক্রান্ত। ফলে তাঁদের সংলাপ, কিংবা চিন্তা¯্রােত উন্মোচনের যে ভাষা তিনি নির্মাণ করেছেন, সেখানে কেবল কল্পনা ও বাস্তবের বিমিশ্রণই নয়, আলো ও অন্ধকারের পরস্পরপ্রোথিত রূপ উদ্ভাসিত হয়।
আগেই উল্লেখ করেছি, বুদ্ধদেব তাঁর কথাসাহিত্যে যে-সকল বিষয়কে প্রশ্রয় দিয়েছেন, তা নিয়ে কাব্য করার বিস্তর সুযোগ রয়েছে। ব্যক্তিজীবনে বুদ্ধদেব মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্কে আবদ্ধ হতে স্বস্তি পেতেন না। সমাজ-সংসারের মাঝখানে থেকেও নিজের চারদিকে একটি অদৃশ্য দেয়াল নির্মাণ করে রাখতেন যেখানে ইচ্ছে করলেই সাধারণের প্রবেশ সম্ভব হত না। কেবল কল্পনা-নামক এক মহাশক্তিধর অনুভবকে তিনি জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় উপহার দিয়েছেন। স্মৃতির জগতে বাস করতে করতে বাস্তবের অনেককিছুকেই তিনি অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখেছেন। তাঁর এই জীবনবোধকে সন্তোষকুমার ঘোষ চমৎকারভাবে চিহ্নিত করেছেন। আনন্দ রায় সম্পাদিত বুদ্ধদেব বসু : নানা প্রসঙ্গ গ্রন্থের ‘শীতের কাছে প্রার্থনা’ শীর্ষক প্রবন্ধে সন্তোষকুমার লিখেছেন :
ভূলোক থেকে বুদ্ধদেব উড্ডীন হয়েছিলেন স্বেচ্ছায়, অথচ দ্যুলোকে উত্তীর্ণ হননি, সেই কারণেই হয়তো দ্যুলোক ভূলোক এই দুই ভুবনের মাঝখানে দুলছেন, ঝাপটাচ্ছেন অস্থির অনিশ্চিত, অশান্ত ডানা। সন্দেহ হয়, একটি স্থিতি তিনি কোথাও পান নাÑ আমরা কে-ই বা পাইÑ আজও রমনা তাঁকে পিছন থেকে টানে, পাশ্চাত্য সামনে থেকে দেয় হাতছানি, মাঝখানে আছে কলকাতা, একদা তাঁর চোখ-ধাঁধাঁনো কলকাতাÑ বলা শক্ত রক্ষিত কে কার।
বুদ্ধদেব বসুর কথাসাহিত্য পাঠ করতে গেলে আবু হেনা মোস্তফা কামালের যেহেতু জন্মান্ধ কাব্যের ‘কিছুই নিজস্ব নয়’ কবিতার একটি পঙ্ক্তি খুব মনে পড়ে : ‘কেবল শূন্যতা ছাড়া শূন্যতার নেই কোনো মানে’। বুদ্ধদেবের কাছে শূন্যতা কিংবা নিঃসঙ্গতা কেবল এক বিশেষ ধরনের অনুভব নয়, শুন্যতাকে তিনি দেবতার মতো করেই পুজো করেছেন। সেই পূজার যে ফুল, তা কল্পনার মতোই সুন্দর, পবিত্র এবং প্রাণবন্ত। ‘বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যে ঢাকা শহর’ শীর্ষক একটি রচনায় আমি বুদ্ধদেবের শৈশবের ঢাকা শহরের চালচিত্র অনুধাবনের চেষ্টা করেছিলাম। সেখানে উল্লেখ করেছিলাম, ‘যৌবনের উত্তাল-উদ্বেল প্রহরগুলোকে প্রাণবন্ত করতে গিয়ে তিনি তাঁর গল্প-উপন্যাসের অনেক পাত্রপাত্রীকেই ঢাকা শহরে পাঠিয়েছেন।’ আমার মনে হয়েছে, বুদ্ধদেবের যে ঢাকা কথাসাহিত্যে মুদ্রিত হতে দেখি, তাকে বুদ্ধদেবের স্মৃতির শহর না-বলে কল্পনার শহর বলাই সঙ্গত। বাস্তবের অবিকল উপস্থাপন কথাসাহিত্যিকের কাজ নয়। রবীন্দ্রনাথ : কথাসাহিত্য গ্রন্থের ‘শেষের কবিতা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বুদ্ধদেব এ-প্রসঙ্গে লিখেছেন :
সাহিত্যকলা জীবনের অনুকরণ করে না; জীবনের একটি প্রতিরূপ ও প্রতিদ্বন্দ্বী সৃষ্টি করে চলে, এ-কথা শুধু ঘটনাবিন্যাসের ক্ষেত্রে নয়, ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সত্য। জীবন ঠিক যে-রকমটি হয় না, অথচ হতে পারে, শিল্পকলা সেই সম্ভাবনার বিবরণ বলেই তার আকর্ষণ আমাদের কাছে জীবনের চেয়েও প্রবল।
সেই অর্থে কথাসাহিত্যেও আমরা এক রকম বাস্তবতারই রূপায়ণ প্রত্যাশা করি যেখানে শিল্পের বাস্তবও অপ্রতিহত থাকে। বুদ্ধদেব বসুর বাস্তবে শিল্পের অসম্মান হয়েছে একথা আমি বলছি না, কিন্তু স্বপ্ন ও কল্পনা শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থেকেছে। সেই স্বপ্ন ও কল্পনা তাঁর ভাষার শরীরেও যোগ করেছে বিশেষ দ্যূতি, যেখানে বারবার কবিতা নামক এক সুন্দর অনুভবের মুখচ্ছবি ভেসে ওঠে।
বুদ্ধদেবের কথাসাহিত্যে আত্মজৈবনিক অনুষঙ্গের কথা ইতোমধ্যেই আলোচনা করা হয়েছে। এই অনুষঙ্গ তাঁর ভাষার শরীরেও বিশেষ বৈশিষ্ট্য যোগ করেছে বলে আমি মনে করি। ব্যক্তিগত স্মৃতির রাজ্যে অনুপ্রবেশের আনন্দ প্রত্যেক মানুষের মনেই আবেগবিহ্বল প্রণোদনা সঞ্চার করে। এই প্রণোদনা সৃজনশীল মানুষের শিল্পকর্মেও ভাবোচ্ছলতা, অসংযতি ও অসংলগ্নতার ছাপ রেখে যায়। বুদ্ধদেবের ভাষা অলঙ্কারবহুল, বিশেষ করে বিশেষণের প্রতি তাঁর প্রবল পক্ষপাত সচেতন পাঠকের দৃষ্টি এড়ানোর কথা নয়। রবীন্দ্রনাথ : কথসাহিত্য গ্রন্থে বুদ্ধদেব রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘আসলে বিশেষণ ছাড়া ভাষা হয় না’। তাঁর গদ্যের চরিত্র সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা লাভ করা সম্ভব হবে না, যদি আমরা তাঁর ব্যবহৃত বিশেষণের গতিবিধি নজরে না আনি। বিশেষণ প্রয়োগে তিনি অমিতব্যয়ী একথা সাহস করে বলা যেতে পারে, কিন্তু তাঁর বিশেষণের অসংলগ্নতাও নিশ্চয়ই পাঠকের চোখে পড়বে। উপমার প্রয়োগ করে তিনি মূলত বিশেষণের কাজটি সম্পন্ন করতে চেয়েছেন, কারণ তাঁর মতে উপমাও ‘বিস্তারিত বিশেষণ ছাড়া আর কিছু নয়।’ বিশেষণে সবিশেষ ব্যক্ত করার এই ঢঙটি পাঠকের সহ্যের সীমায় কেন আলোড়ন তোলে না তার কারণও তাঁর গদ্যভঙ্গির গতরেই মুদ্রিত থাকে। তিনি কেবল তাঁর বলার কথাটিকে পরিবেশন করেই পরিতৃপ্ত হন না, তিনি ভাব বিষয় কিংবা ব্যক্তির ভেতরে প্রবেশ করে সবকিছু নেড়েচেড়ে দেখতে চান। কেবল স্পর্শের সুখটুকু নিয়ে সরে পড়তে চান না তিনি, ভেঙেচুরে দেখার জন্য দৃষ্টির যে তীক্ষèতা দরকার, তিনি বরাবরই সবকিছুর দিকে সেই দৃষ্টি প্রসারিত রাখেন। পরস্পরবিরোধী বিশেষণগুচ্ছের ব্যবহার করে তিনি বক্তব্যের স্বচ্ছতা কিংবা সুস্পষ্টতা বিধানে কতটুকু সক্ষম হয়েছেন, সে আলোচনায় আমি যাবো না, কিন্তু আলোচিত বিষয়, বা ঘটনা বা চরিত্রের সঙ্গে তাঁর আবেগবিহ্বল সংযুক্তির ব্যাপারটি বোঝা যায় :
ক. …লম্বা মেঘলা একলা দুপুর, রঙের আহ্লাদে গ’লে-যাওয়া বিকেল, আর রিমঝিম রাত্রি, আর মাঝে মাঝে মেঘ-ছেঁড়া ভিজে-ভিজে জোছনাÑএত ভালো লাগে, ভালো লাগে ব’লেই একা লাগে, আবার মানুষের সঙ্গও বেশি ভালো লাগে নাÑএইরকম একটা আবছায়ার মধ্যে তার যেন দম আটকে এলো; কলেজটা খুললে বাঁচে। (তিথিডোর)
খ. সোমেন দেখলো মীরার পিঙ্ক রঙের হাতের তেলোয় আলতা লাল ছিটে, পাশেই কালচে দাগÑ মশার থ্যাঁতলানো শব। কার রক্ত খেয়েছিলো? রংটা টকটকে তাজাÑ মীরার। (নির্জন স্বাক্ষর)
বুদ্ধদেব বসুর কথাসাহিত্যের ভাষিক শৃঙ্খলার একটি বিশেষ দিক অর্থাৎ বিশেষণ বিষয়ে উপরিউক্ত স্মারকসমূহ উপস্থাপিত হলেও তাঁর গদ্যশৈলির অন্য যে-সব বৈশিষ্ট্য আমি উল্লেখ করেছি, তারও নানা নজির উদ্ধৃতিসমূহে খুঁজে পাওয়া যাবে। দীর্ঘ বাক্যের নির্মাতা হিসেবে বুদ্ধদেবের যে বাড়াবাড়ি কিংবা মুন্সিয়ানা সমালোচকমহলে নিন্দিত কিংবা প্রশংসিত হয়েছে, তাও ওপরের উদাহরণে পরিস্ফুট।
কলকাতার যে পরিমণ্ডলে কবি ও কথাশিল্পী বুদ্ধদেব সক্রিয় ছিলেন, তাঁর উপন্যাসের পাত্রপাত্রিরাও সেই জগতেরই অগ্রসর মানুষ। তাঁরই মতো তাঁর পাত্রপাত্রিরাও রবীন্দ্রসাহিত্যের ভক্ত-পাঠক, শিল্পসাহিত্যের স্বদেশী ও বৈশ্বিক অবস্থা সম্পর্কে তারা সচেতন। তাঁর প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতা ধার করেই যেন তাঁর কথাসাহিত্যের নায়ক নায়িকারা অনর্গল স্মৃতিচারণ করতে থাকে। তাঁর পাত্রপাত্রিরা তাঁরই মতো নাগরিক জীবনের নানা জটিলতায় জীর্ণ; তাঁর কথাসাহিত্যের মানুষজনেরা যৌন-জীবনের অস্থির-অশোভন কিংবা অসঙ্গত আদান-প্রদানে অকুণ্ঠ। এ-প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বসুর মন্তব্য : ‘বিবাহোত্তর প্রেম এবং সে-প্রেমে যৌনতা তথা দেহচেতনার উপস্থিতির কারণে বুদ্ধদেবের নায়ক-নায়িকারা নিপতিত হয়েছে জটিল জীবনাবর্তে।’ বুদ্ধদেবের নির্জন স্বাক্ষর, শেষ পাণ্ডুলিপি, পাতাল থেকে আলাপ, রাত ভ’রে বৃষ্টি, গোলাপ কেন কালো প্রভৃতি উপন্যাসে আমরা যৌন-চেতনাশ্রয়ী মানুষের অসংলগ্ন কর্মকাণ্ডের বিস্তর প্রমাণ খুঁজে পাবো। এই বৈষয়িক পরিমণ্ডল তাঁর উপন্যাসের ভাষা-শরীরকেও প্রভাবিত করেছে। রাত ভ’রে বৃষ্টি উপন্যাস থেকে সামান্য অংশ উদ্ধৃত করা যাক :
আলো জ্বেলে দেখলুম সুন্দর একটি ছবি। মালতী ঘুমিয়ে আছে, শাড়িটা উঠে গিয়ে নিটোল একটি পা দেখা যাচ্ছে হাটু থেকে পাতা পর্যন্ত, আঁচল স’রে গিয়ে একটি স্তন সম্পূর্ণ বেরিয়ে     পড়েছেÑ সম্পূর্ণ গোল, নধর ঊর্ধ্বমুখ। একটি শ্যামবরনী ভেনাসÑ বতিচেলির সদ্যতরুণী নয়, বরং টিৎসিয়ানোর কোন ছাত্রের আঁকা পক্কযুবতি, সারা ঘুমন্ত শরীরের মধ্যে ঐ অনাবৃত স্তন যেন চোখ মেলে তাকিয়ে আছে, রূপের চেতনা ও স্পর্ধা নিয়ে, লোকেদের অভিনন্দন নেবার জন্য।
বুদ্ধদেবের পাত্রপাত্রিরা তাদের কথোপকথনে প্রচুর ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে; কলকাতার কথ্যভাষার বিশিষ্ট রূপটিই তাঁর প্রধানতম অবলম্বন; ক্রিয়াপদ ব্যবহারে তিনি অমিতব্যয়ী শুধু নন, বরং বলা চলে ভয়ানকভাবে সীমিত এবং তাঁর এ-প্রয়াস গদ্যের গতিশীলতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ও স্বাস্থ্যকর; অনেক অপ্রচলিত শব্দকে তিনি অবলীলায় বাক্যের ভেতর চালিয়ে দেন। অর্থাৎ তাঁরই চেতনার রঙে উজ্জ্বল তাঁর পাত্রপাত্রীদের মনোজগৎ, এমনকি বুদ্ধদেবের ভাষাই তাঁর কথাসাহিত্যের মানুষজনের মুখের ও মনের ভাষা। ‘রবীন্দ্রনাথের পাত্রপাত্রীরা রবীন্দ্রনাথেরই ভাষায় কথা বলে’জ্জসমালোচকবৃন্দের এই মন্তব্যের কোন সারবত্তা খুঁজে পান নি বুদ্ধদেব। তাঁর মতে, ‘সেটাকে রচনার একটা রীতি হিশেবেই মেনে নিতে হবে।’ বুদ্ধদেবের পাত্রপাত্রিদের ভাষা-প্রসঙ্গেও আমি তাঁর পরামর্শের ওপর নির্ভর করতে চাই। কারণ, এটা তাঁর কথাসাহিত্যের রসাস্বাদনে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বলে মনে হয় না। ‘জিনিশটা যেহেতু রচনা, একই ব্যক্তির চিত্তের নিঃসার, তাই কোনো-একজন লেখকের সকল পাত্রপাত্রীর মুখের ভাষায় সাদৃশ্য অনিবার্য। ভেবে দেখতে গেলে, এর কোনো অন্যথা নেই।’Ñ বুদ্ধদেবের এই মন্তব্যে আমি আংশিক সমর্থন জানাতে রাজি আছি। এমন অনেক লেখকই আছেন যাঁরা নিজস্ব শ্রেণি কিংবা চৌহদ্দির বাইরে থেকেও বিচিত্র পেশা ও চরিত্রের মানুষজনকে তাঁদের কথাসাহিত্যে স্থান দেন, যারা তাদের শ্রেণি ও পেশার অনুকূলেই ভাষা ব্যবহার করে। বুদ্ধদেবের কথাসাহিত্যের মানুষজন যেহেতু তাঁরই পরিচিত পরিমণ্ডলের, তাই তাঁর এই বিবেচনা তাঁর কথাসাহিত্যের ভাষা-বিচারে পুরোপুরি প্রযুক্ত হতে পারে।

কী লিখি কেন লিখি ৫

নূরুননবী শান্ত

পৃথিবীর বিশাল বৈচিত্র্যের কোনো এক নির্দিষ্ট দিকে চোখ রেখে তাকাবার সাহস তৈরি হয় নি বেড়ে ওঠার স্বর্ণসময়ে। ভগ্নস্বাস্থ্য টেনে টেনে মাটির দিকে তাকিয়ে গুবরে পোকার মতো হাঁটি। সমবয়সীদের টিটকারি এক কান দিয়ে মাথার ভেতরে ঢুকে দলা পাকিয়ে পাকিয়ে নিস্তেজ অসাড় ভাব হয়ে আরেক কান দিয়ে বেরিয়ে যায়। ওরা সবাই অব্যাহতভাবে দুদ্দার হাঁটে। খইয়ের মতো কথা ফোটে ওদের বাকযন্ত্রের পরতে পরতে। কোন স্বপ্ন ছিল না মনে, ছিল না তথাকথিত ভবিষ্যৎ ভাবনা, না কোনো আমার জীবনের লক্ষ্য। শুধু আমার কানে আন্দোলিত হতে থাকতো ওয়ালমেছ মামার কেচ্ছা বয়ানের ঘটনা পরম্পরাÑএইতো রাজকন্যা। এইতো কী তার রূপ! রাজবাড়ির ঘরের সাথে লাগানো দিঘির ঘাটের সিঁড়ি আলো করে বসে আছে চান্নিরাতে, পাইক-পেয়াদার বারণ উপেক্ষা করে। এইতো, দানব রাক্ষস তাকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যাচ্ছে রাজবাড়ির দিঘির ঘাট থেকে। রাজকন্যার তাতে ডর-ভয় নাই। আঁচলের মাথায় তার বাধা আছে, এইতো, কুদরতি সরিষার দানা। কোত্থেকে এলো যে সরিষার দানা! (ওয়ালমেছ মামাকে আবার বায়না করতে হবে কেচ্ছাটা জোরার জন্য।) এইতো রাক্ষসের দৈত্যাকার ঘোড়ার লেজে সেই সরিষার দানা বেঁধে দিচ্ছে অপহৃত রাজকন্যা! কী সাহস! সেই সরিষা দানা পথে পথে ছড়িয়ে যাচ্ছে পথ নির্দেশক হয়ে। জাতশিকারী কোটালপুত্র তাই দেখে রাক্ষসের গুহা চিনে নিচ্ছে অনায়াসে। রাক্ষসের আস্তানায় যাওয়া তবু কী যে-সে কর্ম। শেষে তো সব ভয় জয় করে রাজকন্যা উদ্ধার হয়। রাজার মনে শান্তি আসে। রাণীমার চোখে নামে আনন্দাশ্র“! রাজ্যে বেজে ওঠে আনন্দ-ধ্বনি। অথচ, তারপরই তো হরিষে বিষাদ। রাজসভায় প্রশ্ন ওঠে, কোটালপুত্র কেন যাবে রাজকন্যা উদ্ধারিতে! কেন সে রাজপুত্র হলো না, হোক না তা ভিন্ন রাজ্যের! কোটালপুত্রের মর্যাদা সমান হয় নাকি রাজকন্যার মানের?
রূপকথার জগৎ আর চারদিকের বস্তুজগতের স্বভাব-চরিত্র খুব কি আলাদা? কোন্ জগতটা যেন আমার, আমাদের? বৈপরীত্যে ভরপুর মানুষের অমানবিক জগত। আমি সেই কেচ্ছার জগতে বাস করি। বস্তুজগতের ভেতরে গড়ে ওঠা মনুষ্যসভ্যতার ভাবজগত ও রীতিনীতির কঠোর অনুশাসনের মধ্যে থাকি। এতো বিধি-বিধান, বিবেকের রক্তচক্ষুর সামনে তবু অস্তিত্বশীল থাকতে হয় প্রত্যেক স্বতন্ত্র ব্যক্তিকে। নিজের শরীর পাটকাঠির মতো সরু হলেও, পাটকাঠিকে তরোয়াল বানায়ে বাতাসে ঘোরাই। একটার পর একটা রাক্ষস কতল করি। ডানাভাঙা প্রজাপতি না ধরে দূরে উড়ায়ে দেওয়ার অপরাধে যে ছেলেটি আমার কানের উপর চাপড় মারে, চোখ বন্ধ করে তাকে হত্যা করতে থাকি বাতাসে সিন্টার বল্লম খুঁচিয়ে! সেই লড়াই আমার আচমকা থেমে যায় কারো নিন্দুক-পায়ের আওয়াজে। আমি মাথা নিচু করে আমার তরোয়াল দিয়ে মাটিতে কাটিকুটি করতে থাকি। চোখ তুলে দেখতেও ইচ্ছে করে না, কার পা’জোড়া থপ থপ শব্দে আমার অস্তিত্বকে কটাক্ষ করে পাশ দিয়ে চলে গেল। কেবল তার মুখ কল্পনা করি। এ হয়তো সেই লোক, যে তার হালের গরুটাকে খৈল খাওয়ানোর সময় চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দেয়, আর প্রতিবেশির গরুটা তার ধানক্ষেতে ঢুকেছে বলে হালুয়া পেন্টি দিয়ে পেটাতে পেটাতে মাটিতে শোয়ায়ে ফেলে! এই লোকের দিকে তাকাতে আমার দ্বিধা করে। আবার মনে হয়, সমাজে সবরকম মানুষ না থাকলে চলে না। দ্বন্দ্ব, দ্বিমত, তর্ক ও যুদ্ধের ভেতর দিয়ে মানুষ, প্রকৃতি, সভ্যতা, অসভ্যতার ক্রমবিবর্তন। দ্বন্দ্বে থাকাই মানুষের নিয়তি। দ্বিধাকে পাকিয়ে তুলি সুতরাং। পায়ের শব্দ সৃষ্টিকারী সম্পর্কে অন্য ভাবনা উপস্থিত হয় মনে। হঠাৎ হয়তো বুঝে ফেলি, অথবা মনে করি যে, আরে না, এ তো পূবপাড়ার সেই বুজান। আরে, সেই সেয়ানা মেয়েটা। তার নাম বলবো না। একদিন বৃষ্টির দিনে নানীর ঘরের মেঝেতে পালা করে রাখা সোনারঙের পাটের নরমের মধ্যে দেহ গুঁজে দিয়ে টিনের উপর বাজতে থাকা মল্লারে মশগুল ছিলাম। বুজান কখন আমার পাশে এসে শুয়েছে টের পাই নি। তাঁর ঠোঁট দিয়ে আমার ঠোঁটে বিলি কাটতে শুরু করেছে বুঝতেই পারি নি। বোঝার কী দরকার! হাত-পা ঝিম ঝিম করছিলো যে আমার। সুখ সুখ ¯্রােত একটা আমার অবশ দেহের পায়ের পাতা থেকে চুলের ডগা পর্যন্ত ছড়িয়ে যাচ্ছিলো যে তখন। অতশত বুঝে কাজ কী আমার! বুজানের বুকের গভীরে মুখ রেখে খানিকটা কাতরভাব প্রকাশ করতেই সে কী চোখ-রাঙানি তার! কেন তার বুকের হুক খুলতে গেছি! সবকথা আম্মাকে বলে দেবে যে! আমি কি বলতে পারতাম, আম্মাকে? আমার ঠোঁট কেন থুতু দিয়ে ভেজাইলা? আমিও আম্মাকে কয়ে দেব? কওয়া কি যায় আসলে সবকথা সবাইকে? কেবলি মাথা নিচু করে থাকা। কেবলি দ্বিধার ভারে নূয়ে পড়তে পড়তে মাটিতে লীন হয়ে যাওয়া! তখন তো নানির বাড়িতে থাকি। নানির চূলা থেকে দুধের সর চুরি করে খাই। আবার সর পড়ে। এবার মামা খায়। ছোট মামা। আমি বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখি। কাউকে বলি না। রাত হলে ছোট মামার সাথে সাতনাপাড়া যাবো যে! কীর্তন শুনবো। মন্দিরার বাজনাটা এতো নেশা জাগায়! ঢোলের বাজনাটা বুকের ভেতরে কম্পন তোলে। তারপর বড়িয়াহাটে যাত্রা আসছে আবার। তো কথা নাই। দুপুরে ঘুমিয়ে নাও। রাতে দি বাসন্তি অপেরা। ট্রাম্পেট! ড্রাম। পালার নাম গুনাই বিবি। আর মাখনের তৈরি মেয়েগুলো, ক্ষীরের তৈরি ডানাকাটা প্রিন্সেসরাÑআলো-আঁধারিতে আনন্দ-কামনার ঝড় তোলে। বুকের ভেতরে একইসাথে কনকনে শীতে নাড়া পোড়ানোর উত্তাপ আর কাঠফাটা গরমের দুপুরে বড় দিঘির পাড়ের আমগাছের তলার শীতল হাওয়ার তোলপাড়।
আমার মাথায় কি ঢুকবে স্কুলের অংক! না, বাংলা ভালো। দ্রুতপঠন আরো ভালো! তবু ঠিক গুনাই বিবির পরদিন যখন শাকপালা বিলে মাছ ধরা নিয়ে কাজিয়া লাগে দুই পাড়ায়, একটা খুন হয়, কুকিকালিদাশে আমরা ঘুমাতে পারি না। আতঙ্ক! যদি আমিও একদিন খুন হয়ে যাই। আহা! জীবন, পাগলামিভরা প্রেম আমার, তোমাকে ছেড়ে যেতে হবে অজানা নিস্তব্ধতার দিকে! ভয়! একা লাগে! শূন্য মনে হয়! গুটিয়ে নেতিয়ে পড়ি মাটির বুকে। মাটি নীরবে স্থান দেয় আমার দেহকে। বিলের দিঘির পাড়ের শিমুল গাছের শিকড়ে মাথা দিয়ে, কাত হয়ে, বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতের ঢেউ খেলানো সবুজের দিকে চোখ রেখে বাতাস বয়ে যাওয়ার মৃদু শোঁ শোঁ আওয়াজ শুনতে থাকি।
নাহ! এবার মায়ের কাছে যেতে হবে। কুকিকালিদাশে, নানির কাছে থাকলে চলবে না আর। আমডারা গ্রাম। সেখানে আম্মা থাকে। আর থাকে রাজ্যের যতো অভাব, দারিদ্র্য, অন্ধকার, অশ¬ীলতা। ঘরের পেছনে মানুষের গু পড়ে থাকে বলে ঘর থেকে বাইরে যেতে ইচ্ছে করে না। সে গাঁয়ের কেউ স্কুলে যায় না। কেবল আমি যাই। আর যায় আলাল। আলাল তো আমার বড়। খালি মারে। দেমাগ দেখায়। আমার সাথে ওর পোষায় না। তাতে কী? দশগাঁয়ে আমার মায়ের নামডাক। পাড়ার নানা বয়সী মেয়েরা আমাদের আঙিনায় হেলে পড়া কাঁঠাল গাছের নিচে ভিড় করে। কল কল করে কত কথা কয়। হাসে। কাঁদে। পরচর্চা করে। ফায়সা বকে। পান চাবায়। আমি মাটির বারান্দায় বসে মাটিতে দাগ কাটার ছলে সেইসব ধ্বনি-সর্বস্বতার দিকে কান পেতে থাকি। কেউ আদর করে কথা বলতে এলে পালিয়ে যাই। আলালকে আমার কী দরকার!
খালি হালি বু’কে এড়াতে পারি না। হালি বু’ অনেক মোটাসোটা। ভারী তার পাছা আর বিরাট তার বুক। কোমর দোলায়ে দোলায়ে নাচে আর গীতের বোল তোলে হাফাতে হাফাতে। বুকের ভেতরে কেমন একটা করে ওঠে। টানা টানা সুর। নির্দিষ্ট দুই তিনটা মাত্রার প্রয়োগে দুলে দুলে ওঠা মানবদেহের বিচিত্র ভঙ্গিমার মাতাল ঢেউ। এরকম সবাই হয় না কেন? কেন গাঁয়ের মেয়েদের মুখে শুধু ক্ষুধা আর না-পাওয়ার গল্প! আমডারায়। আর হালি বু’র নামে ছড়ান কুকথা! গীতের সুর আর নাচের ঠাট তার দেহে ঝলকে ওঠে বলেই তাকে কেন গাঁয়ের বিচ্ছিরি দেঁতো মানুষেরা নটী বলবে! কুকিকালিদাশের ওয়ালমেছ মামাও কিন্তু আমনের ক্ষেত নিড়াতে নিড়াতে  হঠাৎ উঠে কোমরের গামছা দিয়ে ঘোমটা বানিয়ে, আঁচল বানিয়ে নেচে ওঠে। তার নামের আগে কোনোদিন নটী বলা হয় নাই। হালি বু’র নামে কথা বলা তাহলে কী রীতি? প্রথা? মেয়েরা নাচলেই যত দুন্নাম হবে? লোকেরা জমি-জিরাতের আইল ঠেলে ঠেলে পরের জাগায় ঢুকে গেলে ‘ক্ষ্যামতাআলা’ হয়ে ওঠে! একটু নাচ দেখাও তো দেখি কেমন মরদ তুমি, শোনাও একটা গীত দেখি কেমন ক্ষ্যামতা তোমার ধানের ভাতের! এইসব কথা জমা থেকে যায় বুকের ভেতরে। কেন জমা করে রাখতাম, জানি না। আলালের দেখাদেখি, আমিও গাঁও থেকে হেঁটে হেঁটে তিন মাইল দূরের শহরের স্কুলে যাই। শহরের ছেলে-মেয়েগুলোর চেহারা সুন্দর! কথা বলে স্টাইল করে। জামা-প্যান্ট পড়ে বাহারি ডিজাইনের। আমি পারি না। নতুন জামা অলৌকিকভাবে পেয়ে গেলে গায়ে চাপাতেই শরমে গুটিয়ে যাই। আব্বার ফুলপ্যান্ট কেটে হাফপ্যান্ট বানায়ে নেই। সবাই হাসে। আমি শুনি না তোদের হাসি হে! যত পারিস হাসাহাসি করে নে। আমার তাতে বাল হইল। আমি স্কাউট করব। তোরা হাসতে থাক। আমি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের কবিতা পড়ে নিজেই একটা কবিতা লেখছি, তোদের দেখাব না। সিদ্দিক স্যারকে চুপ করে দেব। আরে কী কাণ্ড! সিদ্দিক স্যার তো সেইটা ছাপায়ে দিল। আমি লেখলাম আমার কথা আর কী বলবো/ যখন বুকের ভেতরে বাজতে থাকা কথা/ শুনতে শুনতেই দিন চলে যায়… হা হা হা, এমনভাবে নকল করলাম কবিতায় আর কী লিখবো/যখন বুকের রক্তে লিখেছি একটি নাম…। সিদ্দিক স্যারও বোঝে নাই আমার নকলবাজি। ছাপায়া দিছে। আর আমার নাম ছড়ায়ে গেল স্কুলে। ঠিক তখনই আমার আমডারা গাঁয়ে অগ্নিকাণ্ড হলো। ছাই হয়ে গেল উঁচু বারান্দাওয়ালা আমার কাঠের বেড়ার স্নিগ্ধ বাড়িটা। কাঁঠাল গাছের ছায়াটা ছাই হলো।
আমি আবার কুকিকালিদাশ গাঁয়ে। আমার কী মজা! কুকিকালিদাশে প্রত্যেক সন্ধ্যায় কীর্তন শোনা যায়। যাত্রা-সার্কাস হয় গাঙনগরের মেলাতেও। কুকিকালিদাশের ছেলেরা সুন্দর করে কথা বলে। মেয়েরা পয়-পরিষ্কার থাকে। কিন্তু হঠাৎ একদিন সন্ধ্যার আবছা আলোয় আব্বা এসে আমাকে নিয়ে চলে যায় উত্তর সীমান্তের বন্দর রাণীশংকৈলে।
আমি পাল্টে যেতে থাকি সেখানে। হাতের কাছেই পত্রিকার দোকান। সেখানে নবারুণ, সচিত্র বাংলাদেশ, রহস্য পত্রিকা, শিশু শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, রোমেনা আফাজ, মাসুদ রানা, অনুবাদ, বিজ্ঞান না কোরান আরো কত কী! আমি পড়ি। আব্বার কষ্টের টাকা নষ্ট করি বই কিনে। সীমান্ত ঘেঁষা নেকমরদ হাট থেকে ভারতের অ্যাভন সাইকেল একটা কিনি একদিন। তাতে চড়ে সাাঁওয়াল পল্লি, ওরাঁও পল্লি, মালদইয়া পাড়া, রামরাই দিঘি, শালবন চষে বেড়াই। বন্দরের যুবসংঘে নাটক করি। আর প্রেমে পড়ে যাই বেলি আন্টির! একই বিল্ডিংয়ের বেলি আন্টি। তিনি আমায় আদর করেন আর আমি গলে গলে তছনছ হয়ে যাই। কাউকে বলা যায় না সে কথা। তাই লিখি। লিখে লিখে সরকারি কোয়ার্টারের পেছনের শিবদিঘির জলে ভাসিয়ে দিই। একদিন আমার লেখা একটা পাতা দিঘির জলে না গিয়ে উড়তে উড়তে পড়ে মুনসেফ আঙ্কেলের বাবরি চুলের উপর। হাত দিয়ে মাথার ছাদ থেকে নামিয়ে সেটা পড়ে তিনি মুচকি হাসেন। বলেন, ‘লেখ বেটা, ভালোই হচ্ছে’। আমি লজ্জায় আর কোনোদিন লিখি না। আবারও তো উড়ে উড়ে কারো হাতে পড়বে। হায় হায় আমার গভীর গোপন জীবন তো জেনে যাবে মহাবিশ্ব! সমাজ আমাকে শিখিয়েছে সত্য প্রকাশ না করতে। আমার খাতার ছেঁড়া পাতাগুলোতে আমি যে বানিয়ে লিখি না। রবীন্দ্রনাথ কি বানিয়ে লিখতেন? রবীন্দ্রনাথের কী কপাল যে ‘পোস্টমাস্টার’ লিখে তাকে লজ্জা পেতে হয় নি। চিঠিপত্তরগুলোতে কত সুন্দর করে মনের কথা বলেছেন তিনি। লজ্জা তো দেয় নি কেউ তাঁকে। সেগুলো পড়তেও তো কেউ লজ্জা পায় না। মুনসেফ আঙ্কেলের রঙিন টেলিভিশনে রেখা যখন নাচে নাভীতে ঢেউ তুলে, কেউ আমরা সে নাচ দেখতে তার ঘরে গেলে তিনি লজ্জা পান না। কিন্তু আমি যে তুচ্ছ বালক, মনের কথা প্রকাশ করতে শরম পাই; আমি আর লিখব না তাই। রবীন্দ্রনাথকে কেই বা সামনা-সামনি চেনে! কাজী আনোয়ার হোসেন রানা-সোহানার যে বিবরণ দেন তাতে তাকে কেই বা দোষ দেবে, তিনি তো লেখক। আমি কি করে এসব লিখব! আব্বা জানলে মারবে! আর লিখব না তাই। না, লিখি নি। যতদিন না রংপুরের লিজি আপা আমাকে একদিন অভিযাত্রিক্ল-এ নিয়ে যায়। সেখানে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতোই একজন আছে। নাম তাঁর শহীদুর রহমান বিশু। তিনি আমাকে প্রতি শুক্কুরবার দাওয়াত দেন। লিজি যদি না-ও যায় তবু যেন আমি যাইজ্জএইসব বলেন। সেখানে আরজু যায়, ইঝন যায়, জিপশি যায়, রুবি যায়। মাথা নিচু করে বসে থাকতে হয় না সেখানে আমডারার মতো। মনে তখন মাসুদ রানা হওয়ার স্বপ্ন। রানা মাসুদকে একদিন সে কথা বলি। জিমনেশিয়ামে যাই। জুডো-কারাত করি। জেড.এইচ.খান টিপু তো আমার কাছে মাসুদ রানাই। তার বান্ধবী রুনিই তো আমার দেখা বাস্তব সোহানা। তাদের নিয়ে পদ্য লিখে বিশুদা’কে দেখাই। তিনি আবার সেটা আসরে পাঠ করতে বলেন। তাই নিয়ে বিজ্ঞ লোকের মতো আলোচনা করেন জুয়েল মমতাজ (হায় এই লোকটা এখন নানান কোম্পানির হিসাব পর্যবেক্ষণ করতে করতে অন্ধ হয়ে গেছে!) আমার কালো মুখটাও শরমে লাল হয়ে ওঠে। কবিতাচর্চা কম হয় নি। কিন্তু একটাও কবিতা লিখতে পারি নি আমি। অলঙ্কার, উপমা, মেটাফোর, চিত্রকল্পজ্জসব ছুঁয়ে দেখি, কিন্তু কবিতার মায়াবী শরীর ছোঁয়া হয়ে ওঠে না। ছুঁতে চাইও না। আমি বড়বেশি সরাসরি বলতে চাই। কিন্তু ক্যামনে? বললেই কে শুনবে? পড়বেই বা কেন আমাকে? আমি কি আর ইলিয়াস নাকি যে আমার লেখা ছাপবে? হাসান আজিজুল হককে যেদিন প্রথম দেখলাম মনে হলো, আরে, কী আশ্চর্য, কালো, কৃষকের মতো সরলমুখের সাদামাটা পোশাকের এই লোকটাই এত বড় লেখক! কথাশিল্পী! তাইলে যেকেউ লিখতে পারে! লিখতে গেলে নাম লাগে না, চেহারা লাগে না, বংশশক্তি লাগে না, পলিটিক্যাল পাওয়ার লাগে না, জমিদারি লাগে না, দারিদ্র্য দ্বারা মহান হওয়া লাগে না, শোষিত, শোষক কোনো পরিচয়ই তো লাগে না! লিখলেই কেউ এসে পড়বে এমনটাও তো সবসময় লাগে না। বাহ! বাহ! ওয়ালমেছ মামাও আসলে লেখক। হালি বু’ও লেখক। কেউ তাদের জানুক আর না জানুক। তুলোট কাগজের উপর যারা মন্ত্র লিখে দশগাঁয়ে পণ্ডিত হিসেবে খ্যাত ছিলেন তারাও তো বড় বড় লেখক। আমিও লিখবো। কিন্তু কাউকে কবো না। নিজে থেকে দেখাবো না। কেউ বললে অবশ্য…
রাশেদ কাঞ্চন হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন আমার ভেতরের অস্থিরতা। বলে¬ন একটা গল্প লিখতে। লিখলাম। গল্পের নাম তিনিই ঠিক করলেন। ‘সুখলোকে যাত্রা’। তাদের পত্রিকার নাম শাশ্বতিক। পত্রিকাটা বেরোনোর পর আমি একদিন সম্পাদক আমিরুল ইসলামের (রাবি-র সেকশন অফিসার ছিলেন) টেবিলে গেছি। দেখি কবি আবুবকর সিদ্দিক তার সামনে। কবিকন্যা তৃষা আর বিপাশাকে আমি তখন পড়াই। তো কবিকে দেখে আমি দরোজার আড়ালে অপেক্ষা করতে থাকি। কান খাড়া করে শুনি, আবুবকর সিদ্দিক বলছেন, এই নূরুননবী শান্তটা কে? গল্পটা অন্যরকম লাগলো! ভাষাটা তো নতুন! তবে শেষটা নিয়ে সে আরেকটু ভাবতে পারে, ওকে বলবেন তো, আমীরুল। ততদিনে আবুবকর সিদ্দিকের কুয়ো থেকে বেরিয়ে আমি কয়েকবার পড়ে ফেলেছি। তাঁর প্রবন্ধের ভাষায় আমি কুপোকাত। জলরাক্ষস কেমনে লেখা সম্ভব হলো সেসব প্রশ্ন নিজের কাছেই তুলতে শুরু করেছি। এরকম একজন মহান ¯্রষ্টা বলছেন আমার গল্পটা নাকি অন্যরকম হয়েছে। ভাষাটা নতুন নতুন লাগে। আমি আর আমীর ভাইয়ের টেবিলে যাই না। শরম লাগে। কবি যদি বুঝে যান যে, ওনার মেয়েদের হাউস টিউটরটাই সেই লেখক, সেই ভয়। কিন্তু বেশ একটা রোখ চেপে বসে। এই গল্পটা আমি অনেকবার লিখি। শেষটা নানা রকম করি। আরো কয়েক জায়গায় ছাপতে দেই। সবশেষে সমকালের কালের খেয়াতেও দেই। সে অনেক আগের কথা। কালের খেয়ায় ছিলো রংপুর অঞ্চলের ভাষায় লেখা সংস্করণ। তবু শেষাবধি সে গল্পটিকে আমি ঠিক বইয়ে ছাপানোর উপযুক্ত ভাবতে পারি নি। কেমন করে এই ঘটনা ঘটলো? লিখলাম, সেটা নিয়ে স্বনামধন্য সৃষ্টিশীল একজনের মন্তব্য আড়ি পেতে শুনলাম, তারপর সেটা আবার করতে চাইলাম। এমন একটা কাজ যা করে টাকা হয় না, ভাত হয় না, পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার মতো কিছু একটা পাওয়া পর্যন্ত যায় না!
কিন্তু, তবু, কেন যেন, কীভাবে যেন, আমি লিখে চলেছি। নিয়মিত যে খুব তাও নয়। তবে লিখতেই হয় মাঝে মাঝে। কে যেন বলে ভেতর থেকেজ্জএই লেখ্; যতো তাগিদ থাকে থাকুক রুটি-রুজির, লিখতে বস্। কে যে মাথার ভেতর হাতুড়ি পেটাতে থাকে মাঝে মাঝে, চিনিও না তাকে! কিন্তু আমি হন্যে হয়ে বসি। না লিখলে যেন গা-হাত-পা চিড়বিড় করে। এসবের মানে কী, সত্যিই আছে কি কোনো গুরুত্ব? আমি কি ছাই জানি নাকি অতশত! আমার রূপকথাগুলো, আমার বস্তুজগৎ, আমার স্বপ্ন, প্রত্যাশা, হতাশা, কাম, ক্রোধ, একাকিত্ব, পরিবেষ্টন, সাহস, দুর্বলতা, ক্ষুধা, রসনা, বাসনা, ভঙ্গি, ভয় সবকিছু একসাথে প্রদর্শন করতেই কি লিখি? বিশেষ কোনো ইচ্ছাপূরণের জন্য? খ্যাতি? অমরত্ব? নাকি নিজের সদাপরিবর্তনশীল ক্ষণস্থায়ী জীবনের সংকট ও সম্ভাবনা মানুষের সাথে ভাগাভাগি করার বাসনা? কেউ কি এইসব অবৈষয়িক আপাত অলাভজনক কারবারের ভাগ নিয়ে কাজের সময় নষ্ট করে আসলে? দুনিয়া তো কেজো লোকে ভর্তি! রবীন্দ্রনাথের ভুলস্বর্গে প্রবেশ করার বাসনা তাহলে কেন হলো? এইসব বাসনা মনুষ্যসমাজে, ক্রমবিবর্তমান সভ্যতার কিংবা অসভ্যতার নানান কালপর্বে কিছুই কি অর্থ বহন করে? টিকে যায় কি কি? মহাকালে কিছুই কি টেকসই? কতটা সময়কালের জন্য? টেকসই না হলেই কি সেটা ভঙ্গুর, ক্ষণস্থায়ী? এ জীবনের মতো? ঠিক জানি না! সম্ভবত জানার চেষ্টা হিসেবে আমি লেখাকে বেছে নিয়েছি! ‘সম্ভবত’ বলতে হচ্ছে, কেননা, আসলেই তো জানি না কেন লিখি!
কী লিখি তা হয়তো একরকম চিহ্নিত করা যায়। সঠিকভাবে চিহ্নিত করা যায় কী না সে প্রশ্ন তুলছি না নিজের কাছে। তবে যায় বটে একরকম। আমার লেখালেখির মধ্যে কতটা আমার নিজের কথা? সাধারণত নিজের দৃষ্টিভঙ্গি এড়িয়ে যাওয়ারই তো চেষ্টা করি বলে বোধহয়। তবে চেষ্টা করে কি সাহিত্য তৈরি হয়? হয় কখনোসখনো। বেশিরভাগ সময় লিখতে লিখতে মনে হয় একটা কিছু পাচ্ছি। তারপর বিচার করো, আগেও কি এরকম কেউ লিখেছে? হুম, লিখেছে, দেখতে পাচ্ছি। শুনতেও পাচ্ছি। তবে ওটা বাতিল। রিপিটিশন। বাদ দিই। বই পড়ে লেখা কঠিন। আগেরকালের লেখা আবার লিখিত হয়ে যায়। তখন মানুষের কাছে শোনা গল্পগুলো লিখি। জীবন-যাপন, স্বপ্ন কল্পনা, আনন্দ, উল্লাস এই তো। এই বিষয়গুলোর পেছনের যুক্তি বেশি জানি না। যখন বুঝতে পারি মন এইরকম করতে চাচ্ছে। মানে লিখে একটা কিছু প্রকাশ করতে চাচ্ছে। মনকে কষ্ট দিই না তখন। মনের ইচ্ছাটা অবদমিত না রেখে সাধারণ একজন খামখেয়ালি মানুষের মতো ইচ্ছাপূরণ করে ফেলি। বিষয়টা কার কাছে কেমন লাগবে না ভেবেই করি। অথচ এই আমি কী না গুটিপোকার মতো নিজের ভেতরে গুটিশুটি মেরে দুমড়ে-মুচড়ে গড়াতে গড়াতে চলেছি, বাল্যে! কিন্তু ঠিকঠাক স্বপ্নটা, মনের ইচ্ছেটা প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে এমনটা মনে করার সময়ে আমি উপনীত হই নি একবারও। মনের রঙ শব্দ দিয়ে ফুটিয়ে তোলার প্রাণান্ত ক্লেশ শেষে ছোটগল্পের শরীরে, আখ্যানে বেজায় খুঁত ধরা পড়ে। ফলে আর লিখতে ইচ্ছে করে না। শব্দ দিয়ে যে ছবি আঁকতে চাই, যে চিন্তা উগরে দিতে চাই, যে গল্পটা তৈরি করতে চাই বা বলতে চাই, তা হয়ে ওঠে না বলে দিনের পর দিন চুপচাপ বসে থাকি। তারপর হঠাৎ কে যেন মাথায় হাতুরি পেটাতে থাকে। আবার লিখি আচমকা। আবার একই অপূর্ণতা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করতে থাকে আমার সমস্ত অস্তিত্ব। কিন্তু পূর্ণতায় একবার অন্তত অবগাহনের অদমনীয় ইচ্ছেটা লাফালাফি করে, একই গ্লানি-বেদনার জগতে আমাকে আহ্বান করে। মনে হয়, কী করেই বা কী হয়? লিখে কিছু না হলেই বিশ্বজগতের এমন কী আসে যায়? কিন্তু পারি না আর দূরে সরে থাকতে। এও এক প্রকার প্রেম। কামও। অতএব ফিরে ফিরে আসি লেখার চেষ্টার কাছে। ভয়ে ভয়ে থাকি লেখা হওয়া-না-হওয়া নিয়ে। ভয়কে জয় করা হয়ে ওঠে না। জয় করতে চাইও না আসলে। তাই, নিজের প্রতিপক্ষ হয়ে দাবা খেলে চলেছি যেন।
আমার তো দুই রকম লেখা। সাহিত্য আর অসাহিত্য। অসাহিত্য লিখি সোজা করে সমাজটাকে, দেশটাকে, দেশের মানুষকে, মাটিকে, মানুষের সামাজিক ভিত্তিগুলোকে পর্যবেক্ষণ করার অভিজ্ঞতা বয়ান করার জন্য। আর ঐ যে স্বপ্ন, আহা! পরিচিত মানুষগুলো এমন হলে হতো, তেমন চর্চায় লিপ্ত থাকলে হতো; সংবিধানটা অন্যরকম হতে পারতো; কৃষক আর কৃষিমন্ত্রীর একই রকম বাড়ি থাকলে হতো, সাদা-কালো-ধর্ম-অধর্মের অসাড় তর্ক বন্ধ হতো যদিজ্জএইসব প্রকাশের উৎসাহ চরিতার্থ করতে পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতাগুলোর উপর ভর করি। বন্ধুরা এই প্রবণতার নিন্দায় মুখর। তবু মনের বিরুদ্ধে যাই না। মনকে বলি, তোমার কথাই শেষ পর্যন্ত রাখবো। তোমারই চেতনার রঙে নিজের রূপ বিসদৃশ হয়ে উঠলেও আক্ষেপ নেই। মন, তুমিই আমার একমাত্র সর্বময় নিয়ন্ত্রক। কিন্তু এই যে কিঞ্চিত সাহিত্য করি, এর উপরে মনের নিয়ন্ত্রণ সবসময় খাটেও না ছাই। শব্দ আর বাক্য নিজেরাই খানিকটা অটোক্র্যাট আচরণ করে। আমিও মেনে নিই শব্দে নির্মিত আখ্যানের আচরণ। একটা জিনিস লক্ষ্য করি, ক্রমাগত বিশেষণ আমাকে ছেড়ে যাচ্ছে। খুব চাছাছোলা বাক্য তৈরি হচ্ছে। হোক, জোর করে কিছু আরোপ করতে চাই না। শব্দেরা স্বাধীনভাবে সজ্জিত হয়ে যা দাঁড়ায় তা যেমনই হোক, সেটাই আমার লেখালেখি। তাতে কী থাকে আর কী থাকে না তা নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করে না। প্রতিষ্ঠিত পণ্ডিতদের ছক তাতে না থাকলে আমি কি আর জোর করে ছক বানাতে পারি! মানুষের ভাষা ও চিন্তা কাঠামোর মধ্যে পড়ে কি সীমাবদ্ধ হয়ে হাসফাঁস করে না? আমার তো মনে হয়, করে। প্রমিত, অপ্রমিত, প্রাচ্য, পাশ্চাত্য, শ্লীল, অশ্লীল, সমাজ-স্বীকৃত বা প্রতিষ্ঠিত নৈতিকতা বর্জিত, ব্যাকরণ সিদ্ধ বা বিশৃঙ্খল, শেষ হয়েও শেষ না হওয়া বা এভাবেও বলা যেত ধরনের কোনো কিছুই আমাকে স্পর্শ করে না। মানুষে-মানুষে সম্পর্কের স্বাভাবিক ধরনের ভেতরেও অসমর্থিত অসহ্য এক ধরন যদি এসে পড়ে, তাতে যা কিছুই আহত হোক, যেই নাক সিটকাক, আমি এর বাইরে যেতে পারি না। সবচেয়ে বড় কথা আমি জ্ঞানী মানুষ নই। সূত্র, সংজ্ঞা, দর্শন, তত্ত্ব, ধর্ম ইত্যাদি জ্ঞান আমার নাই। তাই তা ফলানোও হয় না। কোনো কিছুতে বিশ্বাস যেমন পাই না, ঘোর অবিশ্বাসও পাই না। দ্বিধা আমাকে ঘিরে রাখে। দ্বিধার কোনো পিঠ কোনো এক গল্পে যদি দেখাই তো অন্য কোনো রচনায় অন্যপিঠ ভেসে ওঠে। আমি নিশ্চিত নই কোনো কিছু সম্পর্কেই। এমনকি আমি কেন লিখি, কী লিখি তাও ঠিকঠাক জানি না। তবু লিখি। হয়তো লেখালেখি আমার দ্বিধার আধার। পাঠক আমাকে মন্দ কিংবা ভালো বললেই আমি দ্বিধাহীন হয়ে উঠতে পারি না। শরীরের ভেতরে একইসাথে আমি টের পাই উত্তেজনা ও অসাড়তা, আশার আগুন ও হতাশার গ্লানি, পরিতৃপ্তি ও পিপাসা। সংসার, সমাজের হিসেব, রুটির ধান্দা, রাজনীতির নির্লিপ্ততা ইত্যাদি মাড়িয়ে আমার চেতনার বৈপরিত্যগুলো আমাকে কোথাও তো রাখতে হবে! এগুলো আমি গল্পের ভাঁজে, অগল্পের তলায়, গদ্যের তাকে, অগদ্যের বগলের নিচে রেখে দেই। কেউ দেখতে পায়, কেউ পায় না। কাউকে ডেকে এনে দেখানোর স্পৃহাও জাগে না। কেউ তা তলিয়ে দেখার গরজ বোধ করুক তেমন প্রত্যাশাও করি না। হঠাৎ কেউ আমার লেখায় থুতু দিলে আহত হই না, আমার লেখায় চুমু দিলে শিহরিতও হই না। কেবল নিজের দ্বিধাগুলো নানানভাবে লেখার মধ্যে রেখে দিই, হারিয়ে ফেলি, আবার রাখি, ফেলে দিই, আবার তুলে নেই, আবার…
আমি কি আসলে আমাকেই লিখি? আর নানান জীবনের ফাঁক গলিয়ে খুঁজতে থাকি নিজেকেই? আমার সমগ্র শরীরে লেপ্টে থাকা ত্বকের কৃত্রিম রঙ মেলে ধরি, রাজকন্যার অপার্থিব রূপের ভেতরে মানুষের সমতার প্রতি বিরূপ মনোভাব আবিষ্কার করি, শহর আর গাঁয়ের ব্যবধান উপরে ফেলে হাসি, নারী আর পুরুষের ভিন্নতা অস্বীকার করে চিৎকার করতে থাকি, হালি বু’ আর ঐশ্বরিয়া রাইকে একই আসনে নাচাই, বলি, দেখুন, বিশুদা আর শরৎচন্দ্রে কোনো তফাৎ নাই, মনিরুজ্জামান আর সিদ্দিক স্যার তো আসলে একই ব্যক্তির দুইরূপ প্রকাশ, জীবন সত্য, মৃত্যুও সত্য ইত্যাদি ইত্যাদি। মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থেকেই যাপিত হোক লেখক জীবন। কিন্তু আসলে এইসবই আমি বলতে চাই কী না, স্পষ্ট জানি না। আমডারা আর কুকিকালিদাশ ভিন্ন দুটি গ্রাম কী না সন্দেহ হয়। দ্বিধা আমাকে তছনছ করতে থাকে। সুতরাং উদ্ধার পেতে লিখি। কেউ বাধ্য করে না, উৎসাহ দেয় না, নিরুৎসাহিতও করে না। জীবন এরকমই প্রবহমান অজ্ঞতার অশেষ অন্ধকার সুরঙ্গপথ; যার কোনো চূড়ান্ত রেখা নেই; আছে অসীমের দিকে যাত্রা। আসলেই জানি না, কেন জন্মালাম, কেন রিপুতাড়িত হয়ে ক্ষয় মেনে নিয়ে নিজেকে টেনে নিয়ে চলেছি আর মাঝে মাঝে লিখছি।

তিতাস-এর শেকড় ও কারুণ্যশ্রুতি ।। রকিবুল হাসান

রকিবুল হাসান

বাংলাসাহিত্যে নদীভিত্তিক আঞ্চলিক উপন্যাস তিতাস একটি নদীর নাম। অদ্বৈত মল্লবর্মণ(১ জানুয়ারি, ১৯১৪-১৬ এপ্রিল, ১৯৫১) এই একটি গ্রন্থের জন্যেই বাংলাসাহিত্যে অমরত্ব লাভ করেছেন। তিনি স্বল্পায়ু জীবনে সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় পদচারণা করলেও, পরিমাণের দিক থেকে তা বিশাল হিসেবে বিবেচিত হয় না। কিন্তু গুণগত মানে সেসবের গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি রাঙামাটি নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন। তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম হলো জীবনতৃষা। এটি তাঁর আরভিং স্টোনের লাস্ট ফর লাইফ-এর অনুবাদকর্ম। এ গ্রন্থটি মূলত শিল্পি ভিনসেন্ট ভ্যানগঘের জীবনী। তাঁর গদ্য-নিবন্ধগ্রন্থ ভারতের চিঠি-পার্ল বাক্কে। কবিতাও লিখেছেন ছোটবেলা থেকেই, বিদ্যালয়ে নিচু ক্লাশে পড়ার সময় থেকেই। কবিতা রচনার মাধ্যমেই অদ্বৈতের সাহিত্যজীবন শুরু। ছোটগল্পেও তিনি অসামান্য শিল্পি। তাঁর ‘স্পর্শদোষ’, ‘সন্তানিকা’ ও  ‘কান্না’ গল্পত্রয় তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। অদ্বৈত পেশাগতভাবে সাংবাদিক ছিলেন। নবশক্তি পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে পত্রিকার প্রয়োজনেই লিখেছেন নানা প্রবন্ধ-নিবন্ধ। দেশ পত্রিকাতেও গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রবন্ধ লিখেছেন। মোহাম্মদী, নবযুগ, কৃষক ও দেশ পত্রিকাতেও তিনি কাজ করেছেন। ভারতবর্ষ, মাসিক বসুমতী প্রভৃতি উচ্চশ্রেণির পত্রিকাতেও গল্প ও প্রবন্ধ প্রকাশ পেয়েছে।
তিতাস একটি নদীর নাম বাংলাসাহিত্যে অসামান্য মর্যাদায় সমাসীন। বাঙালি পাঠকের কাছে উপন্যাসটি পরম আদরে সমাদৃত। বিদেশি সাহিত্যেও এমন উপন্যাস আছে। এ ধারার লেখকদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য মারিয়া এজওয়ার্থ, টমাস হার্ডি, আর্নল বোনেট, উইলিয়াম ফাকনার, মিখাইল শলোকভ, এমিলিয়া পারডো বাজান, গ্রাজিয়া ডেলেহডা, ইভান সাংকার, জিন গিয়োনো। বাংলাসাহিত্যে এ-ধারার প্রধান লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী, সমরেশ বসু প্রমুখ। নদীনির্ভর আঞ্চলিক এ উপন্যাসগুলো বিষয়বস্তুতে মিল থাকলেও এদের দৃষ্টিভঙ্গি, চরিত্রনির্মাণশৈলী, ভাষাপ্রয়োগ আলাদা। তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের লোক-উপাদান, গঠনশৈলি, চারিত্র্যবিচার, মনোস্তত্ত্ব জ্জবিচার্য বিষয়।
তিতাসের ছবি বুকভরা জলের মতো, কখনো আবার নদীর শুকনো বুকে ফসলের ক্ষেত, বিদেশি সংস্কৃতির দাপটে নিজেদের সংস্কৃতির ভেঙে পড়া, জীবন বদলের নানামাত্রিক ছবি এ উপন্যাসের পরতে পরতে সাজানো। যা কখনো আনন্দের, কখনো সর্বস্ব হারানো বুকভাঙা কান্না-আর্তনাদ-আহজারি। গ্রাম-বাংলার জীবনে চিরপরিচিত এক উৎসব নৌকা বাইচ। এ ছবিও উপন্যাসে আছে। নৌকা-প্রতিযোগিদের উৎসাহ দেবার জন্যে নানামাত্রিক গান গাওয়া হয়। এর বাইরেও বিভিন্ন ধরনের গান এ উপন্যাসে ব্যবহৃত হয়েছে। মুর্শিদা গান, বাউল গান, মারফতী গান, পদ্মাপুরাণ গান, পুঁথি পড়া এসব আছে। এ উপন্যাসে গানে গানেই যেন তিতাসের স্রোতের মতো জীবনপ্রবাহ প্রবাহিত হয়েছে। তিতাসের ইতিহাস আছে। তিতাসের ইতিহাসতো ‘সত্যের মতো গোপন হইয়াও বাতাসের মতো স্পর্শপ্রবণ’। যে ইতিহাসে যুক্ত হয়ে আছে তিতাসের পাড়ের মালোদের জীবনের আনন্দ-বেদনার জীবন-উৎসবের অপরিহার্য অনুষঙ্গেজ্জযেখানে ধাঁধাঁ, লৌকিক ক্রীড়া, আনন্দ-অনুষ্ঠান, রূপকথা, গল্প বলাজ্জউপন্যাসটির গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রকৃতির রঙও তিনি ধরেছেন অসামান্য দক্ষতার সঙ্গে। বাংলার বারো মাসের স্বভাব-চিত্র ছবির মতো করে এঁকেছেন তিনি। যেন প্রকৃতিকে স্পর্শ করা যায়, তার ঘ্রাণও অনুভব করা যায়। প্রকৃতির সাথে একাত্ম হলেই কেবল এ ধরনের চিত্র আঁকা সম্ভব। যেটি কবি জীবনানন্দের কবিতায় আমরা পাই।
তিতাসে মালোদের নিজস্ব সংস্কৃতি পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে। যে সংস্কৃতি ‘মালোরা  প্রাণের সঙ্গে মিশাইয়া লইয়াছিল’। অদ্বৈত-এর ভাষায় :
গানে গল্পে প্রবাদে এবং লোকসাহিত্যের অন্যান্য মালমসলায় যে সংস্কৃতি ছিল অপূর্ব। পূজায় পার্বণে, হাসি ঠাট্টায় এবং দৈনন্দিন জীবনের আত্মপ্রকাশের ভাষাতে তাদের সংস্কৃতি ছিল বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। মালো ভিন্ন অপর কারো পক্ষে সে সংস্কৃতির ভিতরে প্রবেশ করার বা তার থেকে রস গ্রহণ করার পথ সুগম ছিল না।
এ-সংস্কৃতি ভেঙে পড়ার যন্ত্রণা যেমন আছে, তেমনি শাহরিক নতুন সংস্কৃতিও যে মালোদের জীবনে যুক্ত হয়েছে অপরিহার্যভাবেইজ্জনতুন জীবনের এক মুগ্ধ ঘ্রাণে যেন মালোরাও একসময় আপন সংস্কৃতি ভুলে-বসে। নৌকা-দৌড় খেলা তো মালোদের জীবনেরই এক অপরিহার্য জীবনখণ্ড। নৌকা-দৌড় বা নৌকা বাইচ ঘিরে তাদের আবেগ ও আয়োজন জীবন-উৎসবের রূপ নেয়Ñ যেন আনন্দে জেগে ওঠে গোটা মালো সম্প্রদায়। যে-স্থানে নৌকা-দৌড় হতো সে-দিক লক্ষ করে ছোট বড় নানা আকারের পালের নৌকা ছুটে আসতো। নৌকাতে পুরুষের চেয়ে স্ত্রীলোকই বেশি থাকতো। এদিন তিতাসের দুপাড় যেন আরো মোটা হয়ে উঠতো। দুপাড় ঘেঁষে হাজার হাজার ছোট বড় ছইওয়ালা নৌকা খুঁটে পুঁততো। কোথাও আবার বড় বড় নৌকা গেরাপি দিতো। আর গেরাপি দেয়া এসব এক একটা নৌকাকে ঘিরে দশ বিশটা ছোট নৌকা আশ্রয় নিতো। নৌকা থেকে নানারকমের গান ভেসে আসছে। মনখুলে উৎসবে মেতে সবাই গান গাইছে। প্রাণের ঢেউয়ে যেন তিতাসের স্রোত বয়ে চলেছে, আর তাতে মিশে গেছে কতো রকমের যে সুর :
আমার বন্ধু ঢাকা যায়, গাঙ্ পারে রান্ধিয়া খায় গো,
অ দিদি, জোয়ারে ভাসাইয়া নিল হাঁড়ি কি ঘটি কি বাটি গো
অ দিদি প্রাণ বন্ধুরে তোরা ডাক দে।

আমার বন্ধু রঙ্গিঢঙ্গি, হাওরে বেঁধেছে টঙ্গি গো
অ দিদি, টঙ্গির নাম রেখেছে উদয়তারা কি তারা কি তারা গো
অ দিদি প্রাণ বন্ধুরে তোরা ডাক দে।

আমার বন্ধু আসবে বলি, দুয়ারে না দিলাম খিলি গো,
অ দিদি ধন থুইয়া যৈবন করল চুরি, চুরি গো কি চুরি, চুরি গো,
অ দিদি প্রাণ বন্ধুরে তোরা ডাক দে।
নৌকা প্রতিযোগিদের উৎসাহ প্রদান এবং নৌকা-দৌড় দেখতে আসা নারীপুরুষদের আনন্দ দেয়ার ব্যাপারটি এ গানে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এ গানে ফুটে উঠেছে প্রেমের আকুতি। কাল্পনিক একটি চিত্রও এ গানে লক্ষণীয়জ্জঢাকায় গিয়ে বন্ধু নদীর পারে রান্না করে খায়। রান্নার আসবাবপত্র জোয়ারা ভেসে যাওয়ার কথাও গানে আছেজ্জযা কল্পনাপ্রসূত। আবার এ গানে ব্যক্তি-চরিত্রও ব্যবহৃত হয়েছে। ‘উদয়তারা’ নাম ব্যবহার করে গানটিকে বাস্তবের কাছাকাছি করে ছোঁয়ার চেষ্টা আছে।
নৌকা দৌড়ের সময় বেশকিছু গানের ব্যহার আছে। এক এক নৌকা থেকে ভেসে ওঠে এক এক ধরনের গান। গদ্যভাবের গানও আছেজ্জ‘চাঁদমিয়ারে বলি দিল কে, দারোগা জিজ্ঞাসে, আরে চাঁদমিয়ারে বলি দিল কে।’ একটা গানের সংগে আর একটা গানের কোন মিল নেই। কথা সুর সব আলাদাÑভিন্ন ধাঁচের। অন্য আর একটি গানের কথা :
জ্যৈষ্ঠি না আষাঢ় মাসে যমুনা উথলে গো
যাইস না যমুনার জলে।
যমুনার ঘাটে যাইতে দেয়ায় করল আন্ধি
পান্থহারা হইয়া আমরা কিষ্ণ বলে কান্দি।
অন্য নৌকা থেকে ভেসে আসে :
আম গাছে আম নাই ইটা কেনে মারে
তোমায় আমায় দেখা নাই আঁখি কেনে ঠারো
তুমি আমি করলাম পিরীত কদমতলায় রইয়া
শত্তুরবাদী পাড়াপড়শী তারা দিল কইয়া।
রাধা-কৃষ্ণের প্রেম-বিরহ-বেদনা আকুতি-আর্তনাদ ফুটে উঠেছে এ গানে। মর্মস্পর্শী আকুতিভরা গান আরো আছে :
প্রাণবন্ধু গড়াইয়া দিছে ইলশাপাট্য নথ
সে নথ পইড়া গেল রে
কাল সারা রাত কোথায় ছিলি রে।
সব গানেই নানাভাবে উঠে এসেছে প্রেম ও প্রেমের বেদনা। বিশেষ করে বিরহ-জ্বালা এ সব গানের মূলভাবে স্থান করে নিয়েছে। জীবনের শেকড়ের গান হয়ে উঠেছে এসব গান। স্রোতবিহীন নদী যেমন মরা, তিতাসবিহীন জীবন যেমন মালোরা ভাবতে পারে না, এসব গানও যেন তিতাসের স্রোতের মতোই জেগে থাকে গ্রাম-বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনে। প্রেম এখানে শরীরী প্রেম হয়ে ওঠে নি, রাধা-কৃষ্ণের প্রেম অপার্থিব এক শান্তি-বারতা তৈরি করে সরল মানুষের মনে। এগানগুলোতে আদিরসের ঘ্রাণ থাকলেও, স্থান-কালের উল্লেখ থাকলেওজ্জএসব ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে লৌকিক সংস্কৃতিবোধ। মুর্শিদা বাউল গান, পুঁথি, কেচ্ছাজ্জএসবও ব্যবহৃত হয়েছে তিতাসে। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের নদী-বিহারীদের এসব নিজস্ব সম্পদ। বুকের গহিনে এসব লালন করে তারা। নদী-বিহারীদের জীবনের শেকড়ের সাথে বাংলার মুর্শিদা বাউল গান, বারোমাসি গান, পুঁথি, রাধা-কৃষ্ণের প্রেম-লীলা এরকম নানামাত্রিক গান যুক্ত। এসব বাদ দিয়ে তাদের জীবন হয় না। তাদের আনন্দ-বেদনার সাথে এসব গান একাত্ম হয়ে মিশে থাকে। তাদের জীবনেরই যেন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এসব মরমী সংগীত। নৌকা দৌড় এখানে আর শুধু দৃশ্যবস্তু থাকে না, গানে গানে নৌকা দৌড় পেয়ে যায় ভিন্নমাত্রা। তিতাসের স্রোতের মতোই গানও যেন প্রবাহিত হয়ে ওঠে সুরের ঢেউয়ে ঢেউয়ে। কখনো তা উৎসাহব্যঞ্জক, কখনো উদ্দেশ্যমূলক, কখনো আবার চিরায়ত প্রেমের স্বরূপেজ্জমানব-মানবী ব্যক্তি পাওয়া না-পাওয়া কখনোবা তা রাধা-কৃষ্ণের অপার্থিব প্রেমসাধনা।
নৌকা দৌড়ে নৌকা ছাড়াও ‘প্রকাণ্ড মাটির গামলা বিচিত্র রঙে সাজাইয়া’ তিতাসের বুকে ভেসে পড়তো। উৎসবের এওতো এক ভিন্ন রঙÑএদের মুখে গান-ছন্দ না থাকলেও ‘ফেশন করিয়া চুল দাড়ি ছাঁটাই করা, মাথায় জব্ জবে তেল, পরিষ্কার রুতির ওপর গায়ে সাদা গেঞ্জি’ ঠিকই থাকতো। বাইচের নৌকার সাথে প্রতিযোগিতা তাদের মূল উদ্দেশ্য থাকতো না। গ্রাম গ্রামান্তরের মেয়েদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলেই তারা খুশি হতো। তিতাস পারের সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র অনবদ্যভাবে তুলে ধরেছেন। কল্পনার রঙ একটুও না লাগিয়ে বাস্তবতার গায়ে শুধু কাব্যিক-ভাষাটুকু বসিয়ে দিয়েছেন।
গ্রাম-বাংলায় নদীভিত্তিক এলাকায় বেদেনীরা নৌকা-করে এসে নোঙর ফেলে। এর পর আশপ